Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

‘যত সুর সবই তোমার, যত গান সবই তোমার’

অতনু মৌলিক

আগস্ট ৪, ২০২৬

Kishore Kumar Birthday
Bookmark (0)
Please login to bookmark Close
(Kishore Kumar Birthday)

‘সলিলদা, আমাকে একবার চেষ্টা করে দেখবেন, ঠিক উতরে দেব’, শুনে আকাশ থেকে পড়লেন সঙ্গীত পরিচালক সলিল চৌধুরী, ‘বলে কী, এ পাগল! দ্বৈত কণ্ঠের গান, তাও পুরুষ ও নারীকণ্ঠ। একসঙ্গে গেয়ে দেবে? মজা হচ্ছে? নাছোড় গায়ক বলেন, ‘চরিত্রটি মহিলা সেজে গাইছে, আদপে পুরুষ, একেবারে সুললিত কণ্ঠমাধুর্য তো না থাকলেও চলে। তাছাড়া লতা, আশা কাউকে যখন এই মুহূর্তে পাওয়া যাচ্ছে না…’

নিমরাজি সলিল একবার চান্স নিলেন। আর, চমকে উঠলেন ওই আশ্চর্য প্রতিভার বিচ্ছুরণ দেখে, যুগপৎ মহিলা ও পুরুষ কণ্ঠে গান সাবলীলভাবে ধরছেন এবং ছাড়ছেন। কোনও জার্ক নেই, সুরচ্যুতি নেই। বুঝলেন এই প্রতিভা প্রথাগত নিয়মের উর্ধ্বে। শুধু মোহাবিষ্ট করতে এসেছেন। জন্ম নিল এক বিস্ময়কর সৃষ্টি ‘আকে সিধি লাগি’, ছবির নাম ‘হাফ টিকিট’।


আরও পড়ুন: বাংলা লোকগীতির চিরকালীন সম্রাট


আজ সেই প্রতিভা কিশোর কুমার গাঙ্গুলির ৯৭তম শুভ আবির্ভাব দিবস, ভারতীয় প্লেব্যাক গানের ইতিহাসে যিনি তর্কাতীতভাবে সর্বকালের জনপ্রিয়তম এবং নবীন প্রজন্মের কাছেও রেট্রো যুগের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য কণ্ঠ জিনিয়াস।

শচীন কর্তার মানস পুত্র

রাহুলদেব বর্মন কথায় কথায় প্রায়ই বলতেন, ‘আমি আমার বাবার ছোট ছেলে, বড় ছেলে কিশোরদা।’

Kishore Kumar Birthday
শচীন কর্তা ও কিশোর কুমার

দাদামণি অশোককুমার একবার সেই ‘বড় ছেলে’কে নিয়ে গিয়েছিলেন কর্তার কাছে। কর্তার গান কর্তার গলা নকল করে গেয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন কিশোর। জুহুরি চিনেছিলেন কাটা হিরেটিকে। অশোক কুমারকে বলেছিলেন ‘আমার কাছে রেখে যাও, আমি ওকে তৈরি করে নেব’। শুরুর দিকে কিশোর এড়িয়ে চলতেন শচীনদেবকে, বিরক্ত হতেন ওঁর অভিভাবকসুলভ কমান্ডিং এবং ডিমান্ডিং ব্যবহারে। কিন্তু কী এক অমোঘ আকর্ষণে যেন বাঁধাও পড়ে  গেলেন নিজের অজান্তে।

একদিন ট্রাফিক সিগন্যালে আটকা পড়া নায়ক-গায়ক কিশোরকে দেখে অবলীলায় নিজের গাড়ি থেকে নেমে কর্তা উঠে এলেন ‘বড় ছেলে’র গাড়িতে। নির্দেশ দিলেন ড্রাইভারকে— পাওয়াই লেক চলো।

মাঝপথে গাড়ি থামিয়ে জমির আলে নেমে ভাটিয়ালি সুরে মেঠো পথ ধরে যেন অচিনপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন কর্তা। বিরক্ত হলেও কিশোর মোহাবিষ্ট হয়ে ওঁকে অনুসরণ করলেন। চেতনারহিত হয়ে অনুভব করলেন যেন এখানেই মুক্তি, ওঁর কাছেই সঁপে দিলেন নিজেকে। তৈরি হল আরেক ইতিহাস। ‘গাইড’ ছবির ‘গাতা রহে মেরা দিল’ থেকে শুরু হল সেই নিঃশর্ত সমর্পণ। গুরুদক্ষিণা শেষ হল ‘মিলি’ ছবির ‘বড়ি শুনি শুনি হ্যায়’ -এর হৃদয়বিদারক হাহাকারে। রেকর্ডিং-এর সময় সুরকার এস ডি বর্মন প্যারালাইজড হয়ে বাহ্যজ্ঞানহীন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন। আর তার কিছুদিনের মধ্যেই নিলেন চিরবিদায়। সারা রাস্তা নগ্নপদে অশ্রুসিক্ত মানসপুত্র উদ্ভ্রান্তের মতো গেয়ে চলেছিলেন— ‘বড়ি শুনি শুনি হ্যায়, জিন্দেগি ইয়ে জিন্দেগি…’

একবার টাকার জন্য ‘পথের পাঁচালী’র কাজ বন্ধ। খবর পেয়ে টাকা দিলেন কিশোর। পরে গর্ব করে বলতেন ‘এই কাল্ট ছবিতে আমারও কন্ট্রিবিউশন আছে!’ বম্বে গেলে সত্যজিৎকে উঠতেই হত ‘গৌরীকুঞ্জ’-এ। কিশোরের বাড়িতে দুজনের অবারিত দ্বার। এক তার মানিক মামা আর তাঁর হেমন্তদা।

মানিকমামার প্রশ্রয়

গানের জগতে অভাবনীয় সাফল্য সত্ত্বেও সেভাবে গুরুত্ব বা সম্মান পাচ্ছিলেন না প্রথাগত তালিমহীন এই অনন্য প্রতিভা। ‘চারুলতা’ ছবির রবীন্দ্রসঙ্গীত তাঁকে এনে দিল সেই স্বীকৃতি ও সম্মান। সটান বলে দিয়েছিলেন সত্যজিৎ— ‘ছবির গানে এমন মেলুফ্লুয়াস ভয়েসের কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।’ আর পিছন ফিরে দেখেননি এই প্রতিভা। দেশ জয় করে নিয়েছিলেন।

Kishore Kumar Birthday
সত্যজিৎ রায় ও কিশোর কুমার

একবার টাকার জন্য ‘পথের পাঁচালী’র কাজ বন্ধ। খবর পেয়ে টাকা দিলেন কিশোর। পরে গর্ব করে বলতেন ‘এই কাল্ট ছবিতে আমারও কন্ট্রিবিউশন আছে!’ বম্বে গেলে সত্যজিৎকে উঠতেই হত ‘গৌরীকুঞ্জ’-এ। কিশোরের বাড়িতে দুজনের অবারিত দ্বার। এক তার মানিক মামা আর তাঁর হেমন্তদা।

একবার ‘অভিযান’ ছবির ইনডোর হচ্ছে, ক্যামেরায় লুক থ্রু করছেন সাত রাজার ধন আমাদের এক মানিক, সত্যজিৎ রায়। পিছন থেকে এসে কিশোর জড়িয়ে ধরে বলে উঠলেন ‘মানিক মামা, মানিক মামা করছ তুমি কী!’ সত্যজিৎ বললেন, ‘ব্যস হয়ে গেল কাজ। প্যাক আপ।’

স্বভাবচটুল কিশোর একদিন বললেন, একটি ছবি করবেন সত্যজিৎকে নিয়ে। তিনি পরিচালনা করবেন আর অভিনয় করবেন সত্যজিৎ। শর্ত একটাই, ওঁকে হাফপ্যান্ট পরে শুটিং করতে হবে। ভাবা যায়, সত্যজিতের মতো আপাত গম্ভীর মানুষকে নিয়ে এমন মজা আর তাঁর স্নেহ প্রশ্রয়!

ইতিমধ্যে প্রযোজক-পরিচালক শক্তি সামন্ত বলছেন রফিকে দিয়ে গাইয়ে নিতে, এ গান কিশোরের দ্বারা হবে না। রেকর্ডিংয়ের দিন রিহার্সালে খুব সাধারণ গাইলেন। শক্তি সামন্ত বললেন, রফিকে দিয়ে করিয়ে নিতে।

গুপি গাইনের চরিত্রচিত্রণে সত্যজিতের প্রথম পছন্দ ছিলেন কিশোরকুমার! কিশোরের ব্যস্ততা আর বম্বেতে শুটিংয়ের বাধ্যবাধকতায় সেটা আর বাস্তবায়িত হয়নি। কিন্তু ‘ঘরে বাইরে’ ছবিতে তিনটি গান রেকর্ডিং করতে বম্বে যান সত্যজিৎ। বিজয়া রায় ক্যাসেটে স্পুল পাঠিয়ে দিলে কিশোর সেটি আত্মস্থ করে খালি গলায় ‘বিধির বাঁধন’কে অমর করে দিয়ে গেলেন!

Kishore Kumar Birthday
রাহুল দেব বর্মন ও কিশোর কুমার

পঞ্চম— দ্য ফিফথ নোট এফেক্ট

‘দাদা একটা দারুণ গান বানিয়েছি, শিবরঞ্জনী রাগে, এর আগে ফিল্মে এই রাগে খুব কম কাজ হয়েছে। আপনি গাইবেন তো?’ 

‘রঞ্জনী টঞ্জনী তুই জানিস, এ গান আমার দ্বারা হবে না।’

‘দাদা লতা তাই গাইবেন, গান তুলিয়েছি ইতিমধ্যেই।’

‘আগে লতাকে দিয়ে রেকর্ড করে নে, আমাকে স্পুল পাঠা, আমি গানটা বুঝব, খাব, হজম করব, তারপর গাইব এক মাস বাদে।’

ইতিমধ্যে প্রযোজক-পরিচালক শক্তি সামন্ত বলছেন রফিকে দিয়ে গাইয়ে নিতে, এ গান কিশোরের দ্বারা হবে না। রেকর্ডিংয়ের দিন রিহার্সালে খুব সাধারণ গাইলেন। শক্তি সামন্ত বললেন, রফিকে দিয়ে করিয়ে নিতে।

কিছুক্ষণ পর কিশোর বললেন, ‘পঞ্চম, দাদা চলে গেছে? শক্তিদা গ্যায়ে? ফির টেক লাগা’

বাকিটা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে জায়গা নিল। শক্তি সামন্ত ভুল স্বীকার করলেন। ছবি সেভাবে চলল না, কিন্তু গান চিরকালীন হয়ে গেল। ছবির নাম ‘মেহেবুবা’, গানটি ‘মেরে ন্যায়না শাওন ভাদো’।

পণ্ডিত ভীমসেন যোশীর অনুষ্ঠান দেখে ফিরে রাহুল দেবের বাড়িতে আড্ডায় বসেছেন কিশোরসহ আরও অনেকে। হঠাৎই পঞ্চম শোনেন, পাশের ঘর থেকে ভেসে আসছে যোশী জির গলা। হন্তদন্ত ভিতরে গিয়ে দেখেন মাটিতে বসে কিশোর গাইছেন ‘জো ভজে হরি কো সদা’। অবিকল পণ্ডিতজির গলায়!

জীবনের যেকোনও কঠিন মুহূর্তে পঞ্চম বলতেন, ‘আমাকে কিশোরদাকে এনে দাও, আমি বিপ্লব ঘটাবো গানে।’ সত্যি অর্থেই সারাজীবন সব থেকে চর্চিত পুরুষকণ্ঠ ছিলেন কিশোর। তাঁর যত এক্সপেরিমেন্ট, সব কিশোরদাকে নিয়ে। একে অন্যের পরিপূরক যেন।

মিমিক্রি মজার শিল্প

অমিত কুমার এবং সন্দীপ রায় দুজনেই বহুবার বলেছেন এই ঘটনা। লেক টেম্পল রোড বা বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়ি থেকে সকালে কাজে বেরিয়েছেন একসঙ্গে কিশোর ও তাঁর মানিক মামা। ঘরে রয়েছে কিশোর বা তরুণ বয়সের অমিত ও সন্দীপ রায়। বেশ কিছুক্ষণ পর অমিত হঠাৎ শোনেন, সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছেন তাঁর মানিক দাদু আর বলছেন ‘বাবু (সন্দীপ), অমিত তোমরা কী করছ দুজনে।’ বেরিয়ে এসে দুজনেই হতভম্ব, হাসতে হাসতে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছেন কিশোর কুমার!

Kishore Kumar Birthday
মহম্মদ রফি ও কিশোর কুমার

পণ্ডিত ভীমসেন যোশীর অনুষ্ঠান দেখে ফিরে রাহুল দেবের বাড়িতে আড্ডায় বসেছেন কিশোরসহ আরও অনেকে। হঠাৎই পঞ্চম শোনেন, পাশের ঘর থেকে ভেসে আসছে যোশী জির গলা। হন্তদন্ত ভিতরে গিয়ে দেখেন মাটিতে বসে কিশোর গাইছেন ‘জো ভজে হরি কো সদা’। অবিকল পণ্ডিতজির গলায়!

বম্বে এসে পরিচালক তরুণ মজুমদার সোজা উঠেছেন শচীন দেব বর্মনের মিউজিক রুমে। কর্তা কিছুক্ষণ পরেই একটু দরকারে বাড়ির বাইরে গেলেন। কিশোর ডেকে নিলেন, ‘আরে তনুবাবু আসুন আসুন, গান করা যাক।’ তারপর কর্তার গলা নকল করে একে একে ওঁর বিভিন্ন বাংলা, হিন্দি গান গাইতে লাগলেন। হঠাৎ নজরে এল দরজায় এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন দীর্ঘদেহী মানুষটি, ফর্সা মুখটা লাল হয়ে গেছে। তরুণ মজুমদারের কথায়, ‘আসল কাহিনি এর পরে, কিশোর হঠাৎ উঠে জানলা দিয়ে গলে রেইন ওয়াটার পাইপ বেয়ে পোর্টিকোতে রাখা গাড়িতে উঠে পগার পার। কর্তা জানলার কাছে এসে স্নেহ মিশ্রিত গলায় অস্ফুটে বলে ওঠেন ‘বান্দর’!

১৯৮০ সালের ৩১শে জুলাই, চলে গেলেন গানের রাজা মহম্মদ রফি। পরের দিন টাইমস অব ইন্ডিয়া ছাপল এক নিদারুণ ছবি— রফির পা জড়িয়ে অঝোরে কেঁদে চলেছেন তাঁর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী কিশোরকুমার!

সঙ্গীতের জলসাঘরে

সত্তরের দশকে প্রবল কিশোর ঝড়ে সারা ভারত আন্দোলিত। সব কিংবদন্তি পুরুষ কণ্ঠ যেন কোণঠাসা। এক বিখ্যাত ফিল্ম ম্যাগাজিন সমীক্ষা চালাল, কে বড় তারকা শিল্পী, রফি না কিশোর? প্রবল বাকবিতণ্ডা আর মতবিনিময় পত্রিকার পাতায় পাতায়। কিশোর কুমার ছাপিয়ে যাচ্ছেন সকলকে। কয়েক সপ্তাহ পরে সেই পত্রিকার দপ্তরে চিঠি এল স্বয়ং কিশোরকুমারের কাছ থেকে— ‘এই প্রতিযোগিতা বন্ধ করুন, এর কোনও মানে নেই, রফি সাব অনন্য, তাঁকে স্পর্শ করবার যোগ্যতা আমার নেই। এইভাবে আমাদের সুন্দর সম্পর্ককে বিষিয়ে তুলবেন না দয়া করে।’

বন্ধ হল সেই সমীক্ষা, মন জিতে নিলেন কিশোর কুমার।

Kishore Kumar Birthday
কিশোর কুমার ও আশা ভোঁসলে

১৯৮০ সালের ৩১শে জুলাই, চলে গেলেন গানের রাজা মহম্মদ রফি। পরের দিন টাইমস অব ইন্ডিয়া ছাপল এক নিদারুণ ছবি— রফির পা জড়িয়ে অঝোরে কেঁদে চলেছেন তাঁর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী কিশোরকুমার!

মান্না দে-কে নিয়ে কিশোরের মধ্যে ছিল অসম্ভব শ্রদ্ধা। অমিতকুমার রাগাশ্রয়ী গান শিখতে চাইলে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মান্না দে-র কাছে। বন্দিশসহ কোনও গান রেকর্ডিংয়ের আবদার এলে বলতেন ‘মান্না দা কে দিয়ে গাওয়ান, উনি থাকতে আমি কেন!’

মুকেশকে নিয়ে বলতেন, ‘আমরা একই গুরুর শিষ্য। মুকেশ ভাই সায়গল সাহেবের সরাসরি তালিম পেয়েছেন, আর আমি তাঁর একলব্য শিষ্য। তাই আমাদের বিষাদের রং একরকম লাগে!’

আশাকে ছোট বোনের মতোই স্নেহ করতেন, আগলে রাখতেন, আবার রাগাতেনও। বলতেন ‘আশা, ম্যায়নে জানলি তেরি মন কি ভাষা।’ সবচেয়ে বেশি ডুয়েট আশার সঙ্গেই। তবে, লতার সঙ্গে ডুয়েট যেন ইতিহাস। কালজয়ী গান ও হিট সবথেকে বেশি লতার সঙ্গেই। দুই বোনের সঙ্গেই এক অনবদ্য রসায়ন তৈরি হত তাঁর গানে।

জিতেন্দ্র, সঞ্জীবকুমারের সঙ্গে সাময়িক মনোমালিন্যের কারণে কণ্ঠদান বন্ধ করলেও দিশেহারা নায়করা ক্ষমা চেয়ে মিটিয়ে নেন। একই ঘটনা মিঠুন চক্রবর্তীর সঙ্গেও। ঋষি কাপুরকে বানিয়ে দেন ‘সিঙ্গিং স্টার’। রণধীর কাপুরেরও কণ্ঠ হয়ে ওঠেন।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে অভিভাবকতুল্য সম্মান-ভালবাসার সম্পর্ক। বাংলা গানের জগতে প্রতিষ্ঠা দেন তো হেমন্তই। প্রথম ছবিতে রবীন্দ্র সঙ্গীত থেকে রবি ঠাকুরের গানে প্রথম লং প্লে রেকর্ড, সব তাঁর হাত ধরে। ইতিহাস হয়ে যাওয়া রাজেশ-কিশোর জুটির শুরুও তো ‘আরাধনা’ ছবির আগে ‘খামোশি’ ছবিতে, ‘উহ শাম কুছ আজীব থি’, হেমন্তের হাত ধরে।

তারকাদের তারকা

এক সময়ের তাচ্ছিল্যের স্বীকার এই গায়ক পরে হয়ে ওঠেন পর্দার তারকাদের লাকি চার্ম! তাঁর কণ্ঠ পাওয়ার জন্য তারকাদের লাইন পড়ত ‘গৌরিকুঞ্জে’। জিতেন্দ্র, সঞ্জীবকুমারের সঙ্গে সাময়িক মনোমালিন্যের কারণে কণ্ঠদান বন্ধ করলেও দিশেহারা নায়করা ক্ষমা চেয়ে মিটিয়ে নেন। একই ঘটনা মিঠুন চক্রবর্তীর সঙ্গেও। ঋষি কাপুরকে বানিয়ে দেন ‘সিঙ্গিং স্টার’। রণধীর কাপুরেরও কণ্ঠ হয়ে ওঠেন।

Kishore Kumar Birthday
চির’কিশোর

গত শতাব্দীর মহাতারকা অমিতাভকে বলেছিলেন, ‘অমিত অনেকদিন অভিনয় ছেড়ে দিয়েছি, তোকে দেখে আবার ছবি করতে ইচ্ছে করছে’। অমিতাভ বলেন, ‘আপনি গলা দিয়ে যা করেন, তা পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে আমাদের দফারফা, আপনার সঙ্গে আমি অভিনয় করব না, কারণ পর্দায় আপনি থাকলে আমায় কেউ দেখবে না।’ তৈরি হল অস্বস্তি। সরে গেলেন কিশোর। বেশ কিছু বছর পর বরফ গলেছিল।

ভারতের ছবির গানের জগতে এভাবে টার্ম ডিক্টেট কেউ আগেও করেনি, ভবিষ্যতেও করার যোগ্যতা অর্জন করবে কি না সন্দেহ!

ছবির নাম ‘পিয়া কা ঘর’, সঙ্গীত পরিচালক লক্ষীকান্ত-পেয়ারেলাল। স্বভাবসুলভ মাচো বলিষ্ঠ কণ্ঠে গেয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন সম্রাট। সুরকার জুটি আমতা আমতা করে বললেন, যদি একটু নরম করে গাওয়া যায়। বললেন, ‘চা খাওয়াও’। তারপর সারাক্ষণ নিজের গালদুটো হাত দিয়ে চেপে ধরে বার স্টুলের উপর রেখে গাইলেন গানটা। সুরকারদ্বয় মোহিত। ইতিহাস হয়ে যায় গানটি— ‘ইয়ে জীবন হ্যায়, ইস জীবন কা’…

সিংহনাদ

ছবির নাম ‘ওয়ারিশ’, সঙ্গীত পরিচালক উত্তম সিং। পর্দায় রাজ কিরণের গলায় গাইলেন কিশোর। মিক্সিংয়ের সময় মাথায় হাত উত্তমের। লতার অংশের পর যখন কিশোর গাইছেন, প্রায় ১০০ যন্ত্রশিল্পীর বাজনা চাপা পড়ে গেছে সিংহনাদে! প্রখ্যাত রেকর্ডিস্ট ওয়াই এস মুলকি বললেন, ‘ভলিউম ফুল ছিল, কিন্তু ঐশ্বরিক ওই টোনাল কোয়ালিটিতে সব চাপা পরে গেছে!’ অগত্যা হাতে পায়ে ধরে হাফ নোট নিচে গাইতে বলতে বাধ্য হলেন উত্তম সিং। মনে রাখতে হবে, এর কিছু মাস পরেই সেই সিংহ গর্জন চিরতরে থেমে গিয়েছিল! গানটি ছিল ‘হুসন কি ওয়াদিও মে, পেয়ার পলতা রহে গা’।

ছবির নাম ‘পিয়া কা ঘর’, সঙ্গীত পরিচালক লক্ষীকান্ত-পেয়ারেলাল। স্বভাবসুলভ মাচো বলিষ্ঠ কণ্ঠে গেয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন সম্রাট। সুরকার জুটি আমতা আমতা করে বললেন, যদি একটু নরম করে গাওয়া যায়। বললেন, ‘চা খাওয়াও’। তারপর সারাক্ষণ নিজের গালদুটো হাত দিয়ে চেপে ধরে বার স্টুলের উপর রেখে গাইলেন গানটা। সুরকারদ্বয় মোহিত। ইতিহাস হয়ে যায় গানটি— ‘ইয়ে জীবন হ্যায়, ইস জীবন কা’…

Kishore Kumar Birthday
রাহুলদেব বর্মন কথায় কথায় প্রায়ই বলতেন, ‘আমি আমার বাবার ছোট ছেলে, বড় ছেলে কিশোরদা।’

পণ্ডিত ভীমসেন যোশীর কাছে এক খ্যাতনামা সাংবাদিক এসে দেখলেন পণ্ডিতজি ফিল্মের গান শুনছেন— ‘অমরপ্রেম ছবির ‘চিঙ্গারি কোই ভড়কে’, উনি অপ্রস্তুত, আশাহত। উন্নাসিক সাংবাদিক বললেন, ‘আপনি রাগ সঙ্গীতের পণ্ডিত হয়ে গান না-শেখা একটা লোকের গান শুনছেন!’ গান থামিয়ে দিয়ে যোশী জী বলেন, ‘যে শিখে জন্মেছে তাঁকে কে কী শেখাবে! তাছাড়া উনি শেখেননি, তাই আমরা করে খাচ্ছি, না হলে আমাদের রুজিরুটি মারা যেত, এমন গলার রেঞ্জ, টেক্সচার আর ডিকশান। আপনি বুঝবেন না।’

কিশোর প্রয়াণের পর দিশেহারা পঞ্চম উদাস নয়নে তাকিয়ে তাঁর কিশোরদার দিকে, মাথার কাছে বসে। অভিনেতা প্রাণ আর ও পুরী এসে বললেন, ‘পঞ্চম এবার যেতে হবে শেষকৃত্যে। কিশোরকে ছেড়ে দাও।’

সলিল চৌধুরী বলেছিলেন, ‘ব্যারিটোন ভয়েস, প্রায় দেড় অক্টেভ ছাড়িয়ে রেঞ্জ, কিন্তু ইলাস্টিকের মতো, চড়ায় গেলেও সুর নড়ে না, টোনাল কোয়ালিটি কম্প্রোমাইজড হয় না, স্বরের গভীরতা এক থাকে। এ এক আশ্চর্য কণ্ঠ।’

রবীন্দ্র গানে সমে ফেরা

জীবনের উপান্তে এসে কিশোর শুধু রবি ঠাকুরের গান গুনগুন করতেন। দাদামণি অশোক কুমারের স্ত্রী বিয়োগের পর তাঁর চেম্বুরের বাড়িতে সারারাত তাঁকে খালি গলায় রবি ঠাকুরের গান শুনিয়েছিলেন। কলকাতায় জীবনের শেষ অনুষ্ঠানে অনেক গান নাচের পর হঠাৎ মঞ্চে বসে পড়ে হারমোনিয়াম, তবলা নিয়ে এক এক করে রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতে শুরু করেন। শেষে বলেছিলেন, ‘যদি বেঁচে থাকি আবার দেখা হবে।’ অডিওটা আজও ইউটিউবে আছে। ওই দিন শেষ গান ধরলেন ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে’।

সময়টা ছিল ১৯৮৭ সালের এপ্রিল মাস। আর তার কয়েক মাসের মধ্যেই অদ্ভুত সমাপতন।

কিশোর প্রয়াণের পর দিশেহারা পঞ্চম উদাস নয়নে তাকিয়ে তাঁর কিশোরদার দিকে, মাথার কাছে বসে। অভিনেতা প্রাণ আর ও অমরিশ পুরী এসে বললেন, ‘পঞ্চম এবার যেতে হবে শেষকৃত্যে। কিশোরকে ছেড়ে দাও।’ বিহ্বল কিংবদন্তি অস্ফুটে শুধু বললেন, ‘আরও অন্তত দুশো সুর দাদাকে নিয়ে ভাবা আছে মাথায়। কী করব সেগুলো নিয়ে?’ এই আর্তনাদ কয়েক বছরেই ধ্বংস করে দিল এই দেশের আরেক অন্যতম প্রতিভাবান সুরস্রষ্টাকে।

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Picture of অতনু মৌলিক

অতনু মৌলিক

সমাজসেবায় নিয়োজিত থাকা, নিয়মিত থাকা, শখে নয়, সেটাই একমাত্র বেঁচে থাকার মন্ত্র এখন। এছাড়া, খেলাধুলো, সাহিত্যসংস্কৃতি, সিনেমা, গানবাজনা ভালো লাগে। আজীবন এই পছন্দগুলির সম্পৃক্ততা বজায় রাখার চেষ্টা আছে, সময়াভাবে কিছুটা ব্যাহত।
Picture of অতনু মৌলিক

অতনু মৌলিক

সমাজসেবায় নিয়োজিত থাকা, নিয়মিত থাকা, শখে নয়, সেটাই একমাত্র বেঁচে থাকার মন্ত্র এখন। এছাড়া, খেলাধুলো, সাহিত্যসংস্কৃতি, সিনেমা, গানবাজনা ভালো লাগে। আজীবন এই পছন্দগুলির সম্পৃক্ততা বজায় রাখার চেষ্টা আছে, সময়াভাবে কিছুটা ব্যাহত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe To Newsletter

কথাসাহিত্য

বিনোদ ঘোষাল
দীপান্বিতা রায়
বিতস্তা ঘোষাল

সংস্কৃতি

আহার

অমৃতা ভট্টাচার্য
অমৃতা ভট্টাচার্য

বিহার

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

কলমকারী

ফোটো স্টোরি

নির্মাল্য চ্যাটার্জি
দেবার্চন চ্যাটার্জি

উপন্যাস

[adning id="384325"]
[adning id="384325"]

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com