(Nirmalendu Chowdhury)
‘বুড়ো, তুই আমার গাড়িটা নিয়ে এয়ারপোর্ট চলে যা, নির্মল সারা বাংলার গর্ব। ও আজ পোল্যান্ড থেকে বিশ্বজয় করে ফিরছে। ওকে সসম্মানে এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে আয়।’ উচ্ছ্বসিত হয়ে সহোদর তরুণকুমারকে কথাটা বলেছিলেন মহানায়ক। সালটা ছিল ১৯৫৫। পঞ্চম বিশ্ব যুব ও ছাত্র উৎসব (WFYS) অনুষ্ঠিত হয়েছিল পোল্যান্ডে। ভারতীয় প্রতিনিধিদলের তরফে এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন বাংলার এক তরুণ লোকসংগীত শিল্পী। মহানায়কের এই ‘সংলাপ’ তাঁকে নিয়েই।
সেই প্রথম বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছেন তরুণ শিল্পীটি। আন্তর্জাতিক লোকসংগীত প্রতিযোগিতায় ভারতের প্রতিনিধি তিনি। নাম ঘোষণার পর তিনি মঞ্চে উঠতেই যেন এক অলৌকিক ঘটনা ঘটল। অন্য এক সত্তায় পরিণত হলেন তরুণটি, যেন এক দরবেশ, আবিষ্ট মানুষ। উদাত্ত কণ্ঠের তাঁর সুমধুর লোকগান বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে দিল দর্শকদের।
আরও পড়ুন: ‘তবু আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে’
শিল্পীর কণ্ঠে ‘মুসলমানে গো বোলে আল্লাহ/ হিন্দু বোলে হরি…’ সেদিন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছিল বিশ্বের নানা প্রান্তের অগণিত দর্শক। লোকসংগীত প্রতিযোগিতায় সেই বছর প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন তরুণটি। একই সঙ্গে দেশের জন্য স্বর্ণপদকজয় করে ফিরেছিলেন।
আজ বাংলা লোকগীতির সেই চিরকালীন সম্রাট নির্মলেন্দু চৌধুরীর জন্মবার্ষিকী।
‘ও মশায়, আরে ও মশায়, আমারে একটু গাইতে দিতে কন না, আমার এইসব মাইক, যন্ত্র লাগে না, আমি সিলেট থন আইসি।’
‘সে আপনি সিলেট থন আসুন কি পেন্সিল থন আসুন, লোডশেডিং বা যান্ত্রিক গোলযোগে জলসা বন্ধ রয়েছে, কত বড় শিল্পীরা রয়েছেন, অপেক্ষা করছেন, আর আপনি খালি গলায় এত লোককে গান শোনাবেন?’

তাঁকে নিয়ে বহুশ্রুত এই গল্প, টেলিভিশনের আর্কাইভে হয়তো আজও আছে। নিজে দেখেছি বন্ধুবর বিমান মুখোপাধ্যায়কে সাক্ষাৎকারে নিজের মুগ্ধতার কথা বলছিলেন আরেক কিংবদন্তি মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়! ‘কেমন এক আত্মবিশ্বাস আর গান গাইবার আকুতিতে, গলায় ঝোলানো ছোট একটা ম্যান্ডোলিনের মতো যন্ত্র নিয়ে স্বপ্নালু চোখের সেই যুবক খালি গলায় চড়ায় একটা লাইন ধরল… মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমরা যে যার আসনে বসে রইলাম পরবর্তী বেশ কিছু সময়… সেই নির্মলকে প্রথম দেখা…’ লোকগানের রাজার অভিষেক যেন!
বাংলার লোকগানকে এক দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছিলেন নির্মলেন্দু চৌধুরী। তাঁর দরাজ কণ্ঠে মাটির সুর মন জয় করত শ্রোতা ও দর্শকদের। বিশেষত ভাটিয়ালি গান চোখে জল এনে দিত শ্রোতাদের। শোনা যায়, তাঁর গানের ভক্ত ছিলেন দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুও। তিনি নাকি নির্মলেন্দু চৌধুরীর কাছে কয়েকটি বাংলা লোকগানও শিখেছিলেন। শুধু গান গাওয়াই নয়, সুর সৃষ্টি এমনকী অভিনয় জগতেও নিজের কৃতিত্বের পরিচয় রেখেছিলেন লোকগীতির এই কিংবদন্তি।
একটি অনুষ্ঠানে গান গাইবার আমন্ত্রণ জানাতে প্রয়াত লোকগানের শিল্পী উৎপলেন্দু চৌধুরীর সঙ্গে বেশ কয়েকবার ওঁর বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ আসে ১৯৯৩ সালে। সেই সময় সম্ভবত সিআইটি রোডের বাড়িতে থাকতেন।
১৯২২ সালের ২৭ জুলাই তৎকালীন পূর্ববঙ্গের সিলেট জেলার সুনামগঞ্জে জন্ম তাঁর। ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের কাছে গ্রামবাংলার গান, অর্থাৎ লোকগীতি-পল্লীগীতির চর্চা শুরু। পরবর্তী সময়ে ময়মনসিংহের আবদুল মজিদ ও আবদুল রহিমের কাছে শুরু করেন লোকসংগীত ও লোকবাদ্যের তালিম। এরপর শান্তিনিকেতনে আসেন। অশোকবিজয় রাহার কাছে নেন রবীন্দ্রসংগীতের শিক্ষা, যদিও, বাংলা তথা গোটা দেশ, এমনকী বিদেশের শ্রোতারাও তাঁর লোকগানে বেশি মুগ্ধ হয়েছেন বরাবর।
একটি অনুষ্ঠানে গান গাইবার আমন্ত্রণ জানাতে প্রয়াত লোকগানের শিল্পী উৎপলেন্দু চৌধুরীর সঙ্গে বেশ কয়েকবার ওঁর বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ আসে ১৯৯৩ সালে। সেই সময় সম্ভবত সিআইটি রোডের বাড়িতে থাকতেন। আলাপচারিতায় জানতে পারি, ওঁর পিতৃদেবের ফুটবল প্রেমের গল্প। উনি নাকি নিজেও ভাল খেলতেন, এবং কলকাতায় থাকলে ইস্টবেঙ্গল মাঠে প্রায়শই যেতেন বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে খেলা দেখতে।

বায়না ধরায় ছেলেকে একবার সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন, তবে পরে বন্ধুদলকে বলেন, ছেলেকে আর আনবেন না। প্রিয় দল হেরে গেলে মাঠের মধ্যে মেজাজ আর ভাষার উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কাজেই ছেলে সে সব শুনে বাড়িতে বললে আরেক বিপত্তি। উৎপলেন্দু পরে বলেন, এরপর থেকে তিনি নিজের বন্ধুবৃত্ত নিয়ে বাবার থেকে নিরাপদ দূরত্বে মাঠে খেলা দেখতে বসতেন!
কথায় কথায় সেদিন শিল্পী জানিয়েছিলেন, পোল্যান্ডের সেই প্রতিযোগিতায় ভারতীয় দলে ছিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা বলরাজ সাহানি। তিনি এই জয় স্মরণীয় করে রাখতে সেই রাতে হোটেলে পার্টির ব্যবস্থা করেন।
শ্রীহট্টের স্কুলের চৌকাঠ পার হলে, পড়াশোনার জন্য নির্মলেন্দু চলে যান সিলেটে। সেই বয়সেই স্বাধীনতা সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন। তারপর গণ সংগ্রামে। ক্রমে কমিউনিস্ট পার্টির সভ্যপদের সদস্য হন, হয়ে উঠেছিলেন পার্টির একজন দক্ষ সংগঠকও।
নির্মলেন্দু চৌধুরী হয়তো একটা বিষয় গোড়াতেই ধরতে পেরেছিলেন। লোকসংগীত মানুষের আবেগের গান। দরদ দিয়ে গাইতে হয়। লোকসংগীতের উৎপত্তিস্থল লোকসংস্কৃতি। ‘লোক’ অর্থে সমষ্টি, ব্যক্তি নয়। তাই যা কিছু লোকনির্ভর, তা-ই লোকসংস্কৃতি। সুর খেলানোর কায়দা, আগলহীন, আড়ষ্টতাহীন স্বরপ্রক্ষেপ, ঢোল, খোল, খমক, মাদল, ধামসা, সারিন্দা, ডুবকি, খঞ্জনি বাজিয়ে গানের সঙ্গে যেভাবে ধ্বনির বাতাবরণ তৈরি হয়, সেটাই লোকগানের ইউএসপি! এই ধরনের গানের মাদকতাটাই আসল। যে মাদকতা ভরপুর ছিল তাঁর গানে।
‘সোহাগ চাঁদ বদনি ধনি’, ‘সাগর কূলের নাইয়া রে’, ‘ভাল কইরা বাজান গো দোতরা’, ‘লোকে বলে, বলে রে’, ‘নাচ করে সুন্দরী গো’, ‘ও আমার দরদী আগে জানলে’, ‘পাখি কখন উড়ে যায়’, ‘সুন্দইরা নাওয়ের মাঝি’, ‘দয়া নি করিবা আল্লারে’, ‘তোমার মতো দয়াল বন্ধু’, ‘লাঙল যার, জমি তার’, ‘তোমার রক্তে রাঙ্গা নিশান’– বাংলা, আসাম, ত্রিপুরা মিলিয়ে অসংখ্য ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, ধামাইল, ঝুমুর, সারি, টুসু, ছাদ পেটানোর গান, গাজির গান, গণনাট্যের গান গেয়েছেন তিনি।

দেশবিদেশে ঘুরলেও কখনও ভুলে যাননি নিজের শিকড়। শ্রীহট্টের স্কুলের চৌকাঠ পার হলে, পড়াশোনার জন্য নির্মলেন্দু চলে যান সিলেটে। সেই বয়সেই স্বাধীনতা সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন। তারপর গণ সংগ্রামে। ক্রমে কমিউনিস্ট পার্টির সভ্যপদের সদস্য হন, হয়ে উঠেছিলেন পার্টির একজন দক্ষ সংগঠকও। তাঁর জীবনজুড়ে গণসংগ্রাম ও এই সময়ই নির্মলেন্দুর সঙ্গে আলাপ হল খালেদ চৌধুরীর। নির্মলেন্দুর গান শুনে মুগ্ধ হয়ে যেতেন তিনি। তার কিছু দিন পর পরই তাঁর জীবনে এলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। হেমাঙ্গ নির্মলেন্দুকে ডাকতেন ‘নবনী’, আর নির্মলেন্দু হেমাঙ্গকে ‘লালুদা’ নামে।
গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলার প্রগতিবাদী সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম হয়ে উঠেছিলেন দেবব্রত বিশ্বাস, নির্মলেন্দু চৌধুরী, রমেশ শীল, সলিল চৌধুরী, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, তুলসী লাহিড়ী, শম্ভু মিত্র, অরুণ মিত্র, সুকান্ত ভট্টাচার্য, নিবারণ পণ্ডিত প্রমুখ। প্রগতিবাদী লেখক সংঘ ও ভারতীয় গণনাট্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
রাজেন তরফদার পরিচালিত ‘গঙ্গা’ ছবির পর তাঁর জনপ্রিয়তা অসম্ভব বেড়ে যায়। সলিল চৌধুরীর মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্টে আর প্রচলিত কথা ও সুরে নির্মল গাইলেন ‘আরে ও সুন্দইরা নাওয়ের মাঝি’।
১৯৪৪ সাল। শ্রদ্ধানন্দ পার্কে আয়োজিত হয়েছিল ফ্যাসিবাদবিরোধী অনুষ্ঠান। হেমাঙ্গ বিশ্বাস গান গাওয়ার জন্য নিয়ে আসেন শ্রীহট্টের ছেলে নির্মলেন্দুকে। সেই প্রথম তাঁর গান শুনল মহানগর। গান গেয়ে আসর মাতিয়ে দেন সেদিন। শিক্ষিত সমাজে ব্রাত্য লোকসংগীতকে যোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করলেন লোকসংগীত শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরী।
পাকাপাকিভাবে কলকাতায় থাকা শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার পর। দেশ স্বাধীন হলেও, দেশভাগের ক্ষত ছিল তাঁর বুকে। যে ক্ষত ঝরে পড়ত তাঁর গায়কীতে, আবেগে। আজীবন সিলেটের টান ছিল তাঁর কথায়। সিলেটের অসংখ্য লোকগান রেকর্ড করে সংরক্ষণ করার চেষ্টাও করেছিলেন। কলকাতায় লোকভারতী নামে একটি লোকসঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও, কিছুদিন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগে অধ্যাপনা করেন। ‘এপার বাংলা ওপার বাংলার গান’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গীতগ্রন্থও প্রকাশ করেন এই সময়।

ছোট্ট উৎপলেন্দু (উৎপলেন্দু চৌধুরী) তখন অসুস্থ। হেমাঙ্গের অনুরোধে বম্বেতে গণনাট্য সংঘের সারা ভারত সম্মেলনে (সম্ভবত ১৯৫৩ সাল তখন) যেতে হয় নির্মলেন্দুকে। ‘দলিল’ নাটক নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন ঋত্বিকও। বম্বেতে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই সলিল চৌধুরী তৈরি করলেন ‘বম্বে ইয়ুথ কয়্যার’। পাশে থাকলেন নির্মলেন্দু ও অন্যান্যরা। বম্বেতে গিয়েই আলাপ শোভা সেন-উৎপল দত্তের সঙ্গে। অভিনয় করলেন উৎপল দত্তের ‘অঙ্গার’ নাটকে, সঙ্গে গান। কয়লাখনির মজদুর জীবনের গান। এছাড়াও তাঁকে দেখা গেল ‘ফেরারী ফৌজ’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ নাটকে।
রাজেন তরফদার পরিচালিত ‘গঙ্গা’ ছবির পর তাঁর জনপ্রিয়তা অসম্ভব বেড়ে যায়। সলিল চৌধুরীর মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্টে আর প্রচলিত কথা ও সুরে নির্মল গাইলেন ‘আরে ও সুন্দইরা নাওয়ের মাঝি’। এছাড়াও, গাইলেন সলিল চৌধুরীর কথা ও সুরে ‘গঙ্গা গঙ্গার তরঙ্গে’। এরপর একে একে জনপ্রিয় হতে থাকে ‘প্রেম জানে না রসিক কালাচাঁদ’, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সংগীত পরিচালনায় তরুণ মজুমদারের ‘নিমন্ত্রণ’ ছবির ‘আমি বন্ধুর প্রেমাগুণে পোড়া’, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় ‘পদ্মা হাসে, পদ্মা কাঁদে’, ‘ডাকাতিয়া বাঁশিরে’ ও আরও কতশত গান!
সারা জীবন ধরে বাংলার নানা প্রান্তের লোকগান সযত্নে আগলে রেখেছিলেন নিজের কণ্ঠে। দেশভাগের যন্ত্রণা ভুলতে যেন অন্য এক দেশ নির্মাণ করেছিলেন বাংলার নানা স্থানের লোকগান সংগ্রহ করতে করতে।
সংগীত জগতে অসামান্য অবদানের জন্য ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মভূষণ’ উপাধিতে ভূষিত করে। একটা সময়, সব গীতিকারই মুখিয়ে থাকতেন তাঁর সঙ্গে কাজ করার জন্য। সারা জীবন ধরে বাংলার নানা প্রান্তের লোকগান সযত্নে আগলে রেখেছিলেন নিজের কণ্ঠে। দেশভাগের যন্ত্রণা ভুলতে যেন অন্য এক দেশ নির্মাণ করেছিলেন বাংলার নানা স্থানের লোকগান সংগ্রহ করতে করতে। তাঁর সেই দেশে আজও ভাটিয়ালির সঙ্গে ভাওয়াইয়া শোনা যায়, শোনা যায় বাউলের সঙ্গেই ঝুমুর। বাংলা লোকগীতির সম্রাটের সৌজন্যে আজ সেখানে কোনও কাঁটাতার নেই।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত