(Namibia Diary)
পর্ব ১: উইন্ডহুক থেকে মরুভূমির প্রবেশদ্বার
মুম্বাই থেকে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমানে চেপে পৌঁছালাম প্রথমে আদ্দিস আবাবা। আদ্দিস আবাবার বিশাল এয়ারপোর্টে পৌঁছে মনে পড়ে যাচ্ছিল ১৯৮৩-১৯৮৫ সালের ভয়াবহ ও প্রলয়ঙ্করী দুর্ভিক্ষের কথা। লাখ লাখ মানুষের বিপন্নতা তখন বিশ্বজুড়ে এক অভূতপূর্ব মানবিক সাড়া জাগিয়ে তুলেছিল- যার মধ্যে বিখ্যাত ‘লাইভ এইড’ কনসার্ট ছিল অন্যতম।
দু’ঘণ্টার বিরতির পর দ্বিতীয় ফ্লাইটে চেপে পৌঁছলাম নামিবিয়ার রাজধানী উইন্ডহুক (Windhoek)-এ। এসেছি নামিবিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্বাদ নিতে। এ এমন একটি দেশ যেখানে আটলান্টিক মহাসাগরের নীল জল এসে আছড়ে পড়ে পৃথিবীর প্রাচীনতম মরুভূমির বুকে। সেই বৈপরীত্যের সুরে তাল মিলিয়ে শুরু হল এই নামিবিয়া যাত্রা। আকাশ থেকে দেখে মনে হচ্ছিল কেউ যেন বিস্তীর্ণ এক ক্যানভাসে লাল, হলুদ আর কমলার আবির ছড়িয়ে দিয়েছে।
আরও পড়ুন: অনুবাদ: তিনদিনের দৃষ্টি
পুঁচকে একটি এয়ারপোর্ট। হেঁটে হেঁটেই বিমান থেকে বেরিয়ে পৌঁছলাম ইমিগ্রেশন কাউন্টারে। বেশ ভিড় আর সময়সাপেক্ষ কাণ্ডকারখানা। যাই হোক, ডলার (এখানকার নামিবিয়ান ডলারের দাম ভারতের টাকার প্রায় ছয় গুণ) ভাঙিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে উপভোগ করলাম চারপাশের শান্ত পরিবেশ। পথে নামিবিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চমৎকার বিশাল ক্যাম্পাস চোখে পড়ল। ছিমছাম ইউরোপীয় ধাঁচের স্থাপত্য এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দিল।
হোটেলে পৌঁছানোর আগেই নামলাম পার্লামেন্ট আর ইনডেপেনডেন্স মেমোরিয়াল মিউজিয়াম দেখে নিতে। পার্লামেন্ট বিল্ডিং সুন্দর, ফুলে ছাওয়া। আর মেমোরিয়াল মিউজিয়ামটি বেইজ রঙের প্যানেল, কালো কাচ আর সামনের দিকে সুপরিচিত সূর্য প্রতীকের সমন্বয়ে তৈরি একটি আধুনিক নকশার বিল্ডিং। প্রাঙ্গণে নামিবিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপতি স্যাম নুজোমার একটি ব্রোঞ্জের মূর্তিও রয়েছে।

শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই জাদুঘরটি নামিবিয়ার ইতিহাস এবং স্বাধীনতার সংগ্রামকে তুলে ধরে। এর পাঁচতলায় গিয়ে পুরো শহরের একটি প্যানোরামিক ভিউ দেখতে বেশ লাগল। ঢোকার মুখে ক’টি বাচ্চা নাচগান করে টুরিস্টদের মনোরঞ্জন করতে ব্যস্ত। স্কুলে না গিয়ে এই ব্যবস্থায় প্রথমেই একটু ধাক্কা খেলাম।
যাওয়ার আগে খুব একটা পড়াশুনা করে যেতে পারিনি, তাই নেট খুঁজে দেখলাম যে নামিবিয়া ভৌগোলিকভাবে বিশাল দেশ হলেও জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশ কম, কিন্তু সাংস্কৃতিক দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
বহুকাল বহু বিদেশি রাষ্ট্রযন্ত্রের চাপে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছে, সঙ্গে রয়েছে তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য। নামিবিয়া পৃথিবীর অন্যতম সর্বোচ্চ বিষম আয়ের দেশ। গুটিকয়েক মানুষের হাতে দেশের বেশিরভাগ সম্পদ পুঞ্জীভূত, যার প্রভাব শিক্ষাব্যবস্থাতেও পড়েছে। এখানে প্রায় ১১টি প্রধান নৃগোষ্ঠী এবং উপজাতি রয়েছে, যাদের প্রত্যেকের ভাষা, শারীরিক বৈশিষ্ট্য এবং জীবনযাত্রা আলাদা।
নির্জন এই জায়গায় পেট্রোল পাম্প আর পুরোনো মরচে পড়া গাড়ির কঙ্কালের মাঝে ম্যাকগ্রিগরের বেকারির বিখ্যাত ‘অ্যাপেল পাই’ খাওয়া এক অনন্য তৃপ্তি। জনমানবশূন্য রাস্তাঘাট, মরুপ্রান্তর।
পরদিনই মস্ত এক গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সেই এক অন্তহীন যাত্রায়। ধীরে ধীরে উইন্ডহুকের সাজানো ঘরবাড়ি পাল্টে যেতে লাগল শুষ্ক শীর্ণ জরাগ্রস্ত গাছের প্রান্তরে। ক্রমশ ঢুকে পড়েছি নামিব মরুভূমিতে, যার নামে দেশের নাম। খাড়া পাহাড়ের কোল বেয়ে নেমে যাওয়া এই গিরিপথ থেকে যখন নিচের বিস্তীর্ণ নামিব মরুভূমির উপত্যকা চোখে পড়ল, তখন এক মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস আটকে গিয়েছিল। যেন কোনও দক্ষ শিল্পীর ক্যানভাস!
সেখান থেকে ধুলো উড়িয়ে আমরা পৌঁছালাম মরুভূমির ছোট্ট এক মরূদ্যান সলিটেয়র (Solitaire)-এ। রাস্তার অবস্থা ভাল নয় মোটেই। নির্জন এই জায়গায় পেট্রোল পাম্প আর পুরোনো মরচে পড়া গাড়ির কঙ্কালের মাঝে ম্যাকগ্রিগরের বেকারির বিখ্যাত ‘অ্যাপেল পাই’ খাওয়া এক অনন্য তৃপ্তি। জনমানবশূন্য রাস্তাঘাট, মরুপ্রান্তর।

দিনশেষে প্রথম ওয়াইফাই পাওয়া গেল সলটেয়রে। বিকেলের দিকে গিয়ে পৌঁছলাম রিসর্টে। খোলা মরুভূমির বিস্তীর্ণ আকাশের নীচে সমস্ত শহুরে সুবিধাসহ থাকার জায়গা। খানিক বাদে সূর্যদেব আকাশে নানা রং দেখিয়ে অস্ত গেলেন। উন্মোচিত হল উজ্জ্বল তারার তিমির। ধূলিকণা বা দূষণহীন সেই বুক চিতিয়ে থাকা কালো আকাশে ছায়াপথ এত স্পষ্ট ও উজ্জ্বল দেখায় যে মনে হয়, হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে।
পর্ব ২: ডিউন ৪৫, ডেডভলেই এবং সোসুসভলেই-এর জাদু
পরদিন প্যাকড ব্রেকফাস্ট নিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারে আমাদের যাত্রা শুরু হল নামিব-নাউক্লুফট ন্যাশনাল পার্কের উদ্দেশ্যে, লক্ষ্য মরুভূমির সূর্যোদয় দেখা। প্রবল ঠান্ডা। সাতটায় গেট খুলবে। ততক্ষণে প্রাতরাশ করে নিলাম। সোসুসভলেইতে সূর্যোদয় হল। পার হয়ে চললাম একের পর এক লাল রঙের স্যান্ড ডিউনস (sand dunes)। এলেম ডিউন (Elem dune), ডিউন ৪০ (dune 40) পেরিয়ে ঠিক সময়ে আমরা পৌঁছালাম পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত বালিয়াড়ি ডিউন ৪৫ (Dune 45)-এর পাদদেশে। গেট থেকে দূরত্বের হিসেবে এই নাম।

ভোরের আলোতেই প্রায় ১৭০ মিটার উঁচু এই লাল বালির পাহাড় বেয়ে ওপরে ওঠা শুরু করলাম। প্রতিটা পদক্ষেপে পা বালিতে গেঁথে যাচ্ছিল, কিন্তু চূড়ায় পৌঁছানোর পর যে দৃশ্য দেখলাম, তা সমস্ত ক্লান্তি ভুলিয়ে দিল। ভোরের প্রথম আলোয় বালিয়াড়ির একপাশ উজ্জ্বল লাল আর অন্যপাশ কুচকুচে কালো ছায়ায় ঢেকে এক জাদুকরী বৈপরীত্য তৈরি করেছিল।
জানা গেল, বালিয়াড়িগুলোর এই উজ্জ্বল লাল রঙের জন্য বালির অতিরিক্ত আয়রন এবং বহু বহু বছর ধরে তার জারণ মূলত দায়ী। লক্ষ লক্ষ বছর আগে অরেঞ্জ রিভার অববাহিকা থেকে এই বালি উৎপন্ন হয়েছিল। সমুদ্রের স্রোত সেই বালিকে উপকূল ধরে বয়ে নিয়ে আসে এবং শক্তিশালী বাতাস তা উড়িয়ে ভেতরের দিকে নিয়ে যায়।

এই বালিতে প্রচুর পরিমাণে আয়রনযুক্ত খনিজ বাতাসে থাকা অতি সামান্য আর্দ্রতা এবং অক্সিজেনের সাথে বালির ভেতরের আয়রন বিক্রিয়া করে। এই প্রক্রিয়ায় আয়রন অক্সাইড তৈরি হয়— যা প্রতিটি কোয়ার্টজ বালুকণাকে মরচের একটি পাতলা আস্তরণে ঢেকে দেয়। বালির এই রঙের তীব্রতা আসলে বালিয়াড়ির বয়সের একটি ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ।
বালিয়াড়ি যত পুরনো হয়, তার রঙ তত বেশি গাঢ় হয়, কারণ আয়রন জারিত হওয়ার জন্য অনেক বেশি সময় পায়। তাই ভেতরের দিকের সসুসভলেই (Sossusvlei)-এর বালিয়াড়িগুলো অনেক পুরনো। সম্ভবত ৫০ লক্ষ বছরেরও বেশি। দীর্ঘ সময় ধরে জারণের ফলে এগুলো গাঢ় কমলা এবং পাটকিলে রঙ ধারণ করেছে। মজার বিষয় হল, এই লাল বালির ওপর দিনের বিভিন্ন সময়ে সূর্যের আলো যখন ভিন্ন ভিন্ন কোণে পড়ে, তখন বালিয়াড়িগুলোর রঙও বদলে যেতে থাকে। এর ফলেই নামিব মরুভূমিতে আলো-ছায়ার এমন চমৎকার রূপ দেখা যায়।

সেখান থেকে এগোলাম পরাবাস্তব ডেডভলেই (Deadvlei)-এর দিকে। এখানকার বাহন খোলা ল্যানডক্রুজার, সঙ্গী কনকনে ঠান্ডা হাওয়া। পৌঁছলাম Deadvlei বা Death Valley তে। সেখানে হাজার বছর আগে ছিল জল, ছিল মানুষের প্রাণের স্পন্দন, ছিল তরুমর্মর। আজ শুধু সাদা লবণের চাতাল, চারপাশে চড়া লাল রঙের বালিয়াড়ি। ডেডভলেই সমতলভূমির ঠিক ওপরে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ‘বিগ ড্যাডি’ হল এই অঞ্চলের সবচেয়ে বিখ্যাত ও সর্বোচ্চ বালিয়াড়ি যার উচ্চতা প্রায় ৩২৫ মিটার।
অল্প দূরে দাঁড়িয়ে আছে ‘বিগ মান্না’। আর তার মাঝে প্রায় ৯০০ বছর ধরে শুকিয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের কঙ্কাল। জলের অভাবে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাওয়া মৃত্যুর গহ্বর। সব মিলিয়ে জায়গাটা এতই অদ্ভুত যে মনে হয়, অন্য কোনও গ্রহে চলে এসেছি। ওইসব গাছের কঙ্কাল যেন মানুষকে সাবধানবাণী শোনাচ্ছে প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে চলার জন্য।

তবে দেশবিদেশের প্রচুর টুরিস্ট এসেছে। হৈচৈও করছে। কিন্তু আমার মনের মধ্যে বাজতে লাগল বেদনার সুর। একসময়ের নদীবহুল প্রাণচঞ্চল প্রকৃতির এই ভয়ানক শেষ অবস্থা যেন ‘বিরূপের ছদ্মবেশে বিদ্রূপ করছিল ভীষণকে’।
যাওয়া আসায় বেশ সময় লাগে। বালির মধ্যে দিয়ে হাঁটতে তৃষ্ণা নিবারণের জন্য জল নিয়ে চলতে হয়। খোলা ল্যানডক্রুজারেই ফেরা হল গেট পর্যন্ত। এবার যাব সেসরিয়েম ক্যানিয়ন (Sesriem canyon)- নামিব-নাউকলুফ্ট ন্যাশনাল পার্কের প্রবেশদ্বারের একদম কাছে অবস্থিত অসাধারণ একটি প্রাকৃতিক গিরিখাত।

প্রায় ২০ থেকে ৪০ লক্ষ বছর আগে সওচাব (Tsauchab) নদীর প্রাবল্যে পাথুরে মাটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে এই গভীর খাদের সৃষ্টি হয়েছিল। ‘সেসরিয়েম’ শব্দটি আফ্রিকান্স ভাষার শব্দ, যার অর্থ ছয়টি বেল্ট। অতীতে ওলন্দাজ পরিব্রাজকেরা যখন এই মরুভূমি পার হচ্ছিল, তখন গিরিখাতের গভীর তলদেশ থেকে বালতি দিয়ে জল তোলার জন্য তাদের ছয়টি গরুর চামড়ার বেল্ট একসাথে বাঁধতে হত।
সেই থেকেই এই জায়গার নাম হয় সেসরিয়েম। গিরিখাতটি লম্বায় প্রায় ১ কিলোমিটার এবং ৩০ মিটার (১০০ ফুট) পর্যন্ত গভীর। কিছু কিছু অংশ এতটাই সরু যে প্রস্থে মাত্র দুই মিটারের মতো। এই সরু ও গভীর গঠনের কারণে গিরিখাতের ভেতরে সূর্যের আলো সরাসরি পৌঁছায় না, ফলে বাইরের মরুভূমির তীব্র গরমের তুলনায় এর ভেতরের পরিবেশ বেশ ঠাণ্ডা থাকে।

চারপাশের শুষ্ক নামিব মরুভূমির মাঝে এই ক্যানিয়নটি একটি মরূদ্যানের মতো কাজ করে। এর পাথুরে খাঁজে সারা বছরই কমবেশি জল জমে থাকে, যা স্থানীয় বন্যপ্রাণীদের বেঁচে থাকার প্রধান উৎস। হেঁটে হেঁটে এই গিরিখাতের তলদেশে নেমে কোটি কোটি বছরের প্রাচীন পাথরের স্তরগুলো সহজেই ঘুরে দেখা গেল। দিনশেষে আবার সেই অপরূপ রিসর্টের রুমে ফেরা।
পর্ব ৩: ট্রপিক অব ক্যাপ্রিকর্ন, সোয়াকোপমুন্ড এবং আটলান্টিকের জাদুকরী সূর্যাস্ত, ওয়ালভিস বে
আজ যাব উপকূল শহর সোয়াকোপমুন্ডে। ব্রেকফাস্ট খেয়ে গাড়িতে চড়ে বসলাম। আবারও সেই জনমানবশূন্য দীর্ঘ রাস্তা। কোনও গণপরিবহন নেই। কিছুটা যেতেই আমাদের গাড়ি এসে থামল একটি রোমাঞ্চকর সাইনবোর্ডের সামনে— মকরক্রান্তি রেখা (Tropic of Capricorn)। মাইলের পর মাইল জনমানবহীন ধূ-ধূ প্রান্তরের বুক চিরে চলে যাওয়া এই কাল্পনিক রেখাটি ছুঁয়ে যাওয়ার অনুভূতিটাই অন্যরকম। সেখানে একটি স্মৃতিসূচক ছবি তুলে আবার এগিয়ে চললাম।

মরুভূমির রুক্ষতা পেরিয়ে আমরা উপকূলের কাছে এসে পড়েছি। ভূপ্রকৃতিতেই তা বোঝা যাচ্ছে। পৌঁছালাম একটু শান্ত ও ছিমছাম শহর সোয়াকোপমুন্ড (Swakopmund)-এ। এখানে জার্মান ঔপনিবেশিক আমলের ঘরবাড়ি আর সাগরের ঠান্ডা হাওয়া মরুভূমির ক্লান্তি এক নিমেষে দূর করে দিল। মরুভূমির গনগনে আঁচ আর ধুলো উড়িয়ে যখন আমরা সোয়াকোপমুন্ড (Swakopmund) শহরে পা রাখলাম, তখন এক মুহূর্তের জন্য বিভ্রম তৈরি হল। মনে হল আফ্রিকার বুক থেকে এক লহমায় বুঝি জার্মানির কোনও শান্ত উপকূলীয় শহরে চলে এসেছি।
একদিকে আদিম নামিব মরুভূমি আর অন্যদিকে উত্তাল আটলান্টিক মহাসাগর— এই দুই চরম বিপ্রতীপ জগতের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এই শহরটি। ঔপনিবেশিক আমলের চমৎকার জার্মান স্থাপত্য, সুন্দর মার্জিত রাস্তাঘাট আর ক্যাফেগুলোর পরিবেশ মরুভূমির ক্লান্তি এক নিমেষে ভুলিয়ে দেয়। প্রচুর বাড়ি শতাব্দীপ্রাচীন, পুরনো স্থাপত্যের চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তবে সোয়াকোপমুন্ডের আসল জাদু দেখা যায় দিনের শেষে, সমুদ্রসৈকতে তার বিখ্যাত জেটিতে (Swakopmund Jetty) দাঁড়িয়ে। তাই বিকেলের আলো পড়ে আসতেই আমরা গিয়ে দাঁড়ালাম সাগরের বুকে প্রসারিত ঐতিহাসিক কাঠের জেটিটার ওপর। আটলান্টিকের ঠান্ডা, তীব্র হাওয়া আছড়ে পড়ছিল জেটির গায়ে। ঠিক তখনই শুরু হল প্রকৃতির সেই অবিস্মরণীয় রঙের খেলা।
আফ্রিকার পশ্চিম দিগন্তে সূর্য যখন ধীরে ধীরে নিচে নামতে থাকে, তখন পুরো আকাশ আর সমুদ্রের জল প্রথমে গাঢ় হলুদ, তারপর টকটকে কমলা আর শেষে এক মায়াবী রক্তিম আভায় ভরে যায়। মরুভূমির প্রান্তর ছুঁয়ে আসা বাতাস আর মহাসাগরের গর্জন যেন এক অদ্ভুত সুর তৈরি করে।

কাঠের জেটির ওপর দাঁড়িয়ে আটলান্টিকের সেই দিগন্তজোড়া সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে মনে হল, এই দৃশ্য ফ্রেমবন্দি করার জন্য নয়, শুধু চোখ বুজে মনের ভেতর চিরকালের জন্য জমিয়ে রাখার মতো। সূর্য পুরোপুরি ডুবে যাওয়ার পরও আকাশের সেই লালচে-বেগুনি আভা অনেকক্ষণ আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।
পরদিন সকাল থেকে বৃষ্টি! এখানে আবহাওয়া খুব তাড়াতাড়ি পাল্টায়। একটু কমলে গেলাম এখানকার আসল আকর্ষণ স্যান্ডউইচ হারবার (Sandwich Harbour), যেখানে আটলান্টিক মহাসাগরের উত্তাল তরঙ্গ সরাসরি গিয়ে আছড়ে পড়েছে প্রকাণ্ড নামিব মরুভূমির বিশাল সব বালিয়াড়ির গায়ে।

খাড়া বালির পাহাড় বেয়ে নিচে সাগরের জল ছুঁইছুঁই অবস্থা যে কী ভয়ঙ্কর সুন্দর রোমাঞ্চ, তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব! যেন সমুদ্র তার অসীম জলরাশি নিয়ে মরুর তৃষ্ণা মেটানোর জন্য উদগ্রীব।
তারপর গেলাম উপকূলের শহর ওয়ালভিস বে (Walvis Bay)-তে। এখানকার শান্ত লেগুনে হাজার হাজার ফ্ল্যামিঙ্গো (Flamingos) আর পেলিক্যান পাখির মেলা বসেছে। এরপর গেলাম পোর্টে। গুরুত্বপূর্ণ পোর্ট। আশেপাশের সব দেশের আমদানি রপ্তানির জন্য ব্যস্ততম পোর্ট। কাছাকাছি অনেক দেশে সমুদ্র নেই যে!

তবে কিছু অংশ টুরিস্টদের জন্য খোলা। সেখান থেকেই তিমি দর্শনের ছোট্ট ছোট্ট বোট ছাড়ে। আমার এতে যাওয়ার সুযোগ হল না, সে আর কী করা যাবে! একটি সরকারি স্কুলে যাওয়া হল। বাচ্চাগুলো বিদেশি টুরিস্ট দেখে খুব খুশি- প্রধান শিক্ষক ও কয়েকজন টিচারদের সঙ্গে কথা হল। নামিবিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা খানিকটা বোঝা গেল।
নামিবিয়ার সংবিধান অনুযায়ী, ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সি প্রতিটি শিশুর জন্য শিক্ষা গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক এবং সরকারি স্কুলগুলোতে এই শিক্ষা সম্পূর্ণ অবৈতনিক। শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি, যেহেতু নামিবিয়ার সরকারি ভাষা ইংরেজি। নামিবিয়া সরকার তার জাতীয় বাজেটের প্রায় ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করে, যা এই সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। কিন্তু মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছে স্কুলছুটের হার বেশ বেশি।

শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলগুলোতে যোগ্য শিক্ষকের অভাব, দুর্বল পরিকাঠামো এবং পরিচ্ছন্নতার অভাবে অবস্থা আরও বেহাল। আর আছে ভয়াবহ বেকারত্ব। নামিবিয়ায় সামগ্রিক বেকারত্বের হার এমনিতেই অনেকটা বেশি (প্রায় ৩৪-৩৬ শতাংশ), তবে ১৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সি যুবসমাজের মধ্যে এই হার প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
বিকেলের দিকে আবার গেলাম সমুদ্রের পারে। আজ মেঘে ঢাকা দিকচক্রবাল; যার ফলে গতকালের অপরূপ সৌন্দর্যের পুনরাবৃত্তি দেখা গেল না। তবে এই সোয়াকোপমুন্ডে পেলাম গুজরাটি মালিকানাধীন একটি রেস্তোরাঁ, ভারতীয় খিচুড়ি ডিমভাজায় তাই ডিনার সারলাম।

পর্ব ৪: দামারাল্যান্ডের আদিম ইতিহাস ও ইতোশার বন্যপ্রাণ
পরদিন সোয়াকোপমুন্ড থেকে উপকূল ধরে আরও উত্তরে যেতেই প্রথমে পৌঁছে গেলাম স্কেলিটন কোস্ট (Skeleton Coast)। একটি সীলের কঙ্কাল আটকে আছে সমুদ্রতটে, আর আছে জেইলা (Zeila) নামের জাহাজের ধ্বংসাবশেষ। জেইলা একটি মাছ ধরার ট্রলার, ২০০৮ সালে স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রিত এটিকে যখন ভারতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন একটি টো-লাইন ছিঁড়ে চরে আটকে যায়।
হেনটিস বে-র (Henties Bay) কাছে অবস্থিত এই ধ্বংসাবশেষটি পাখি পর্যবেক্ষণ এবং ছবি তোলার জন্য একটি জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ। তবে জনমানবশূন্য এই তটরেখায় কিছু টুরিস্টদের বিক্ষিপ্ত কোলাহল যেন শূন্যতার বোধ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। আরও কিছু সময় বাদে পৌঁছালাম কেপ ক্রস (Cape Cross)-এ।

হাজার হাজার ফার সিল (Fur Seals)-এর ডাক, তাদের খুনসুটি আর সাগরের গর্জন সেখানে এক বন্য কোলাহলের সৃষ্টি করেছিল। অসংখ্য সীল, সবই প্রায় মাদি, কখনও ছানা সীলের নিবিষ্ট আলাপন, আবার কখনও অন্যদের সঙ্গে মাতামাতি করছে, কেউ বা রোদ পোহাচ্ছে, আবার কিছু সীল সমুদ্রস্নানে ব্যস্ত। যতদূর দেখা যায় রাশি রাশি সীল। কটু গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আছে। ঘণ্টাখানেক তাদের সঙ্গে থেকে আবার রওনা। উপকূল ছেড়ে আমাদের গাড়ি এবার বাঁক নিল ভেতরের দিকে। পাথুরে ও রুক্ষ দামারাল্যান্ড-এর উদ্দেশ্যে।
অসীম দারিদ্র্য আর প্রাকৃতিক জলহীনতায় ভুগছে পুরো দামারাল্যান্ড। এ হল এমন এক অনন্য জায়গা, যেখানে আধুনিক পৃথিবীর ছোঁয়া এড়িয়ে মানুষ প্রকৃতির কঠোর নিয়মের সঙ্গে লড়াই করে আজও তাদের প্রাচীন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রেখেছে। দামারাল্যান্ডে প্রধানত তিনটি নৃগোষ্ঠী বা উপজাতির মানুষের বসবাস দেখা যায়: (১) দামারা জনগোষ্ঠী (Damara People), (২) হিম্বা জনগোষ্ঠী (Himba People) এবং (৩) হেরেথো জনগোষ্ঠী (Herero People)।

এই অঞ্চলের নাম মূলত প্রথম গোষ্ঠীর নাম অনুসারেই হয়েছে। বুশম্যান (San) উপজাতির পর দামারাদের নামিবিয়ার অন্যতম প্রাচীন অধিবাসী বলে মনে করা হয়। তারা খোয়েখোয়ে (Khoekhoe) নামক একটি বিশেষ ভাষা ব্যবহার করে, যা তাদের মুখের ‘ক্লিক’ (Click) শব্দের জন্য পরিচিত।
ঐতিহাসিকভাবে তারা শিকারী এবং পশুপালক। হিম্বা জনগোষ্ঠী (Himba People) মূলত আধা-যাযাবর (Semi-nomadic) পশুপালক। হিম্বা নারীদের উর্ধ্বাঙ্গ প্রায়শই অনাবৃত। তারা আজও তাদের শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী মাটির কুঁড়েঘরে বাস করে। হেরেথো জনগোষ্ঠী (Herero People) ও এই অঞ্চলের বাসিন্দা। এদের নারীদের পোশাক আবার বেশ আকর্ষণীয়; তারা ভিক্টোরিয়ান আমলের ঢঙে তৈরি বড় ঘেরওয়ালা স্কার্ট এবং গরুর শিং-এর মতো দেখতে এক বিশেষ ধরনের টুপি মাথায় পরে।

তবে এখানকার মরুভূমির হাতিদের (Desert Elephants) দেখতে পেলাম দূর থেকে। রিসর্টে ঢোকার রাস্তায় তাদের মস্ত পায়ের ছাপ আর বিদ্যুৎবাহী তারের দেওয়াল অস্বস্তি আর স্বস্তি দুটোই নিয়ে এল। রেস্তোরাঁর কর্মীরা আবার একটা মিরক্যাটকে পুষেছে- নাম তার মিলা। সে দিব্যি আমার কোলে চেপে আদর খেয়ে গেল।
পরদিন সকালে গেলাম এখানকার মূল আকর্ষণ টুইফেলফন্টেইন (Twyfelfontein)-এর প্রাচীন রক আর্ট (Rock Art) দেখতে। হাজার হাজার বছর আগে এই অঞ্চলের আদিম শিকারী ও সান (San) উপজাতির মানুষেরা পাথরের গায়ে খোদাই করে জিরাফ, সিংহ এবং শিকারের যেসব ছবি এঁকে রেখে গেছেন, তা মানবসভ্যতার এক প্রাচীন দলিল।

এরপর আমাদের সফর পৌঁছাল এক চূড়ান্ত অধ্যায়ে— ইতোশা ন্যাশনাল পার্ক (Etosha National Park)। পৌঁছতেই বিকেল হয়ে গেল। তাই নিজেদের গাড়িতেই একটি দ্রুত ভ্রমণ করে নেওয়া হল। দেখা দিল জেব্রা, জিরাফ আর গন্ডার। ‘আবার কাল সকালে আসছি’ বলে খুব সুন্দর এক রিসর্টে রাত কাটাতে গেলাম।
পরদিন সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম ল্যান্ডক্রুজারে চেপে বিগ ফোর দেখার আশায়। বিশাল এক লবণের চাতাল বা ‘Etosha Pan’-কে ঘিরে গড়ে ওঠা এই অভয়ারণ্যে দেখা পেলাম বনের আসল রাজাদের। এটি অদ্ভুত বিস্ময়কর লবণাক্ত সমভূমি এবং বিখ্যাত এতোশা ন্যাশনাল পার্কের প্রাণকেন্দ্র। শোনা যায়, মহাকাশ থেকেও এই সাদা লবণের চাদরটি পরিষ্কার দেখা যায়।

স্থানীয় ওভাম্বো (Ovambo) উপজাতির ভাষায় ‘এতোশা’ শব্দের অর্থ ‘বিশাল সাদা জায়গা’। এটি প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং প্রায় ৫০ কিলোমিটার চওড়া। এটি আফ্রিকার বৃহত্তম লবণের সমভূমিগুলোর একটি। জানা গেল, আজ থেকে প্রায় ১ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে এই অঞ্চলে একটি বিশাল হ্রদ ছিল, যা কুনেনে (Kunene) নদী দ্বারা পুষ্ট হত। পরবর্তীতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীর গতিপথ বদলে যায় এবং হ্রদটি ধীরে ধীরে শুকিয়ে গিয়ে এই বিশাল লবণের চাদরে পরিণত হয়।
বিশাল পার্কের বিভিন্ন ওয়াটারহোল বা জলের আধারগুলোর পাশে চুপচাপ গাড়ি থামিয়ে দেখতে পেলাম জিরাফ, হাতি, জেব্রা, গন্ডার, ওয়াইল্ডি বিস্ট এবং বিরল প্রজাতির ইম্পালা ও স্প্রিংবকদের। সন্ধ্যার প্রাক্কালে প্রথমে তিনটি, তারপর বহু জিরাফের জল খাওয়ার দৃশ্য ছিল খুবই চিত্তাকর্ষক। তবে সিংহ বা চিতা দেখা দিল না। ছটার মধ্যে পার্ক থেকে বেরিয়ে এর অপর পারে সুমেব (Tsumeb) শহরতলির আরেকটি চমৎকার হোটেলে রাত কাটালাম।

পর্ব ৫: রুনডু, দিভুনদু এবং ওকাভাঙ্গো নদী
আমাদের এই অবিস্মরণীয় দীর্ঘ যাত্রার শেষ ঠিকানা ছিল নামিবিয়ার উত্তর-পূর্ব কোণের সবুজে ঘেরা ওকাভাঙ্গো নদীর তীরের অঞ্চল দিভুনদু (Divundu)। মাঝে নেমেছিলাম রুনডু-তে। অপরিসীম দারিদ্র্যের মালিন্য মেখে ওপারের বড় বড় শহুরে বাজারের দিকে তাকিয়ে আছে একদল মানুষ। অসহ্য গরমে তাদের বাস জানলাহীন টিনের বাড়িতে, পানীয় জলও অমিল।
সামাজিক পার্থক্যের এক বিষম দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই রুনডু এবং আশেপাশের এলাকা। রুনডু এবং এর আশেপাশের অঞ্চলে মূলত বান্টু-ভাষী কাভাঙ্গো (Kavango) জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন, যারা নামিবিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ শতাংশ। কয়েক শতাব্দী আগে মধ্য ও পূর্ব আফ্রিকা থেকে স্থানান্তরিত হয়ে এই অঞ্চলের উর্বর অববাহিকায় তারা বসতি স্থাপন করেছিলেন।

আধুনিক সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রতিটি উপজাতি এখনও তাদের নিজস্ব রাজা/রানি (Chief) এবং গ্রামপ্রধানদের (Headmen) দ্বারা পরিচালিত হয়। ভূমির বণ্টন এবং সামাজিক বিরোধ মীমাংসায় এই ঐতিহ্যবাহী কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা এখনও আইনগতভাবে স্বীকৃত। কাভাঙ্গো সংস্কৃতিতে ড্রাম বা মাদল বাজানো, গান এবং নাচ সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসবের মূল অংশ।
গল্প বলার মাধ্যমে তারা তাদের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে বাঁচিয়ে রাখে। তাদের পাশ কাটিয়ে আমরা চলে গেলাম ওকাভাঙ্গো নদীর তীরের অঞ্চল দিভুনদুতে। নদীর তীরে চমৎকার একটি রিসর্ট। ওকাভাঙ্গো নদীর জলের শব্দ, হিপোর ঘোঁৎ ঘোঁৎ, কুমিরের রোদ পোহানো এবং ঘন সবুজ অরণ্যের মাঝে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে মরুভূমি আর সাগরের দেশ নামিবিয়াকে বিদায় জানালাম।

এবারের গন্তব্য বতসোয়ানা। রাতে ডিনারের পর বড় বড় জয়ঢাকের তালে স্থানীয় আদিবাসী নৃত্য এই নদীর পারের বাস আরও মোহময় করে তুলল। আগামীকাল চলে যাব বতসোয়ানা। সে আরেক নতুন দেশ, নতুন ভূপ্রকৃতি, নতুন মানুষ। তার গল্প পরে শোনাব।
পর্ব ৬: শেষ গানেরই রেশ
নামিবিয়া এমন এক দেশ, যেখানে পা রাখলে মনে হয় পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে অন্য কোনও আদিম, শান্ত গ্রহে চলে এসেছি। এখানকার রুক্ষ কিন্তু চোখ ধাঁধানো ল্যান্ডস্কেপ মনের মণিকোঠায় যে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যায়, তাকেই বোধহয় বলা চলে নামিবিয়া ভ্রমণের ‘রেশ’।

নামিবিয়া শেখাল একাকিত্ব কতটা সুন্দর হতে পারে। দিগন্ত বিস্তৃত ফাঁকা রাস্তা, মাইলের পর মাইল কোনও মানুষের চিহ্ন না থাকা আর প্রকৃতির এই আদিম রূপ মনের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়। নামিবিয়া থেকে ফিরে এলেও, সেই লাল বালির নীরবতা বহুদিন মনে থেকে যাবে।
নামিবিয়ার সফর শেষ হতে পারে, কিন্তু সেই ধু-ধু প্রান্তরের আদিমতা, রুক্ষ পাহাড়ের খাঁজে লুকিয়ে থাকা লালচে মাটির গন্ধ, হিম্বা নারীদের চিরন্তন হাসি, আর ওকাভাঙ্গো নদীর শান্ত বয়ে চলা— সব মিলিয়ে এক অপার্থিব শান্তির অনুভূতি মনের গহীনে থেকে যায়। যেন এক অনন্ত ভ্রমণের ডাক, যা ঘরে ফেরার পরও বারবার অবচেতনে কড়া নেড়ে যায়।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্য়মে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
