(Children Horror Story)
স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে একবার উপরের দিকে তাকালেন নারাণবাবু। দোতলা বাড়িটার মাঝামাঝি জায়গায় সাদার উপর নীল রং দিয়ে লেখা আছে, জগৎপতি হাইস্কুল। দেখেই পিত্তি জ্বলে গেল তাঁর। আহা কী একখানা বাহারি নাম রে! জগতের পতি। এদিকে তো দোতলা বাড়ির এদিক-ওদিক দু-চারখানা অশ্বত্থের চারা দেখা যাচ্ছে। বেশ কিছুদিন কলি ফেরানো হয়নি নিশ্চিত। সাদা দেওয়ালের গায়ে শ্যাওলার ছোপ লেগেছে। কিন্তু বিরক্ত যতই লাগুক কিছু করার নেই। সরকারবাহাদুরের হুকুম তো তামিল করতেই হবে। তাই এই জগৎপতি হাইস্কুলের হেডমাস্টার হয়েই আসতে হয়েছে নারাণ বসুকে।
এঁদো গ্রাম পালানপুর। পায়রাডাঙা রেল স্টেশনে নেমে বাসে চড়ে আসতে হয় প্রায় দু’ঘণ্টা। তারপর আবার ভ্যান রিকশায় অন্তত পঁয়তাল্লিশ মিনিট। মাঠ-ঘাট-নড়বড়ে সাঁকো সব পেরিয়ে তবে দেখা মেলে গ্রামের। তাও আবার সবেধন নীলমণি। আশপাশের তিন-চারটে গ্রামের মধ্যে এই একটিই হাইস্কুল। ছাত্র তাই ভালই। কিন্তু বেশিরভাগই গ্রামের গরিব-গুর্বো চাষীদের ছেলে।
আচ্ছা নারাণ বসুর মতো একজন শিক্ষিত, সভ্য-ভদ্র মানুষকে কি এরকম একটা গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া উচিত? কে যে তাঁর এই সর্বনাশটি করল এখনও জানতে পারেননি। তবে লোক লাগিয়ে রেখেছেন। কানে একদিন নিশ্চয় আসবে। আর তিনিও তো এই ধ্যাড়ধেড়ে গোবিন্দপুরে বেশিদিন পড়ে থাকবেন না। তখন বুঝিয়ে দেবেন কত ধানে কত চাল।
ভাবতে ভাবতেই গেট দিয়ে ঢুকে পড়লেন নারাণবাবু। গেটের পাশে একটা ছোটমতো চালাঘর। সেখানে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে একটা লোক খুব মন দিয়ে ছোট খাতায় কী যেন লিখছিল। এই নিশ্চয় স্কুলের দারোয়ান। কিন্তু নারাণবাবুকে তো সে চেনে না। তাই উঠেও দাঁড়াল না, সেলামও ঠুকল না। দেখলই না। নিজের কাজ করে যেতে লাগল একমনে। মাথাটা গরম হয়ে গেল নারাণবাবুর। আগের স্কুলে তাঁর কড়া নির্দেশ ছিল হেডমাস্টারকে দেখলেই দারোয়ানকে লাফিয়ে উঠে সেলাম করতে হবে। আর এই লোকটা এমন বেয়াদপ! ঠিক আছে সবে তো প্রথমদিন। দারোয়ানকে সিধে করতে বেশিদিন লাগবে না।

কাউকে সিধে করতেই নারাণ বসুর বেশিদিন লাগে না। আগের স্কুলেও সবাই তাঁর ভয়ে থরহরি কম্প ছিল। আর ছাত্রদের জন্য তো রোজই হাতে কিংবা পিঠে ঘা-কতক বসিয়ে দেওয়া ছিল তাঁর কাছে জলভাত। পড়াশোনা নিয়ে তেমন মাথা ঘামান না তিনি কোনওদিনই। তাঁর মতে স্কুলের পরিবেশটি ঠিকঠাক রাখা চাই। তাহলেই লেখাপড়া আপনি হবে। কিন্তু আজকাল এমন সব বাজে নিয়মকানুন হয়েছে যে নারাণবাবুর মতো কড়া হেডমাস্টারের পক্ষে স্কুল চালানোই মুশকিল। তিনি যে ছেলেদের শাসন করেন সেকথাই নাকি ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তাঁর নামে নালিশ হয়েছে। সেজন্যই এই বদলি।
নারাণবাবুর ধারণা, ছেলেরা বাড়ি গিয়ে কাঁদুনি গেয়েছে আর তাতেই মা-বাবারা গলে জল হয়ে উপরমহলে খবর দিয়েছেন। সেদিক দিয়ে অবশ্য এই জগৎপতি স্কুল নিয়ে কোনও চিন্তা নেই। খোঁজখবর নিয়ে তিনি বুঝেছেন এই স্কুলের ছাত্র থেকে মাস্টার সবই তাঁর হাতের মুঠোয় থাকবে। হাতের সুখ করতে বাধা দেবে না কেউ।
গটমট করে বারান্দায় উঠতেই একটা লোকের সঙ্গে একেবারে মুখোমুখি। এ ব্যাটা নিশ্চয় পিওন…দেখেই বুঝেছেন ঠিক। তাই গোঁফ ফুলিয়ে বললেন— এই যে ছোকরা… আমি স্কুলের নতুন হেডমাস্টার।
স্কুল এখনও বসেনি। ছাত্ররা একজন-দুজন করে আসছে। গেট থেকে একটা সুড়কির রাস্তা গেছে স্কুলবাড়ি পর্যন্ত। তার পাশেই মাঠ। জ্যেষ্ঠের মাঝামাঝি। কিন্তু আগের দিনই বৃষ্টি হয়েছে। ভেজা মাঠে দুটো ছেলে বল পেটাপেটি করছে। ক্লাস ফাইভ-সিক্স হবে। ক্লাস শুরুর আগে এক পক্কড় খেলে নিচ্ছে। কটমট করে তাকাবেন ভেবেছিলেন নারাণবাবু। কিন্তু তার আগেই ঘটে গেল কাণ্ডটা।
একটা ছেলে বলে লাথি মারল আর অমনি কাদা ছিটকে লাগল তাঁর ধুতিতে। দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। কাদা যে ছিটকেছে, সেটা ছেলেটা খেয়ালই করেনি। সে ছুটছে বলের পিছনে। খপ করে তার নড়াটা ধরে ফেললেন নারাণবাবু। তারপর কষকষ করে কানটা মলে দিয়ে আবার হনহন করে এগোলেন সামনের দিকে। ছেলেটা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে কানে হাত বোলাতে লাগল।

গটমট করে বারান্দায় উঠতেই একটা লোকের সঙ্গে একেবারে মুখোমুখি। এ ব্যাটা নিশ্চয় পিওন…দেখেই বুঝেছেন ঠিক। তাই গোঁফ ফুলিয়ে বললেন— এই যে ছোকরা… আমি স্কুলের নতুন হেডমাস্টার। ঘর খুলে দাও আর সবাইকে খবর দাও আমি এসেছি।
নতুন হেডমাস্টার যে আসতে পারে এরকম কথা ক’দিন ধরেই স্কুলে শোনা যাচ্ছিল। ছকু পিওনও শুনেছিল। তাই তাড়াতাড়ি বলল, আসুন স্যার। আমার কাছে চাবি আছে। আমি নিয়ে যাচ্ছি আপনাকে…
এক সপ্তাহ কেটে গেছে। নারাণবাবু এখন স্কুলের অন্ধিসন্ধি অনেকটা জেনে গেছেন। সাধারণভাবে তাঁর সবাইকেই সন্দেহের চোখে দেখা অভ্যাস। তাই মাস্টারমশাইদের উপর কড়া নজর রাখছেন।
দোতলার একপ্রান্তে হেডমাস্টারের ঘর। তার পাশেই টিচার্স রুম। ছকু তালা খুলে দরজা ফাঁক করতেই নারাণবাবু ভিতরে ঢুকতে গেলেন। কিন্তু আহাম্মক ছকু তার আগেই দরজাটা ছেড়ে দিয়েছে। তাই দরজার পাল্লাটা সোজা এসে পড়ল হেডমাস্টারের আঙুলের উপর। বিকট আর্তনাদে যে ক’জন শিক্ষক এসেছিলেন, তাঁরা ছুটে এলেন।
ছকু ছুটে গিয়ে ঠাণ্ডা জল নিয়ে এল। পাতলা কাপড় ভিজিয়ে আঙুলে বেঁধে দেওয়া হল। কিন্তু তারপরেও নারাণবাবুর মনে হচ্ছিল আঙুলের হাড়টা যেন দপদপ করছে। ব্যথাটা আরও বেশি মনে হচ্ছিল কারণ ততক্ষণে স্কুলের সব ছেলেপুলেরাও এসে হেডস্যারের ঘরে জড়ো হয়েছে। নারাণবাবু খেয়াল করেছেন, তার মধ্যে একটু আগে যার কান মুলে দিয়েছেন সেই ছোঁড়াটাও আছে আর তাঁর দুর্দশা দেখে কেমন যেন মিটিমিটি হাসছে!

এক সপ্তাহ কেটে গেছে। নারাণবাবু এখন স্কুলের অন্ধিসন্ধি অনেকটা জেনে গেছেন। সাধারণভাবে তাঁর সবাইকেই সন্দেহের চোখে দেখা অভ্যাস। তাই মাস্টারমশাইদের উপর কড়া নজর রাখছেন। ছাত্রদেরও তিনি খুব ভাল চোখে দেখেন না। বয়স কম হলেও তারা যে কী সাংঘাতিক রকম বিচ্ছু, সে সম্বন্ধে তাঁর যথেষ্ট ধারণা আছে। তাদের রীতিমত শাসনে রাখাই তাঁর অভ্যাস। সেজন্য রোজ ক্লাস চলাকালীন স্কুলের বারান্দায় জুতো মশমশিয়ে, হাতের ছড়ি ঠুকতে ঠুকতে পায়চারি করেন। এইসময় কোনও বেচারা ছাত্র সামনে পড়লে পালাতে পথ পায় না। সাধারণত সেটা দেখে বেশ আত্মপ্রসাদ অনুভব করেন নারাণ বসু।
কিন্তু এবারে কেন জানি ঠিক সেরকম মনটা ভরপুর হচ্ছে না। তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন সবার উপর নজর রাখার জন্য। অথচ সারাক্ষণ মনে হচ্ছে, তাঁর উপর কে যেন নজর রাখছে। বারান্দা দিয়ে হাঁটার সময় কে যেন পিছনে আসছে। এমনকি অনেক সময় চেয়ারে বসেও মনে হচ্ছে, উল্টোদিকে বসে কে যেন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। অথচ চোখ তুলে তাকালেই বেবাক ফাঁকা। নারাণবাবুর ভয় হচ্ছে শরীরে কিছু গণ্ডগোল হয়নি তো? প্রেশার লো হয়ে গেল নাকি? রক্তচাপ কমে গেলে মানুষের অনেকরকম হ্যালুসিনেশন হতে পারে শুনেছেন। কথাটা কে যে বলেছিল, এখন আর মনে নেই। তবে বলেছিল নিশ্চয় কেউ।
তাঁর অবস্থা বুঝেই অঙ্কের সুধীর স্যার অবস্থা সামাল দিলেন, বাজে কথা বোলো না তো বনমালী… গরু-ছাগল ঢুকতে দেবে না। ঢুকে গেলে তক্ষুনি তাড়িয়ে দেবে। এ তো সোজা কথা।
চিন্তাটা মাথার মধ্যে ঘুরছিল। কিন্তু নিজের শরীর নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবার সময় পেলেন না নারাণবাবু। হঠাৎ স্কুলের বাগানের দিকে চোখ পড়ল। গ্রামের ইস্কুল। তাই সামনে পিছনে জায়গা অনেক। সামনের দিকে দুটো বেশ বড় মাঠ আছে। একটাতে উঁচু ক্লাসের ছেলেরা ফুটবল-ক্রিকেট খেলে। অন্যটা ছোটদের বল পেটানো আর হুটোপাটি করার জন্য। পিছন দিকটায় বাগান। নানারকম সবজির চাষ হয় সেখানে। মালি আছে একজন। দেখাশোনা মাস্টারমশাইরা করেন। ছেলেরাও দরকারমতো বাগানে কাজ করে। স্কুলের বাচ্চাদের দুপুরের খাবারের সবজিপাতি অনেকটাই বাগান থেকে পাওয়া যায়।
বাগানের কথাটা প্রথমদিন এসেই শুনেছিলেন নারাণ বসু। কিন্তু বিশেষ গুরুত্ব দেননি। এগুলো সব তাঁর মতে আসলে ফাঁকি মারার ছল। আজ হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল নিতাই মালি উবু হয়ে বসে গাছের গোড়া উসকে দিচ্ছে। আর তার ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে আছে একটা বুড়ো মতো লোক। মন দিয়ে নিতাইয়ের কাজ দেখছে। কথাবার্তা কিছু হচ্ছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু স্কুল আওয়ার্সে গেটের ভিতরে বাইরের লোকের ঢোকা বারণ। নারাণবাবু এসেই নিয়মটি চালু করেছেন। কেউ যদি আসতে চায়, তাহলে হেডমাস্টারের কাছে অনুমতি নিতে হবে। হতচ্ছাড়া, গাধা দারোয়ানটা তাই শুনে প্রশ্ন করেছিল— স্যার অনেকসময় তো গরু-ছাগল মাঠের ঘাস খেতে ভিতরে ঢুকে পড়ে। তখনও কি তাহলে আপনার অনুমতি নিতে হবে?

আশপাশে অন্য মাস্টারমশাইরা না থাকলে ওই দারোয়ানটাকে তখনই দু-ঘা বসিয়ে দিতেন তিনি। তাঁর অবস্থা বুঝেই অঙ্কের সুধীর স্যার অবস্থা সামাল দিলেন, বাজে কথা বোলো না তো বনমালী… গরু-ছাগল ঢুকতে দেবে না। ঢুকে গেলে তক্ষুনি তাড়িয়ে দেবে। এ তো সোজা কথা।
ব্যাপারটা সেখানেই মিটে গেছিল। কিন্তু হুকুমটা চালু আছে। তাহলে এই লোকটা ভিতরে এল কী করে! নির্ঘাৎ এই মালিটা ডেকে এনেছে। বাগানের সবজি বাইরে বিক্রি করার ধান্দা। কিন্তু নারাণ বসু থাকতে সেটি তো আর হতে পারে না… চোর ধরার উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটতে ফুটতে নারাণবাবু দ্রুত নীচে নেমে গিয়ে হাঁক পাড়লেন, এই মালি ইধার আও…
মালি ঘাবড়ে গিয়ে ঘুরে নিজের পিছনটা প্রথমে দেখে। তারপর এদিক-ওদিক দেখে। কিন্তু কোথাও কেউ নেই। তার মানে লোকটা এর মধ্যেই বাগানে কোথাও লুকিয়ে পড়েছে। মালিকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে নারাণবাবু নিজেই বাগানে নেমে গোটা বাগানটা ঘুরে দেখেন।
মালি বেচারা সবটা না বুঝলেও আওটা বুঝেছিল, তাই তাড়াতাড়ি গামছায় হাতটা মুছে এগিয়ে এল।
ওই লোকটা কে?
কোন লোকটা বাবু? মালি তো অবাক।
কিন্তু এসব ভান খুব চেনেন নারাণ বসু। তাই মুখ গম্ভীর করে বলেন, ওই যে তোমার পিছনে যে দাঁড়িয়েছিল…

মালি ঘাবড়ে গিয়ে ঘুরে নিজের পিছনটা প্রথমে দেখে। তারপর এদিক-ওদিক দেখে। কিন্তু কোথাও কেউ নেই। তার মানে লোকটা এর মধ্যেই বাগানে কোথাও লুকিয়ে পড়েছে। মালিকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে নারাণবাবু নিজেই বাগানে নেমে গোটা বাগানটা ঘুরে দেখেন। কোথাও কেউ নেই। গেট বন্ধ আছে। পালিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। এক যদি পাঁচিল ডিঙিয়ে পালায়। কিন্তু প্রায় একমানুষ উঁচু পাচিল দিয়ে ঘেরা স্কুলবাড়ি। টপকে পালানো অত সহজ নয়। প্যাঁচটা ঠিক ধরতে না পেরে আরও রেগে যান। মশমশ করে গোটা বাগান পায়চারি করতে থাকেন। ছড়ির ঘায়ে এপাশে-ওপাশে দু-চারটে চারাগাছ উল্টে পড়ে। বেচারা নিতাই মালি তড়িঘড়ি সেগুলো মেরামতের চেষ্টা করে।
তবে চোর ধরতে না পারলেও বাগান পরিক্রমায় অন্য একটি লাভ হয়। নজরে পড়ে দক্ষিণ-পূর্ব কোণ বরাবর রয়েছে বেশ কয়েকরকম ফলের গাছ। তার মধ্যে আমগাছই গোটা তিনেক। আর তাতে বেশ হালকা কমলা রং ধরা আমও ঝুলছে অনেকগুলো। বাঃ বাঃ এ তো দারুণ ব্যাপার। নিতাই পাকা আম গোটা দশেক পেড়ে আমার টেবিলে রেখে এসো তো। গাছপাকা আম বহু বছর খাইনি।
মালিকে হুকুম দিয়ে ঘরে ফিরে আসেন নারাণবাবু। একটু পরে নিতাই মালি এক টুকরি আম এনে টেবিলে রাখে। গাছপাকা আম। গন্ধে ভরপুর। জিভে জল আসছে।
হেডস্যারের কথা শুনে নিতাই কেমন যেন ঘাবড়ে যাওয়া গলায় বলে, স্যার, গাছের ফল তো ছেলেরা খায়। উনি বলেছেন ওদের জন্যই গাছ লাগানো হয়েছে। মাস্টারমশাইরাও কেউ খান না।
উনিটি কে শুনি? প্রশ্নের উত্তরে মালি অনিশ্চিতভাবে ঘাড় নাড়ে।
বদমাইশিটা বুঝতে নারাণবাবুর দেরি হয় না। তাছাড়া এরকম অবাস্তব কথা তিনি আগে কখনও শোনেননি। স্কুলের গাছে ফল হয়েছে, সেই ফল নাকি শুধু ছেলেদের জন্য। মামাবাড়ির আবদার! কোনওরকমে রাগ সামলে নিতাইয়ের দিকে ফিরে দাঁতে দাঁত চিপে বলেন, খায় নয় খেত। এবার থেকে আর খাবে না। এক টুকরি ভাল পাকা আম এখনই আমার টেবিলে রেখে এসো। আর এখানে একটা নোটিস পুঁতে দাও যে, কোনও ছাত্র যেন আমগাছের কাছে না আসে।

মালিকে হুকুম দিয়ে ঘরে ফিরে আসেন নারাণবাবু। একটু পরে নিতাই মালি এক টুকরি আম এনে টেবিলে রাখে। গাছপাকা আম। গন্ধে ভরপুর। জিভে জল আসছে। কিন্তু তাও ঠিক করেন, বাড়ি গিয়ে জলে ভিজিয়ে, আরাম করে ছুরি দিয়ে কেটে কেটে খাবেন। গ্রামের ভিতরেই বাড়ি নিয়েছেন। দারোয়ান চেনে। বললেই পৌঁছে দেবে।
খুশি মনে নারাণ স্যার বারন্দায় একপ্রস্থ মশমশ করে চক্কর দিয়ে আসেন। কিন্তু ঘরে ফিরেই তাঁর চক্ষুস্থির। একটিও আম নেই। খালি ঝুড়িটা পড়ে আছে তাঁর টেবিলের উপর। রেগে আগুন হয়ে ঘর থেকে ছুটে বেরোন নারাণবাবু। ঠিক সেই সময় টিফিনের ঘণ্টা পড়ে ঢংঢং করে। হুড়মুড়িয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে আসে ছেলেরা। হেডস্যার স্তম্ভিত হয়ে দেখেন, ছেলেদের প্রায় সবার হাতেই একটি করে পাকা আম। কেউ খাচ্ছে, কেউ চুষছে, কেউ আবার লোফালুফি করছে।
নারাণবাবুর মনে হয় ঠিক তাঁর কানের পাশে কে যেন খিকখিক করে হেসে উঠেই চুপ করে গেল। দিনের বেলা। চারিদিকে কটকট করছে রোদ। তবু যেন কেমন গা-টা শিরশির করে ওঠে হেডমাস্টারের।
এর মধ্যে ঝুড়ির আম কোনগুলো এক্ষুনি জানা দরকার। নারাণবাবু ছুটে আসেন টিচার্স রুমে। বেঘো গর্জন করে জিজ্ঞাসা করেন, আমার ঘরে কারা ঢুকেছিল শুনি?
মাস্টাররা সবাই একটু নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচায়ি করেন। তারপর ভূগোলের মাস্টার নিলয় বলেন, কেউ তো ঢোকেনি স্যার। আমি আর পরিতোষ বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম। আপনি ঘর থেকে বেরোলেন আবার পায়চারি করে ফিরে এলেন দেখলাম। কিন্তু কাউকে ঢুকতে দেখিনি। আসলে আমার মনে হয় উনি…
নিলয়ের কথা শেষ করতে না দিয়েই দাঁত কিড়মিড় করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন নারাণ বসু। বোঝাই যাচ্ছে এরা সব সাঁট করে বদমাইশি করছে। এই কুকুরের জন্য অন্য মুগুর দরকার। ঠিক আছে, কুছ পরোয়া নেই। সেই ওষুধও তাঁর কাছে আছে। জব্দ করার মতলব ভাঁজতে ভাঁজতে ঘরে ঢুকে আবার প্রবল চমক লাগে তাঁর। টেবিলের উপর ঝুড়িটা ঠিক আগের মতই পড়ে আছে। তবে এখন আর খালি নয়। খোঁসা আর আঁটিতে ভর্তি। দু’খানা নীল ডুমো মাছিও উপরে ঘোরঘুরি করছে।

নারাণবাবুর মনে হয় ঠিক তাঁর কানের পাশে কে যেন খিকখিক করে হেসে উঠেই চুপ করে গেল। দিনের বেলা। চারিদিকে কটকট করছে রোদ। তবু যেন কেমন গা-টা শিরশির করে ওঠে হেডমাস্টারের।
নির্ঘাৎ রক্তচাপ কমে যাওয়াতেই এসব গণ্ডগোল। আর রক্তচাপ কমারও কারণ আছে। খাওয়াদাওয়া তো ঠিকমত হচ্ছে না। গ্রামদেশে রান্নার লোক পাওয়া যায় না। স্কুল থেকে ফিরে কোনওরকমে নিজেই দুটো ফুটিয়ে নেন। একেকদিন ইচ্ছে করে না। মুড়ি খেয়ে শুয়ে পড়েন। কিন্তু এভাবে তো চলতে পারে না। সমস্যার একটা সমাধান দরকার। নারাণবাবু তাই জানিয়ে দিয়েছেন, দুপুরের খাবার তিনি স্কুলেই খাবেন। ছাত্রদের জন্য রান্না হয়। তাঁর জন্যও হবে। তবে তাঁর শরীর দুর্বল, তাই পাতে মাছ-মাংস দরকার। কিন্তু টাকা কে দেবে? রান্নার দায়িত্বে যে মাস্টার তিনি মিনমিন করে জানতে চেয়েছিলেন। নারাণবাবু জলদগম্ভীর স্বরে বলে দিয়েছেন, ম্যানেজ করবেন। অনেক টাকা বাজে খরচ হয়। ওর থেকে ম্যানেজ করবেন।
আজকাল মনমেজাজ সারাক্ষণই খারাপ থাকে নারাণবাবুর। স্কুলের ছেলেপুলেদের শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারটা তিনি যেন কিছুতেই আয়ত্তে আনতে পারছেন না। সিঁধেল চোরের তেলমাখা গায়ের মতো পিছলে যাচ্ছে।
না মানে উনি বিরক্ত হবেন…
উনিটি কে? পরিচালন সমিতি তো। ও আমি বুঝে নেব। আপনাকে মাথা ঘামাতে হবে না।
অতএব প্রথমদিন খাবার এল। বাটিতে মাছের ঝোল দেখে খুশি মনে বসে সবে ভাতটি ভেঙেছেন নারাণবাবু, অমনি থপাস। ছাদ থেকে টিকটিকি লাফ দিয়ে ঠিক থালার মাঝখানে। বাধ্য হয়ে ছেলেদের খাবারই খেলেন হেডমাস্টার। পরের দিন ভাতের থালায় কড়ি-বরগায় জমা ঝুল খসে পড়ল। তৃতীয় দিনে নিজেই হাতের ধাক্কায় জলের গেলাস উল্টে দিলেন থালায়। তারপরে আর চেষ্টা করেননি নারাণবাবু। ছেলেরা যা খায় তাই তিনি খাচ্ছেন।
তবে ভাল খাবার না খেতে পাওয়ায় শরীর যে সারেনি, তা বুঝতে পারছেন দিব্যি। সেদিন দুটো ছেলে খেলতে গিয়ে জামা ভিজিয়ে ফেলেছিল বলে তাদের দু-ঘা বেত মারতে গেলে কীভাবে যেন বেতটা ছিটকে এসে নিজের ঘাড়েই এক ঘা বসিয়ে দিল। সে কী জ্বালা! বাড়ি ফিরে সর্ষের তেল লাগাতে তবে জ্বলুনি কমল। ক্লাসে ছেলেরা প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে চক ছুড়ে মারা তাঁর অনেক দিনের অভ্যাস। হাতের টিপ সাংঘাতিক। ছাত্রের মাথা ফুলে আলু হয়ে যায়। কিন্তু ইদানীং রোজ লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছে। সেদিন তো চকের টুকরোটা সোজা জানলা দিয়ে বেরিয়ে বাগানে শয্যা নিল। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে প্রত্যেকবার টিপ ফস্কানোর পর সেই খিকখিক হাসিটা যেন কানের পাশে শুনতে পান নারাণবাবু, আর তক্ষুনি গা শিরশির করে ওঠে তাঁর।
আজকাল মনমেজাজ সারাক্ষণই খারাপ থাকে নারাণবাবুর। স্কুলের ছেলেপুলেদের শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারটা তিনি যেন কিছুতেই আয়ত্তে আনতে পারছেন না। সিঁধেল চোরের তেলমাখা গায়ের মতো পিছলে যাচ্ছে। সেদিন বাংলার প্রদীপ স্যার আসেননি। তিনি তক্কে তক্কে ছিলেন। ফাঁকা ক্লাসে ছেলেগুলো গণ্ডগোল করতে শুরু করলেই বেশ করে সবাইকে কয়েক ঘা দেবেন। বেত হাতে নিয়ে তৈরি হয়েই গেছিলেন। কিন্তু অবাক কাণ্ড। গিয়ে দেখেন ক্লাস একদম চুপচাপ। ছেলেরা মন দিয়ে খাতায় কী যেন লিখছে। বিরক্ত হয়ে হুংকার দিলেন,
কী লিখছিস রে তোরা?
রচনা স্যার…
ভিতু গলায় বলল একটা ছেলে।
কে লিখতে দিল?
ওই যে উনি…
পঞ্চায়েত প্রধান প্রায় পালিয়েই গেলেন। কিন্তু নারাণবাবুর ভুরুর ভাঁজ মেলাল না। সবাই দেখি উনি বলে, এই উনিটি কে? জানা দরকার। নির্ঘাৎ পরিচালন সমিতির কেউ উপর থেকে কলকাঠি নাড়ে।
ছেলেটা যে কাকে বোঝালো কিছুই মাথায় ঢুকল না হেডমাস্টারের। বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে আসছেন, হঠাৎ মনে হল ব্ল্যাকবোর্ডের পাশে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। পিছন ফিরে তাকাতেই একদম ফক্কা। কোথাও কেউ নেই।
প্রায় যখন হতাশ হয়ে পড়েছেন নারাণবাবু, তখনই একদিন জুৎমতো পাওয়া গেল বিশুকে। গায়ে কাদা ছিটিয়েছিল বলে এমনিতেই তার উপর চাপা রাগ ছিলই। তার উপর সে ছেলে খাতা না নিয়ে ক্লাসে চলে এসেছে। প্রকাণ্ড একটা ধমক দিয়ে সবে কানটা বাগিয়ে ধরে এক ঘা লাগিয়েছেন অমনি হন্তদন্ত হয়ে দারোয়ান এসে হাজির। পিছন পিছন পঞ্চায়েতের প্রধান। বাধ্য হয়েই বিশুর কানটা তখনকার মতো ছেড়ে দিতে হল। আর অমনি প্রধান একখানা নতুন খাতা তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, এই নিন মাস্টারমশাই বিশুর খাতা। আসলে ওর বাপ হাসপাতালে ভর্তি। মাও সেখানে আছে। তাই ছেলেটা খাতা কিনতে পারেনি…
ভুরু কুঁচকে শুঁয়োপোকা হয়ে যায় নারাণস্যারের। তা বিশুর যে খাতা নেই সেই খবরটা আপনি পেলেন কোথা থেকে?
আজ্ঞে না মানে…উনি বললেন…আমি এখন যাই বুঝলেন, মেলা কাজ পড়ে আছে…
পঞ্চায়েত প্রধান প্রায় পালিয়েই গেলেন। কিন্তু নারাণবাবুর ভুরুর ভাঁজ মেলাল না। সবাই দেখি উনি বলে, এই উনিটি কে? জানা দরকার। নির্ঘাৎ পরিচালন সমিতির কেউ উপর থেকে কলকাঠি নাড়ে। হাতে ধরা শিকার ফস্কে গেছে। বিশুর দিকে একবার কটমট করে তাকিয়ে নিজের ঘরে ফেরেন তিনি।
কিন্তু চিন্তাটা মাথা থেকে যায় না। স্কুল থেকে ফেরার সময়ও প্রশ্নগুলো ভনভন করতে থাকে। অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটতে গিয়ে বাড়ির রাস্তা ছাড়িয়ে যে অনেকটা চলে এসেছেন, খেয়াল করেননি প্রথমটায়। যখন বুঝলেন ততক্ষণে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। এদিকে সঙ্গে ছাতা নেই। ভিজে জুবড়ে বাড়ি ফিরে জামাকাপড় বদলানোর পরেই বুঝতে পারলেন, শরীরটা খারাপ লাগছে। খাওয়ার ইচ্ছা নেই। কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন বিছানায়।
সামনের চেয়ারটা একটু নড়ে উঠল। আজ কিন্তু আর গা শিরশির করল না হেডমাস্টারের। নম্র গলায় বললেন, আমার ধারণা ছিল শাস্তি দিয়ে ছাত্রদের জব্দ করতে পারলে তবেই তারা নিয়মে থাকে, পড়াশোনা করে।
তারপর আর কিছু মনে নেই। জ্বরের ঘোরে একবার মনে হচ্ছে কেউ যেন মাথায় জলপটি দিচ্ছে। কারা যেন ওষুধ খাইয়ে দিল। দুধের বাটি মুখের কাছে ধরছে কেউ। সাতদিন পর জ্বর একটু কমলে জানতে পারলেন বেহুঁশ হয়ে গেছিলেন তিনি। স্কুলের মাস্টারমশাই আর ছাত্ররা মিলে পালা করে সেবা করেছে, রাত জেগেছে। আজ অনেকটা সুস্থ বলে বাকিরা বাড়ি গেছে। একা নিলয় বসেছিল বিছানার পাশে। তাকেই জিজ্ঞাসা করলেন, আমি অসুস্থ, সেই খবর পেলেন কী করে?
আজ্ঞে উনি খবর দিলেন।
এই উনি কে বলুন তো নিলয়? সবার কাছেই ওঁর কথা শুনি, অথচ উনি কে বুঝতে পারি না।

একটু চুপ করে থেকে নিলয় বললেন, বললে হয়তো আপনি বিশ্বাস করবেন না, তাই কেউ বলেনি। রামগোপাল সরকার ছিলেন এই স্কুলের প্রথম হেডমাস্টার। তাঁর হাতেই স্কুলটা তৈরি হয়েছিল। মারা গেছেন অনেকদিন। কিন্তু স্কুল ছেড়ে যেতে পারেননি। ছাত্ররা ছিল ওঁর প্রাণ। তাই ছাত্রদের উপর কোনও অত্যাচার উনি সহ্য করতে পারেন না। গ্রামের সবাই জানে। সবাই ওঁকে সম্মান করে।
সুস্থ হয়ে স্কুলে এসেছেন নারাণবাবু। শরীরটা এখনও বেশ দুর্বল। ক্লাস শুরু হয়ে যাওয়ার পর আজ আর বারান্দায় পায়চারি করতে গেলেন না। ঘরের দরজাটি বন্ধ করে এসে বসলেন নিজের চেয়ারে। তারপর সামান্য একটু গলা তুলে বললেন, আছেন নাকি এখানে? আপনার কথা অনেক শুনেছি। তাই ভাবলাম একবার সরাসরি কথা বলাই ভাল…
সামনের চেয়ারটা একটু নড়ে উঠল। আজ কিন্তু আর গা শিরশির করল না হেডমাস্টারের। নম্র গলায় বললেন, আমার ধারণা ছিল শাস্তি দিয়ে ছাত্রদের জব্দ করতে পারলে তবেই তারা নিয়মে থাকে, পড়াশোনা করে। কিন্তু সেই ধারণা ঠিক নয় এখানে এসে বুঝলাম। আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আপনি আমার ভুল ভেঙে দিয়েছেন…
চেয়ারটা আবার একটু নড়ে স্থির হয়ে গেল। সেদিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নারাণবাবু উঠে গিয়ে দরজা খুললেন। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে নিচের মাঠে দু’টো ছেলে বল পেটাচ্ছে। তাঁকে দেখেই ছুটে পালিয়ে গেল। মুচকি হেসে নিজের ঘরে ফিরে নারাণবাবু ভাবলেন, এবার শীতকালে ছেলেদের নিয়ে একটা পিকনিকের ব্যবস্থা করতে হবে। রামগোপালবাবুকেও বলবেন সঙ্গে যেতে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত