আমাজন, আন্দিজ ও আতাকামায় – পর্ব ৩
(Peru Travelogue 1)
আমাজন অ্যাডভেঞ্চার সেরে নিয়ে আবারও প্রত্যাবর্তন পেরুর রাজধানী লিমায় আর সেখান থেকে বিমান পথে বেরোনো পেরুর এক কলোনিয়াল শহর কুসকোর দিকে। ভোর ছ’টার ফ্লাইট। দেড় ঘণ্টা বাদে অবতরণ কুসকোর বিমানবন্দরে। সেখান থেকে বাসে করে হোটেলে।
আরও পড়ুন: আমাজনের জঙ্গলে – পর্ব ২
কুসকোয় যাওয়ার দু’দিন আগে থেকেই ডাক্তারি পরামর্শে দু’বেলা আধখানা ডায়ামক্স ২৫০ মিলিগ্রাম খাওয়ার নির্দেশিকা। হঠাৎ করে মাত্র ২ ঘণ্টায় ১১৫০০ ফুট উচ্চতাজনিত কারণে শ্বাসকষ্ট যাতে না হয়। প্লেনের জানলাতেই চোখ পড়েছিল ভূগোল বইয়ে পড়া আন্দিজ পর্বতমালায়। যেন সেই ঘেরাটোপের ঘোরের মধ্যে দিয়েই চলেছি তখন আমরা।

দক্ষিণে আন্দিজ পর্বতমালার কোলে, বহু প্রাচীন সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বহন করে ইনকা সাম্রাজ্য। যার উত্থান ত্রয়োদশ শতকে। পঞ্চদশ শতকে পাচাকুতির আমলে তা বিস্তৃত সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। কেচুয়া ভাষাভাষী ইনকারা কুসকোকে কেন্দ্র করে এমন এক রাষ্ট্র নির্মাণ করেন, যা বর্তমান পেরু, বলিভিয়া, ইকুয়েডর, চিলি ও আর্জেন্টিনার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতে যখন বিজয়নগর সাম্রাজ্য তার শিখরে, তখন আন্দিজে নির্মিত হচ্ছে মাচুপিচুর মতো বিস্ময়কর স্থাপত্য, মেঘ ও পর্বতের মাঝখানে মানুষের এক স্বপ্নের নগরী।
ইনকাদের সৃষ্টিকর্তা দেবতা বিরাকোচা ছিলেন সভ্যতার পথপ্রদর্শক। তাঁর কাহিনিতে অনেকেই কেত্জালকোয়াত্লের দূর প্রতিধ্বনি খুঁজে পান। ষোড়শ শতকে স্প্যানিশ বিজেতাদের আগমনে অ্যাজটেক ও ইনকা সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক অবসান ঘটে, কিন্তু এই মহাদেশের বাতাসে আজও ভেসে বেড়ায় সেই হারিয়ে যাওয়া নগরীগুলির স্মৃতি— মেসোআমেরিকার টেওতিহুয়াকানের পিরামিড, চিচেন ইত্জার ছায়া, কুসকোর পাথর আর মাচুপিচুর মেঘে ঢাকা প্রাচীর যেন এক দীর্ঘ, অসমাপ্ত মহাকাব্যের বিচ্ছিন্ন অধ্যায়।

পেরুর প্রাচীন কলোনিয়াল শহর কুসকো ছিল ইনকা সাম্রাজ্যের রাজধানী এবং কোরিকাঞ্চা ছিল কুসকোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র। প্রাচীন সৌন্দর্য এবং ইনকা সাম্রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও তার ঐতিহাসিক তাৎপর্যের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এত উঁচু পাহাড়ে অবস্থিত কুসকোর ভূখণ্ডে ইনকা এবং স্প্যানিশ উপনিবেশকারী উভয়েরই স্থাপত্যের এক অসাধারণ মেলবন্ধন ঘটেছে ছত্রে ছত্রে। এখানকার বাসিন্দারা সদা হাস্যময়। হোটেলে ঢুকেই তাঁদের উষ্ণ অতিথিপরায়ণতা এবং বারবার গরম কোকা টি (কোকা গাছের পাতা শুকিয়ে গরম জলে খেলে শ্বাসকষ্ট হয় না) সহযোগে বড় বড় ভুট্টাদানা ভাজা আর আলুর চিপস দিয়ে আমাদের আপ্যায়ন, মন ছুঁয়ে গেল।
বিভিন্ন হাতের কাজ আর শিল্পকলা যেন এখানকার মানুষের শয়নে, স্বপনে, জাগরণে। হোটেলের বাইরেও সেসব বিকিকিনির পসরা। আর যাঁরা বিক্রি করছেন, তাঁরা যে ইনকাদের বংশোদ্ভূত তা বোঝা যায় তাঁদের পোশাকআশাক, চেহারা, চুল বাঁধার স্টাইল দেখে। পরনে সব লং স্কার্ট আর মাথায় লম্বা বিনুনি। প্রবল শৈত্যপ্রবাহে হোটেলের সামনেই কুসকো সিটি স্কোয়ারে তাঁরা ঘুরে ঘুরে শীতবস্ত্র, হাতে আঁকা ছবি, কুটির শিল্প বিক্রি করছেন। তাঁদের কারওর সাজপোশাক ইউরোপিয়ান বা স্প্যানিশদের মতো নয়। বেশ এক আদিমতার ছোঁয়া সবেতেই।
লামা ও আলপাকার উলের শীতবস্ত্রের খুব চাহিদা সারা পেরুতেই। মা তাঁর দুগ্ধপোষ্য শিশুটিকেও কোলে নিয়ে খাওয়াতে খাওয়াতে ব্যস্ত ক্রেতাকে উলের পোশাক দেখাতে ও দরদাম করে গছাতে।
জীবনের আনন্দময় প্রকাশের জন্য পরিচিত এই ইনকারা। মূলত চারধরনের উট প্রজাতির পশুপালন হয় এখানে আর সেই উটের ক্ষুদ্রতম প্রজাতি আলপাকার মাংস এখানে এক ডেলিকেসি। এই মাংস এতটাই স্বাস্থ্যসম্মত যে, তা খেলে কোলেস্টেরল বাড়ে না। আর এই আলপাকার নরম ও হালকা উলের খুব কদর এখানে। লামা ও আলপাকার উলের শীতবস্ত্রের খুব চাহিদা সারা পেরুতেই। মা তাঁর দুগ্ধপোষ্য শিশুটিকেও কোলে নিয়ে খাওয়াতে খাওয়াতে ব্যস্ত ক্রেতাকে উলের পোশাক দেখাতে ও দরদাম করে গছাতে।
কুসকো বড় রঙিন তার উচ্চমানের হস্তশিল্পের জন্য। চিত্রশিল্পীর রঙতুলিতে ফুটে ওঠে শহরের রোজনামচা। আলো-ঝলমলে এই শহরের সেটাই স্পন্দন। সেই ভাইবস নিয়েই আপাতত আমরা এগিয়ে চলি ইনকা সভ্যতার অন্যতম নিদর্শন এক প্রাচীন মন্দিরের দিকে। তা ধ্বংসাবশেষ নয়, কিন্তু স্প্যানিশ আগ্রাসন ও খ্রিস্টধর্মের দ্রুত ধর্মান্তকরণের ব্যাপক প্রভাবে অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত এই ইনকা সভ্যতা ও সংস্কৃতি। পুরোটাই ক্যাথিড্রালের রূপান্তরিত শুধু দু-একটি পাথরের দেওয়াল ও ঘর ছাড়া। তবুও মন্দির ও চার্চের সমন্বয়ে আজ এক মিশ্র সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষ করলাম মন্দির চত্ত্বরে প্রবেশ করে।
তথ্যতালাশ রীতিমত অব্যাহত রইল গাইড জনের সঙ্গে। আর সেই সঙ্গে আমাদের আদিবাসী জনজীবনের ধর্মীয় রীতিনীতি, আচারবিচার, ভাবাবেগের বেশ মিল খুঁজে পেলাম। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাংলার ব্রত বইখানি মাথায় গাঁথা।
তামা এখানে সবচাইতে বেশি পাওয়া যায়। আর সেই তাম্রফলকে বিশাল এক পাতে খোদিত রয়েছে ইনকাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতিনীতি। ঠিক আমাদের লৌকিক দেবদেবীর মতোই। মূল ফলকটি সোনার পাতে ছিল, যেটি স্প্যানিশরা গুলিয়ে ফেলে নিজেদের দেশে চলে যায় আর যেটি দেখলাম সেটি রেপ্লিকা। কিন্তু তথ্যতালাশ রীতিমত অব্যাহত রইল গাইড জনের সঙ্গে। আর সেই সঙ্গে আমাদের আদিবাসী জনজীবনের ধর্মীয় রীতিনীতি, আচারবিচার, ভাবাবেগের বেশ মিল খুঁজে পেলাম। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাংলার ব্রত বইখানি মাথায় গাঁথা। সেখানে আমাদের দেশসহ আরও অনেক দেশের জনগোষ্ঠীর প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি নিবিড় নির্ভরশীলতা, কৃষির জন্য তাদের প্রাকৃতিক সম্পদের উদ্দেশ্যে নতজানু হয়ে ধন্যবাদ জ্ঞাপন… কোথায় যেন বড় একাত্ম হয়ে গেলাম। এই মন্দিরটি ছিল ইনকা ও প্রাক্ ইনকাদের সূর্য মন্দির।

ইনকা সাম্রাজ্যের নাম Twantinsuyu। যাদের এককালে সব ছিল, ছিল আমাদের মতোই fertility cult/female deity, মানে দেবীর উপাসনা। জ্যোতির্বিজ্ঞানের গ্রহতারকায় ভরসা রেখে তাদের উদ্দেশ্যে প্রণতি জানানো। Qorikancha-তে এই পুঞ্চাও বা ইনতি দেবতার একটি বিশাল ও জাঁকজমকপূর্ণ স্বর্ণমূর্তি ছিল। মূর্তিটি ছিল সম্পূর্ণ খাঁটি সোনার তৈরি এবং রত্নপাথরে খচিত।
প্রাক-কলম্বিয়ান আমেরিকার মানে ইউরোপীয়দের আগমনের পূর্বে সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী সাম্রাজ্য এবং প্রাচীন ইনকাদের রাজধানী শহর ছিল Qorikancha। যার সময়কাল হল ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দ। মিউজিয়ামের ফলক থেকে জানলাম কেচুয়া ভাষায় ‘তাওয়া’ হল চার এবং ‘সুয়ু’ হল অঞ্চল বা প্রদেশ। ‘তাওয়ান্তিনসুয়ু’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল ‘চারটি অঞ্চলের সমষ্টি’ বা ‘চার কোণের ভূমি’। সাম্রাজ্যটি প্রশাসনিক সুবিধার জন্য চারটি প্রধান অঞ্চলে বিভক্ত ছিল, যার কেন্দ্রবিন্দু বা রাজধানী ছিল কুসকো শহর।

কুসকোর এই মন্দিরটি ইনকাদের সূর্য দেবতা ‘ইন্তি’-র উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত। প্রাচীন আন্দিজ পর্বতমালার আদিবাসী ভাষা কেচুয়া ভাষায় ‘কোরিকাঞ্চা’ শব্দের অর্থ ‘সোনার ঘের’ বা ‘সোনার উঠোন’। ইনকা আমলে এই মন্দিরের দেয়ালগুলো খাঁটি সোনার পাত দিয়ে মোড়ানো ছিল। এখানে সূর্য দেবতা ছাড়াও চন্দ্র, তারা এবং বজ্রদেবতার পুজোর প্রচলন ছিল। ইনকা রাজাদের মমিগুলো রাজকীয় পোশাকে সোনার সিংহাসনে বসিয়ে এখানে সংরক্ষণ করা হত। ইনকা সম্রাটদের মৃত্যুর পর তাঁদের দেহ মমি করে রাখার আগে তাঁদের হৃৎপিণ্ড বা ভেতরের কিছু অংশ পুড়িয়ে ছাই করে ফেলা হত। সেই পবিত্র ছাই এই পুঞ্চাও মূর্তির ভেতরের সোনার পাত্রে রাখা হত। তাদের বিশ্বাসে মৃত সম্রাটরা সরাসরি সূর্য দেবতার সঙ্গে লীন হয়ে গেছেন। তা কি এই পুঞ্চাও?

জনের মুখে শুনলাম। পুঞ্চাও (Punchao) ইনকা সভ্যতার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতীক। কেচুয়া ভাষায় ‘পুঞ্চাও’ শব্দের অর্থ ‘দিন’ বা ‘দিনের আলো’। ইনকা পুরাণে এটি সূর্য দেবতা ইনতি (Inti)-র একটি বিশেষ রূপ।
পেরুর ভূমিপুত্র ইনকা ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একজন আদিবাসী ঐতিহাসিক, লেখক হুয়ান দে সান্তা ক্রুজ (Juan de Santa Cruz) এর বিখ্যাত ঐতিহাসিক বই ‘Relación de las antigüedades deste Reyno del Perú’ পেরু রাজ্যের প্রাচীন ইতিহাসের বিবরণ)-তে আছে কোরিকাঞ্চায় পূজিত প্রধান দেবতা ছিলেন সৃষ্টিকর্তা দেবতা ভিরাকোচার নাম। আমরা টিনটিনের গল্পেও পড়েছি এই নাম। গান করতে করতে বলছে ‘পাচা কামাক, পাচা রোরাক, ভিরাকোচা…Pachamama’ হল ইনকাদের ভাষায় পৃথিবী বা মাদার আর্থ।

তাওয়ান্তিনসুয়ুর ইনকা অধিবাসীরা যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অত্যন্ত উন্নত, তা বোঝা যায় সেই যুগে তাদের এই মন্দিরের গঠনশৈলীতে চোখ রাখলে। আধুনিককালের লোহা বা সিমেন্ট ছাড়াই বিশালাকার পাথর নিখুঁতভাবে কেটে একটির উপর আরেকটি বসিয়ে এই মন্দির তৈরি করেছিল তারা। দেওয়াল দেখলে এখনও তা বেশ বোঝা যায়। ভূমিকম্প প্রতিরোধক এই পাথরগুলোর জোড় এতই নিখুঁত যে, একটি ব্লেডও মাঝখান দিয়ে গলানো সম্ভব নয়। এই বিশেষ প্রযুক্তির কারণে শক্তিশালী ভূমিকম্পেও মন্দিরটি ভেঙে পড়েনি। ষোড়শ শতকে স্প্যানিশরা কুসকো জয় করার পর মন্দিরের সমস্ত সোনারূপো লুঠ করে নিয়ে যায়।
তারা ইনকা মন্দিরের মূল কাঠামোর উপরই ‘সান্তো দোমিনানাঙ্গো’ (Santo Domingo) নামক একটি খ্রিস্টান গির্জা নির্মাণ করে। এযুগে দাঁড়িয়ে আমরা সেই প্রকান্ড চত্ত্বরে যুগপৎভাবে অনুভব করলাম ইনকাদের হাতে তৈরি নিখুঁত পাথরের দেয়াল, সে মন্দিরের বিশালতা এবং তার উপর স্প্যানিশ স্থাপত্যের মেলবন্ধন। এটি পেরুর অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ।

ইনকারা একইসঙ্গে দক্ষ যোদ্ধা, রাজনীতিবিদ এবং স্থপতি হিসেবে নিজেদের স্থান করে নিয়েছিল। মৃৎশিল্প, ধাতুবিদ্যা, বস্ত্রবয়ন এবং বিশেষ করে স্থাপত্য ও প্রকৌশলবিদ্যায় উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করে সংস্কৃতিকে অনন্য করে তুলেছিল। তাদের অনেক সৃষ্টি আজও টিকে আছে। সেই সঙ্গে ইনকাদের উত্তরসূরিদের চেহারা, পোশাক, হস্তশিল্প এখনও এই আধুনিক কালে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেয় বৈকি। কুসকোর পথে প্রান্তরে আজও তারা তাদের হাতের কাজের পসরা সাজিয়ে সকাল সন্ধে বসে আছে পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে।

কুসকোয় নামার পর থেকেই লক্ষ করছিলাম এক বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মহড়া, যা জোর কদমে চলছিল বিশাল উন্মুক্ত প্রান্তরে। এবার পেরুতে ২৪শে মে হাজির থেকে সেই অনুষ্ঠানের রোমহর্ষক সেই প্রোসেশন, নাচগানসম্বলিত মুখোশ নৃত্যের সাক্ষী থাকলাম। উরুবুম্বা নদীর ধারেই শহর Ollantaytambo।

২৪শে মে সেখানে চলছিল এক বর্ণাঢ্য উৎসব। তা সাধারণ কার্নিভাল নয়, বরং আন্দিজ পর্বতমালার কোলে প্রাচীন ইনকা ঐতিহ্যবাহী এই শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব সেনিয়র দে চোকেকিলকা (Señor de Choquekillka)। পেন্টেকস্ট (Pentecost) উপলক্ষ্যে পালিত এই উৎসবে ক্যাথলিক ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে কেচুয়া আদিবাসী সংস্কৃতি এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করেছে। রঙিন পোশাকে সজ্জিত নৃত্যশিল্পী, আন্দীয় বাদ্যযন্ত্রের সুর, ধর্মীয় শোভাযাত্রা, প্রার্থনা এবং স্থানীয় মানুষের উচ্ছ্বাসে ওলান্তাইতাম্বোর প্রাচীন পাথরের রাস্তা ও চত্বর যেন কয়েক শতাব্দী পিছনে ফিরে যায়।

কথিত আছে, ভিলকানোটো (Vilcanota) নদীর কাছে এক অলৌকিক ঘটনার পর তাদের এক ধর্মীয় বিশ্বাস জাগে, আর তা থেকেই মানুষের মনে ভক্তির সূচনা। মাচু পিচুর পথে পর্যটকদের পরিচিত এই ছোট্ট শহরটি এই দিনে শুধু একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নয়, বরং জীবন্ত আন্দীয় সভ্যতার এক স্পন্দন।

আজকাল আমরা আমাদের দেশেও সাস্টেনেবল ইকোসিস্টেম সংক্রান্ত চাষাবাদ, বীজ সংরক্ষণ, সারা বছর ধরে কৃষি নিয়ে এক উদযাপন, সচেতনতা লক্ষ করছি। পেরুর প্রত্যন্ত ইনকাদের অধ্যুষিত এক গ্রামে গিয়ে ঠিক তেমন মনে হল। আরও রঙিন সেই সবুজ বনভূমি। কৃষি, ফসল সংরক্ষণ, বীজ, হস্তশিল্প মূলত আলপাকা, লামার উলের শীত পোশাক, সেই প্রাকৃতিক উল কেমন করে ধুতে হবে, সব মিলিয়ে এক সম্যক জ্ঞান হল। আমাদের রিঠা ফল ভিজিয়ে উলের পোশাক ধোয়ার রীতি ছিল। তাদের এখনও অন্য আরেক ফল দিয়ে ধোয়ার রীতি চালু। সূতির সুতো, আলপাকার উল রঙ হচ্ছে প্রাকৃতিক ফুল, ফল ও বীজ দিয়ে। কিনে ফেলি ইনকা বংশোদ্ভূত এই মহিলার কাছ থেকে আলপাকার উলের শোলার মতো ফিনফিনে পাতলা কার্ডিগান।

প্রচুর শীতেও খুব কাজ দিল তা এবারের ট্রিপে। বারবার স্প্যানিশ আক্রমণে বিপর্যস্ত ইনকাদের মায়ানগরী মাচুপিচু সহ আশপাশ বিধ্বস্ত হয়ে লোপ পেতে পেতে আচমকাই এইসব অঞ্চলে আগুনপাখির ভস্ম থেকে উঠে পুনর্জন্ম নিয়েছে যেন। তেমনি উরুবাম্বা নদীর ধারে সেই ইনকাদের গ্রাম যেখানে এখনও বেঁচে আছে ইনকাদের লোকজ সংস্কৃতির ধারা। থরে থরে হস্তশিল্পের পসরা সেখানে। কারওর হাতের টানাপোড়েনে জন্ম নিচ্ছে অভিনব তাঁত শিল্প। আজও অক্ষয় পেরুর বয়নসংস্কৃতি। কথা বলে উঠছে যেন হাতে বোনা শতরঞ্চি, টেবিল ম্যাট, ওয়াল হ্যাঙ্গিং, আরও কতকিছু।
(চলবে)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত