(Disability Awareness)
‘হাতের ওপর হাত রাখা খুব সহজ নয়
সারা জীবন বইতে পারা সহজ নয়
এ কথা খুব সহজ কিন্তু কে না জানে
সহজ কথা ঠিক ততটা সহজ নয়’
—শঙ্খ ঘোষ
অনেকক্ষণ পর টের পেলাম যে আমরা হারিয়ে গিয়েছি। আমি রাকেশের হাত টিপছি। রাকেশও খুব চিন্তিত মুখে আমার দিকে তাকাচ্ছে। দুর্গাপুজোর ভিড় সারা রাস্তা জুড়ে। এদিকে, দশ বছর বয়সী দু’টি ছেলে রাস্তা খুঁজে পাচ্ছে না। আমাদের দু’জনের ভয় এই কারণে লাগছে যে, রাকেশের বাবা নারায়ণ কাকু আর সঙ্গে নেই। এতক্ষণ তাঁর সাথেই আমরা বিভিন্ন মণ্ডপে ঠাকুর দর্শন করছিলাম। এই সময় আমরা মানে আমি আর রাকেশ ঢুকে পড়েছি কেওড়াতলা মহাশ্মশানের ভিতর।
আরও পড়ুন: যে রবীন্দ্র জয়ন্তী সন্ধ্যা হারিয়ে গিয়েছে
শ্মশানটা এত সুন্দর করে সাজানো, আমরা দু’জন ভেবেছি এটাও একটা প্যান্ডেল! কিন্তু এ প্যান্ডেলে কোনও ঠাকুর নেই। বরং দেখছি যে সার দিয়ে মৃতদেহ শোয়ানো এবং এক একটা মৃতদেহ ঘিরে চলছে আপনজনের রোদন। কী একটা আশ্চর্য অবস্থা! ভয়টা আরও বেশি ঘনীভূত হচ্ছে কারণ নারায়ণ কাকু কথা বলতে পারেন না, কানেও শুনতে পান না।
আমরা যে চিৎকার করে তাঁকে ডাকব বা কাউকে বলব, তাও তাঁর কাছে পৌঁছাবে কি না আমরা নিশ্চিত নই। এদিকে আশপাশের কোনও লোককে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারছি না। সে সময় কলকাতায় খুব ছেলে ধরার বাড়বাড়ন্ত। যদি আমাদের কেউ অপহরণ করে নিয়ে যায়, তারপর আমাদের লিভার, কিডনি, চোখ উপড়ে নেয়, সেই ভয়ে কাউকে কিছু জানাতে সাহস পাচ্ছি না।

শেষে ওই শ্মশানে বসার জায়গায় দু’জন চুপটি করে বসেছিলাম। বেশ খানিকক্ষণ পর ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল আমাদের। নারায়ণ কাকু স্বয়ং দেখি আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে। ভীষণরকম আবেগের সঙ্গে হাতের ইশারায় বোঝাতে থাকলেন যে, কেন তাঁর হাত ছেড়ে আমরা এগিয়ে গিয়েছিলাম? উনি নাকি ভিড়ের মধ্যে বারবার রুমাল নাড়ছিলেন, যাতে আমরা ওঁকে দেখতে পাই। ভাগ্যিস, উনি কিছু একটা মনে করে এই শ্মশানে ঢুকে এসেছেন। সে কারণে আপন পুত্র আর পাশের বাড়ির মা-বাবাহীন ছেলেটাকেও উনি খুঁজে পেয়েছেন এবং বুকে জল এসেছে ওঁর। রাকেশ আর আমাকে বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন উনি। হারানো মূল্যবান জিনিস প্রাপ্তির যে আনন্দ, তা যেন ওঁর বুকের ধুকপুকের সঙ্গে মিলে গেল।
সুতপাদি, নুপুর আর রাকেশ। আমাদের টালিগঞ্জের কোয়ার্টার্সের পাশের বাড়িটা ছিল এই তিন ভাইবোনের। ওদের বাবা, মা, এক মাসি এবং এক মামা কথা বলতে পারতেন না; কানেও শুনতে পেতেন না। প্রতিবন্ধী হিসেবে নারায়ণ কাকু সরকারি চাকরি পান এবং আমাদের সরকারি আবাসনে থাকতে আসেন।
ইশারার ভাষায় আমি সবার আগে শিখেছিলাম ‘মা’ কীভাবে বোঝাতে হয়। তার কারণ, রাকেশের মা সুব্রতা কাকিমা আমাকে পুত্রস্নেহে ভালবাসতেন। ওদের বাড়িটা ছিল আমার জন্য শান্তির নীড়। ওদের পাশের ফ্ল্যাট ছিল আমার মাসির বাড়ি।
কাকু-কাকিমার গালভরা নাম ছিল ‘ডেফ অ্যান্ড ডাম্ব’। একজন কথা বলতে না পারলে কেন তাকে ‘ডাম্ব’ বলে ডাকা হবে, তার কারণ তখন বুঝিনি। পরে যখন উপলব্ধি করেছি, তখন মনে হত সেই সমস্ত শব্দগুলো আসলে ভীষণ রকম অপমানের। তবে আমাদের কখনও ওদের বাড়ির মানুষগুলোর সঙ্গে বাক্য বিনিময় করতে অসুবিধে হয়নি।
প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে আমাদের ওঠা-বসা সেই কোন ছোটবেলা থেকে! রাকেশ, নূপুর কিংবা সুতপাদির পাশাপাশি, আমরাও ইশারার ভাষায় কথা বলতে শিখে গিয়েছিলাম। হয়তো ওদের মতো পারতাম না। কিন্তু প্রতিনিয়ত চেষ্টা করতাম যেন ইশারার ভাষাতেই সমস্ত কথা কাকু-কাকিমার সঙ্গে বলতে পারি, আর ওঁদেরও যেন আমাদের কিছু বোঝাতে অসুবিধা পোহাতে না হয়।

ইশারার ভাষায় আমি সবার আগে শিখেছিলাম ‘মা’ কীভাবে বোঝাতে হয়। তার কারণ, রাকেশের মা সুব্রতা কাকিমা আমাকে পুত্রস্নেহে ভালবাসতেন। ওদের বাড়িটা ছিল আমার জন্য শান্তির নীড়। ওদের পাশের ফ্ল্যাট ছিল আমার মাসির বাড়ি। মা-বাবা আমার সঙ্গে থাকতেন না, আর আমাদের বাড়িতে তখন প্রায় আট-দশ জন একসঙ্গে থাকতাম। মাসি, মেসো, তাঁদের পাঁচ-ছ’টি ছেলেমেয়ে এবং আমি।
আমাদের বাড়িতে খুব একটা নিয়ম শৃঙ্খলা ছিল না। বেলা করে খাওয়াদাওয়া, রাত অবধি বহুক্ষণ জেগে থাকা, চিলচিৎকার, গান চলা ছিল কোলাহলময় প্রাত্যহিক জীবন। অনেকগুলো মানুষ এক জায়গায় থাকলে যে অসুবিধাগুলো হয়, সেগুলো আমাদের জীবনেও ছিল। কিন্তু রাকেশদের বাড়ি ছিল ঠিক এর উল্টো।
আমার খালি মনে হত আমি যদি বোবা হতাম, তাহলে কোনও অসুবিধা হত না জীবনে। কারণ, ইশারার ভাষা তো শিখেই গিয়েছি! ইশারার ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি অ্যালফাবেট কীভাবে সেই ভাষায় বোঝাতে হয়, আমি জানতাম।
ওরা ‘ব্রেকফাস্ট’ করত। স্কুল যাওয়ার সময় ওর বাবা ওদের হাতে দশ টাকা করে দিত। ওদের জামাকাপড় ঠিক সময়ে কাচা হত। বেলা বারোটার মধ্যে দুপুরের খাওয়া ওরা সেরে নিত। বিকেলে টিফিন থাকত। রাত দশটার মধ্যে খাওয়াদাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়ত। ওদের ঘরে জ্বলত একটা নীল নাইট-বাল্ব। অনেক সময় ওদের বাড়িতে দুপুরে আমি খেয়ে নিতাম। আমাদের তখনও হয়তো রান্নাই হয়নি।
কাকিমা একটা বড় থালাতে ডাল, ভাত, আলুমাখা, মাছ বাড়তেন। এক গ্রাস ভাত রাকেশের মুখে দিতেন, পরের গ্রাস আমার মুখে। আর তিন নম্বরটা নিজে খেতেন। এভাবে পুরো খাওয়া শেষ করে হাত-মুখ ধোওয়ার পর আমার মাথা চাপড়ে কাকিমা ইশারায় বলতেন দুপুরবেলা ওদের বাড়িতে ঘুমিয়ে পড়তে। আমি আর রাকেশ কাকিমাকে জড়িয়ে ঘুমোতাম। মনে হত এত প্রশান্তির ঘুম, যেন কখনও আগে ঘুমাইনি!

কোনও কোনও দিন বিকেলে ওদের বাড়িতে কাকু-কাকিমার বোবা-ইস্কুলের বন্ধুরা দেখা করতে আসত। তখন আমাদের, বিশেষত আমার, আরও মজা হত। প্রতিটা মানুষ ইশারার ভাষায় কথা বলছে, অথচ আমার বুঝতে এতটুকু অসুবিধা হচ্ছে না। ওদের মধ্যে একজন ছিলেন অমরদার বাবা। উনি চোখে দেখতে পেতেন না, কথা বলতে পারতেন না, এবং কানেও শুনতে পেতেন না। ওঁকে বোঝাতে হত অন্যরকম ভাষায়। হাতে আঙুল দিয়ে লিখে সেই হাত শরীরে ছুঁইয়ে কীভাবে অন্ধ, বোবা এবং কালা একজন মানুষকে বোঝাতে হয়, সেই টেকনিকও আমি রাকেশদের সঙ্গে থাকতে থাকতে শিখে গিয়েছিলাম।
আমার খালি মনে হত আমি যদি বোবা হতাম, তাহলে কোনও অসুবিধা হত না জীবনে। কারণ, ইশারার ভাষা তো শিখেই গিয়েছি! ইশারার ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি অ্যালফাবেট কীভাবে সেই ভাষায় বোঝাতে হয়, আমি জানতাম। তাছাড়া, ওই যে রোববার দুপুরে দূরদর্শনে ইংরেজি খবর হত, সেখানে একজন ইশারার ভাষায় খবর বলতেন। তিনি কী বলতেন, সেটাও মন দিয়ে শেখার চেষ্টা করতাম।
সুব্রতা কাকিমার কোনও নাম ছিল না আমাদের কোয়ার্টার্সে। লোকে বলত ‘বুবি’! আর নারায়ণ কাকুকে পরিচয় দিত ‘বোবা’ কিংবা ‘গোগা’ নামে। সুতপা-নুপুর-রাকেশদের বলা হত ‘বোবার ছেলেমেয়ে’!
একবার মনে আছে, ‘খামোশি’ (১৯৯৬) ছবি মুক্তি পেল। আমরা কেউ তখন খুব বেশি বড় নয়। মালঞ্চ না নবীনা সিনেমা হলে আমাদের বাচ্চাদের নিয়ে সুব্রতা কাকিমা সেই ছবি দেখতে গেলেন। এর আগে উনি কখনও সিনেমা হলে যাননি। তার কারণ, সিনেমাতে তো কিছু শুনতে পাবেন না। কিন্তু ‘খামোশি’ দেখতে দেখতে কাকিমা ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন।
এই ছবির দু’টি প্রধান চরিত্র— নানা পাটেকর আর সীমা বিশ্বাস— মূক এবং বধির। হয়তো পুরো সিনেমাটা কাকিমা শুনতে পাননি। কিন্তু নানা পাটেকর, সীমা বিশ্বাস এবং মনীষা কৈরালা যখন ইশারার ভাষায় একে অপরের সঙ্গে আনন্দ-হাসি-রাগ-অভিমানের কথা বলেছে, তখন উনি বুঝতে পেরেছেন। ওঁর সেই চোখে-জল-আনা আনন্দ দেখে কে!

রাকেশদের বাড়ির সঙ্গে আমরা খুব মিশে গেলেও, প্রতিবন্ধকতা দু’টি পরিবারের সৌজন্যের মাঝে কোনও বাঁধা হয়ে না দাঁড়ালেও, আমাদের জীবনের সমগ্র ছবিটা যে খুব সুন্দর ছিল, তা নয়। সুব্রতা কাকিমার কোনও নাম ছিল না আমাদের কোয়ার্টার্সে। লোকে বলত ‘বুবি’! আর নারায়ণ কাকুকে পরিচয় দিত ‘বোবা’ কিংবা ‘গোগা’ নামে। সুতপা-নুপুর-রাকেশদের বলা হত ‘বোবার ছেলেমেয়ে’!
কাকু, কাকিমা কিছু শুনতে পেতেন না, তাঁদের কিছু যেত আসত না। কিন্তু আমি বহুবার দেখেছি, রাকেশ যখন খেলছে কিংবা আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কোনও বচসা হয়েছে, রাগ করে ওকে বন্ধুরা বলছে ‘বোবার ছেলে’। রাকেশ সেই মারপিট থেকে সরে এসে টপটপ করে চোখের জল ফেলেছে। প্রতিবন্ধকতা নিজের না হলে যদি মা-বাবারও হয়, সে কী তীব্র যন্ত্রণা, ব্যথা এবং অপমানের হতে পারে, তা সুতপাদি, রাকেশ আর নূপুরের জীবন দেখে উপলব্ধি করেছিলাম ছোটবেলাতেই।
সমাজ, রাষ্ট্র, স্থাপত্য— সবকিছুই আমরা সক্ষম শরীরের মানুষদের জন্য তৈরি করেছি। প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রতিবন্ধকতা বোধ যাতে চিরজাগ্রত থাকে, সে কারণে আমরা সমাজের কোনও কিছুই সাম্যের সঙ্গে গড়ে তুলতে পারিনি।
একজন মানুষ প্রতিবন্ধী হলে তাঁর জীবনের কোনও দাম থাকে না। তিনি সরকারি চাকরি করুন, আর্থিকভাবে সচ্ছল হোন অথবা দেখতে সুন্দর— তবুও তিনি প্রতিবন্ধী এবং তাঁকে অপমানজনক কথা যে কেউ বলতে পারার অধিকার রাখে!
জুলাই মাস সারা পৃথিবীতে ‘ডিজ়েবিলিটি প্রাইড মান্থ’ হিসেবে পরিচিত। প্রতিবন্ধকতা বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তারিখ আছে। ৪ জানুয়ারি ‘বিশ্ব ব্রেল দিবস’, ১ মার্চ ‘আন্তর্জাতিক হুইলচেয়ার দিবস’, ২১ মার্চ ‘বিশ্ব ডাউন-সিন্ড্রোম দিবস’, ২ এপ্রিল ‘আন্তর্জাতিক অটিজম দিবস’, ২৩ সেপ্টেম্বর ‘বিশ্ব সাংকেতিক ভাষা দিবস’ কিংবা ৩ ডিসেম্বর ‘আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস’।

কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের যদি সহমর্মিতা না তৈরি হয় তাহলে কোনও মাসের কোনও তারিখেই সমাজ প্রতিবন্ধকতার মিথ্যা ধারণা থেকে বেরোতে পারবে না। প্রতিবন্ধকতা এমন একটি অবস্থা, যা নিয়ে সবসময় মানুষ জন্মায়, এমন কোনও কথা নেই। আমাদের সকলের মধ্যে নিহিত থাকে প্রতিবন্ধকতার বীজ। আমরা যেকোনও সময়, যেকোনও পরিস্থিতিতে প্রতিবন্ধী হয়ে উঠতে পারি। দুর্ঘটনার কবলে পড়ে বা বয়সজনিত কারণে যে-কেউ হয়ে উঠতে পারে প্রতিবন্ধী। কিন্তু এই যে সক্ষম শরীরের একটা দর্প, যা দিয়ে আমরা আমাদের মতো করে সমাজ গড়ি কেবল, প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য কীভাবে সেই সমাজ যৌথযাপনের হবে, তা কখনও ভেবে দেখি না, সেটা একপ্রকার অন্যায়।
সমাজ, রাষ্ট্র, স্থাপত্য— সবকিছুই আমরা সক্ষম শরীরের মানুষদের জন্য তৈরি করেছি। প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রতিবন্ধকতা বোধ যাতে চিরজাগ্রত থাকে, সে কারণে আমরা সমাজের কোনও কিছুই সাম্যের সঙ্গে গড়ে তুলতে পারিনি। কিন্তু সংখ্যালঘু মানুষ যেখানে তার সংখ্যালঘুত্বের বোধ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না, সেই সমাজ আর যাই হোক, একটা পূর্ণ, গতিময় সমাজ হতে পারে না।
আমার এক প্রফেসর বন্ধু আছেন, যিনি দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী। তাঁর সঙ্গে প্রথম আলাপের পর একটা মজার কথা তিনি আমাকে বলেছিলেন— ‘জানো, অন্ধ মানুষকে দেখলেই জনগণ একটা ধারণা করে নেয়, যে ইনি ভাল গান গাইবেন!’
শুধু নারায়ণ কাকু কিংবা সুব্রতা কাকিমা নয়, ছোটবেলায় আমাদের সঙ্গে পড়ত সমৃদ্ধ চক্রবর্তী। সমৃদ্ধ ছিল অটিস্টিক। সমৃদ্ধর মা কৃষ্ণা কাকিমা ওঁকে নিয়ে স্কুলে আসতেন। পরীক্ষার সময় ওঁকে নিয়ে বসতেন। সমৃদ্ধর আসল অসুবিধাগুলো কোথায়, তা হয়তো আমরা বুঝতাম না, কিন্তু ওকে আপন করে নিতে আমাদের ছোটদের কখনও কোনও অসুবিধা হয়নি। সমৃদ্ধ যে আলাদা, তা কোনওদিন বুঝতে দিইনি। কিন্তু আমাদের অভিভাবকেরা তা করতেন না। কী অবলীলাক্রমে তখন গার্জিয়ানরা সমৃদ্ধকে বলে দিত ‘অ্যাবনর্মাল বাচ্চা’!
অথচ এই সমৃদ্ধ প্রতিটি পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করত। আমাদের সঙ্গেই মাধ্যমিক পাশ করেছিল। কিন্তু ওই যে মানুষ একটু আলাদা হলেই তাকে ‘অ্যাবনর্মাল’ বলার রেওয়াজ আমাদের, সেই অসভ্যতা হয়তো সমৃদ্ধ এবং ওর মা কৃষ্ণা কাকিমার জীবন বিষময় করে তুলেছিল। ওরা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সে খবর আমরা রাখতে পারিনি।
আমার এক প্রফেসর বন্ধু আছেন, যিনি দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী। তাঁর সঙ্গে প্রথম আলাপের পর একটা মজার কথা তিনি আমাকে বলেছিলেন— ‘জানো, অন্ধ মানুষকে দেখলেই জনগণ একটা ধারণা করে নেয়, যে ইনি ভাল গান গাইবেন!’ আমার সেই বন্ধু কথাটা হেসে বললেও আমি উপলব্ধি করেছিলাম যে দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী মানুষকে শুধুমাত্র গায়ক হিসেবে দেখবার যে আমাদের তীব্র স্পৃহা, উনি অন্য কোনও কাজ করতে পারবেন না, শুধু গান গাইবেন—তা বড় অপমানের।
আরেক বন্ধু, যিনি হুইলচেয়ার-ব্যবহারকারী, একটি স্কুলে চাকরি করেন। তিনি হুইলচেয়ার-ব্যবহারকারী জানা সত্ত্বেও তাঁর সহকর্মী বারবার জোর করেন যে, পরীক্ষার সময় তাঁকেও ক্লাসে ঘুরে ঘুরে গার্ড দিতে হবে, তিনি বসতে পারবেন না! এমন অনেক সময় ঘটে যে, শিক্ষিত স্টাফরুমে তাঁর আড়ালে কোনও একটা দোষ-গুণের ব্যাপারে বলা হয়েছে- ‘বোবা কানা খোঁড়া/এক গুণ বাড়া!’
মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখি— চারিদিকে আলোর রোশনাই… দুর্গাপুজোর ঢাক বাজছে… রাস্তায় খুব ভিড়… আমি আর রাকেশ একটা জনশূন্য শ্মশানের সামনে দাঁড়িয়ে… দুই বন্ধু একে অপরের হাত ধরা… আর দূরে নারায়ণ কাকু একটা সাদা রুমাল ক্রমাগত নেড়ে চলেছেন!
আজ হয়তো আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী অধিকার আইন তৈরি হয়েছে। বহু চিরাচরিত প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি কিছু নতুন ধরনের প্রতিবন্ধকতাও সেই আইনে স্থান পেয়েছে। তবে সহানুভূতি ও সমতার জায়গাটা যদি দৃঢ় না হয়, তাহলে আইন করে কখনওই কোনও পরিবর্তন আসবে না। কিছুদিন আগেই একটি অভিজ্ঞতা হল— আমাদের এক উঁচু ক্লাসের ছাত্রীর কেবল ক্লিফপ্যালেট আছে বলে ওর বন্ধুরা ওকে ঠিক ওদের সঙ্গে রাখে না। ওরা নাকি ওর কথা ‘বুঝতে পারে না’! এদের সঙ্গে নিজের ছোটবেলাটা মেলাই। এই ছেলেমেয়েগুলো কিন্তু হেলেন কেলারের জীবনী পাঠ্য হিসেবে পড়েছে। তাও কোনও প্রভাব পড়েছে কি?
এই সময়গুলো প্রতিবন্ধকতা, অধিকার, গর্বের মাস, সংখ্যালঘুত্ব— সব কেমন গুলিয়ে যায়। কিছু বুঝে উঠতে পারি না। মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখি— চারিদিকে আলোর রোশনাই… দুর্গাপুজোর ঢাক বাজছে… রাস্তায় খুব ভিড়… আমি আর রাকেশ একটা জনশূন্য শ্মশানের সামনে দাঁড়িয়ে… দুই বন্ধু একে অপরের হাত ধরা… আর দূরে নারায়ণ কাকু একটা সাদা রুমাল ক্রমাগত নেড়ে চলেছেন!
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত