(Kings In British India)
ছোটবেলায় বিছানায় শুয়ে মা-ঠাকুমাদের কাছে রূপকথার গল্প শুনতাম। তাঁরা বলতেন “এক ছিল রাজা, তার ছিল রানী। তাদের ছিল অগাধ ঐশ্বর্য। হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া, লোক-লস্কর, ঢাল-তরোয়াল, পাইক-বরকন্দাজ, পাত্র-মিত্র, মন্ত্রী-আমলা, সাতমহলা প্রাসাদ ইত্যাদি আরও কত কী।”

কিন্তু এগুলো যে শুধুই রূপকথার গল্প নয়, বাস্তবেও যে ছিল এমন সব রাজা, তা জেনেছি অনেক পরে।
এদেশে ইংরেজ শাসনের অনেক আগে থেকেই ভারতের উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম সারা দেশজুড়েই ছিল অসংখ্য ছোট-বড় রাজ্য। এদের মধ্যে কারওর কারওর ছিল অগাধ ভূ-সম্পত্তি। কোষাগারে ছিল সোনাদানা, দামি দামি মণিমানিক্যে ঠাসা।

যেমন ছিল তাঁদের বিলাসবহুল জীবন যাপন, তেমনই ছিল তাঁদের আত্ম-অহংকার ও অন্যান্য রাজ্যের রাজাদের কাছে নিজেকে সেরা প্রতিপন্ন করার রেষারেষি। নতুন নতুন দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ ও দুর্ভেদ্য দুর্গ নির্মাণ করে তাঁরা অন্য রাজাদের কাছে নিজেকে সব থেকে ক্ষমতাশালী প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করতেন।

আরও পড়ুন: খুচরো পয়সার আকাল, ট্রামে-বাসে চালু হল কুপন ব্যবস্থা
এদের মধ্যে যাঁরা সেনাবলে বেশি বলীয়ান, তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার সুযোগ পেলেই উন্নত সেনাবাহিনী নিয়ে পার্শবর্তী অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাজার রাজ্য আক্রমণ করতেও দ্বিধা বোধ করতেন না। সেই রাজ্য জয় করে একদিকে যেমন রাজ্যের সীমানা বাড়িয়ে নিতেন, তেমনই পরাজিত রাজ্যের ধন-সম্পদ লুঠ করে এনে নিজের রাজকোষ ভর্তি করতেন। সেই সঙ্গে জাহির করতেন নিজের ক্ষমতা।

পলাশীর যুদ্ধের পর কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটল। ভারতে শুরু হল ইংরেজ সরকারের শাসন। তখন এই সব রাজারা বেশির ভাগই ইংরেজ শাসকদের বশ্যতা মেনে নিয়ে শর্তসাপেক্ষে নিজ নিজ রাজ্য শাসন করতে থাকলেন। সেসময় ব্রিটিশ সিংহাসনে আসীন রানি ভিক্টোরিয়া।

ক্যামেরা আবিষ্কারের পর বিদেশিদের হাত ধরেই এদেশে ক্যামেরার আবির্ভাব হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ভাগ্যের সন্ধানে আসা কিছু মানুষ ছবি তোলাকেই পেশা হিসাবে গ্রহণ করলেন। এদেশে সেসময়ে না ছিল কোনও স্টুডিও, না ছিল ছবি ছাপানোর কোনও ব্যবস্থা। সেই প্রথম যুগে ক্যামেরায় ছবি তোলা ও বিদেশ থেকে তা ছাপিয়ে আনা পুরো ব্যাপারটাই ছিল বেশ ব্যয়বহুল। ফলে তা সাধারণের নাগালের বাইরেই ছিল। একমাত্র রাজদরবারে বা অত্যন্ত অভিজাত ধনী লোকের গৃহেই সমাদর লাভ করে।

ভারতের দেশীয় রাজা-বাদশা-নবাব পরিবারে ছবি তোলাটা সেই সময় একটা রাজকীয় শখে পরিণত হয়েছিল। ফলে একের পর এক তাদের কত যে ছবি তোলা হয়েছিল, তার কোনও হিসেব নেই। নানা ভঙ্গিমায়, চোখ ধাঁধানো নানা জমকালো পোশাক পরিহিত, বহুমূল্যবান রত্নালংকার শোভিত সেই সব রাজা, নবাব, বাদশাদের দরবারি ছবি ও সেই সঙ্গে রাজপরিবারের পুত্র-কন্যা ও বিশিষ্ট পাত্র-মিত্রদের ছবিগুলো ভারতের ইতিহাসে একটি বিশেষ সময়ের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

ছবি তোলার সেই প্রথম যুগে দেশি-বিদেশি ফটোগ্রাফারদের হাতে তোলা ও বর্তমানে দেশ-বিদেশের সংগ্রহশালায় স্থান পাওয়া অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য মূল ছবিগুলোর কিছু পিকচার পোস্টকার্ড ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে পেশ করছি।

কোনও কোনও রাজা-মহারাজার মাথার পাগড়ির উপর সোনা-রুপা ছাড়াও বহুমূল্য রত্নখচিত রাজমুকুট লাগানো থাকত।

তাঁদের মাথার পাগড়িগুলি ছিল বৈচিত্র্যে অনন্য। একেক রাজ্যের রাজার মাথায় এক এক রকম পাগড়ি।

সিল্ক, রেশম বা অন্য কোনও দামি কাপড় খুব সরু করে বিশেষ কায়দায় সুনিপুণভাবে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে মোটা দড়ির মতো বানিয়ে তা দিয়ে তৈরি করা হত নানা রকমের নকশার পাগড়ি।

যে সব মূল্যবান পাথর ও দামি দামি হিরে-জহরতে মোড়া অলংকার তাঁরা অঙ্গে ধারণ করতেন তা দেখলে সাধারণের চোখে তাক লেগে যেত।


সোনার সুতোয় সেলাই করা বহু দামি দামি পাথর বসানো এমন সব ভারী ভারী রাজপোশাক পরার মতো চেহারাও ছিল তাঁদের।



চোখ ধাঁধানো দামি দামি পাথর খচিত তাঁদের তরবারির হাতলগুলি ছিল দেখার মতো।

রাজা থাকলেই থাকতে হবে রাজ সিংহাসন। সেই সিংহাসনও মূল্যবান ধাতু ও রত্নে মোড়া উঁচু-নীচু ছোট-বড় অপূর্ব নকশার কত রকমের যে ছিল তা দেখার মতো।

আদ্দিকালের ক্যামেরায় তোলা ও সুমুদ্রিত এই অপূর্ব ফটোগুলি সবই সেই যুগের লন্ডনের বিভিন্ন স্টুডিও থেকে প্রকাশিত।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত