(Bibhutibhushan Memoir)
‘দুঃখের তত্ত্ব আর সৃষ্টির তত্ত্ব একেবারে একসঙ্গে বাঁধা। কারণ, অপূর্ণতাই দুঃখ এবং সৃষ্টিই যে অপূর্ণ।’
এ-কথা মনে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের। বলেছিলেন এ কথাও, ‘অপূর্ণতার গৌরবই দুঃখ।’ রবীন্দ্রনাথের এই চিন্তা বেশ কিছুদিন ধরেই আমার বন্ধু। দিনরাত্রির সহচর। জানতে ইচ্ছে করে, এই দুঃখের জন্মসূত্র কোথায়? দুঃখের সঙ্গে অপূর্ণতার সংযোগের কথাই বা বলছেন কেন রবীন্দ্রনাথ?
একটি সহজ উত্তর বারবার দেখা দেয় মনে। পূর্ণ অবস্থার সঙ্গে যে কোনও ইচ্ছের সফলতাই যুক্ত হয়ে থাকে। কিন্তু যেখানে মনের ইচ্ছেরা ঠোক্কর খায়, পা পিছলে পড়ে, কিংবা দিনের পর দিন ধাক্কা খেতে খেতে আর পেরে ওঠে না, মরতে থাকে; হ্যাঁ সেখানেই, সেই মৃত্যুর যোনি ভেদ করে জন্ম নেয়— দুঃখ।
অর্থাৎ চাওয়া-পাওয়ার মৃত্যুই সৃষ্টি করে দুঃখকে। এখানেই রবীন্দ্রনাথের চিন্তার মন, আমার সামনে আলোকিত হয়ে ওঠে।
দুঃখ কি একা আসে? না। দুঃখের সখা হল নিঃসঙ্গতা, একাকিত্ব।
এই নিঃসঙ্গতাকে কেউ কেউ বুঝতে পারেন। বুঝতে পারেন, যে তাঁরা নিরন্তর একা হয়ে পড়ছেন। হয়তো সেটা তাঁদের কাম্যও। কিন্তু তাঁদের একাকিত্ব সম্পর্কে তাঁরা অবগত থাকেন। অবশ্য এমন মানুষ খুবই কম। কিন্তু একেবারে নেই যে, তা বলি কী করে? যাঁরা বুঝতে পারেন নিজেদের এই দুঃখ-প্রকৃতি, তাঁরা এক অর্থে ভাগ্যবান। কারণ, এক্ষেত্রে নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলার পথটুকু অন্তত তাঁদের সামনে খোলা রয়েছে।

আর, যাঁরা বুঝতে পারেন না? তাঁদের কাছেই— দুঃখ, নিঃসঙ্গতা, একাকিত্ব— জীবনরূপী চাবুকের একেকটা ঝাপট। বিভূতিভূষণের ‘মৌরীফুল’ গল্পের সুশীলা আমার কাছে তেমনই এক চরিত্র!
বিভূতিভূষণ গল্পটি শুরু করেছেন এই ইঙ্গিতের মাধ্যমে যে, সংসারে সুশীলা সম্পূর্ণ অচল। কোর্টে সাক্ষী দিতে যাবেন রামতনু মুখুজ্যে। তার আগে গল্পটি জানায়:
‘বৃদ্ধ রামতনু মুখুয্যে শিবকৃষ্ণ পরমহংসের শিষ্য। তিনি রোজ সন্ধ্যাবেলায় আরতি দিয়া থাকেন, এ-জন্য প্রায় একপোয়া খাঁটি গাওয়া ঘি তাঁর চাই। তিনি নানা উপায়ে এই ঘি সংগ্রহ করিয়া ঘরে রাখিয়া দেন। অন্যদিনের মতো আজও তাকের উপর একটা বাটিতে ঘি-টা ছিল, তাঁর পুত্রবধূ সুশীলা সেই বাটি তাকের উপর হইতে পাড়িয়া সে ঘি-টার সমস্তই দিয়া খাবার তৈয়ারি করিয়াছে।’
হঠাৎ তাহার স্ত্রী রাগিয়া উঠিল— নিতে জানেনা তো জেনো। কাল থেকে আমার এখানে আর বনবে না। এ যেন হয়েছে শক্রপুরীর মধ্যে বাস— বাড়িসুদ্ধ লোক আমার পেছনে এমন করে লেগেছে কেন শুনতে চাই। না-হয় বরং… কান্নায় ফুলিয়া সে বালিশের উপর মুখ গুঁজিল।
ফিরে এসে রামতনু যখন দেখল, তার পুজোর ঘি সম্পূর্ণ নষ্ট করে দিয়েছে তার পুত্রবধূ, তখনই শুরু হল অশান্তি। গল্পের এই প্রাথমিক অংশেই ‘সুশীলা’ চরিত্রটির এক বৈশিষ্ট্য নজরে আসে। সে অন্যায় করেছে, এবং সেই মতো শ্বশুরের কটুবাক্য সে অনেকক্ষণ সহ্য করছিল। কিন্তু একটা সময়ের পর সে প্রত্যুত্তর দিতে শুরু করে। সুশীলার এই স্বাধীন মনোভাবকে বিভূতিভূষণ গল্পটির মধ্যে খুব আশ্চর্যভাবে প্রয়োগ করেছেন। কীভাবে? বলছি।
প্রথমেই, গল্পটি পড়তে পড়তে আমাদের মনে হয় সামান্য বয়সি সুশীলা খুবই অবিবেচক। সংসারে মন নেই। কেবলই ঝগড়া করে। শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে তর্ক তার লেগেই আছে। সবচেয়ে বিরক্ত হই, স্ত্রীর অশান্তির জেরে রাত করে বাড়ি ফেরা সুশীলার স্বামী কিশোরী যখন তার জন্য রাতের ঢাকা দেওয়া খাবার একা বসে খেয়ে নেয়, এবং তা জানতে পেরে রেগে যায় সুশীলা।
সুশীলার রাগের কারণ? গল্পের এই অংশের বর্ণনাটি এখানে তুলে দিলাম:
‘স্বামীকে দেখিয়া একটু অপ্রতিভের সুরে বলিল— কখন এলে? তা আমায় একটু ডাকলে না কেন?
কিশোরী বলিল— আর ডেকে কী হবে? আমার কী আর হাত-পা নেই! নিতে জানিনে?
হঠাৎ তাহার স্ত্রী রাগিয়া উঠিল— নিতে জানেনা তো জেনো। কাল থেকে আমার এখানে আর বনবে না। এ যেন হয়েছে শক্রপুরীর মধ্যে বাস— বাড়িসুদ্ধ লোক আমার পেছনে এমন করে লেগেছে কেন শুনতে চাই। না-হয় বরং… কান্নায় ফুলিয়া সে বালিশের উপর মুখ গুঁজিল।
কিশোরী দেখিল স্ত্রী রাতদুপুরের সময় গায়ে পড়িয়া ঝগড়া করিয়া একটা বিভ্রাট বাধাইয়া তোলে বুঝি। এরকম করিয়া আর সংসার করা চলে না— ভাত ঢাকা ছিল, খুলিয়া লইয়া খাইয়াছে, ইহাতেও যদি স্ত্রী চটিয়া যায় তাহা হইলে আর পারা যায় না; কিছু না, ওই একটা ছল; ওই সামান্য সূত্র ধরিয়া এখনি সে একটা রাম রাবণের যুদ্ধ বাধাইয়া তুলিবে।’
অপর দিকে, তার সংসারের সকলেই তার প্রতি যে ব্যবহার ছুঁড়ে দিয়েছে রোজ, তা ক্রীতদাসের উদ্দেশ্যে মনিবের আচরণের সমার্থক! সংসারের যাবতীয় কাজ সে একা হাতে করে। সারাদিন খাটে। কোনও দুর্ব্যবহার না করলে, সেই খাটনির বিপরীতে কোনও বাজে আচরণ পর্যন্ত করে না।
সুশীলার কলহ প্রবণতা এবং তার স্বামী কিশোরীর তার প্রতি আতঙ্ককে আমাদের স্বাভাবিক মনে হয়। ইচ্ছে করেই সুশীলা চরিত্রটির প্রতি এই বিরক্তিকে যেন প্রথমে পাঠকের মনে রোপণ করে দিতে চান বিভূতিভূষণ। তাঁর এই চাওয়ার পেছনে লুকিয়ে আছে সুশীলার অপূর্ণতা, না-পাওয়া, দুঃখ। আর সেখান থেকে বিচ্ছুরিত হয় তার কলহ-স্বভাব।
কীসের দুঃখ? বিভূতিভূষণ জানিয়েছেন সুশীলার বয়স আঠারো। অর্থাৎ সে নিতান্ত তরুণী। গল্পটি যত এগোয়, মাঝে মাঝেই সুশীলার মনের বিরক্তির মূলকে যেন চিনতে পারি আমরা। তার সঙ্গে কেউ ভাল করে কথা বললে, সে অত্যন্ত ভাল ব্যবহার করে। হতদরিদ্র বাচ্চা একটা ছেলেকে সে লুকিয়ে বস্ত্র দিয়ে দেয়। প্রতিবেশী আত্মীয়া গৃহবধূকে সে অকৃপণভাবে সাহায্য করে সবসময়।

অপর দিকে, তার সংসারের সকলেই তার প্রতি যে ব্যবহার ছুঁড়ে দিয়েছে রোজ, তা ক্রীতদাসের উদ্দেশ্যে মনিবের আচরণের সমার্থক! সংসারের যাবতীয় কাজ সে একা হাতে করে। সারাদিন খাটে। কোনও দুর্ব্যবহার না করলে, সেই খাটনির বিপরীতে কোনও বাজে আচরণ পর্যন্ত করে না। বিভূতিভূষণ স্বীকার করেছেন, ‘যখন মেজাজ ভাল থাকিত, তখন সমস্ত দিন নীরবে ভূতের মতো খাটিয়াও সে বিরক্ত হইত না।’
প্রশ্ন হল, মেজাজ খারাপ হত কেন তার? কেন মাঝেমাঝে সংসারে বিদ্রোহ করতে চাইত সুশীলা? যাঁরা গল্পটি পড়েছেন, তাঁদের অনুরোধ করব মনে করার জন্য যে কী বিপুল আর্তি নিয়ে সে তার স্বামীর কাছে রোজ রাত্রে যেত। কী থাকত সেই আর্তির ভেতর? যৌনতা? না। থাকত বন্ধুত্বের অকুল বসনা।
এমন একটি মন, যার কেউ নেই। তার সঙ্গে, খুবই সামান্য সময়ের জন্য কলকাতা থেকে গ্রামে আসা এক শহুরে স্ত্রীর দেখা করিয়ে দেন বিভূতিভূষণ। তারা নিজেদের মধ্যে ‘সই’ পাতায়।
বিয়ের প্রথম দিকে সারারাত সুশীলাকে কত রকমের গল্প শোনাত কিশোরী। সেই গল্প শোনানোর মধ্যে ছিল, যত্ন। ভালবাসা। কতবার অভিমানের ছলনায় সে কাছে টানতে চেয়েছে কিশোরীকে। পারেনি। গল্পের প্রথমে, ঘুমন্ত সুশীলাকে না ডেকে রাতের খাবার খেয়ে নিয়েছিল যখন কিশোরী, তখন সুশীলার ক্রুদ্ধ-অভিমান দেখে অবাক হয়েছিলাম আমরা। বিভ্রান্ত ও বিরক্তও কি হইনি? হয়েছি। গল্পটির সর্বাঙ্গ-নিয়তি জানার পর, পড়ে মনে হয়েছে, এই সবই ছিল একজন একা মানুষের সংযোগের ইচ্ছায় বিফল হওয়া। হতাশায় ফেটে পড়াও।
এমন একটি মন, যার কেউ নেই। তার সঙ্গে, খুবই সামান্য সময়ের জন্য কলকাতা থেকে গ্রামে আসা এক শহুরে স্ত্রীর দেখা করিয়ে দেন বিভূতিভূষণ। তারা নিজেদের মধ্যে ‘সই’ পাতায়। একে অপরকে ডাকে ‘মৌরীফুল’ নামে। সেই ‘মৌরীফুল’ও যখন ফিরে যাচ্ছে শহরে তখন বিভূতিভূষণ লিখছেন:
‘আমি কাল কী পরশু চলে যাব। তাহলেও তোমায় ভুলব না মৌরীফুল, তোমার মুখখানি আমার মনে থাকবে ভাই— চিঠিপত্র দেবে তো? এবার পাড়াগাঁয়ে এসে তোমায় কুড়িয়ে পেলাম— তোমায় কখনো ভুলব না।
সুশীলার চোখে জল আসল, এত মিষ্ট কথা তাহাকে কে বলে? সে কেবল শুনিয়া আসিতেছে সে দস্যু, একগুঁয়ে ঝগড়াটে। তাহার হাতে একটি সোনার আংটি ছিল, ইহা তাহার মায়ের দেওয়া আংটি, বিবাহের পর প্রথম তাহার মা তাহার হাতে এটি পরাইয়া দিয়াছিলেন। সেটি হাত হইতে খুলিয়া সে সঙ্গিনীর হাত ধরিয়া বলিল— দেখি ভাই তোমার আঙুল, তুমি হলে মৌরীফুল, তোমায় খাওয়াবার কথা, কাপড় দেওয়ার কথা— এই আংটিটা আমার মায়ের দেওয়া, তোমায় দিলাম, তবু এটা দেখে তুমি গরিব মৌরীফুলকে ভুলে যাবে না।’
মৃত্যুর একেবারে আগে আগে, রাত্রে শুয়ে কী ভেবেছে সে? ‘জগতে কেউ তাহাকে ভালবাসে না— কেবল ভালবাসে তাহার মৌরীফুল।’ অথচ কতটুকুই বা তাদের আলাপ? সঙ্গে থাকা? কিন্তু ভালবাসার, বন্ধুত্বের নদীজলস্পর্শ সুশীলা পেয়েছিল জীবনের ওই স্বল্প মুহূর্তেই। তার বন্ধু, মৌরীফুলের কাছ থেকে।
সুশীলার চোখের জল কেবল ওই কলকাতার সঙ্গিনীর প্রতি ছিল না। সারা জীবনে এই প্রথম কোনও বন্ধুত্বকে সে দেখতে পেয়েছিল সেদিন। ‘এত মিষ্ট কথা তাহাকে কে বলে?’ এই বাক্যটি আমাদের জানিয়ে যায় যে শ্বশুরবাড়িতে থাকতে থাকতে ভুলেই গিয়েছিল সুশীলা— ভাল ব্যবহার তার প্রাপ্য। সম্মান তার একান্ত অধিকার।

তাই মৃত্যুর একেবারে আগে আগে, রাত্রে শুয়ে কী ভেবেছে সে? ‘জগতে কেউ তাহাকে ভালবাসে না— কেবল ভালবাসে তাহার মৌরীফুল।’ অথচ কতটুকুই বা তাদের আলাপ? সঙ্গে থাকা? কিন্তু ভালবাসার, বন্ধুত্বের নদীজলস্পর্শ সুশীলা পেয়েছিল জীবনের ওই স্বল্প মুহূর্তেই। তার বন্ধু, মৌরীফুলের কাছ থেকে। একজন মানুষ কতখানি একা হলে, সেই স্বল্প মুহূর্তের বন্ধুত্বকেই জীবনেই সবচেয়ে মূল্যবান সঞ্চয় বলে মনে করতে পারে? ভাবলে ভয় লাগে!
গল্পে সুশীলা শেষ পর্যন্ত মারা যায়। তার বন্ধু, মৌরীফুলের সঙ্গে আর কোনওদিন দেখা হয় না তার। এই অপূর্ণতাকে কী বলব? নিয়তির স্বেচ্ছাচার, না দুঃখের চাবুক?
একটা উত্তর অবশ্য আমার মনে জেগে আছে। এ-ই হল বিভূতিভূষণের লেখার মায়া!
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত