হে শারদ সংখ্যা, তব বিবিধ বিপণন

Pujabarshiki Sales
Pujabarshiki Sales

হে শারদ সংখ্যা, তব বিবিধ বিপণন

(Pujabarshiki Sales)

সন্ধে নামতেই কলেজ স্ট্রিট জংশন জুড়ে আলোর রোশনাই ছড়িয়ে যায়। বইয়ের দোকানের বাল্বের যতটা না আলো, তার থেকেও বেশি শাড়ি-পাঞ্জাবি-খাবারের দোকানের ছিটকে পড়া জেল্লা। তবে বাল্বের ওই আলোর নিচেই ফুটপাথের তিনটে ম্যাগাজিন স্টলে বেশ ভিড় জমে ভাদ্র-আশ্বিনের সন্ধেয়। শাড়ির দোকানের গেটে দু-হাত নেড়ে লোক ডাকার ফাঁকে একবার সেই সব স্টলের দিকে আড়চোখে দেখে নেন ডাঁটার মতো গাঁট ফুলে ওঠা শীর্ণ লোকটি। 

পুজোর দু-তিন মাস আগে থেকেই নানা স্বাদের শারদীয়া সংখ্যা আসতে থাকে কলেজ স্ট্রিটে, আর শারদীয়ার ভিড় বাড়লেই বাড়ে পাঠকের ভিড়, বিক্রেতাদের ভিড়, পরিবেশক তথা ডিসট্রিবিউটরের ভিড়। 


আরও পড়ুন: ধর্মে পুরাণে ডিম-কথা


কেউ বাণ্ডিল বাণ্ডিল পুজোবার্ষিকী বেঁধে নিচ্ছেন সাদা প্লাস্টিকের বস্তায়। কেউ আবার ভ্যানে চাপিয়ে চলে যাচ্ছেন হাওড়া বা শিয়ালদা হয়ে নিজস্ব গন্তব্যে। কেউ বা পুজো সংখ্যা কাঁধে নিয়ে রাস্তা পেরিয়ে শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট ধরছেন, মালিকের স্টলে কাস্টমার দাঁড়িয়ে আছে বলে। এসবের মধ্যেই তিনফুট চওড়া ওই ফুটপাথে পুজোবার্ষিকীর পাঠকরা ঠায় দাঁড়িয়ে, নেড়েচেড়ে দেখছেন চেনা-অচেনা শারদ সংখ্যাগুলো।

শিউলি ফুলের মতো পুজোবার্ষিকীর প্রচ্ছদও বয়ে আনে দুর্গাপুজোর আমেজ। গড়পড়তা বইপ্রেমী বাঙালির আশ্বিনের রোজনামচায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে এই পুজোসংখ্যা কেনা ও পড়ার রীতি। তবে পুজোবার্ষিকী যতটা পাঠকের, ততটাই বিক্রেতাদেরও। একনিষ্ঠ বহু পাঠকের কাছে যেমন পুজোবার্ষিকী ছাড়া পুজো অসম্পূর্ণ, বিক্রেতাদের কাছেও কি তা-ই? পুজোসংখ্যা বইবিক্রেতাদের জন্য কতটা মরসুমি সুখ বয়ে আনে— এই প্রশ্নের তত্ত্বতালাশ করতে গেলে চোখে পড়ে আড়ালে থাকা নানা রূঢ় বাস্তব, যে বাস্তবগুলো বইবাজার ঢোঁক গিলে নেয় প্রায়ই উৎসবের হাসি হেসে!

Pujabarshiki Sales
গড়পড়তা বইপ্রেমী বাঙালির আশ্বিনের রোজনামচায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে এই পুজোসংখ্যা কেনা ও পড়ার রীতি

শ্যামাচরণ দে স্ট্রিটে ৫০ বছরেরও বেশি পুরনো দোকান বলে পুজোবার্ষিকীর স্বর্ণযুগের সাক্ষী সজল গুহ*। দীঘার পার্শ্ববর্তী রামনগরের বাসিন্দা অবিনাশ গুহ কলেজ স্ট্রিটে এসে একটি গুমটি ঘরে পসার সাজিয়ে বসেছিলেন প্রায় ৭০ বছর আগে। তারপর সেই দোকানের দায়িত্ব পান তাঁর ছেলে সজলবাবু।

বছর পঁয়ষট্টির প্রবীণ বিক্রেতার কথায়, গত শতকের শেষ ও এই শতকের গোড়ার দিকে পুজো সংখ্যার বিক্রি ছিল তুঙ্গে। পুজোর আগে বিভিন্ন সংবাদপত্রের পুজোবার্ষিকী বাজার কাঁপাত রীতিমতো। ১০০-২০০ কপি অনায়াসে ফুরিয়ে যেত দু-তিনদিনের মধ্যে। আজ সেই বিক্রি পড়তে পড়তে ১০-১৫ টায় এসে ঠেকেছে। গত তিন-চার বছরে, গড়ে ১০ হাজার টাকা লস হচ্ছে প্রতি বছর। এই বছর তাই শারদ সংখ্যাতে হাতই দেননি সজলবাবু।

পাঠককে ২০-২৫ শতাংশ ছাড় দেওয়ার পর আড়াই শতাংশ লাভ হয় বিক্রেতার। এই লাভের হার খুব বেশি হলে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। অর্থাৎ, ১০০ টাকার পুজোবার্ষিকীতে একজন বিক্রেতার লাভ থাকে গড়ে ৫ টাকা।

পুজোবার্ষিকীর লাভক্ষতি অনেকটাই সরু পাঁচিলের উপর দিয়ে হাঁটার মতো। লাভ হলে সামান্য, ক্ষতি হলে বিশাল। বইয়ের তুলনায় পুজো সংখ্যাতে এমনিই লাভ বেশ কম। পাঠকরা কমবেশি ২০-২৫ শতাংশ ছাড় পান বিক্রেতাদের থেকে। এদিকে বিক্রেতারা ডিসট্রিবিউটরদের থেকে পুজো সংখ্যা কেনেন ২৫-৩০ শতাংশ ছাড়ে। অধিকাংশ সময় এর থেকে কম ছাড় যেমন ২২.৫ বা ২৭.৫ শতাংশ ছাড়েও রফা করতে হয়‌। অর্থাৎ পাঠককে ২০-২৫ শতাংশ ছাড় দেওয়ার পর আড়াই শতাংশ লাভ হয় বিক্রেতার। এই লাভের হার খুব বেশি হলে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। অর্থাৎ, ১০০ টাকার পুজোবার্ষিকীতে একজন বিক্রেতার লাভ থাকে গড়ে ৫ টাকা।

তবে এই লাভও মেনে নেওয়া যায় যদি বইয়ের মতো সম্বৎসর বিক্রি হত‌ শারদ সংখ্যা। শারদীয়ার যা কিছু বিকিকিনি দুর্গাষষ্ঠী পর্যন্ত। এরপর পুজোবার্ষিকী পড়ে থাকলে সেগুলো লোকসানের খাতাতে চলে যায়।

Pujabarshiki Sales
শারদীয়ার যা কিছু বিকিকিনি দুর্গাষষ্ঠী পর্যন্ত

লোকসানের অঙ্কটা আরও মনখারাপ করা। ধরা যাক, একজন বিক্রেতা ৭০ টাকায় একটি পুজোবার্ষিকী ২০ কপি কিনে ৮০ টাকায় বিক্রি করবেন। অর্থাৎ ১০ টাকা লাভ। এই ১০ টাকা গড়ে সর্বোচ্চ লাভ, কারণ আগেই বলা হয়েছে অধিকাংশ বিক্রেতা পাঁচ বা আড়াই টাকা লাভেও পুজোবার্ষিকী বেচেন। এবার যদি ষষ্ঠী পর্যন্ত ১৭টা বিক্রি হয়, তাহলে পড়ে থাকে তিনটে। অর্থাৎ, ১৭টা পুজোবার্ষিকী বাবদ ১৭০ টাকা লাভ হলেও তিনটে পুজোবার্ষিকীর জন্য ২১০ (৩×৭০) টাকা ক্ষতি হয়। অর্থাৎ সারা মরসুমের খাটনির পরও পুজোর দিন ৪০ টাকার লোকসান গুণে ঝাঁপ ফেলতে হয় সেই দোকানদারকে। 

দুর্গাপুজোর পর কালীপুজো পর্যন্ত শারদ সংখ্যা অল্পস্বল্প বিক্রি হয় ঠিকই, তবে তাপসবাবুর কথায়, তাতে লোকসানের অঙ্ক খুব একটা কমে না।

আগে বর্ধমান, হাওড়া, মেদিনীপুর, নদিয়ার বিক্রেতারা এক-একটা পুজোবার্ষিকী ৫০-৭০ কপি বস্তা বেঁধে ভ্যানে তুলে নিয়ে যেত। এখন তাঁরা আসেন বাজারের ব্যাগ হাতে।

তাপসবাবু বাংলা পত্রিকার বিখ্যাত ঠেক ‘পাতিরাম বুক স্টল’-এর কর্ণধার। বাংলা পত্রিকার বৃহত্তম পরিবেশকদের মধ্যে অন্যতম ছিল এই স্টল। এখান থেকে জেলার ম্যাগাজিন বিক্রেতারাও পত্রিকা কেনেন, নিজের এলাকায় বিক্রির জন্য। তাপসবাবুর অভিজ্ঞতা, কলকাতার পাশাপাশি জেলার বিক্রিও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। আগে বর্ধমান, হাওড়া, মেদিনীপুর, নদিয়ার বিক্রেতারা এক-একটা পুজোবার্ষিকী ৫০-৭০ কপি বস্তা বেঁধে ভ্যানে তুলে নিয়ে যেত। এখন তাঁরা আসেন বাজারের ব্যাগ হাতে।

কোনও পুজোবার্ষিকী পাঁচ কপি তো কোনওটা সাত কপি নিয়ে অটোয় উঠে যান।‌ ভরসা করে ১০-২০ কপি পুজোবার্ষিকী তুলতেও ভয় পান অনেকে। বেশিরভাগ বিক্রেতারই এক কথা, ‘ডিমান্ড থাকলে আবার এসে নিয়ে যাব, একবারে নেব না।’ এমন ভাগে ভাগে বারবার আসার একটাই কারণ, পুজোবার্ষিকী বিক্রি না হলে আর প্রকাশনের ঘরে ফেরত যায় না। দেদার লোকসান তখন।

Pujabarshiki Sales
আগে বিক্রেতারা এক-একটা পুজোবার্ষিকী ৫০-৭০ কপি বস্তা বেঁধে ভ্যানে তুলে নিয়ে যেত

তাপসবাবুর ব্যক্তিগত অভিমত, পুজোবার্ষিকীর সেল পড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ মানুষের বই পড়া কমে গেছে। আগে যে পুজোবার্ষিকী ৫০০-১০০০ কপি তিনি একা বিক্রি করেছেন, এখন সেই পুজোবার্ষিকী সেঞ্চুরি করার আগেই মাঠের বাইরে চলে যায়। আগে শারদ সংখ্যায় এত ছাড় দেওয়ার রেওয়াজও ছিল না। ইদানীং বিক্রি বাড়াতে ছাড় বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বিশেষ লাভ হয়নি তাতে। 

এসবের মধ্যে দেজ পাবলিশিংয়ের বিকিকিনির দৃশ্য কিছুটা আলাদা। তারা গত কয়েক বছর ধরে পুরনোর পাশাপাশি নতুন কিছু পুজো সংখ্যা রাখছে। এই পুজো সংখ্যাগুলির গড় বয়স ৫ থেকে ১০ বছর অর্থাৎ সদ্য পথ চলা শুরু। বাজারে এই ম্যাগাজিনগুলির নিজস্ব পাঠকবৃত্ত থাকায় বিক্রি নেহাত মন্দ নয়। তবে দেজ-এ সেই বিক্রি যে ৫০-১০০ পেরিয়ে যায়, তেমনটাও নয়। দেজ-এর সুভাষচন্দ্র দে-র কথায়, পুরনো নতুন মিলিয়ে মিশিয়ে বিক্রি ভালই। তবে ষষ্ঠীর মধ্যে সব বিক্রি হওয়াটাই আসল‌। ষষ্ঠীর পর পুজোবার্ষিকী পড়ে থাকলে বড়রকম লোকসান। 

পুজোর পরে শারদীয়া সংখ্যার বিক্রি তেমন হয় না বলে গত বছরের ‘প্ল্যাটফর্ম’-এর প্রকাশক তন্ময় কোলের লোকসান হয়েছিল অনেকটাই। শুধু গত বছর কেন, ৩-৪ বছর আগের বহু পুজোবার্ষিকী এখনও পড়ে আছে তাঁর বই-ঘরে, কেজি দরে বিক্রি হওয়ার ভবিতব্য নিয়ে।

সংবাদপত্রের পুজোবার্ষিকী বরাবরই বাঙালি বাড়িতে পৌঁছায় সংবাদপত্র বিক্রেতা মারফত। অনলাইনের যুগে তাদের ব্যবসায় ভাটা পড়েছে। ব্যবসায় ভাটা পড়ার আরেকটি কারণ, কলেজ স্ট্রিটের ছাড় বাড়িয়ে দেওয়া। আগে পুজোবার্ষিকীতে গড়ে ১০-১৫ শতাংশ ছাড় থাকত। এখন তা বেড়ে ২০-২৫ শতাংশ হয়েছে। অনলাইন বুক সাইটেও একই ছবি। যাঁরা একসঙ্গে ৪-৫টার বেশি পুজো সংখ্যা কেনেন, তারা অনলাইনে অর্ডার করেন বা কলেজ স্ট্রিট চলে যান। খবরের কাগজের বিক্রেতাদের জন্য তখন পড়ে থাকে খুচরো অর্ডার। রঞ্জিত* সরকারের মতে, একটা কি দুটো শারদ সংখ্যা যাঁরা কেনেন, তাঁরাই খবরের কাগজের বিক্রেতাদের ভরসা। 

রঞ্জিত উত্তর চব্বিশ পরগনার মধ্যমগ্রাম স্টেশনে দীর্ঘদিন ধরে সংবাদপত্র বিক্রি করছেন। পুজোর সময় তাঁর শারদীয়ার বিক্রি নেহাত মন্দ ছিল না। আগে ওই লাভের টাকায় পুজোর বাজার সারতেন পরিবারের জন্য। এখন আর তত বিক্রিবাট্টা হয় না। পথচলতি বা নিত্যযাত্রীদের কেউ কেউ বেশ কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে একটা কি দুটো পুজোবার্ষিকী কেনেন। তাদের ভরসাতেই যেটুকু যা বিক্রি। 

Pujabarshiki Sales
একটা কি দুটো শারদ সংখ্যা যাঁরা কেনেন, তাঁরাই খবরের কাগজের বিক্রেতাদের ভরসা

বিক্রেতাদের পাশাপাশি প্রকাশকদের অবস্থা তথৈবচ। শারদীয়া ‘অরণ্যমন’ এই বছর প্রকাশিত হচ্ছে না। প্রকাশক চিরঞ্জিৎ দাশের মতে, চলতি বছর পত্রিকা বিক্রির ট্রেন্ড খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। বাজারের ট্রেন্ড আগাম আভাস দেয়, শারদীয়া কতটা বিক্রি হতে পারে। এই বছর সেই কারণেই শারদীয়া প্রকাশের চিন্তাভাবনা করছেন না তিনি। পরের বছর পত্রিকা বিক্রির ট্রেন্ড ভাল থাকলে শারদীয়া ‘অরণ্যমন’ ছাপা হলেও হতে পারে।  

পুজোর পরে শারদীয়া সংখ্যার বিক্রি তেমন হয় না বলে গত বছরের ‘প্ল্যাটফর্ম’-এর প্রকাশক তন্ময় কোলের লোকসান হয়েছিল অনেকটাই। শুধু গত বছর কেন, ৩-৪ বছর আগের বহু পুজোবার্ষিকী এখনও পড়ে আছে তাঁর বই-ঘরে, কেজি দরে বিক্রি হওয়ার ভবিতব্য নিয়ে।

মেদিনীপুরের বাসিন্দা গৃহবধূ সোনালি ভট্টাচার্যর বালিকাবেলা থেকেই পুজোবার্ষিকী পড়ার নেশা। পঞ্চান্নটি বসন্ত পেরিয়েও তাঁর সেই নেশা অটুট, তবে অটুট নেই নেশাদ্রব্যের গুণমান। তাঁর মতে, এখনকার বহু লেখকের লেখায় অশ্লীলতার বাড়বাড়ন্ত; তুলনায় কাহিনি সাদামাটা।

বিক্রেতাদের ঘর থেকে বেরিয়ে প্রকাশকের ঘরে গেলে লাভক্ষতির অঙ্কে থাবা মারে বিজ্ঞাপনী হিসেব। বিজ্ঞাপনের টাকায় পুজোবার্ষিকী তৈরির খরচ বেশ কিছুটা উঠে আসে। লোকসানের মেরামতও খানিকটা হয়‌। কিন্তু বিজ্ঞাপনের টাকা সময়মতো পাওয়াটাও দরকার। তন্ময় যেমন গত বছরে তাঁর পুজো সংখ্যায় ছাপা বহু বিজ্ঞাপনের টাকা আজও পাননি। বিজ্ঞাপনদাতাদের আশ্বাসবাণী শুনতে শুনতেই এই বছরের শারদ সংখ্যার পাণ্ডুলিপি প্রেসে গিয়েছে। তবে ২০২৬ সালের শারদ সংখ্যায় রাখা হয়নি একটিও বিজ্ঞাপন। 

পুজো সংখ্যার বিকিকিনি কমে যাওয়ার একটা বড় কারণ লেখার গুণমান কমে যাওয়া— এমনটাই মনে করেন তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী ঋষভ দস্তিদার*। বছর চল্লিশের ঋষভ জানাচ্ছেন, ছোটবেলায় আনন্দমেলা, কিশোরভারতী, শুকতারাসহ বাড়িতে অন্তত ৮-৯টা পুজোবার্ষিকী আসত। এখন সেখানে ২-৩টের বেশি পুজো সংখ্যা আসে না। লেখা ও লেখক, দুইয়ের গুণমান নিয়েই ঋষভের অভিযোগ।

Pujabarshiki Sales
সংবাদপত্রের পুজোবার্ষিকী বরাবরই বাঙালি বাড়িতে পৌঁছায় সংবাদপত্র বিক্রেতা মারফত

মেদিনীপুরের বাসিন্দা গৃহবধূ সোনালি ভট্টাচার্যর বালিকাবেলা থেকেই পুজোবার্ষিকী পড়ার নেশা। পঞ্চান্নটি বসন্ত পেরিয়েও তাঁর সেই নেশা অটুট, তবে অটুট নেই নেশাদ্রব্যের গুণমান। তাঁর মতে, এখনকার বহু লেখকের লেখায় অশ্লীলতার বাড়বাড়ন্ত; তুলনায় কাহিনি সাদামাটা। শারদ সংখ্যা বরাবরই অন্য সাধারণ সংখ্যা থেকে আলাদা ও বিশিষ্ট হওয়া উচিত। কিন্তু সেই বিশিষ্টতা আর সেভাবে নজরে পড়ে না। উপন্যাস, গল্পের বিষয়বস্তুও বেশিরভাগ সময় মনোগ্রাহী মনে হয় না তাঁর।

আগের মতো  শারদীয়া সংখ্যা আর ততটা না টানলেও পড়ার অভ্যাসটা ছাড়তে পারেননি ঋতপ্রভ সেন। তাই অল্প টাকা খসিয়ে বেশি শারদীয়া কিনতে লক্ষ্মীপুজো পর্যন্ত অপেক্ষা করেন ৭০ বছর বয়সি এই পাঠক। লক্ষ্মীপুজোর পর কোনও এক দুপুরে কলেজ স্ট্রিটে তাঁকে দেখা যায় বিভিন্ন ম্যাগাজিনের স্টলে পুরনো শারদীয়া খুঁজতে। মোটামুটি হাফ দাম বা অনেকটা ছাড়ে ৫-৬টা পুজোবার্ষিকী বাগিয়ে ব্যারাকপুর ফেরার বাস ধরেন তিনি।

অভিজিতের সুরেই পদার্থবিদ্যার গবেষক নীহারিকা চক্রবর্তী* বলেন, ‘পয়সা দিয়ে বিজ্ঞাপন কিনি বলে মনে হয়।’ ১০ বছর আগেও তাঁর বাড়িতে ১৪-১৫টা পুজোবার্ষিকী আসত। এখন পাঁচটার বেশি পুজোবার্ষিকী আসে না।

লেখার গুণমান ছাড়াও অভিজিতের মতো এক বড় অংশের পাঠকের অভিযোগ শারদ সংখ্যায় বিজ্ঞাপনের ভিড় নিয়ে। ‘লেখার মধ্যে বিজ্ঞাপন, না বিজ্ঞাপনের মধ্যে লেখা ছেপেছে, বোঝা যায় না’, নামজাদা এক সংবাদপত্রের শারদ সংখ্যাগুলি নিয়ে মন্তব্য করেন বছর পঁয়তিরিশের সরকারি আধিকারিক অভিজিৎ সাহা*। 

অভিজিতের সুরেই পদার্থবিদ্যার গবেষক নীহারিকা চক্রবর্তী* বলেন, ‘পয়সা দিয়ে বিজ্ঞাপন কিনি বলে মনে হয়।’ ১০ বছর আগেও তাঁর বাড়িতে ১৪-১৫টা পুজোবার্ষিকী আসত। এখন পাঁচটার বেশি পুজোবার্ষিকী কেনেন না বছর তিরিশের এই পাঠিকা। প্রধানত নতুন পুজো সংখ্যাগুলোই বেশি কেনেন। তবে সূচিপত্র, লেখক ও দাম বুঝে। 

Pujabarshiki Sales
পুরনো পুজোবার্ষিকী ছেড়ে নতুন পুজোবার্ষিকীর দিকে ঝুঁকছেন বহু পাঠক

পুরনো পুজোবার্ষিকী ছেড়ে নতুন পুজোবার্ষিকীর দিকে ঝুঁকছেন পলাশ* ও সৌভিকের* মতো পাঠকরাও। পলাশ ঝাঁ পেশায় কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী ও সৌভিক বোস পেশায় মনোবিদ। দু’জনের বাড়িতেই পুজো সংখ্যা পড়ার চল দীর্ঘদিনের। তবে সময় বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলাচ্ছে রুচি। গত কয়েক বছরে প্রকাশিত নতুন পুজো সংখ্যাগুলো সেই পাল্টে যাওয়া রুচিকে যথাযথ ফুটিয়ে তুলছে বলে বিশ্বাস করে পঁচিশের তরুণ পলাশ। 

অন্যদিকে তিরিশ বছর বয়সি সৌভিকের নতুন পুজোবার্ষিকী বেছে নেওয়ার মূলত তিনটি কারণ। এক, দামের সঙ্গে গুণমানের সামঞ্জস্য রয়েছে। দুই, নতুনদের মধ্যে অনেকেই বেশ ‘প্রমিসিং’ সাহিত্যের বিষয়ে। পাঠকদের কাছে তাঁরা সেরা লেখাটা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিন, পুরনো পুজোবার্ষিকীগুলোয় বছরের পর বছর একই লেখকের দাপট। তাদের অনেকেই হয়তো সেরা লেখাগুলো লিখে ফেলেছেন দশ-বিশ বছর আগে। নতুন লেখকদের প্রতি কিছুটা দুর্বল সৌভিক তাই নতুন প্রকাশকদের পাশে দাঁড়াতেই বেশি আগ্রহী।

কোনও কোনও প্রকাশক অবশ্য বিক্রেতাদের দিকটিও দেখেন। প্রি-বুকিংয়ে নিজে ২৫ শতাংশ ছাড় দিলে, বিক্রেতাদের ৩০ বা ৩৫ শতাংশ ছাড়ে বেচেন। এতে বিক্রেতারা পাঠকদের ২৫ শতাংশ ছাড় দিতে পারেন। ফলে সবারই অল্পবিস্তর লাভ থাকে। 

সৌভিকের মতো পাঠকদের শুভেচ্ছাতেই ‘আনন্দকানন’-এর মতো নতুন পুজোবার্ষিকীর বিক্রি বাড়ছে। অমৃতা সিংহ রায় ও অগ্নীশ্বর সরকারের যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত এই পত্রিকা মাত্র ৫ বছর ছাপা আকারে প্রকাশিত হচ্ছে। অমৃতার কথায়, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বিক্রি বেড়েছিল অনেকটাই। প্রি-বুকিং ফেজ শেষ হলে ২০২৬ সালেও তেমনটাই হবে বলে মনে করেন সম্পাদক। 

পুজোবার্ষিকী বিক্রির জন্য বিক্রেতাদের হাতে সময় থাকে মেরেকেটে দুই থেকে আড়াই মাস। পুজো সংখ্যা বিক্রির ‘স্বর্ণযুগ’ ফিরিয়ে দিতে না পারলেও লোকসানের হাত থেকে অনেকটাই বাঁচায় প্রি-বুকিং। নতুনদের মধ্যে অনেকেই এখন তাই এই পন্থাটি অবলম্বন করেছেন। এতে ক্ষতি এড়িয়ে লাভের অঙ্ক বাড়ানো যাচ্ছে। তবে এই পদ্ধতিতে লাভ হয় মূলত প্রকাশকদের। কারণ অনেক সময় দেখা যায়, তাঁরা পাঠকদের যত ছাড় দেন, বিক্রেতারা তত ছাড়েই বই কেনেন। ফলে বিক্রেতারা সরাসরি পাঠকদের তত ছাড় দিতে পারেন না। 

কোনও কোনও প্রকাশক অবশ্য বিক্রেতাদের দিকটিও দেখেন। প্রি-বুকিংয়ে নিজে ২৫ শতাংশ ছাড় দিলে, বিক্রেতাদের ৩০ বা ৩৫ শতাংশ ছাড়ে বেচেন। এতে বিক্রেতারা পাঠকদের ২৫ শতাংশ ছাড় দিতে পারেন। ফলে সবারই অল্পবিস্তর লাভ থাকে। 

পুজোবার্ষিকীর বিক্রি কমলেও হাল ছাড়তে নারাজ প্রকাশক নীলাভ মণ্ডল*। তাঁর স্পষ্ট কথা, ‘প্রি-বুকিংয়ের অর্ডার বুঝে পত্রিকা ছাপব। দরকারে কম ছাপব।’ বই ভালবেসে প্রকাশনা ব্যবসায় আসা নীলাভর কথায়, ‘শারদীয়ার বিকিকিনিও একরকম পুজোই— বিক্রেতা-প্রকাশকদের পুজো। সব বারের পুজোয় তো সমান আনন্দ হয় না। কোনওবার কম হয়, কোনওবার বেশি।’ পাঠকদের উপর তাই এখনই ভরসা হারিয়ে পুজো সংখ্যা প্রকাশ বন্ধ করছেন না তিনি। 

কোম্পানি পুজোর আগে বোনাস দেবে কি না, জানা নেই। বড়বাজারের শাড়ির দোকানের মধ্যবয়স্ক বাঙালি কর্মচারীটি তাই রাত নটার ট্রেনে বাড়ি ফিরতে ফিরতে শারদীয়ার গল্প-কবিতায় খুঁজে নেন তাঁর পছন্দের বোনাস।

পাঠকদের উপর ভরসা রেখেই কখনও কখনও রাত নটা পর্যন্ত খোলা থাকে কলেজ স্ট্রিটের কিছু ম্যাগাজিন স্টল। প্রেসিডেন্সির মাঠে বসে যে ছেলেটা সন্ধ্যাতারার দিকে চেয়ে গিটার বাজিয়ে আড্ডা দেয়, সে-ও পুজোর আমেজ পেতে ট্রেন ধরার আগে ওই স্টলগুলো থেকে কিনে নেয় পছন্দের পুজোবার্ষিকী। কোম্পানি পুজোর আগে বোনাস দেবে কি না, জানা নেই। বড়বাজারের শাড়ির দোকানের মধ্যবয়স্ক বাঙালি কর্মচারীটি তাই রাত নটার ট্রেনে বাড়ি ফিরতে ফিরতে শারদীয়ার গল্প-কবিতায় খুঁজে নেন তাঁর পছন্দের বোনাস। সেই বোনাসের আশাতেই বছর বছর আশ্বিনের ভিড় নামে বইপাড়ায়। আগের চেয়ে সংখ্যায় স্বল্প হলেও, বাল্বের ওই অল্প আলোতে শারদীয়ার আলো খুঁজে চলেন শারদ সংখ্যার পাঠকেরা।

*নাম প্রকাশে অনিচ্ছুকদের পরিবর্তিত নাম

ছবি – আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Please login to bookmark Close
Picture of সংকেত ধর

সংকেত ধর

বইয়ের প্রতি অগাধ ভালবাসা। প্রিয় ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও প্রিয় বিষয় বাংলার আঞ্চলিক সংস্কৃতি। সাধারণ নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষদের জীবনধারা হয়ে উঠেছে আগ্রহের কেন্দ্র। হিন্দুস্থান টাইমস বাংলা ও এবিপি আনন্দে জীবনযাপন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সাংবাদিক ছিলেন। পড়াশোনা অর্থনীতি নিয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

The Banglalive's Picks

Weekly Newsletter

Enjoy our flagship newsletter as a digest delivered once a week.

By signing up, you agree to our User Agreement and Privacy Policy & Cookie Statement.

Please login to bookmark Close
পুজোয় নতুন জামাকাপড় পাওয়া যতটা আনন্দের, ততটাই একটি শারদীয় পাওয়াও। আমার শৈশবে তা ছিল দেব সাহিত্য কুটিরের পূজাবার্ষিকী। ‘তপোবন’, ‘আলপনা’, ‘মনোবীনা’… কিশোর সাহিত্য সেই প্রথম পড়া হয়তো। লিখতেন সেরা লেখকরা। লীলা মজুমদার, আশাপূর্ণা দেবী তো পড়তামই, আরও কয়েকজনের কথা খুব মনে আছে যেমন, ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্যর বিজ্ঞাননির্ভর গল্প। লিখছেন অমর মিত্র...
Please login to bookmark Close
মহাভারত ও হিন্দু ধর্মের নানা পুরাণ ছাড়াও, বিশ্বের অন্যান্য ধর্ম-পুরাণেও একইভাবে দেখা মেলে ডিমের। কখনও সেই ডিম জন্মের কথা বলে, কখনও বা বলে পুনর্জন্মের কাহিনি। বহু লোকধর্মে ডিম যেমন স্বয়ং দেবতার জন্মদাত্রী। লিখছেন সংকেত ধর...
Please login to bookmark Close
মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরে আমাদের পুরনো পারিবারিক বাড়িটার কথা মনে পড়লেই চোখের সামনে প্রথমে ভেসে ওঠে সকালের নরম রোদ, আর পাড়ার মোড়ের ছোট্ট দোকানটা। জ্যাঠতুতো-খুড়তুতো ভাইবোনেরা মিলে যখনই সেই দোকানের সামনে দিয়ে যেতাম, দেওয়ালে বড় বড় হরফে লেখা একটা লাইন চোখে পড়ত– ‘শাকাহারী আন্ডে’। আর আমরা সবাই হেসে গড়িয়ে পড়তাম। লিখছেন মৌসুমী দত্ত রায়...

Subscribe

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com