(Uttam Soumitra Dwando)
১৯৭৩-এ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ক্লিফোর্ড ওডেটস রচিত ‘দি বিগ নাইফ’ অবলম্বনে রচনা করেন ‘রাজকুমার’ নাটকটি। অভিনেতৃ সংঘ প্রযোজিত নাট্যোৎসব উপলক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে ৪ঠা ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ‘রবীন্দ্র সদন’ মঞ্চে এর প্রথম অভিনয় হয়। নাটক আকারে প্রকাশিত হয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও নির্মাল্য আচার্য সম্পাদিত ‘এক্ষণ’ পত্রিকার একাদশ বর্ষ: ১-২ সংখ্যায় (শারদীয় ১৩৮১, ইংরেজি ১৯৭৪)।
প্রথম মঞ্চাভিনয়ের প্রায় ১০ বছর পরে, ১৯৮৩ সালের ১ অক্টোবর থেকে এই নাটকের ধারাবাহিক অভিনয় শুরু হয় কাশী বিশ্বনাথ মঞ্চে। এখানে বিশেষ প্রণিধানযোগ্য বিষয় হল, এই নাটকের উৎসর্গপত্রে লেখা ছিল ‘বাংলা চলচ্চিত্রের শ্রমিক ও কলাকুশলী বৃন্দকে’।
আরও পড়ুন: বাংলা চলচ্চিত্রের উদ্ভাসিত আলোক ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়
‘রাজকুমার’ নাটকটি বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম সারির নায়ক রাজকুমারকে কেন্দ্র করে। সে জীবনের এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলেছে। আমরা নাটক থেকে জানতে পারি, রাজকুমার একটি হিন্দি ছবি প্রযোজনা করেছিল এক প্রভাবশালী প্রযোজকের টাকা ধার করে। সেই ছবি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। ফলে রাজকুমারের জন্য প্রযোজকের টাকা মেটানো কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। প্রযোজক গোপাল ঘোষ রাজকুমারকে দিয়ে একটা কনট্র্যাক্ট সই করাতে চায়, যা করলে তার দেনার অনেকটাই পরিশোধ হবে। কিন্তু তার বিনিময়ে তাকে নির্বিরোধে একাধিক বস্তাপচা ছবিতে অভিনয় করতে হবে। গন্ডগোল অবশ্য সেটা নয়, কারণ এই কয়েক বছরে রাজকুমার বুঝেছে— ব্যর্থ পরিচালকদের হাতে কথা বলা পুতুল ব্যতীত আর কিছুই নয় সে এখন।
তার স্ত্রী জয়া তাকে মনে করিয়ে দেয়- ‘তোমার ছবি দেখে যে অ্যামেরিকান ছেলেটি তোমাকে লিখেছিল- I found you absolutely beautiful, warm, poignant, real… for you I saw life, and it is to be relished- সে ঠিকই দেখেছিল।’ আমাদের এখানে মনে পড়বে সৌমিত্রের ‘অপুর সংসার’ দেখে এমনই একাধিক বিদেশি তরুণ-তরুণীর উচ্ছ্বাস, তাঁকে লেখা দীর্ঘ চিঠি। পরে সৌমিত্রর ‘স্বগত’ প্রবন্ধে চলচ্চিত্রে অভিনয় নিয়ে অতৃপ্তির কথা যদি পড়ি, তাহলে বুঝব রাজকুমারের অসন্তোষ আসলে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নিজের অসন্তোষ। বারবার তিনি বীতশ্রদ্ধ হচ্ছেন এই শিল্পে। এখানে তাঁর শ্রম কিনে মুনাফা লাভ করছে প্রযোজক। অথচ সেই প্রযোজক তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক শিল্প সম্পর্কে ততটা উদগ্রীব নয়।

রাজকুমারের গন্ডগোলটা রাজনৈতিক। নাটকের সংলাপ-সূত্রে জানা যায়, চলচ্চিত্র শিল্পের শ্রমিক এবং হলের কর্মীদের দীর্ঘ বঞ্চনা করায় বাংলা চলচ্চিত্রে দুর্যোগ নেমে এসেছে। হলের কর্মীরা প্রদর্শনী বন্ধ করে দিয়েছে। ছাত্রজীবনে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা রাজকুমার শ্রমিকদের ধর্মঘটকে প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন করে। আন্দোলনের সপক্ষে টাকা তোলার একটি ফাংশনে অংশ নেয়।
তাই গোপাল ৩ লক্ষ টাকার কন্ট্রাক্ট সই করিয়ে রাজকুমারকে দিয়ে শুধু ছবিই করাবে না। তার উদ্দেশ্য আরও গভীর— সে রাজকুমারকে বলতে বাধ্য করবে যে, হল-শ্রমিকদের এই ধর্মঘটকে রাজকুমার নিন্দা করছে এবং টাকা তোলার ফাংশানে তাকে ঠকিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। রাজনীতির এই খেলা রাজকুমার বুঝতে পারছে, কিন্তু দেনার দায়ে সে দ্বিধাগ্রস্ত। সে জানে প্রযোজকের কনট্র্যাক্ট সই করার শর্ত হল ওয়ার্কারদের ধর্মঘটকে বিশ্বাসঘাতকতা করা।
১৯৬৮ সালের ১৩ এপ্রিল যে পশ্চিমঙ্গ চলচ্চিত্র শিল্প সংরক্ষণ সমিতি (পরে সংরক্ষণ সমিতি নামে খ্যাত) হয়েছিল, তার অ্যাকশন কাউন্সিলে দেখা গেল ৪২ জন সদস্যদের মধ্যে একজনই বাংলা ছবির প্রযোজক-পরিবেশক এবং এদের মধ্যে আবার কিছু বাঙালি ভদ্রলোক ছিলেন, যাঁরা চিত্রগৃহ ও ল্যাবরেটরির মালিক।
তার প্রাইভেট সেক্রেটারি, বিচক্ষণ অতুল রাজকুমারকে বোঝায়- “ছেলেমানুষের মতো কথা বোলো না রাজু। যে strike film-star-এর ভরসায় চলে, তার না চলাই ভাল। ওরা কি তোমায় দেখে strike করেছিল, না তোমায় জিজ্ঞেস করে করেছিল? ওটা কোনও point-ই না।” রাজকুমারের দ্বিধা-বিভক্তিতে এই গুটিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাকে তীব্র আক্রমণ করেছে জয়া। সে রাজকুমারের এই একটু একটু করে পাল্টে যাওয়া দেখে তাকে ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছে।
এ তো গেল নাটকের কথা। বাস্তবে ১৯৬৮ সালে বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশে যে কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছিল, সে সম্পর্কে গবেষক ও প্রাবন্ধিক সুধী প্রধানের আমাদের জানাচ্ছেন- “১৯৬৮ সালের ১২ই মার্চ থেকে সিনেমা শিল্পের সর্বাপেক্ষা সংগঠিত ট্রেড ইউনিয়ন বেঙ্গল মোশন পিকচার্স এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (বিএমপিইইউ) সিনেমা হলের মালিকদের অনমনীয় মনোভাবের বিরুদ্ধে ধর্মঘট ঘোষণা করে।

১৯৬৮ সালের ১৩ এপ্রিল যে পশ্চিমঙ্গ চলচ্চিত্র শিল্প সংরক্ষণ সমিতি (পরে সংরক্ষণ সমিতি নামে খ্যাত) হয়েছিল, তার অ্যাকশন কাউন্সিলে দেখা গেল ৪২ জন সদস্যদের মধ্যে একজনই বাংলা ছবির প্রযোজক-পরিবেশক এবং এদের মধ্যে আবার কিছু বাঙালি ভদ্রলোক ছিলেন, যাঁরা চিত্রগৃহ ও ল্যাবরেটরির মালিক।
স্বভাবতই এরা বাংলা ছবির মুক্তি এবং টিকিট বিক্রয়লব্ধ অর্থবণ্টনের দাবি এই সুযোগে আদায় করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শ্রমিক কর্মচারীদের মদত দিতে চাইলেন না। ফলে সংরক্ষণ সমিতির অন্যতম প্রতিনিধি সংগঠন অভিনেতৃ সংঘ— যারা সিনেমাগৃহের কর্মচারীদের দাবি সম্পূর্ণ সমর্থন করেছিলেন— তাদের সঙ্গে অন্যদের বিরোধ সৃষ্টি হল।
১৯৬৮-তে যখন ধর্মঘট শুরু হল, অভিনেতৃ সঙ্ঘ-এর সভাপতি ছিলেন উত্তমকুমার এবং সম্পাদক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সমস্যাটা বাধল কিছুদিন পর থেকে। তখন ধর্মঘট ১০০ দিনের দিকে গড়াচ্ছে।
অভিনেতৃ সংঘকে অনুষ্ঠান করে ধর্মঘটি শ্রমিকদের ১০,০০০ টাকা অর্থ সাহায্য করতে দেখে এরা বাধা দিলেন। পরিবেশক-প্রযোজকদের প্রভাব খাটিয়ে অভিনেতৃ সংঘ ভেঙে শিল্পী সংসদ তৈরি হল। এছাড়া মালিক পক্ষের চেষ্টায় কলকাতা ও মফস্বলের ৪৫টি সিনেমা গৃহের মালিকরা শিল্পী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অনুপকুমার, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, কলাকুশলী সৌমেন্দু রায়, অনিল চৌধুরী ও অজিত লাহিড়ি সম্পর্কে ঘোষণা করল, যে তাঁরা যে ছবিতে কাজ করবেন, সেই ছবি ওদের চিত্রগৃহে প্রদর্শিত হবে না। সংরক্ষণ সমিতির মধ্যে ফেডারেশনও যুক্ত থাকায় এবং এই সকল ক্রিয়াকর্মে শ্রমিক কলাকুশলী ও শিল্পী ঐক্যকে দৃঢ় করার প্রশ্নকে গুরুত্ব না দেওয়ায় বিরোধ আরও বেড়ে গেল।”
১৯৬৮-তে যখন ধর্মঘট শুরু হল, অভিনেতৃ সঙ্ঘ-এর সভাপতি ছিলেন উত্তমকুমার এবং সম্পাদক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সমস্যাটা বাধল কিছুদিন পর থেকে। তখন ধর্মঘট ১০০ দিনের দিকে গড়াচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ চলচ্চিত্র সংরক্ষণ সমিতি-র নেতৃত্বে ছিলেন অসিত চৌধুরী, দীপচাঁদ কাঙ্কারিয়ার মতো উত্তমকুমারের ঘনিষ্ঠ প্রযোজকেরা। সমিতির সঙ্গে এই ধর্মঘটের কোনও সরাসরি যোগ ছিল না। এই সমিতির মূল দাবি ছিল শহরের তথা রাজ্যের হলগুলোতে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বাংলা ছবি দেখানো, কারণ প্রায় আশি শতাংশ হলে চলত হিন্দি ছবির দাপট। এই নিয়ে প্রযোজক-পরিচালকদের ক্ষোভ ছিল ‘একজিবিটার্স’ বা হল-মালিকদের বিরুদ্ধে।

ফলে গোড়ার দিকে হল কর্মীদের আন্দোলনে সমর্থন ছিল সমিতি এবং অভিনেতৃ সঙ্ঘের, দুয়েরই। কিন্তু হাওয়া বদলে গেল দ্রুত! অভিনেতৃ সঙ্ঘের কার্যকরী সমিতির বৈঠকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুপ কুমাররা ধর্মঘটীদের সমর্থনে সঙ্ঘের তহবিল থেকে ১০,০০০ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এতে আপত্তি করেন বিকাশ রায়, জহর গাঙ্গুলিরা। ক্যালকাটা মুভিটোন স্টুডিও-য় সভা চলছিল। দুপক্ষের বাদানুবাদ চরমে ওঠে, পারস্পরিক দোষারোপও।
পরে উত্তম কুমার পদত্যাগ করেন নিজের অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে এবং শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে গিয়ে স্থাপন করেন শিল্পী সংসদ। শোনা যায় উত্তমকুমার দুঃখিত হয়েছিলেন। কারণ, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তাঁকে ঘিরে রটে যাওয়া কুৎসার প্রত্যক্ষ বিরোধিতা করেননি। উল্টোদিকে, যখন সৌমিত্রকে ব্ল্যাকলিস্ট করা হয়েছিল, তখন উত্তমের কোনও প্রতিক্রিয়া কিন্তু পাওয়া যায় না।
উত্তমকুমার, বিকাশ রায় প্রমুখ এই মুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন। সৌমিত্র, ভানু, অনুপকুমার, কালী ব্যানার্জি প্রমুখ উদ্যোগী হয়েছিলেন যাতে ছবিটি প্রদর্শিত হয় বিজলীতে। এই নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের কোনও বক্তব্য পাওয়া যায় না। আবার এও সত্যি, সত্যজিৎ এই ঘটনার পর আর কখনও উত্তমকে নেওয়ার কথা ভাবেননি।
গন্ডগোল ১৯৬৯ সালেও গড়িয়েছিল। চলচ্চিত্র সংরক্ষণ সমিতি স্থাপনের পর তাদের দাবি ছিল— সেন্সর-এর তারিখের ভিত্তিতে ছবি মুক্তি হবে। আগে চলচ্চিত্র সংরক্ষণ সমিতিতে থাকলেও নানা অপ্রীতিকর ঘটনার পরে এবং হয়তো সমিতির প্রকৃত উদ্দেশ্য অনুধাবন করে বেরিয়ে গিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়, তপন সিংহ, তরুণ মজুমদার, অজয় কর, রাজেন তরফদার ও মৃণাল সেনের মতো নামী পরিচালকরা।
১৯৬৯-এর ৮ই মে মিনার বিজলী ছবিঘরে মুক্তি পায় সত্যজিতের ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’। এতে চেন আটকে যায় বিকাশ রায়ের ‘আরোগ্য নিকেতন’ আর উত্তমকুমারের ‘মন নিয়ে’-র জন্য। ‘আরোগ্য নিকেতন’-এর প্রযোজক অরোরা ফিল্মস-এর দাবি ছিল, তারা ওই ছবি সত্যজিতের ছবির আগে সেন্সর করিয়েছেন। আর ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’-এর প্রযোজকদের যুক্তি, এসব রীতি চালু হবার আগে বিজলী কর্তৃপক্ষ-এর সঙ্গে তাঁদের চুক্তি হয়েছে।

উত্তমকুমার, বিকাশ রায় প্রমুখ এই মুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন। সৌমিত্র, ভানু, অনুপকুমার, কালী ব্যানার্জি প্রমুখ উদ্যোগী হয়েছিলেন যাতে ছবিটি প্রদর্শিত হয় বিজলীতে। এই নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের কোনও বক্তব্য পাওয়া যায় না। আবার এও সত্যি, সত্যজিৎ এই ঘটনার পর আর কখনও উত্তমকে নেওয়ার কথা ভাবেননি।
১৯৬৮-র টালিগঞ্জ পাড়ার অশান্তি, উত্তমকুমারের ‘ছোটি সি মুলাকাত’-এ দেনায় ডুবে যাওয়া, একের পর এক অবান্তর ছবিতে অভিনয় করে যাওয়া (এমনকি বেশ কিছু হিন্দি ছবিতেও সত্তরের দশকের শেষভাগে)— এই দুইকে মেলালে বুঝতে অসুবিধা হয় না সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘রাজকুমার’ নাটকের হিরো রাজকুমার আদতে এক আধারে উত্তমকুমার ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।
ধর্মঘটী শ্রমিকদের সামনে পৌঁছে অরিন্দম বুঝতে পারে তার মতো রূপকথার রাজপুত্রদের বাস্তবের জমিতে অবতীর্ণ হওয়ায় অনেক বাধা আছে। আর আছে বলেই সে যদিও বুঝতে পেরেছে যে, বীরেশের চোখে সে “ছোট হয়ে” গিয়েছে। তাও গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যেতে তার বিবেকে বাঁধেনি।
রাজকুমারের মধ্যে উত্তমের বাংলা ছবিকে একা টেনে নিয়ে যেতে হিন্দি ছবির আকাঙ্ক্ষায় পর্যদুস্ত হওয়া যেমন আছে, তেমনই আবার রয়েছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের তৎকালীন আন্দোলনে অংশগ্রহণের ঘটনা। ভাবতে অবাক লাগে, সেই সময় বসে সৌমিত্র এই নাটক লিখলেন কীভাবে। জানতে ইচ্ছে করে, ১৯৭৩-এ নাটকটি মঞ্চস্থ হওয়ার পর বিভিন্ন মহল থেকে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া ছিল। ঘোষিত কোনও প্রতিবেদনে জানা যায় না উত্তমকুমার এই নাটক দেখেছিলেন বলে। পরে সাধারণ রঙ্গালয়ে এ নাটকের যখন নিয়মিত শো হত, ততদিনে উত্তম মারা গিয়েছেন।
সত্যজিৎ রায় যখন উত্তমকুমারকে নিয়ে ‘নায়ক’ ছবিটি নির্মাণ করেন ১৯৬৬ সালে। তখনও বাংলা ছবির জগতে ১৯৬৮-র এই ফাটলটি দেখা যায়নি। তাই, ১৯৬৮-র পর সত্যজিৎ ‘নায়ক’ তৈরি করলে নায়ক অরিন্দমের অন্তর্লীন দ্বন্দ্বে এই বিভাজন আনতেন কি না জানা নেই। তবে যেখানে রাজকুমার শ্রমিকদের সমাবেশে প্রত্যক্ষ উপস্থিত থেকেছেন: সেখানে সত্যজিতের অরিন্দম, হয়তো উত্তমকুমারের ব্লুপ্রিন্ট মেনেই তার যৌবনের বন্ধু ট্রেড ইউনিয়ন নেতা বীরেশের আহ্বানে সাড়া দিতে পারেনি।

ধর্মঘটী শ্রমিকদের সামনে পৌঁছে অরিন্দম বুঝতে পারে তার মতো রূপকথার রাজপুত্রদের বাস্তবের জমিতে অবতীর্ণ হওয়ায় অনেক বাধা আছে। আর আছে বলেই সে যদিও বুঝতে পেরেছে যে, বীরেশের চোখে সে “ছোট হয়ে” গিয়েছে। তাও গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যেতে তার বিবেকে বাঁধেনি।
সৌমিত্রের রাজকুমার জীবনযুদ্ধের দোলাচলে ভুলে যায়নি তার উত্থানের পথটি। অন্তত তার স্ত্রী জয়া তাকে বারংবার আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। সেখানে সে তার মূক অবস্থানটি ভেবে লজ্জিত হচ্ছে। পুরো নাটকে রাজকুমার নিজের বিবেকের সঙ্গে লড়ে চলেছে। অরিন্দম ভেবেছে, সে বীরেশের চোখে ছোট হয়েছে, রাজকুমারের ট্র্যাজেডি আরও মর্মান্তিক, কারণ রাজকুমার নিজেই নিজের চোখে ছোট হয়ে গিয়েছে নিরন্তর।
ত্যজিতের নায়ক দেবোপম, সর্বাঙ্গসুন্দর। তার ওই এক রাতের ট্রেনযাত্রার আত্ম-উন্মোচনের পরেও। সৌমিত্রের নায়ক ভ্রষ্ট, তার কোনও বহির্মুখী যাত্রা নেই এই পরিত্রাণ থেকে।
সত্যজিতের নায়ক অপরাজিত, নিষ্কলঙ্ক, যদিও তারও উদ্বেগ আছে, আছে হতাশাও। কিন্তু সেটা মূলত তার একাকিত্বের কারণে। ট্রেনের বাথরুমের আয়নায় অরিন্দম নিজের মুখ দেখে থমকে যায়। কিন্তু তার প্রতিটি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার পিছনে পরিচালক একটি যুক্তি খাড়া করে দেন, যার ফলে কখনই নায়ককে দোষ দেওয়া যায় না। মুকুন্দ লাহিড়ী অপমান করেছিলেন বলেই অরিন্দম তাকে সাহায্য করতে পারেনি, নতুন নায়িকা হওয়ার স্বপ্নে প্রমীলা প্রলোভিত করাতেই নায়কের মার্জনীয় স্খলন, প্রথম ছবির মুক্তির টেনশন কাটাতে বন্ধু ও ম্যানেজার জ্যোতির জোরাজুরিতেই মদ্যপানের সঙ্গে প্রথম পরিচিতি।
তাই সত্যজিতের নায়ক দেবোপম, সর্বাঙ্গসুন্দর। তার ওই এক রাতের ট্রেনযাত্রার আত্ম-উন্মোচনের পরেও। সৌমিত্রের নায়ক ভ্রষ্ট, তার কোনও বহির্মুখী যাত্রা নেই এই পরিত্রাণ থেকে। পরেরদিন সকালে ট্রেন যখন দিল্লি পৌঁছল, অরিন্দমের নাকের ডগায় আবার উঠে এসেছে রোদচশমা তার ক্লান্ত চোখ ঢেকে দিয়ে। শুধুমাত্র তার আরোপিত হাসিটি মুখের কোণে ঝুলিয়ে রেখেছে অরিন্দম, যেন সত্যিই কিছু হয়নি, যেন তিনটে দুঃস্বপ্নের মতো এই পুরো ট্রেনযাত্রাটিই অলীক, কাল্পনিক।

অরিন্দমকে ভঙ্গুর মনে হলেও, তার সাফল্যের যাত্রাপথটি আকস্মিক বিপদসংকুল মনে হলেও, ছবির শেষে সে আবার পূর্বকার স্থিতাবস্থায় ফেরত আসতে পারে অনায়াসে। কিন্তু সৌমিত্র রাজকুমারকে স্থানচ্যুত হওয়ার পর পুনরায় কেন্দ্রে স্থাপন করতে অস্বীকার করেন। তাই রাজকুমারের আত্মহত্যা ছাড়া কোনও পথই খোলা থাকে না আর। যে অনিয়মের বিরুদ্ধে রাজকুমারের বিদ্রোহ, সেই বেনিয়মের উদযাপনেই অরিন্দমের আত্মরতির উদ্ভাস।
১৯৬৮-র সেই বিভাজন, যে কারণে উত্তমকুমার অভিনেতৃ সংঘ ছেড়ে গঠন করলেন শিল্পী সংসদ। তার পরেও সৌভাগ্যক্রমে কাজের ক্ষেত্রে দুজনের পেশাদারিত্ব অক্ষুন্ন ছিল। ভাঙনের এক বছরের মাথায় উত্তমকুমার ও সৌমিত্র অভিনয় করলেন তাঁদের দ্বিতীয় যুগ্ম চলচ্চিত্র- ‘অপরিচিত’তে, ১৯৬৯ সালে। দস্তয়েভস্কির ‘দ্য ইডিয়ট’ অবলম্বনে সমরেশ বসুর উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে সলিল দত্তের এই ছবিটি ব্যবসায়িক সাফল্য না পেলেও নিঃসন্দেহে উত্তম-সৌমিত্রের শ্রেষ্ঠ ছবিগুলোর অন্যতম, হয়তো তপন সিংহের ‘ঝিন্দের বন্দি’র পরেই, শৈল্পিক গুণের বিচারে।
অভিনেতৃ সংঘে বরাবরই নানা সমাজসংস্কারমূলক কাজের উদ্দেশ্যে নাট্যোৎসব গঠন করা হত। সত্তরের দশকেই অভিনেতৃ সংঘের জন্য উৎপল দত্ত ‘ক্রুশবিদ্ধ কুবা’ নাটকের প্রয়োগের দায়িত্ব নেন।
বছর তিনেক পর সলিল দত্তই দু’জনকে আবার একত্রে আনলেন ‘স্ত্রী’ ছবিতে, যা সুপারহিট হয়েছিল। ‘অপরিচিত’ এবং ‘স্ত্রী’ দুটোতেই উত্তমকুমার দুর্বিনীত, আক্রমণাত্মক, পাশবিক আর সৌমিত্র কোমল, কিছুটা ভগ্নপ্রবণ, যেন দুর্বলও— অনেকটা বিবেকের মতো। এটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ‘ঝিন্দের বন্দি’তে দুজনের চরিত্রের অভিমুখ সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল, সৌমিত্র ভিলেন, উত্তম নায়ক। ‘অপরিচিত’ এবং ‘স্ত্রী’তেও উত্তমই নায়ক কিন্তু নেতিবাচক ধূসরতা নিয়ে।
অভিনেতৃ সংঘে বরাবরই নানা সমাজসংস্কারমূলক কাজের উদ্দেশ্যে নাট্যোৎসব গঠন করা হত। সত্তরের দশকেই অভিনেতৃ সংঘের জন্য উৎপল দত্ত ‘ক্রুশবিদ্ধ কুবা’ নাটকের প্রয়োগের দায়িত্ব নেন। সে নাটকে প্রায় চল্লিশজনের ওপরে অভিনেতা অভিনেত্রীর দরকার হত। ফলে তা বেশি দিন অভিনয় করা সম্ভব হয়নি। তখন সংঘের সভাপতি হিসেবে সৌমিত্র অ্যান্থনি শ্যাফারের ‘স্লুথ’ নাটককে সম্পূর্ণ বঙ্গীকরণ করে লেখেন ‘টিকটিকি’।

এই নাটকে মাত্র দুজন অভিনেতা তাই ‘ক্রুশবিদ্ধ কুবা’র মতো অসংখ্য চলচ্চিত্র অভিনেতা-অভিনেত্রীর সময় পাওয়ার অসুবিধা ছিল না। দুটি চরিত্রের একটি প্রৌঢ়, আত্মসর্বস্ব, ধর্ষকামী। অন্যটি যুবক, প্রৌঢ়র স্ত্রীর প্রেমিক। মঞ্চে অভিনয় করার কথা ছিল উৎপল দত্তের (প্রৌঢ়) এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের (যুবক), উৎপলের নির্দেশনায়। নানা কারণে সংঘ বা অন্যান্য কয়েকটি সংস্থার থেকে শেষ পর্যন্ত ‘টিকটিকি’র অভিনয় করা সম্ভব হয়নি।
প্রায় বছর কুড়ি পরে স্বপ্নসন্ধানী নাটকের দল নাটকটি মঞ্চস্থ করে ১৯৯৫ সালে। সেই নাটকের নির্দেশনায় ছিলেন সৌমিত্র স্বয়ং। ততদিনে তিনি প্রৌঢ় চরিত্রে, যুবকের ভূমিকায় তরুণ কৌশিক সেন। কিন্তু উল্লেখ্য বিষয়, সত্তরের দশকে নাটক হিসেবে মঞ্চস্থ না হওয়ায় সৌমিত্র এই নাটকের ওপর ভিত্তি করে চলচ্চিত্র পরিচালনার কথা ভেবেছিলেন, উত্তমকুমারকে প্রৌঢ় চরিত্রে, নিজে যুবক চরিত্রে। উত্তম নাটকটি পড়ে সম্ভাব্য চিত্রনাট্যের কথা শুনে উৎসাহিতও হন। তবে মঞ্চে তিন ঘণ্টা থেকে অভিনয় করার ধকল নিতে পারবেন না শারীরিক কারণে, সে কথাও বলেন। বাংলা ছবির দুর্ভাগ্য কোনও প্রযোজক এই প্রকল্পের অভিনব দিকটি দেখতে পেলেন না। গান নেই, নাচ নেই, নায়িকাও অনুপস্থিত, এই বিন্যাসে তাঁরা ছবিতে লগ্নি করতে অস্বীকার করলেন।
‘টিকটিকি’ নাটকটি যখন ১৯৯৫-এ মঞ্চস্থ হয়েছিল, তখন কিন্তু মোটেই অসফল হয়নি। বরং প্রতিটি শো হাউসফুল, চূড়ান্ত সফল প্রযোজনা, নাটকের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা এবং দুই অভিনেতার চূড়ান্ত অভিনয়ের দাপটে।
পরে সৌমিত্র একান্তে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, “যাদের ঘরে উত্তমদার না হোক ১০-১২ সুপারহিট ছবি, আমারও বেশ কয়েকটা, তাঁরাও শুধু লাভ-লোকসানটা দেখলেন। তারা ভাবলেন না, অভিনয়ে উত্তম-সৌমিত্র, এবং সৌমিত্রের নির্দেশনায় প্রথম ছবি, সেটা একটা অভূতপূর্ব, ঐতিহাসিক ছবি হয়ে থাকত। মানছি, ছবিটা হয়তো ব্যবসায়িকভাবে সফল নাও হতে পারত, কিন্তু অসফল ছবি তো তাঁদের হাউসে আগেও হয়েছে। এটা বাণিজ্যিকভাবে ব্যর্থ হবে ধরে নিয়েও তাঁরা একটা রিস্ক নিতে পারতেন।”
‘টিকটিকি’ নাটকটি যখন ১৯৯৫-এ মঞ্চস্থ হয়েছিল, তখন কিন্তু মোটেই অসফল হয়নি। বরং প্রতিটি শো হাউসফুল, চূড়ান্ত সফল প্রযোজনা, নাটকের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা এবং দুই অভিনেতার চূড়ান্ত অভিনয়ের দাপটে। যাঁরা নাটকটি দেখেছেন, তাঁরা হয়তো নির্দ্বিধায় স্বীকার করবেন, চলচ্চিত্রায়িত হলে এই চেম্বার-ড্রামাটি উত্তম-সৌমিত্রের শ্রেষ্ঠ যুগ্ম অভিনয়কীর্তি হিসেবে থেকে যেতে পারত, ‘ঝিন্দের বন্দি’কেও অতিক্রম করে।
১৯৬৮-র পর থেকেই মূলত উত্তমকুমার ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ভক্তদের দুটো শিবির তৈরি হয়। স্বাভাবিক কারণেই উত্তমের ভক্তের সংখ্যা অনেকটাই বেশি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, এত বছর পরেও বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া এবং অন্যান্য গণমাধ্যমেও জারি থাকে দুজনের মধ্যে একজনকে শ্রেষ্ঠ বলার অসভ্য অভ্যেস।
যে দর্শক বোঝে না, অভিনেতার সিদ্ধি পরিচালকের নির্দেশানুসারে অভিনয়ে প্রাণ প্রতিষ্ঠা, পরিচালককে অতিক্রম করে নিজের মতো অভিনয় নয়, সেই দর্শকের কাছে উত্তমকুমার এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, দুজনের অভিনয়ই ব্যর্থ হয়ে যায়। কারণ নিজস্ব মুদ্রাদোষ, অতিব্যবহারে জীর্ণ পরিচ্ছদ দুজনেই তাঁদের অসংখ্য ছবিতে বারবার ব্যবহার করেছেন, বাধ্য হয়েই।
বাংলা চলচ্চিত্র বাস্তবিকই ভাগ্যবান, একই সময়কালে পেয়েছিল তার শ্রেষ্ঠ দুই নটকে বাঙালি পৌরুষের বিভাজিত অস্মিতাকে উচ্চারণ করতে। একজন জীবনকে বিস্তৃত করে প্রেমের ঐশ্বর্য বাঙালির চোখের সামনে মেলে ধরেছিলেন ব্যাপ্তিতে, প্রাপ্তির অনিশ্চয় আকুলতায়।
‘কোনি’র ক্ষিদ্দা, ‘সংসার সীমান্তে’র অঘোর, ‘ঘরে বাইরে’র সন্দীপ বা ‘অভিযান’এর নরসিং উত্তম করতে চাননি তাঁর নায়ক ইমেজ ক্ষুণ্ণ হবে এই আশঙ্কায়, দূরদর্শিতার অভাবে। এই প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই সৌমিত্র লাভবান হয়েছেন, এই চরিত্রগুলো তাঁর সেরা অভিনয়ের অন্যতম। আবার উল্টোদিকে সৌমিত্রের ছেড়ে দেওয়া ‘যদুবংশ’এর গণা-দা হয়তো উত্তমের শ্রেষ্ঠতম অভিনয়, ‘নায়ক’এর অরিন্দমের পাশে অনায়াসে রাখা যায় যাকে।
বাংলা চলচ্চিত্র বাস্তবিকই ভাগ্যবান, একই সময়কালে পেয়েছিল তার শ্রেষ্ঠ দুই নটকে বাঙালি পৌরুষের বিভাজিত অস্মিতাকে উচ্চারণ করতে। একজন জীবনকে বিস্তৃত করে প্রেমের ঐশ্বর্য বাঙালির চোখের সামনে মেলে ধরেছিলেন ব্যাপ্তিতে, প্রাপ্তির অনিশ্চয় আকুলতায়। অন্যজন দীর্ঘ যাত্রাপথে বারবার সাধারণ ভঙ্গিমায় হেঁটে গিয়ে বাঙালির যুবক, প্রৌঢ়, বৃদ্ধ মানসে সম্পৃক্ত হন পরিচিতির নির্মোকে। যেকোনও একজনকে বেছে নিয়ে বাঙালির চলত না, চলেওনি। উত্তম-সৌমিত্র নিজেদের স্ব-স্ব যাপনভূমিকে মেলাতে পেরেছিলেন প্রকাশের মুন্সিয়ানায়, বিম্বিত আলোকের পদচিহ্ন রূপে। বাঙালির সিনেমার ইতিহাসে তাই উত্তমকুমার ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় থেকে যাবেন অভিনয় ব্যাকরণের দ্বন্দ্ব-সমাস হয়ে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত