(Abanindranath Tagore)
“এই খাতাটা অনেকদিন কাছাকাছি রয়েছে। ভাব হয়ে গেল খাতাটার সঙ্গে। কিন্তু এত পৃষ্ঠার লেখা— খাতা, দিই কাকে? আমার ভাব ছোটদের সঙ্গে। থেকে থেকে যারা কাছে এসে, ‘গল্প বলো’ বলে। ছেঁড়া মাদুর নয়তো মাটিতে বসে রাজা রানী বাদশার গল্প শোনে আর উপহারে দিয়ে যায়,— না না কোন মানপত্র নয়, সোনার পদকও নয়। উপহার দেয়, একটু হাসি কিংবা একটু কান্না কিংবা ঘুমে ঢোলা চোখের চাহনি।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পত্র অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ কথাগুলো লিখে গেছেন তাঁর ‘আপন কথা’ বইটির প্রথম অধ্যায় ‘মনের কথা’য়। অবন ঠাকুরের জন্ম ৭ আগস্ট ১৮৭১, জন্মাষ্টমীর এক পুণ্য তিথিতে, জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে। চিত্রশিল্পী হিসেবে খ্যাতি বিশ্বজোড়া হলেও, তাঁর সাহিত্য প্রতিভা ছিল অসাধারণ। কলমে ছিল আশ্চর্য নেশা ধরানো ভাষা, যার ফলে শব্দ হয়ে উঠত ছবি, আর ছবিগুলি কবিতা। তাঁর ‘আপন কথা’ বইয়ের ‘সাইক্লোন’-এ রোদকে নিয়ে যে কী সুন্দর একটি বর্ণনা দিয়ে গেছেন!
আরও পড়ুন: মিথ্যের বেসাতি না নারী-ইচ্ছার স্বীকৃতি?
“কোনদিন রোদ হঠাৎ আসে খোলা জানালা দিয়ে সক্কালেই। তক্তপোষের কোণে বসে থাকে সে। মানুষ বিছানা ছেড়ে গেলেই, তাড়াতাড়ি রোদটা গড়িয়ে নেয় বালিশে তোষকে চাদরে, আমার খাটে। তারপর চট করে, ধরা পড়ার ভয়ে, রোদ বিছানা ছেড়ে দেয়াল বেয়ে উঠে পড়ে কড়িকাঠে।”
অবনীন্দ্রনাথ যে সময় জন্মেছিলেন, তখন আরব্য উপন্যাসের দিন শেষ। বঙ্কিম যুগের সবে সূচনা। সেসময় পথে পথে শোনা যেত বরফওলার হাঁক, ফুলমালির ডাক। বাড়িতে তখনও বসেনি জলের কল। রাস্তার কল থেকে জল চামড়ার মশকে ভরে নিত ভিস্তিওলারা। উত্তরের জানলার খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে অবনীন্দ্রনাথ দেখতেন মানুষের জীবনের এক-একটি অংক। দেখতে দেখতেই কখন যেন সেই দুর্লভ বাল্যস্মৃতিকে রূপকথার মোড়কে পুরে তিনি আমাদেরকে উপহার দিলেন ‘আপন কথা’।

তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে ‘ক্ষীরের পুতুল’, ‘রাজকাহিনী’, ‘নালক’, ‘বুড়ো আংলা’, ‘আলোর ফুলকি’ এবং ‘ভূতপত্রীর দেশ’। আসলে এক চিরকিশোর গুটিসুটি মেরে বসে থাকত তাঁর মনের ভেতরে। দ্বিতীয় কন্যা করুণা অকালে চলে যাওয়ার পর তাঁর শিশু দৌহিত্ররাই হয়ে উঠল বুকের পাঁজর। তাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ‘নাতিবাবু’ মোহনলাল ছিল তাঁর নয়নের মণি। এ ছেলের যেমন সৌম্যকান্তি রূপ, তেমনি মিষ্টি স্বভাব। দাদামশায়ের সর্বক্ষণের সঙ্গী সে। অবনীন্দ্রনাথ তাকে হৃদয় নিঙড়ানো ভালবাসা দিয়ে ঘিরে রাখতেন সবসময়। এক মুহূর্তের জন্যও যেন চোখের আড়াল না হয়।
একদিন মোহনলালের বাই উঠল, সে এক বিরাট গল্পকার হবে। অতএব, ‘দাদামশাই, উপায় বাতলে দাও, কীভাবে লেখক হওয়া যায়? প্লট আসবে কোত্থেকে?’ অবনীন্দ্রনাথ যেন সবেতেই তার মুশকিল আসান। ভুরি ভুরি সমাধান তাঁর কাছে প্রস্তুত। বললেন, ‘দূর, এর জন্য ভাবনা? রাতভর যে স্বপ্ন দেখিস, সকালে উঠে মনে করে করে তা লিখে ফেল, ব্যস, আস্ত এক গল্প রেডি।’
আসলে রঙের অপচয় তিনি মোটে সহ্য করতে পারতেন না। বলতেন, ‘রঙের দাম যে বোঝে না, তার হাতে তুলি মানায় না’। এই তুলি নিয়েও একদিন জোর গোল বাঁধল নাতির সঙ্গে। মোহনলালের ধারণা, ‘আগে তুলি, পরে শিল্পী। তুলিই যদি আবিষ্কৃত না হত, আর্টিস্ট জন্মাতই না’।
ওমা! স্বপ্ন দিয়ে গল্প! প্রথমে যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না। তারপর সব বাচ্চাকাচ্চারা মিলে মেতে উঠল সেই অভিনব গল্প লেখার উৎসবে। কিছুদিন যেতে না যেতেই তাদের মধ্যে আবার নতুন নেশা তৈরি হয়েছে। তারাও ছবি আঁকবে। তা আঁকো না, কে বাধা দিচ্ছে!
শুরু হল খেয়ালখুশির আঁকা। কিন্তু সে আঁকার সরঞ্জাম দেখলে চক্ষু চড়কগাছ হয়। চাঁদনি থেকে আসছে নানা ধরনের রঙের বাক্স। ফুরোচ্ছে, আসছে, আসছে তো আসছেই। জলে গুলে রং দুদিনেই শেষ। ওদিকে অবনীন্দ্রনাথ যে এত ছবি আঁকেন, তাঁর বাক্সের রং যেন আর ফুরোয়ই না। উনি নিজেই ওই রঙের বাক্সকে বলতেন, ‘অক্ষয় তৃণ’।
আসলে রঙের অপচয় তিনি মোটে সহ্য করতে পারতেন না। বলতেন, ‘রঙের দাম যে বোঝে না, তার হাতে তুলি মানায় না’। এই তুলি নিয়েও একদিন জোর গোল বাঁধল নাতির সঙ্গে। মোহনলালের ধারণা, ‘আগে তুলি, পরে শিল্পী। তুলিই যদি আবিষ্কৃত না হত, আর্টিস্ট জন্মাতই না’।
‘যাব্বাবা! কেন?’ দাদামশায়ের প্রতিবাদ। ‘তুলি না থাকলে কলম দিয়ে আঁকতুম, পেনসিল দিয়ে লিখতুম।’
কেউ ছাড়বার পাত্র নয়। শেষে গাছের ডাল, পাখির পালক সব যখন ফুরিয়ে গেল, তখন তিনি নিজের ডান হাতের পাঁচটা আঙুল দেখিয়ে বললেন, ‘কিছুই যদি না থাকত, তা হলেও এই আঙুল কটা দিয়ে দেগে চলতুম। ছবি আঁকা কখনও বন্ধ হয় রে? ভিতর থেকে এক অদ্ভুত তাগিদই আমাকে দিয়ে আঁকিয়ে নিত।
মোহনলালের কচি গলা যুক্তি সাজায়, ‘যদি কলম, পেনসিলও না থাকত, তখন? উ!’
‘খড়িমাটি দিয়ে আঁকতুম।’
‘খড়িমাটি না থাকলে?’
‘এটা দিয়ে। এটা না থাকলে ওটা দিয়ে।’
চলল কথার লড়াই। কেউ ছাড়বার পাত্র নয়। শেষে গাছের ডাল, পাখির পালক সব যখন ফুরিয়ে গেল, তখন তিনি নিজের ডান হাতের পাঁচটা আঙুল দেখিয়ে বললেন, ‘কিছুই যদি না থাকত, তা হলেও এই আঙুল কটা দিয়ে দেগে চলতুম। ছবি আঁকা কখনও বন্ধ হয় রে? ভিতর থেকে এক অদ্ভুত তাগিদই আমাকে দিয়ে আঁকিয়ে নিত। হাত যখন ছিষ্টি হয়েছে, ছবিও ছিষ্টি হবে। আগে যন্ত্র, তারপর কারিগর, এ ধারণা ভুল।’

বলতে বলতেই তাঁর চোখ গেল বাগানের দিকে। মালিরা আগের দিন কাঠকুটো জ্বালিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে হুকুম, ‘কয়েকটা পোড়া কাঠি নিয়ে আয় দেখি’। যেন আঁকা হয় কীসে, তা তিনি এইমাত্র বুঝিয়েই ছাড়বেন সবাইকে। কুচোগুলো হইহই করে আধপোড়া কয়েকটা কাঠকয়লাও নিয়ে ফিরল। এবার দেখা যাক ছবির কেরামতি।
বটে! দাদামশাইও যেন মনে মনে বললেন, ‘দেখ তবে’। ওই কাঠকয়লা দিয়েই শুরু হল আঁকজোক একটা টুকরো কাগজের উপর। কিছুক্ষণের মধ্যেই এক চমৎকার ছবির সৃষ্টি হল। কচিগুলো দেখে আর ভাবে, ওই পোড়া কয়লার আঁচড়ে তৈরি এ ছবি টিকবে কতক্ষণ? সবার মন খুঁতখুঁত করছে। তিনি চুপ।
সত্যিই তো! রোদে শুকোতেই কী অসাধারণ এক ছবি ফুটে উঠেছে! অবনীন্দ্রনাথ হাসেন আর বলেন, ‘আঙুলের কাছে কি কিছু লাগে রে?’
মুচকি মুচকি হাসেন আর আঁক কাটেন। তারপর সব শেষ হলে, কাগজের টুকরোখানি নিয়ে চললেন জলে চোবাতে। সবাই অবাক। অর্ধেকই তো ধুয়ে মুছে যাবে।
দাদামশায় অবিচল। ভেজা কাগজটাকে একটু শুকোতে সময় দিলেন। তারপর পোড়া কাঠের রেখার উপর দিলেন আঙুলের ঘষা। এরকম অদ্ভুত প্রক্রিয়ায় শিল্পকর্ম, আগে যেন কেউ দেখেনি। বিস্ফোরিত চোখে সবাই দেখে চলেছে। ছবিতে নতুন রেখা পড়ছে, তার উপর পড়ছে আঙুলের ঘর্ষণ, তার উপর জলের প্রলেপ। তারপর আবার…
সকাল পেরিয়ে দুপুর গড়ায়। দাদামশায় একসময় ক্ষান্ত হন। নাতিকে বলেন, ‘নে এবার কটকটে রোদের তাপে শুকিয়ে নিয়ে আয়। তারপর ছবির চেহারা দেখ।’
সত্যিই তো! রোদে শুকোতেই কী অসাধারণ এক ছবি ফুটে উঠেছে! অবনীন্দ্রনাথ হাসেন আর বলেন, ‘আঙুলের কাছে কি কিছু লাগে রে?’

তাঁর একটা পুরনো বাক্স ছিল। সেখানে জমানো থাকত যত রাজ্যের চারকোল, খড়িমাটি, গেরিমাটি। সকলের কাছে ওগুলো তুচ্ছ জিনিস হলেও, দারুণ দারুণ সব ছবি তৈরি হত ওই দিয়ে। একবার তো টুথব্রাশ দিয়েও তিনি একটা ছবি এঁকে ফেললেন। কে বলবে ওই ছবি, নামী দোকানের তুলি দিয়ে তৈরি নয়। আসলে তাঁর মনের মধ্যেই একটা আস্ত ছবিঘর ছিল। তাই ছবি তৈরি করতে হাতিয়ারের চাইতে তিনি হাত আর মনের ওপর বেশি নির্ভর করতেন।
তাছাড়া ভাঙা, ফেলে দেওয়া জিনিসের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ ছিল অগাধ। জোড়াসাঁকোর দক্ষিণের বারান্দায় যে চৌকিতে বসে আঁকতেন, তার ডান পাশেই থাকত একটা ডেস্ক, আর সেই ডেস্কের ওপরের দিকে ছিল অজস্র খোপ। সেগুলো তো শুধু খোপ নয়, একেকটা খনি যেন। কী না মিলত তার মধ্যে? টুকরো টাকরা নুড়ি পাথর, বেলোয়ারি কাচের তৈরি ভাঙা বাতিদানের অংশ, পাথরের ভাঙা রেকাবি, ফেলে দেওয়া কলমের নিব। আসলে যা সাধারণের চোখে মূল্যহীন, শুধুই একখণ্ড পাথর, তা তাঁর চোখে অমূল্য হিরে কুচি।
অবন ঠাকুরের ফুর্তি দেখে কে। রেকাবির ভাঙা টুকরোগুলো নিয়েই বসে পড়লেন ট্রিটমেন্টে। তাঁর জহুরির দৃষ্টিতে কিছু ধরা পড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে হালকা ছেনির ঘা পড়ল ওই পাথরের গায়ে।
ওঁর আর এক অন্যতম শখের শিল্পের নাম ‘কুটুম কাটাম’। কাঠি-কুটি, ডালপালা সাজিয়ে তৈরি হত এই ‘কুটুম কাটাম’। বলতেন, ‘এরা আমার সব কুটুম’। কুটুম কাটামের প্রধান ধর্মই হল ডালই হোক কিংবা শিকড়, পাথর বা নিদেন পক্ষে একটা ঢেলা, তার থেকে কুঁদে কিছু বার করা চলবে না। শুধু যেখানে যা অবান্তর, তাকে কেটে বাদ দিয়ে ন্যুনতম ভাঙচুরের মধ্যে দিয়ে বা খানিকটা চেঁছে আসল রূপটা বার করে আনতে হবে। এভাবেই ভাঙা জিনিস দিয়ে তিনি যে কত পুতুল গড়েছেন। গাছের শিকড় থেকেও একবার তিনি গড়ে তুললেন একখানা কুকুর। কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে থাকত তাঁর পায়ের কাছে।

একবার তাঁর স্ত্রী সুহাসিনী দেবীর হাত ফসকে একটা সাদা রংয়ের পাথরের রেকাবি পড়ে ভেঙে গেল। সুহাসিনী দেবী তো দুঃখে ভেঙে পড়েছেন। পুরনো দিনের দামি রেকাবি, ভারি প্রিয় ছিল তাঁর! কিন্তু অবন ঠাকুরের ফুর্তি দেখে কে। রেকাবির ভাঙা টুকরোগুলো নিয়েই বসে পড়লেন ট্রিটমেন্টে। তাঁর জহুরির দৃষ্টিতে কিছু ধরা পড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে হালকা ছেনির ঘা পড়ল ওই পাথরের গায়ে।
এরপরেই সবাই হতবাক। একটা সুন্দর গড়নের মেয়ের আকৃতি বেরিয়ে আসছে যে! কাজ তখনও শেষ হয়নি। ছেনির শেষ ঘা পড়া বাকি। আর সেটা হওয়ার পরই তা হয়ে উঠল একটা ছবি। পাথরে কাটা মনোহর এক মূর্তি। এই ছিলেন আমাদের অবন ঠাকুর। সাক্ষাৎ এক শিল্পমন্দিরের কারিগর যেন!
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত