(Ong Bong Chong 11)
সত্যজিতের ঘরে-বাইরে ছবিতে সন্দীপ আর নিখিলেশ মুখোমুখি। সন্দীপ তো রবীন্দ্রনাথের দেশ ভাবনার বিপরীত জগতের বাসিন্দা। দেশ বলতে ও গঠনমূলক স্বাদেশিকতা বলতে রবীন্দ্রনাথ যা বোঝেন, অন্তত পরিণত রবীন্দ্রনাথ ১৯১০ সালের পর যা বোঝেন, তার সঙ্গে সন্দীপের ভাবনা মেলে না। তবু সত্যজিৎ নিখিলেশের বিপরীতে সন্দীপকে রাখার সময় সন্দীপের গলাতে রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ পর্যায়ের গান ব্যবহার করলেন। এ যেন সত্যজিৎ রবীন্দ্রনাথের বিপক্ষে রবীন্দ্রনাথকেই রাখছেন। নিখিলেশ তো রবীন্দ্রকল্প চরিত্র, তারই বিপরীতে আছে সন্দীপ। একে কী বলব আমরা? রবীন্দ্রনাথের বিপক্ষে রবীন্দ্রনাথ? সত্যজিৎ কি তাই চাইছেন?
আরও পড়ুন: অংবংচং ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০
রবীন্দ্রনাথ নিজেই তো করেছিলেন এ-কাজ। নিজের উপন্যাসে নিয়ে এসেছিলেন একজনকে, যে রবীন্দ্র-বিরোধী কবি। ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে অমিত নিবারণ চক্রবর্তীকে খাড়া করল। রবীন্দ্রনাথের লেখা উপন্যাসেই শোনা গেল রবীন্দ্র-বিরোধী স্বর। অমিত রবি ঠাকুরের বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগ করেছিল। একটি দীর্ঘজীবন বিষয়ক, অন্যটি লেখার শৈলী বিষয়ক।

অমিত বলে, ‘রবি ঠাকুরের বিরুদ্ধে সব চেয়ে বড়ো নালিশ এই যে, বুড়ো ওঅর্ডওঅর্থের নকল করে ভদ্রলোক অতি অন্যায়রকম বেঁচে আছে। যম বাতি নিবিয়ে দেবার জন্যে থেকে থেকে ফরাশ পাঠায়, তবু লোকটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও চৌকির হাতা আঁকড়িয়ে থাকে। ও যদি মানে মানে নিজেই সরে না পড়ে, আমাদের কর্তব্য ওর সভা ছেড়ে দল বেঁধে উঠে আসা।’
রবি ঠাকুরের বয়স হয়েছে। তাঁর দিন গিয়েছে। সময় ফুরিয়েছে। মেনে নিতে হবে। ছেড়ে দিতে হবে আসন। আর কদ্দিন?

দ্বিতীয় অভিযোগ, ‘রবি ঠাকুর সম্বন্ধে আমার দ্বিতীয় বক্তব্য এই যে, তাঁর রচনারেখা তাঁরই হাতের অক্ষরের মতো– গোল বা তরঙ্গরেখা, গোলাপ বা নারীর মুখ বা চাঁদের ধরনে। ওটা প্রিমিটিভ; প্রকৃতির হাতের অক্ষরের মকশো-করা। নতুন প্রেসিডেন্টের কাছে চাই কড়া লাইনের, খাড়া লাইনের রচনা– তীরের মতো, বর্শার ফলার মতো, কাঁটার মতো; ফুলের মতো নয়, বিদ্যুতের রেখার মতো। ন্যুর্যালজিয়ার ব্যথার মতো।’
রবি ঠাকুরের বিপক্ষ হিসেবে অমিত সভায় পড়ে শুনিয়েছিল নিবারণ চক্রবর্তীর কবিতা। রবীন্দ্রনাথ এই যে তাঁর বিপক্ষে অমিতকে খাড়া করলেন নিবারণ চক্রবর্তীসহ, এ যেন এক রণকৌশল। আধুনিক রবীন্দ্র-বিরোধী কবিরা যা বলছেন, সেই কথাগুলিকে আত্মস্থ করে নিজের লেখায় নিজেকে ভাঙার জন্য সাহস লাগে। তবে ভাঙতে পারলে আরও কিছুদিন হয়তো নবীনের মনোযোগ আকর্ষণ করা যায়। নতুনরা, তরুণরা তাঁর লেখা সম্বন্ধে কী বলছে, সে বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের আগ্রহের অবধি ছিল না। তাই প্ল্যানচেটে যাঁদের তিনি আহ্বান করতেন, তাঁদের জিজ্ঞাসা করতেন নিজের লেখালিখি সম্বন্ধে নানা প্রশ্ন।

এই দুর্বলতাকে ঢাকতে নিজেকে ভাঙার সাহস দেখালেন। নিজের বিপক্ষে নিজের লেখায় যে প্রতিপক্ষতা, তা যেন নিজেকে গড়ার জন্য ভাঙা, আরও কিছুদিন কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার কৌশল। এর থেকেও কিন্তু আরও অন্যরকম প্রতিপক্ষতা নিজের সঙ্গে নিজে করেছেন তিনি। যেমন আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছেন নিজের মুখের ধাঁচ বদলে দিয়ে। যে ফকির সুলভ চেহারা তাঁর, তা ভেঙে নানাভাবে নিজের মুখ দেখছেন দেখাচ্ছেন। তাছাড়া, আবার অনেক সময় আগের কথা পরে শুধরে নিচ্ছেন তিনি, একরকমের ভাবনা একসময় ভাবতেন, পরে বদলে গেল। আগের রবীন্দ্রনাথ পরের রবীন্দ্রনাথে রূপান্তরিত। এই রূপান্তরকে যদি কেউ স্বীকার না করেন?
ধরা যাক, কোনও পাঠক হিন্দুমেলা পর্বের রবীন্দ্রনাথের দেশের প্রতি আকুতিকে তুলে ধরে বললেন, এই ছিল রবীন্দ্রনাথের দেশভাবনা তাহলে কি তা মানা যাবে? যাবে না। আগের রবীন্দ্রনাথ পরে বদলে গেছেন। আগের রবীন্দ্রনাথ ঠিক পরের রবীন্দ্রনাথের প্রতিপক্ষ নন। তবু প্রতিপক্ষ। অন্তত এই চিন্তা থেকেই তো সত্যজিৎ সন্দীপের গলায় রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ পর্যায়ের গান বসালেন। স্বদেশি আন্দোলনে বঙ্গভঙ্গের সময় যা ভাবতেন রবীন্দ্রনাথ, পরে আর তা ভাবছেন না।

এই রূপান্তর যে হয়, সেই ভাবনা থেকেই তো গোরা উপন্যাস। সেখানে গোরা হিন্দুধর্ম নিয়ে প্রথমে যা ভাবত আর পরে যা ভাবত, দুয়ের চেহারা এক নয়। প্রথম গোরা পরের গোরার প্রতিপক্ষ। তবে প্রতিপক্ষতা নেই, কারণ আগের গোরা পরের গোরায় বদলে গিয়ে মিশে গেল। তবু যদি কেউ বলেন আগের গোরাই তাঁর কাছে রবীন্দ্রনাথের গোরা তাহলে তিনি প্রতিপক্ষতা করছেন, পরের রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। পরিণত রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আগের রবীন্দ্রনাথের তিনি লড়াই বাঁধিয়ে দিচ্ছেন।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের টানাপড়েন, নিজেকে ভাঙেন, গড়েন, কৌশলে আলোচনার কেন্দ্রে রাখেন আবার নিজের মতকে সংশোধন করেন, এটাই তো সচলতার চিহ্ন। এই সচলতা সামাজিক বহুত্বের ধারক।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ভাষা বিচ্ছেদ’ প্রবন্ধে অহমিয়া আর ওড়িয়াকে বাংলার উপভাষা বলে সেই দুই ভাষার অধিকার হরণ করতে চেয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই এই দুই ভাষার মানুষেরা বিরক্ত ও প্রতিবাদী। রবীন্দ্রনাথকে নিজের মতো বদলাতে হল। বুঝে শুনেই ভুল স্বীকার করলেন। ভাষার অধিকার ত্যাগ করার দরকার নেই। ভারতবর্ষ বহুভাষার দেশ। তার একত্ব এই বহুভাষিকতাকে স্বীকার করেই জেগে উঠেছে। নিজেই তো রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্ষীয় বহুত্বকে স্বীকার করেছেন ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ নামের লেখায়। তাহলে!
এই যে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের টানাপড়েন, নিজেকে ভাঙেন, গড়েন, কৌশলে আলোচনার কেন্দ্রে রাখেন আবার নিজের মতকে সংশোধন করেন, এটাই তো সচলতার চিহ্ন। এই সচলতা সামাজিক বহুত্বের ধারক। রবীন্দ্রনাথ পথ চলতে জানতেন। মানুষের ধর্মই যে পথচলা নিজেকে ভাঙতে ভাঙতে, বদলাতে বদলাতে এগিয়ে যাওয়া, তা জীবনের শেষের দিকে এসে ‘মানুষের ধর্ম’-এ জানিয়েছিলেন।

আমরা অবশ্য নিজেদের সঙ্গে নিজেদের এইভাবে প্রতিপক্ষতার ও রূপান্তরের সূত্রে সম্পর্কিত করি না। বাঙালি আজকাল ঘন ঘন বদলায়। এই এক রং তো ওই আরেক। এই বহুরূপীপনা এক আশ্চর্য সার্কাস। নিজেদের ভেতরের স্বার্থই সেখানে বড়। কী করলে একটু সুবিধে হয়, সেই জন্য বদল। নিজের সঙ্গে নিজের এ প্রতিপক্ষতার সম্পর্ক নয়, এ হল সুবিধেবাদ। ভিখিরির মতো নিজেকে ক্ষমতার অনুগ্রহে অনুগৃহীত করার জন্য আজ এই তো কাল এই। এই ভিখিরিপনা বাঙালিকে রিক্ত করেছে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত