(Bhadra Mas)
‘এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর।/ এ ভরা বাদর মাহ ভাদর/ শূন্য মন্দির মোর।।’ বিদ্যাপতির ‘মাথুর’ পর্যায়ের এই অলোকসামান্য পদে সুরারোপ করার সময় রবীন্দ্রনাথ প্রথম পঙক্তি এবং দ্বিতীয় পঙক্তির শুরুর ‘এ’ শব্দটি বাদ দিলেন কি এ কারণেই, যে ‘মাহ ভাদর’-এর পরিচয় লুকিয়ে রয়েছে ‘ভরা বাদর’-এর মধ্যে, যা রাধার বিরহ যন্ত্রণার দুঃখকাতরতাকে আরও বেশি ব্যঞ্জনামণ্ডিত করে তোলে!

এই সুরারোপের অনেক আগে ১৩০০ বঙ্গাব্দের ২৭ আষাঢ় শাহজাদপুরে অবস্থানকালে কবি ‘ভরা ভাদরে’ কবিতায় লিখেছিলেন— ‘নদী ভরা কূলে কূলে, খেতে ভরা ধান।/ আমি ভাবিতেছি বসে কী গাহিব গান।/…কানায় কানায় পূর্ণ আমার পরান।/…দোয়েল দুলায়ে শাখা/ গাহিছে অমৃতমাখা,/ নিভৃত পাতায় ঢাকা/ কপোতযুগল।/ আমারে সকলে মিলে করেছে বিকল।’
আরও পড়ুন: পুরানো সেই কাপের কথা
আসলে ভরা ভাদ্রের বাতাবরণে লুকিয়ে থাকে কেমন একটা বিরহজনিত বিষাদ, যা কবিহৃদয়কে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে, সে তিনি যে যুগের কবিই হোন না কেন। ভাদ্র পূর্ণ অথচ একই সঙ্গে বিষণ্ণ। ভাদ্রের মধ্যে খেলা করে ভরা জোয়ার, কিন্তু মরা ভাটার টানকেও সে অস্বীকার করতে পারে না। ‘ভরা বাদরে’ অবগাহন করার পরও তার বদনাম ‘পচা ভাদ্র’ হিসাবে।
ঘন বারিধারায় সিক্ত হলেও শীতলতা নয়, লোকে তার উপর বিরক্ত ঘর্মাক্ত প্যাচপ্যাচে ভ্যাপসা গরমের জন্য। অথচ ভাদ্রে শরৎকালের সূচনা, সেই শরৎ, ‘অরুণ আলোর অঞ্জলি’ নিয়ে যার আগমন, যে শরতে ‘মোতিয়া মেঘের চামর পিঁজে পায়রা ফেরে আলোয় ভিজে’ এবং ‘শিশির-কণায় মানিক ঘনায়, দূর্বাদলে দীপ জ্বলে!’ শরৎপ্রকৃতির মধ্যে বিরাজ করে প্রাণ-চাঞ্চল্য এবং সুরলহরী, কারণ ‘ফিরছে ফিঙে দুলিয়ে ফিতে, বোল ধরেছে বুলবুলিতে!/ গুঞ্জনে আর কূজন-গীতে হর্ষে ভুবন হরবোলা!’
শরৎ শুরুর ভাদ্রের বড় সুন্দর বর্ণনা পাওয়া যায় সুনির্মল বসুর ‘ভোরাই’ কবিতায়। ‘বর্ষার ঝুপঝাপ/ থামলো রে থামলো,/ আলোকের নির্ঝর/ ঝরঝর নামলো।’; ‘কাশ-বুড়ো দুল্ দুল্/ দোল খায় ক্ষেত্রে,/ বুলবুল গায় গান/ ঢুল্ ঢুল্ নেত্রে।’; ‘হিন্দোলে দোল খায়।/ গাছপালা ঐ রে,/ খাল-বিল বিলকুল/ জল-থৈ-থৈ রে।’; ‘ঐ এলো ঐ এলো/ শরতের রোদ্দুর—/ বাদলের সাড়া নেই,/ আজ তারা কদ্দুর?’ পুরো কবিতাজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এমন মণিমুক্ত।
১৩১৫ বঙ্গাব্দের ৩রা ভাদ্র একই সুরে গান বেঁধেছেন রবীন্দ্রনাথও— ‘আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা—/ নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে সাজিয়ে এনেছি ডালা।।/ এসো গো শারদলক্ষ্মী, তোমার শুভ্র মেঘের রথে,/এসো নির্মল নীলপথে,/ এসো ধৌত শ্যামল আলো-ঝলমল বনগিরিপর্বতে—/ এসো মুকুটে পরিয়া শ্বেতশতদল শীতল-শিশির-ঢালা।।’ কবিকঙ্কণের ফুল্লরার মধ্যে অবশ্য ভাদ্র নিয়ে কোনও আবেগের আতিশয্য নেই, সে তার বারমাস্যায় সরাসরি জানাচ্ছে— ‘ভাদ্রপদ মাসে বড়ো দুরন্ত বাদল।/ নদনদী একাকার আট দিকে জল।।’
বাংলা সাহিত্যে তালনবমীকে অমর করে রেখেছেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পের মূল প্রসঙ্গ দূরে সরিয়ে রেখে শুধু ভাদ্রের অসামান্য চিত্ররূপ হিসাবেও ‘তালনবমী’ অনবদ্য। গল্পের শুরুই হয় ভাদ্রের তানে— ‘ঝমঝম বর্ষা। ভাদ্র মাসের দিন।‘
পূর্ব ভাদ্রপদ নক্ষত্র থেকে বাংলা সনের পঞ্চম মাস ভাদ্রের নামটি এসেছে। এই মাসের পূর্ণিমার দিন চাঁদ পূর্ব ভাদ্রপদ নক্ষত্রের কাছাকাছি অবস্থান করে বলেই এর নাম ভাদ্রপদ। হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে, এটি চারটি পবিত্র মাসের অন্যতম। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, দ্বাপর যুগে ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে রোহিণী নক্ষত্রের যোগে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের জন্য মথুরায় কংসের কারাগারে মাতা দেবকী ও পিতা বসুদেবের অষ্টম সন্তানরূপে জন্মগ্রহণ করেন বিষ্ণুর অষ্টম অবতার স্বয়ং ভগবান তথা ‘পূর্ণাবতার’ শ্রীকৃষ্ণ। শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি জন্মাষ্টমী ছাড়াও এই মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থীতে পালিত হয় গণেশ চতুর্থী।

ভাদ্রমাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে রাধাষ্টমীর পরের দিন পালিত হয় হিন্দু সনাতন ধর্মের একটি বিশেষ ব্রত তালনবমী। গ্রামীণ বাংলার এই অত্যন্ত জনপ্রিয় লোক উৎসবে ভাদ্রের ফল তালের খাদ্যগুণ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সমন্বয় ঘটতে দেখা যায়। তালনবমীতে তালুজা অর্থাৎ দেবী দুর্গা বা লক্ষ্মী-নারায়ণের পুজো করা হয় তালফল বা তালের তৈরি তালফুলুরি ও তালপিঠের মতো বিভিন্ন উপাদেয় পদ দিয়ে।
বাংলা সাহিত্যে তালনবমীকে অমর করে রেখেছেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পের মূল প্রসঙ্গ দূরে সরিয়ে রেখে শুধু ভাদ্রের অসামান্য চিত্ররূপ হিসাবেও ‘তালনবমী’ অনবদ্য। গল্পের শুরুই হয় ভাদ্রের তানে— ‘ঝমঝম বর্ষা। ভাদ্র মাসের দিন। আজ দিন পনেরো ধরে বর্ষা নেমেছে, তার আর বিরামও নেই, বিশ্রামও নেই।…ভাদ্রের শেষে আউশ ধান চাষিদের ঘরে উঠলে তবে আবার কিছু ধান ঘরে আসবে, ছেলেপুলেরা দু-বেলা পেটপুরে খেতে পাবে।’
গল্প একটু এগোয়, তারপর ‘রাত্রে বৃষ্টি নামে। হু হু বাদলার হাওয়া সেই সঙ্গে। পূবদিকের জানলার কপাট দড়িবাঁধা; হাওয়ায় দড়ি ছিড়ে সারারাত খট খট শব্দ করে ঝড়বৃষ্টির দিনে।…রাত্রের বৃষ্টি থেমে গিয়েচে, সামান্য একটু টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে।…মাঠে একহাঁটু জল আর কাদা।’
ধান দিয়ে পুজো হয় বলে একে ধান্যলক্ষ্মীপুজোও বলে। এই পুজোরও প্রধান উপাদান তাল। অনেক ঘটিবাড়িতে ভাদ্রমাসের এই পুজোতে তালপুজো করার পরই তাল খাওয়া শুরু হয়।
গল্প আর একটু এগোয়, আমরা দেখি ‘বড়ো আর কালো কুচকুচে একটা মাত্র তাল প্রায় জলের ধারে পড়ে; সেটা কুড়িয়ে নিয়ে আসবার পথে আরও গোটা-তিনেক ছোটো তাল পাওয়া গেল।’ তারপর ‘ঘন বর্ষার দুপুরে…নারকোল গাছের মাথা থেকে পাতা বেয়ে জল ঝরে পড়চে, বাঁশঝাড় নুয়ে নুয়ে পড়ছে বাদলার হাওয়ায়, বকুলতলার ডোবায় কটকটে ব্যাঙের দল থেকে থেকে ডাকছে।’ আর শেষের শুরুতে ‘বেলা আরও বাড়ল, ঘন মেঘাচ্ছন্ন বর্ষার দিনে যদিও বোঝা গেল না বেলা কতটা হয়েছে।…বৃষ্টি নেই একটুও, মেঘ-জমকালো আকাশ। বাদলের সজল হাওয়ায় গা শিরশির করে।’
হিন্দু গৃহস্থ বাড়িতে সম্বৎসর কৃষিভিত্তিক চারটি লক্ষ্মীপুজোর বিধান আছে— ভাদ্র, কার্তিক, পৌষ ও চৈত্রে। এর মধ্যে ভাদ্রমাসের পুজোটি হল পেঁচাপেঁচী ব্রত। কথিত আছে, ভাদ্রমাসের শুক্লপক্ষের বৃহস্পতিবার এই ব্রতে পুজোর স্থানে আলপনা দিয়ে মা লক্ষ্মী ও তাঁর বাহন পেঁচার মূর্তি বা ছবি স্থাপন করে পুজো করলে গৃহে মা লক্ষ্মী অচলা থাকেন, ফলে গৃহে ধনসম্পত্তি ও সুখসমৃদ্ধি চিরকাল বজায় থাকে। ধান দিয়ে পুজো হয় বলে একে ধান্যলক্ষ্মীপুজোও বলে। এই পুজোরও প্রধান উপাদান তাল। অনেক ঘটিবাড়িতে ভাদ্রমাসের এই পুজোতে তালপুজো করার পরই তাল খাওয়া শুরু হয়।

পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় অঞ্চলের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুর, পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোল এবং লাগোয়া ঝাড়খণ্ডের মানভূমের ধানবাদ, হাজারিবাগ, রাঁচির ভাদ্রমাস সারা মাস জুড়ে ভাদু উৎসবে মুখর। লৌকিক বিশ্বাস অনুযায়ী, নারীকেন্দ্রিক প্রাচীন এই ভাদু উৎসব পঞ্চকোট জেলার কাশীপুর রাজ্যের রাজবংশের কন্যা ভদ্রাবতীর আত্মত্যাগের করুণ কাহিনি অবলম্বনে প্রচলিত, যাকে ভাদুদেবী হিসেবে পুজো করা হয়। এই লৌকিক উৎসবের প্রাণ হল ভাদু গান, যা বিভিন্ন পাঁচালীর সুরে মূলত মেয়েদের কণ্ঠে গীত হয়।
পৌরাণিক ও সামাজিক গানগুলির বিষয় ভাদুদেবীর রূপ ও বিবাহ অথবা সমাজ জীবনের বিভিন্ন অসঙ্গতি ও গৃহনারীদের জীবনের সুখ-দুঃখ হাস্য-পরিহাসের সাধারণ কাহিনি। ‘তোমরা ছুটে এসো গো, দেখো ভাদু এসেছে গো।/ হলুদ মাখিয়ে ভাদুকে সাজিয়ে, মোরা করব গো বিয়ে।’ ভাদু গানের মধ্যে অনবদ্য এক সরসতাও লক্ষ করা যায়। ‘হলুদ কনের ভাদু তুমি হলুদ কেন মাখনা,/ শাশুড়ি ননদের ঘরে হলুদ মাখা সাজে না।/ কলাগাছে চাবি ছিল, হলুদ বল্যে মেখেছি/ ও শাশুড়ি গাল দিও না পাশা খেলতে বসেছি।’
এরপর এসে পড়ে ভাদ্র সংক্রান্তির বিশ্বকর্মাপুজো আর অরন্ধন। রাঢ় বাংলায় এমনিতে সারা ভাদ্রমাস জুড়ে বিভিন্ন ধরণের রান্নাপুজো হতে দেখা যায়— ইচ্ছা রান্না, গাব রান্না ইত্যাদি। অরন্ধন লোকায়ত বাংলার অন্যতম প্রাচীন উৎসব, যা রান্নাপুজো নামে পরিচিত। ভাদ্রমাসের শেষদিনের রান্নাপুজোকে বুড়ো রান্না বলা হয়।
শ্রাবণ সংক্রান্তির মনসাপুজো শেষ হতে না হতেই পয়লা ভাদ্র কুমারী মেয়েরা ভাদু প্রতিষ্ঠা করেন গ্রামের কোনও বাড়ির পরিষ্কৃত কুলুঙ্গি বা প্রকোষ্ঠে। ভাদুর বিমূর্ত রূপ কল্পনা করে একটা পাত্রে জল রেখে সমবেত কণ্ঠে ভাদুগীত গাওয়া হয়। ‘ওমা ভদ্রেশ্বরী!/ আমরা তোমায় ডাকছি মা বিনয় করি।/ মনেতে মানস করি, ওমা ভদ্রেশ্বরী।’ ভাদুর মূর্তি ঘরে নিয়ে আসা হয় ভাদ্র সংক্রান্তির সাতদিন আগে। সংক্রান্তির আগের রাতে পালিত হয় ভাদুর জাগরণ। রাত নটা-দশটা থেকে গাওয়া শুরু হয় ভাদুগীত। ‘ও আমার ভাদু রে, তোমায় ছাড়া আমি বাঁচি কী করে!/ কোথায় গেলে ভাদু, সাজাব তোমায়?’ সংক্রান্তির সকালে মহিলারা দলবদ্ধভাবে ভাদুমূর্তি বিসর্জন দিতে থাকেন।

এরপর এসে পড়ে ভাদ্র সংক্রান্তির বিশ্বকর্মাপুজো আর অরন্ধন। রাঢ় বাংলায় এমনিতে সারা ভাদ্রমাস জুড়ে বিভিন্ন ধরণের রান্নাপুজো হতে দেখা যায়— ইচ্ছা রান্না, গাব রান্না ইত্যাদি। অরন্ধন লোকায়ত বাংলার অন্যতম প্রাচীন উৎসব, যা রান্নাপুজো নামে পরিচিত। ভাদ্রমাসের শেষদিনের রান্নাপুজোকে বুড়ো রান্না বলা হয়। বিশ্বকর্মাপুজোর সঙ্গে এদিন মনসাপুজোরও আয়োজন করা হয়। মনসাপুজোর অঙ্গ হিসেবেই এই অরন্ধন। অরন্ধন, কারণ এদিন পাকশালার বিশ্রামের দিন। আগুন জ্বালা এদিন নিষিদ্ধ। তাই আগের দিনের রান্না করা ঠাণ্ডা খাবার, বিশেষত পান্তাভাত এবং বিভিন্ন রকমের ভাজা, ডাল, কচুর শাক, ওলের ফুলুরি খাওয়া হয়। অনেকক্ষেত্রে মাছ, বিশেষ করে ইলিশ এবং পোনামাছের বিভিন্ন পদের আয়োজন করা হয়। তাই যতই ‘যেখানে আকাশ মেঘে ঢেকে থাকে ভাদ্রমাসে/ অন্ধকার— সন্ধ্যার বাতাসে—’, তবুও বাংলার নিজস্ব উৎসবমদিরতার কারণে বর্ষা-উত্তীর্ণ বঙ্গজীবনে বড়ই আদৃত এই ‘মাহ ভাদর’।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত