(Planning Commission 4)
নবগঠিত প্রতিষ্ঠানের জন্য লোকলস্কর ও দফতর প্রয়োজন। রাষ্ট্রপতি ভবনের দক্ষিণ-পূর্ব সীমানার বাইরে অবস্থিত ‘জি ব্লক হাটমেন্ট’-এ ঠাঁই মিলল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এইসব একতলা ব্যারাকগুলো তৈরি হয়েছিল। ১৯৪৭-এর পর নতুন নতুন মন্ত্রক আর প্রতিষ্ঠানের কাজ শুরুর সময় সাময়িকভাবে অনেকেরই ঠিকানা হয় জি ব্লক হাটমেন্ট। কোনও কোনও বই বা নথিতে বিষয়টি লিপিবদ্ধ হলেও পুরনো দিনের কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারীদের মুখে মুখে এমনটাই বেশি শোনা যেত। তাঁদেরও অধিকাংশই এখন প্রয়াত।
সেই সূচনা লগ্নে যে সমস্ত কর্মচারী-আধিকারিক প্ল্যানিং কমিশনে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন, তাঁদের আবার অন্য মত। তাঁদের মতে, ইন্ডিয়া গেট এলাকার শাহজাহান রোডে যে ব্যারাকগুলি ছিল, সেখান থেকেই প্ল্যানিং কমিশন যাত্রা শুরু করে। কথাটা ফেলে দেওয়ার মতো নয়। দিল্লিতে দেশের রাজধানী নির্মাণের সময় থেকেই দেশীয় রাজন্যবর্গ ইন্ডিয়া গেটের পাশে নিজের নিজের একটা প্রাসাদ তৈরি করে নিয়েছিলেন। এগুলি ছিল তাঁদের দিল্লির বাসস্থান তথা ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার দফতর।
আরও পড়ুন: প্ল্যানিং কমিশন প্রবর্তন থেকে বিসর্জন পর্ব- ১, ২, ৩
এইভাবেই গড়ে উঠেছিল হায়দরাবাদ হাউস, যোধপুর হাউস, পাতিয়ালা হাউস, জামনগর হাউস, ঢোলপুর হাউস ইত্যাদি। এদের মধ্যে ঢোলপুর হাউস এখন সকলের পরিচিত। এখানেই অবস্থিত ইউপিএসসি-র দফতর। বিদেশ থেকে আসা রাষ্ট্রীয় অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য হায়দরাবাদ হাউস বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
পুরোনো নথি অনুসারে শাহজাহান রোডে অবস্থিত ঢোলপুর হাউসের উল্টোদিকে এখন যেখানে ভারত সরকারের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের আবাসন, সেখানেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফৌজি ব্যারাক তৈরি করা হয়েছিল। সেখানেই নাকি প্ল্যানিং কমিশন প্রাথমিক পর্যায়ে দফতর স্থাপন করে। রাষ্ট্রপতি ভবনের দক্ষিণ-পূর্ব সীমানার বাইরে অবস্থিত ‘জি ব্লক হাটমেন্ট’ হোক বা শাহজাহান রোডের ব্যারাক, মোদ্দা কথা ফৌজের জন্য নির্মিত ছাউনি থেকেই প্ল্যানিং কমিশনের ক্রিয়াকর্মাদি শুরু হয়।

১৯৫৪-৫৫ নাগাদ সংসদ মার্গে ছয়তলা বাড়ি তৈরি হওয়ার পর প্ল্যানিং কমিশন পায় স্থায়ী ঠিকানা– যোজনা ভবন। এখানেও ভিন্ন মত আছে। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ১৯৬১ সালে প্ল্যানিং কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে প্রথম যোজনা ভবনের বৈঠকে আসেন। সেই সূত্রে ধরে নেওয়া হয়, ১৯৬০-৬১ নাগাদ যোজনা ভবন নির্মিত হয়েছিল।
অন্য মতে, ১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সরস্বতী পুজোর দিন প্ল্যানিং কমিশনের বৈঠকে যোগ দিতে এসে ড. মেঘনাদ সাহা যোজনা ভবনের দোতলায় সিঁড়ির সামনে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে দ্রুত নিকটবর্তী উইলিংডন হাসপাতালে (এখনকার রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতাল) নিয়ে গেলে মৃত ঘোষণা করা হয়।
প্রথম সাধারণ নির্বাচন ১৯৫২ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার পর বেশ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল। লোকসভার নির্বাচন পাঁচ বছর অন্তর আয়োজনের সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হয়ে গেছিল। কাজেই প্রতি বার নির্বাচনের পর গঠিত হবে নতুন মন্ত্রীসভা।
।।দুই।।
যে কোনও নবগঠিত প্রতিষ্ঠানকেই কিছু প্রাথমিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, যাকে ইংরেজিতে বলে teething trouble। প্ল্যানিং কমিশনও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রাথমিক প্রশ্ন– পরিকল্পনার দিশা কী হবে? দিশা নির্ধারণ কে বা কারা করবে? নির্ধারিত সময়সীমা কী হবে? এইসব প্রশ্নর উত্তর খুঁজতে গিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে করতে কেটে গেল দু-দুটো বছর।
প্রথম সাধারণ নির্বাচন ১৯৫২ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার পর বেশ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল। লোকসভার নির্বাচন পাঁচ বছর অন্তর আয়োজনের সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হয়ে গেছিল। কাজেই প্রতি বার নির্বাচনের পর গঠিত হবে নতুন মন্ত্রীসভা। একই সঙ্গে মূল্যায়ন করা যাবে পাঁচ বছরের সময়সীমায় সরকার উন্নয়নের লক্ষ্যে কতটুকু সফল অথবা ব্যর্থ হয়েছে।

এই ধারণায় ভিত্তি করে স্থির হয় প্ল্যানিং কমিশন সামগ্রিকভাবে প্রতি পাঁচ বছরের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। চলতি ভাষ্যে– ‘পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা’।
তখনও স্থির হয়নি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার দিশা কে বা কারা নির্ধারণ করবে। ১৯৫২ সালের ৬ই আগস্ট তার উত্তর পাওয়া গেল। ভারত সরকার গঠন করল ‘জাতীয় উন্নয়ন পর্ষদ’ বা ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল, সংক্ষেপে এনডিসি। কী আশ্চর্য সমাপতন! ১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট প্রথম পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের ফলে বিধ্বস্ত হয়েছিল এশিয়ার একটি দেশ। একই দিনে এশিয়া মহাদেশের একটি সদ্য স্বাধীন দেশে গড়ে উঠল জাতীয় উন্নয়নের দিশারী সংগঠন– এনডিসি।
এনডিসি-র সদস্যরা খসড়া অ্যাপ্রোচ পেপার সামনে রেখে মতামত পেশ করতেন। পেশ হত অসংখ্য সংশোধনী। সকলের মতামত বিবেচনা করে দীর্ঘ আলোচনার পর খসড়া অ্যাপ্রোচ পেপারে কাটাকুটি অর্থাৎ সংযোজন-বিয়োজন তথা পরিমার্জন করে চূড়ান্ত করা হত পরবর্তী পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ‘অ্যাপ্রোচ পেপার’।
প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার সমস্ত সদস্য, সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির উপ-রাজ্যপালরা হলেন এনডিসি-র সদস্য। এনডিসি-র বৈঠকে মতবিনিময়ের মাধ্যমে স্থির হত প্রতিটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার দিশা ও অভিমুখ। প্ল্যানিং কমিশনের তৈরি একটি খসড়া প্রতিবেদন সামনে রেখে শুরু হত এনডিসি-র আলোচনা। দেশের সম্পদ বিবেচনা করে কোন কোন বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত, তাই নিয়ে রচিত প্রতিবেদনের সরকারি নাম ‘খসড়া অ্যাপ্রোচ পেপার’।
এনডিসি-র সদস্যরা খসড়া অ্যাপ্রোচ পেপার সামনে রেখে মতামত পেশ করতেন। পেশ হত অসংখ্য সংশোধনী। সকলের মতামত বিবেচনা করে দীর্ঘ আলোচনার পর খসড়া অ্যাপ্রোচ পেপারে কাটাকুটি অর্থাৎ সংযোজন-বিয়োজন তথা পরিমার্জন করে চূড়ান্ত করা হত পরবর্তী পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ‘অ্যাপ্রোচ পেপার’।

অন্যভাবে বিবেচনা করলে বলা যায়, প্ল্যানিং কমিশন হল গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে গঠিত এনডিসি-র সিদ্ধান্ত কার্যকর করার প্রতিষ্ঠান। সব মিলিয়ে ১৯৫২ থেকে ২০১০ পর্যন্ত এনডিসি-র ৫৭টি বৈঠক হয়েছিল। তারপর এনডিসি আছে না তুলে দেওয়া হয়েছে, তা জানা যায়নি। কারণ এ বিষয়ে কোনও বিজ্ঞপ্তি এখনও পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি।
প্ল্যানিং কমিশনের শীর্ষে চেয়ারম্যান হিসেবে আসীন প্রধানমন্ত্রী। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীও প্ল্যানিং কমিশনের সদস্য হিসেবে মনোনীত। তাঁরা সকলে প্ল্যানিং কমিশনের সদস্য থাকলেও প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় ক্রিয়াকর্মাদি সামলানোর জন্য মনোনীত হতেন ডেপুটি চেয়ারম্যান।
প্রণব মুখোপাধ্যায় ১৯৯০-এর দশকে ছিলেন প্ল্যানিং কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান এবং ২০১০-এর দশকে ভারতের রাষ্ট্রপতি। তবে একেবারেই ব্যতিক্রমী ড. মনমোহন সিংহ। তিনি প্ল্যানিং কমিশনের সদস্য-সচিব হিসেবেও কাজ করেছেন।
সাধারণত অভিজ্ঞ রাজনীতিকরাই প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মনোনীত হয়ে ডেপুটি চেয়ারম্যান পদের দায়িত্ব সামলাতেন। গুলজারিলাল নন্দ, ভি টি কৃষ্ণমাচারী, অশোক মেহতা, পি ভি নরসিংহ রাও, মাধব সিংহ সোলাঙ্কি, রামকৃষ্ণ হেগড়ে, মধু দণ্ডবতে, মোহন ধারিয়া, প্রণব মুখোপাধ্যায়, যশবন্ত সিংহ, কে সি পন্থ প্রমুখ বিভিন্ন সময়ে প্ল্যানিং কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ছিলেন। সময় বিশেষে বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞরা যেমন ড. ডি আর গ্যাডগিল, ড. ডি টি লাকড়াওয়ালা, ড. মনমোহন সিংহ প্রমুখও প্ল্যানিং কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান পদে আসীন ছিলেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, পি ভি নরসিংহ রাও ও ড. মনমোহন সিংহ বিভিন্ন সময়ে প্ল্যানিং কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ও চেয়ারম্যান (প্রধানমন্ত্রী) পদে আসীন ছিলেন। প্রণব মুখোপাধ্যায় ১৯৯০-এর দশকে ছিলেন প্ল্যানিং কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান এবং ২০১০-এর দশকে ভারতের রাষ্ট্রপতি। তবে একেবারেই ব্যতিক্রমী ড. মনমোহন সিংহ। তিনি প্ল্যানিং কমিশনের সদস্য-সচিব হিসেবেও কাজ করেছেন। ডেপুটি চেয়ারম্যান পদমর্যাদায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার সদস্য অর্থাৎ পূর্ণ মন্ত্রী।

ডেপুটি চেয়ারম্যান ছাড়াও প্ল্যানিং কমিশনের পূর্ণ সময়ের সদস্য হিসেবে মনোনীত হতেন দেশের বিভিন্ন বিষয়ের বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞবৃন্দ। রাষ্ট্রীয় মন্ত্রীর মর্যাদাসম্পন্ন সদস্যদের নিজের বিষয়ে পরিকল্পনার পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপরেখা প্রণয়ন করাই ছিল মূল দায়িত্ব। সমান্তরালে তাঁরা নিয়মিতভাবে চালিয়ে যেতেন চালু প্রকল্পের মূল্যায়ন।
৬৪ বছরের সময়সীমায় সদস্যদের দীর্ঘ তালিকা থেকে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ, ভি কে আর ভি রাও, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, এম এস থ্যাকার, ক্ষিতিশচন্দ্র নিয়োগী, এম এস স্বামীনাথন, বি ডি নাগচৌধুরী, রাজ কৃষ্ণ, এ এম খুসরো, এম জি কে মেনন, আবিদ হুসেইন, সুখময় চক্রবর্তী, সি রঙ্গরাজন, অর্জুন সেনগুপ্ত, ওয়াই কে অলগ, অভিজিৎ সেন প্রমুখর নাম উল্লেখ করলেই বোঝা যায় ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের জাতীয় পরিকল্পনার দায়িত্ব বিভিন্ন সময়ে কারা পালন করেছেন।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত