(Dwijendranath Boxometry)
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটক, শিল্পকলা ইত্যাদি চর্চার পাশাপাশি বিজ্ঞান নিয়ে চিন্তাভাবনার বিষয়টি বরাবর প্রাধান্য পেয়েছে। দ্বারকানাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে বংশপরম্পরায় তা বিস্তৃতি পেয়েছিল রথীন্দ্রনাথ অবধি। ঠাকুরবাড়ির প্রায় দেড়শো বছরের ইতিহাসে পরিবারের শাখাপ্রশাখা জুড়ে এই বিস্তার যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনই বিস্ময়কর।
এর শুরু প্রিন্স দ্বারকানাথের হাত ধরে, যিনি কর্মজীবনের একটা বড় অংশ জুড়ে সমাজ সংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। রাজা রামমোহনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন দেশে ইংরেজি শিক্ষার প্রসারের কাজে। সতীদাহের মতো একটি অবৈজ্ঞানিক এবং অমানবিক প্রথা রোধ করার অভিযানেও তিনি ছিলেন রামমোহনের পাশে। তাঁর বিজ্ঞান ভাবনার সবচেয়ে বড় উদাহরণ অবশ্যই চিকিৎসাবিদ্যার উন্নতি সাধনে কিছু পদক্ষেপ।
আরও পড়ুন: নিরাপত্তার অলিতে গলিতে
১৮৩৬ সালে মেডিকেল কলেজে তৎকালীন সনাতনী হিন্দু সংস্কার ভেঙে প্রথম শব ব্যবচ্ছেদ করেন কলেজের ডেমনস্ট্রেটর পণ্ডিত মধুসুদন গুপ্ত, যাঁকে এই কাজে রাজি করান ডেভিড হেয়ার। তবে শব ব্যবচ্ছেদ প্রবর্তনের ক্ষেত্রে যে দ্বারকানাথের কিছু ভূমিকা ছিল, এ কথা উল্লেখ করেছেন স্বয়ং ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাঁর প্রপৌত্র। এছাড়াও, নানা ধরনের ব্যবসায় তিনি যেভাবে যুক্ত হয়েছিলেন ব্রিটিশদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, তাতে তাঁর বিজ্ঞানমনস্কতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল এক উদ্যোগী শিল্পপতির উদ্দীপনা।
উনিশ শতকের প্রথমার্ধে সামাজিক পটভূমিকায় যে স্বচ্ছ বৈজ্ঞানিক মনোভাব ও মানসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন দ্বারকানাথ, তা সত্যিই অতুলনীয়। এবং তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো বা নানা রূপে প্রবাহিত হয়েছিল তাঁর উত্তরসূরিদের মধ্যে। তাঁর উত্তরসূরিরাও সেটি লালন করেছিলেন নিজেদের মতো করে।

দ্বারকানাথের জ্যেষ্ঠ পুত্র মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনেও বিজ্ঞান ভাবনার বিশেষ ভূমিকা ছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি মহর্ষির ছিল বিশেষ আগ্রহ, যা তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন নিজের সন্তানদের মধ্যেও। ‘জীবনস্মৃতি’–র পাতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘ডাকবাংলায় পৌঁছিলে পিতৃদেব বাংলার বাহিরে চৌকি লইয়া বসিতেন। সন্ধ্যা হইয়া আসিলে পর্বতের স্বচ্ছ আকাশে তারাগুলি সুস্পষ্ট হইয়া উঠিত এবং পিতা আমাকে গ্রহতারকা চিনাইয়া দিয়া জ্যোতিষ্ক সম্বন্ধে আলোচনা করিতেন।’
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এবং স্বর্ণকুমারীর বর্ণনাতেও পিতা দেবেন্দ্রনাথের জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে উৎসাহী মনের কথা জানা যায়। জ্যোতির্বিদ্যার পাশে পাশে দেবেন্দ্রনাথের ভূতত্ত্বেও অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। শিবনাথ শাস্ত্রী লিখেছিলেন, ‘মহর্ষি যে আপনাকে ভূতত্ত্ব বিদ্যা বিষয়ে গুরু বলিয়াছেন, এই-ই ঠিক কথা।’
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নিজে চর্চা করতেন ফ্রেনোলজি বা শিরোমতিবিদ্যার। জানা যায়, একবার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে গাজিপুর সফরকালে জেলের ডাক্তার রবার্টসনের অনুমতিসাপেক্ষে তাঁর মাথার গঠন দেখে তাঁর চরিত্রের বর্ণনা লিখে দেন এক খণ্ড কাগজে।
জানা যায় দ্বারকানাথের অপর পুত্র গিরীন্দ্রনাথও বিজ্ঞান চর্চা করতেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাঁর আত্মজীবনীতে লিখছেন, ‘মেজকাকা বিজ্ঞানের বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। তাঁহার একটি পরীক্ষাগার (laboratory) ছিল, তাহাতে battery প্রভৃতি নানাবিধ যন্ত্র ছিল। তাহা দ্বারা তিনি অনেক বিষয়ের রাসায়নিক বিশ্লেষণ ও পরীক্ষা করিতেন।’
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নিজে চর্চা করতেন ফ্রেনোলজি বা শিরোমতিবিদ্যার। জানা যায়, একবার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে গাজিপুর সফরকালে জেলের ডাক্তার রবার্টসনের অনুমতিসাপেক্ষে তাঁর মাথার গঠন দেখে তাঁর চরিত্রের বর্ণনা লিখে দেন এক খণ্ড কাগজে। তাছাড়া জাহাজের খোল নিলামে কিনে তাতে ইঞ্জিন জুড়ে বরিশাল–খুলনা লাইনে জাহাজ চালানো শুরু করেছিলেন তিনি। খুলেছিলেন দেশীয় দেশলাই ফ্যাক্টরি, বসিয়েছিলেন তাঁত বোনার কল।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অপর দুই বড় ভাই অর্থাৎ বীরেন্দ্রনাথ ও হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। এঁদের মধ্যে প্রথমজন ছিলেন গণিতবিশারদ এবং হেমেন্দ্রনাথ ছিলেন চিকিৎসাবিদ্যায় আগ্রহী, যিনি কিছু দিন মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনা করেন। ছোটভাই রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানমনস্কতার ক্ষেত্রটি ছিল আরও বিশাল। ১৯০০ সালের শেষ দিকে বা ১৯০১ এর শুরুতে তিনি বন্ধুবর জগদীশচন্দ্র বসুকে এক চিঠিতে লিখছেন, ‘প্রাচীন ভারতবর্ষে বিজ্ঞানের কী পর্যন্ত আলোচনা হইয়াছে, তাহার বিন্দু-বিসর্গও জানিনা।’

কিন্তু সত্যিই কি তাই? ‘বিশ্বপরিচয়’ গ্রন্থে তাঁর অপর সুহৃদ সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উদ্দেশ্যে করে লিখেছেন ‘আমি বিজ্ঞানের সাধক নই সে কথা বলা বাহুল্য। কিন্তু বালককাল থেকে বিজ্ঞানের রস আস্বাদনে আমার লোভের অন্ত ছিল না।’ ‘পথের সঞ্চয়’ প্রবন্ধের ভূমিকাতেও তিনি লেখেন, ‘বুদ্ধিকে মোহমুক্ত ও সতর্ক করবার জন্য প্রধান প্রয়োজন বিজ্ঞানচর্চার।’ শেষ জীবনে তাঁর বিজ্ঞানের বইয়ের সংখ্যা কম ছিল না। ‘Scientific American’-এর পাতায় কোনও বইয়ের ভাল সমালোচনা পড়লেই আনিয়েছেন সেই বই, আস্বাদন করেছেন তার রস। এছাড়া তাঁর হোমিওপ্যাথি চর্চা তো সর্বজনবিদিত।
কিছু ক্ষেত্রে ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি প্রদত্ত সংজ্ঞা সমালোচিত হয়েছে তাঁর লেখায়। ‘জ্যামিতির নতুন সংস্করণ’ রচনায় তিনি লিখছেন ‘পুঙ্খনাপুঙ্খ যুক্তি-প্রণালী দ্বারা সত্য নির্ণয় করিবার যে একটি পদ্ধতি, ইউক্লিডের জ্যামিতি তাহার একটি অনন্যসাধারণ আদর্শ।
এর মধ্যে দেবেন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ পুত্র দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন গণিতজ্ঞ হিসেবে অসামান্য। দুই বিচিত্র এবং আপাত বিসদৃশ গুণের এক অদ্ভুত মিশেল ঘটেছিল এই মানুষটির মধ্যে। একাধারে তাঁর বাক্সমিতি (boxometry) এবং জ্যামিতি সম্পর্কে ছিল তুখোড় জ্ঞান। বাংলা শর্টহ্যান্ডের আবিস্কারক তিনি, এবং বাংলা স্বরলিপির প্রথম রচনাও তাঁরই হাতে।
দ্বিজেন্দ্রনাথ বাঙালি পাঠকের কাছে একজন কবি ও দার্শনিক হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর গণিতচর্চার বিষয়টি বহুলাংশে অপ্রকাশিত থেকে গেছে। গণিত সম্পর্কে তিনি নিজেই লিখেছিলেন ‘অঙ্ক আমার ভাল লাগিত। কিন্তু ক্লাসের বাঁধাধরা নিয়মের মধ্যে অঙ্ক কষা ও গণিত শাস্ত্রের অধ্যয়ন করা আমার পক্ষে অসম্ভব। আমার ভাল লাগিত Trigonometry ও Mensuration; বাড়িতে ইচ্ছেমতো আমি তাহাই আলোচনা করিতাম।’

অর্থাৎ সেন্ট পলস স্কুল বা হিন্দু কলেজের প্রথাগত শিক্ষা তাঁর কখনই ভাল লাগেনি। বাক্সমিতির পুরো বিষয়টি আসলে জ্যামিতিকেন্দ্রিক এবং এই সম্বন্ধে তাঁর রচনার পরিমাণ নেহাত কম নয়, যার অধিকাংশ বেরিয়েছিল ‘ভারতী’ পত্রিকার পাতায়, ১৮৮০ থেকে ১৯০০, এই ২০ বছরের সময়কালে। ইউক্লিডের জ্যামিতি নিয়ে এক গভীর আলোচনা ছিল তাঁর ‘জ্যামিতির নতুন সংস্করণ’, ‘স্থানমান’, ‘উত্তর জ্যামিতি কথা’ প্রভৃতি প্রবন্ধে, যেখানে স্থান (space), বিন্দু, এবং রেখার সংজ্ঞা নিয়ে করেছেন নানা প্রশ্ন।
কিছু ক্ষেত্রে ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি প্রদত্ত সংজ্ঞা সমালোচিত হয়েছে তাঁর লেখায়। ‘জ্যামিতির নতুন সংস্করণ’ রচনায় তিনি লিখছেন ‘পুঙ্খনাপুঙ্খ যুক্তি-প্রণালী দ্বারা সত্য নির্ণয় করিবার যে একটি পদ্ধতি, ইউক্লিডের জ্যামিতি তাহার একটি অনন্যসাধারণ আদর্শ। ইহা সত্ত্বেও আমরা এটুকু বলিতে ছাড়িব না যে, ইউক্লিডের জ্যামিতির ভিত্তিমূল সম্পূর্ণ দোষশূন্য নহে।’
বাক্স নির্মাণের এই পদ্ধতিগত দিকগুলো প্রকাশ পেয়েছিল আরও কিছু পদ্যের মধ্য দিয়ে। ‘কর্তন’, ‘মণ্ডন’, ‘কর্ণ এবং পার্শ্বের নামকরণ’, ‘চূড়াকরণ’ এরকম নানা শিরোনামে লিখেছিলেন কবিতাগুলো। কী অসামান্য সাহিত্যবোধ, ছন্দ ও ভাষার চয়ন।
বলাই বাহুল্য, ইউক্লিডের জ্যামিতিতে boxometry বা বাক্সমিতির কোনও উল্লেখ নেই। সুতরাং এ সম্পর্কে দ্বিজেন্দ্রনাথের চিন্তা ভাবনা মৌলিক, যেখানে তিনি ইউক্লিডের জ্যামিতি ছেড়ে আরও এগিয়ে গেছেন আরও বেশ খানিক।
বাক্সমিতির সংজ্ঞা কী?
তাঁর পাণ্ডুলিপিতে দ্বিজেন্দ্রনাথ বলেছেন ‘paperfolding measurement’ অর্থাৎ কাগজ ভাঁজের পরিমাপন বা পরিমাপ নির্ণয়। ১৮৮৯ সালে ‘ভারতী ও বালক’-এর চৈত্র সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তাঁর এক অদ্ভুত কবিতা– ‘কাগচের বাক্স রচনা’, যেখানে এই বাক্স তৈরির সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া আছে। সুতোয় না গেঁথে, আঠায় না জুড়ে শুধু কাগজ কেটে, মুড়ে এবং তার দু-এক জায়গায় ফুটো করে ডালা ও তালা সমেত সর্বাঙ্গসুন্দর কাজচলা গোছের একটা বাক্স নির্মাণের পদ্ধতি লিখলেন এই কবিতায়–
‘দুপুরু কাগজ-গুলা চারি পৃষ্ঠা খাতা।
এক এক কাগজের দুই দুই পাতা।।
পাতা সেগুলার, যেন, লম্বা হেন দিক্
চওড়া-চেয়ে বড়ো হয় দেড়ার অধিক।।
সব কাগজেরি প্রায় এইরূপ মাপ।
নিরখ শ্রীরামপুরী কিম্বা ফুলিস্কাপ।।
কাটিয়া লইতে হলে কারো কোনো ভাগ।
পাতার মুড়িয়া ধার কাটিবেক দাগ।।
দাগটি কাটিও যেন লম্বা-দিক বাগে।
কাটিবে কাগজ-খানি সেই দাগে দাগে।।’
বাক্স নির্মাণের এই পদ্ধতিগত দিকগুলো প্রকাশ পেয়েছিল আরও কিছু পদ্যের মধ্য দিয়ে। ‘কর্তন’, ‘মণ্ডন’, ‘কর্ণ এবং পার্শ্বের নামকরণ’, ‘চূড়াকরণ’ এরকম নানা শিরোনামে লিখেছিলেন কবিতাগুলো। কী অসামান্য সাহিত্যবোধ, ছন্দ ও ভাষার চয়ন।
চতুর্থ অনুচ্ছেদে তিনি লিখছেন, ‘বড় দাদা তাঁহার পাণ্ডুলিপি তোমাকে পাঠাইবার জন্য আমার হস্তে দিয়াছেন। কোন গণিতওয়ালাকে দিয়া একবার যাচাই করিয়া লইতে চান– নিরুৎসাহজনক কথা হইলে বলিতে কুণ্ঠিত হইও না।’
শান্তিনিকেতনের প্রাক্তন শিক্ষক সতীশচন্দ্র রায়ের ভাগ্নে সুধাকান্ত রায়চৌধুরীর বর্ণনায় উঠে আসে দ্বিজেন্দ্রনাথের কাগজের বাক্স বানানোর এক চাক্ষুষ বিবরণ। ‘তাঁর ঘরের দরজা ছিল খোলা। চেয়ে দেখলাম তিনি বড় একটা ব্রাউন রঙের কাগজ নিয়ে হিসেব করে নানা রকমে ভাঁজ করছেন।’ কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করবার সাহস না হওয়াতে বারান্দার এক কোণায় বসে থাকা তাঁর ভৃত্য গোষ্ঠ মালিকে জিজ্ঞাসা করে জানা গেল ‘বড়ো বাবু কাগজ নিয়ে খেলা করছেন, দোয়াত তৈরি করছেন, বাক্স তৈরি করছেন, নৌকো তৈরি করছেন, এইরকম যেদিন যা খুশি করেন!’
পরে তাঁর কাছ থেকে দোয়াত, নৌকো, কলমরাখা চৌকোনো খাপ, ছোট কাগজের প্যাঁটরা এইসব বেশ কিছু জিনিস উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন সুধাকান্ত। নিজেই একাগ্র চিত্তে নেড়ে চেড়ে দেখে বুঝলেন সেই সব জিনিস তৈরি হয়েছে আঠা না লাগিয়ে, সেলাই ফোঁড়াই না করে শুধুমাত্র কাগজের ভাঁজের বিচিত্র কৌশলে। রাজনারায়ণ বসুর সঙ্গে দ্বিজেন্দ্রনাথের ছিল আন্তরিক সম্পর্ক। তাঁকে লেখা একটি চিঠিতেও জানিয়েছেন এই বক্সমেট্রির কথা। লিখেছেন, ‘আমি এত ব্যস্ত যে আপনাকে পত্র দিব তাহা আর হইয়া উঠিল না।… But what that কাজ is, is a mystery। আপনাকে বলি– কাগজের বাক্স বিরচনায় একটি শাস্ত্র প্রণয়ন করেতেছি পদ্যে।’

রবীন্দ্রনাথের তাঁর বড়দাদাকে নিয়ে গর্বের শেষ ছিল না। জগদীশচন্দ্র বসুকে লেখা যে চিঠির উল্লেখ করা হয়েছে আগে, সে একই চিঠির চতুর্থ অনুচ্ছেদে তিনি লিখছেন, ‘বড় দাদা তাঁহার পাণ্ডুলিপি তোমাকে পাঠাইবার জন্য আমার হস্তে দিয়াছেন। কোন গণিতওয়ালাকে দিয়া একবার যাচাই করিয়া লইতে চান– নিরুৎসাহজনক কথা হইলে বলিতে কুণ্ঠিত হইও না।’
পরবর্তীকালে, ১৯০১ সালের ২২শে মে লেখা জগদীশচন্দ্রের চিঠিতে জানা গেছিল, অনেক অনুসন্ধানের পর তিনি Liverpool Mathematical Society–র সম্পাদকের হাতে তুলে দিয়েছিলেন সেই পাণ্ডুলিপি, যা তিনি অতি যত্ন করে পড়ে এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে জানাবেন বলেছিলেন।
জীবনের শেষ কুড়ি বছর শান্তিনিকেতনেই কাটান দ্বিজেন্দ্রনাথ। স্ত্রী গত হয়েছিলেন ১৮৭৮ সালে। পাঁচ পুত্র ও দুই কন্যা তাঁদের। জ্যেষ্ঠ পুত্র দ্বীপেন্দ্রনাথের পুত্র দিনেন্দ্রনাথ (দিনু) ঠাকুর ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ‘সকল গানের ভাণ্ডারী’, তাঁর সমস্ত গানের স্বরলিপি তুলে রাখবার দায়িত্ব ছিল দিনুবাবুর কাঁধে।
বিশ্বভারতী রবীন্দ্রভবনে রক্ষিত বাক্সমিতি সংক্রান্ত দ্বিজেন্দ্রনাথের পাণ্ডুলিপির সংখ্যা চার। সবকটি মিলিয়ে পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪৫৬, তাঁর মধ্যে লিখিত পৃষ্ঠার সংখ্যা ৪১৪। সবগুলিই ইংরেজি ভাষায় লেখা এবং স্বহস্তে। ইংরেজির বাঁধন এমনই, যে পড়বার সময় কোথাও হোঁচট খেতে হয় না। অঙ্কের সংখ্যার ছাঁদও দৃষ্টিনন্দন। এছাড়াও রবীন্দ্রভবনের সংগ্রহে রয়েছে তাঁর হাতে বানানো ১১ টি বাক্স।
জীবনের শেষ কুড়ি বছর শান্তিনিকেতনেই কাটান দ্বিজেন্দ্রনাথ। স্ত্রী গত হয়েছিলেন ১৮৭৮ সালে। পাঁচ পুত্র ও দুই কন্যা তাঁদের। জ্যেষ্ঠ পুত্র দ্বীপেন্দ্রনাথের পুত্র দিনেন্দ্রনাথ (দিনু) ঠাকুর ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ‘সকল গানের ভাণ্ডারী’, তাঁর সমস্ত গানের স্বরলিপি তুলে রাখবার দায়িত্ব ছিল দিনুবাবুর কাঁধে। রবীন্দ্রনাথের দেখাদেখি চার্লস এন্ড্রুজ সাহেবও দ্বিজেন্দ্রনাথকে ‘বড়দাদা’ সম্বোধন করতেন। তাঁর মৃত্যুপরবর্তী সময়ে তিনি এক প্রবন্ধ লেখেন ‘Young India’–র পাতায়।
‘The first one was his very remarkable gift amounting almost to a genius, for making paper boxes. With him it was a pure mathematical delight; and he had his mathematical formulae for each different pattern. For those whom he loved, he would make all kinds of boxes… Nothing gave him greater delight than to have these gifts accepted and praised and welcomed!’
১৯২৬ সালে ১৯শে জানুয়ারি শান্তিনিকেতনে প্রয়াত হন দ্বিজেন্দ্রনাথ। অবসান হয় এক জিনিয়াসের জীবন।
তথ্যঋণ
দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর – স্মৃতিকথা সুধাকান্ত রায় চৌধুরী
পুরাতন প্রসঙ্গ – কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য
জগদীশচন্দ্র বসু এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পত্রাবলী
জীবনস্মৃতি – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাক্সমিতি – অরূপরতন ভট্টাচার্য
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত