(Jolke Chol 29)
বহুদিন পর মোহনা রাইকে নিয়ে বেরল। মেয়েটার পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। অল ইন্ডিয়া জয়েন্ট দিয়ে সেন্ট্রাল ইন্সটিটিউটে চান্স পেয়েছে। এখন খালি ফাইনাল কলের অপেক্ষা। ক’দিন ধরেই বলছিল–
– মা কতদিন আমরা কোথাও বেরোইনি। একটু বেড়াতে নিয়ে যাবে?
– বল, কোথায় যেতে চাস? টিকিট বুক করে নিচ্ছি।
– আমি বাইরে বলতে কলকাতার বাইরে বলছি না। এই শহরটাকেই ভাল করে দেখিনি। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ি, সিমলায় বিবেকানন্দের বাড়ি, ভিক্টোরিয়া, বিড়লা তারামণ্ডল, চিড়িয়াখানাও দেখিনি।
আরও পড়ুন: জলকে চল: পর্ব – (১) (২) (৩) (৪) (৫) (৬) (৭) (৮) (৯) (১০) (১১), (১২) (১৩), (১৪) ,(১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯), (২০), (২১), (২২), (২৩), (২৪), (২৫), (২৬), (২৭), (২৮)
– বেশ তবে কোথায় যেতে চাস বল। প্রিন্সেপঘাট দিয়ে শুরু করবি?
– নিয়ে যাবে মা? ছোটবেলায় নিয়ে যেতে। আইসক্রিম খেতাম গঙ্গার ধারের স্কুপটায় বসে। বলেই মোহনাকে জড়িয়ে ধরল রাই। তারপর বলল, ‘মা, শিবকে নেব?’
– হ্যাঁ, বলে দে। একসঙ্গেই ঘোরা যাবে। কিন্তু তখন কি আমার সঙ্গ ভাল লাগবে? মোহনা হেসে বলল।
– না, থাক মা। আমি আর তুমিই যাই।
– কেন কী হল?
– সত্যি বলব?
– মিথ্যে বলবি কেন খামোকা?
– আসলে আমি তোমার বিষয়ে খুব পজেসিভ। শিব খুব ‘আন্টি আন্টি’ করে, এবার তুমিও যদি ওকে ভালবেসে ফেলো, আমার খুব রাগ হবে।
– দূর বোকা! নিজের সন্তানের থেকে কাউকে বেশি ভালবাসা যায়? তবে শিব যদি সত্যি আমার জামাই হয়, তখন তো বাসতেই হবে।
– কোনও দরকার নেই মা অত ভালবাসার। তুমি শুধু আমাকে ভালবাসবে।
– আচ্ছা বেশ। তবে কি জানিস ভালবাসা পেতে গেলে দিতেও হয় যে। আমি তো চাইব ওর মা-ও তোকে ভালবাসুক। তখন যদি আমি তার ছেলেকে ভাল না বাসি তিনি কি তোকে খাতির করবেন?
– সে তখন দেখা যাবে। আপাতত তুমি আর আমিই যাচ্ছি।
আইসক্রিম যে এতরকম হতে পারে তা সে এখানে এসেই দেখেছিল। প্রতি বছর পয়লা বৈশাখ আর পয়লা জানুয়ারি বাবা মা আর সে তিনজনে সন্ধে নামার আগেই এখানে চলে আসত। সূর্যটা কেমন লাল হয়ে আকাশ রাঙিয়ে ঝুপ করে গঙ্গার বুকে রক্তিম আভা ছড়িয়ে মিলিয়ে যেত।
প্রিন্সেপঘাট জায়গাটা মোহনার খুব প্রিয়। ছোটবেলা থেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে এখানে আসছে সে। সেই সময় চারধারটা এত সুন্দর করে সাজানো ছিল না। এখন যেমন আলোর বন্যা বইছে, ওয়াটার ফাউন্টেন, ত্রিফলা বাতি স্তম্ভ, দু’পা অন্তর পুলিসের নজরদারি, তখন প্রায় সবটাই অন্ধকারে ঢাকা ছিল। একমাত্র স্কুপের কাছটাতেই যেটুকু আলো ছিল। কলকাতা শহরে তার জানা একটিই মাত্র স্কুপ।
আইসক্রিম যে এতরকম হতে পারে তা সে এখানে এসেই দেখেছিল। প্রতি বছর পয়লা বৈশাখ আর পয়লা জানুয়ারি বাবা মা আর সে তিনজনে সন্ধে নামার আগেই এখানে চলে আসত। সূর্যটা কেমন লাল হয়ে আকাশ রাঙিয়ে ঝুপ করে গঙ্গার বুকে রক্তিম আভা ছড়িয়ে মিলিয়ে যেত। সে মুগ্ধ হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকত। আকাশের রঙ বদলের সঙ্গে সঙ্গে পাখিদের দল সমস্ত কাজ মিটিয়ে আশেপাশের গাছগুলোতে ঠাঁই নিত। নানা কলতানে অদ্ভুত এক সুর তৈরি হত।

বাবা বলত, দেখছিস কেমন সিন্থেসাইজারে সুর বাজছে। এই সুর কীসের বল তো?
মা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি হাসত। সে বুঝতে না পেরে প্রশ্ন করত- কীসের সুর বাবা?
– ঘরে ফেরার গান বাজছে রে। সারাদিন দাপাদাপির পর এখন যে যার ঘরে ফিরে বিশ্রাম নেবে। ক্লান্ত অবসন্ন দেহটা বিছানায় এলিয়ে দিয়ে নিজেদের মধ্যে গল্প করবে। এই সুর তারই। বাবা বলত।
– পাখিদের আবার বিছানা কোথায়? ওরা তো গাছের ডালে বসে থাকে, শোয় নাকি?
– শোয় রে শোয়, ওদের বিছানা ওরাই নিজেদের উপযুক্ত করে বানায়। ওখানেই ওদের বাড়ি।
তবু মাঝেমধ্যে মন উদাস হলে একাই চলে আসে মোহনা। আইসক্রিম নিয়ে দোতলার জানলার ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখে। দ্বিতীয় হুগলি ব্রিজের নিচে ভেসে যাওয়া নৌকা, ছইয়ের ফাঁকে আলিঙ্গনরত যুগলকে দেখে। তারপর ট্রেন লাইন ক্রস করে চলে যায় প্যালাডিয়ান পোর্চের সামনে।
মোহনার বেশ মজা লাগত বাবার কথা শুনে। তার ইচ্ছে করত গাছের ডালে উঠে বাসাগুলো দেখে আসতে। কিন্তু তার আগেই স্কুপ থেকে নেওয়া স্লিপে অর্ডার দেওয়া আইসক্রিম নেওয়ার ডাক আসত। সে দৌড়ে গিয়ে পাঁচ রকম ফ্লেভারে মেশানো আইসক্রিম, তার নিচে, মাঝে, ওপরে দেওয়া নানা রকম ফল, কাজু কিশমিশ আর সবার ওপরে লাল চেরি দেওয়া গ্লাস নিয়ে বসে পড়ত সামনে পাতা চেয়ারে। ধীরে ধীরে খেত সেটা। সে এক জীবন ছিল।
বিয়ের পর কয়েকবার এলেও কবে যেন বন্ধ হয়ে গেছিল আসাটা। তারপর দেশে ফিরে রাইকে নিয়ে কয়েকবার এসেছিল। রাই খুব মজা পেত এখানে এলে। কিন্তু বড় হওয়ার পর চারদিকে এত আইসক্রিম পার্লার, যে এখানে আসার অভ্যাসটা কমে গেল।
তবু মাঝেমধ্যে মন উদাস হলে একাই চলে আসে মোহনা। আইসক্রিম নিয়ে দোতলার জানলার ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখে। দ্বিতীয় হুগলি ব্রিজের নিচে ভেসে যাওয়া নৌকা, ছইয়ের ফাঁকে আলিঙ্গনরত যুগলকে দেখে। তারপর ট্রেন লাইন ক্রস করে চলে যায় প্যালাডিয়ান পোর্চের সামনে।
একা দাঁড়িয়ে স্মৃতি রোমন্থন করে।
জানিস এই জায়গাটার নাম কেন প্রিন্সেপঘাট? বাবার কথা শুনতে পায় কানের ঠিক পাশে।
রাজা অশোকের শিলালিপির পাঠোদ্ধার করেছিলেন প্রাচ্যবিদ জেমস প্রিন্সেপ। তাঁর স্মৃতিতে এই ঘাটটা তৈরি হয়েছিল। এই যে প্যালাডিয়ান পোর্চটা দেখছিস, এর নকশা করেছিলেন ডব্লিউ ফিজগেরাল্ড সেই ১৮৪১ সালে। এই স্থাপত্যটা গ্রিকো-গথিক স্টাইলে তৈরি। তখন কিন্তু রানি ভিক্টোরিয়া এদেশের শাসনভার নিজের হাতে তুলে নেননি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে সব।
মা… কোথায় হারিয়ে গেছিলে? রাইয়ের ডাকে অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে এল মোহনা। রাই আইসক্রিম নিয়ে টেবিলে ফিরে এসেছে। মা তুমি নিশ্চয়ই পুরনো দিনের কথা ভাবছিলে। তোমার মনে কি এখন এই কবিতাটা ঘুরছে?
সেই সময় অশোকের শিলালিপির পাঠ উদ্ধার করলেন জেমস প্রিন্সেপ। এই শিলালিপি তো আর ইংরেজি বা লাতিনে লেখা ছিল না। প্রিন্সেপ যখন ব্রাহ্মী লিপিতে অশোকের দীর্ঘ অনুশাসনের পাঠোদ্ধার করেন, তখন অশোক ও প্রাচীন ভারত সম্পর্কে কেউই বিশেষ কিছু জানতেন না। তিনি দ্বিভাষিক মুদ্রাগুলো পড়ে পড়ে কী লেখা আছে, তা বোঝার চেষ্টা করতেন।
প্রাচীন মুদ্রাগুলোতে গ্রিক ও ব্রাহ্মী লিপিতে রাজার নাম লেখা থাকত। প্রিন্সেপ গ্রিক হরফ জানতেন, এবার খরোষ্টী, ব্রাহ্মী লিপি পড়তে লিখতে শিখলেন। কাজটা সোজা ছিল না। কিন্তু অধ্যাবসায়, নিরন্তর প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়ে তিনি সেই কঠিন কাজকে সবার সামনে তুলে ধরলেন। আর এর ফলেই প্রাচীন ভারতের শক্তিশালী শাসক অশোক সম্পর্কে জানতে পারল। একই সূত্র ধরে জানা গেল গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কেও।

বাবার কথা শুনতে শুনতে মোহনা যেন মানসচক্ষে দেখতে পেত, চাঁদপাল ঘাটে এসে দাঁড়াল বিশাল এক বিদেশি জাহাজ। সেখান থেকে নেমে কলকাতার মাটিতে পা রাখলেন এক কুড়ি বছরের যুবক জেমস প্রিন্সেপ। কলকাতার টাঁকশালে সহকারী ধাতু পরীক্ষক হিসাবে যোগ দিতে এসেছিলেন তিনি। এসব গল্পে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকত ঘাটের দিকে, যতক্ষণ না বাবা বলত- চল, এবার ফেরা যাক।
মা… কোথায় হারিয়ে গেছিলে? রাইয়ের ডাকে অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে এল মোহনা। রাই আইসক্রিম নিয়ে টেবিলে ফিরে এসেছে। মা তুমি নিশ্চয়ই পুরনো দিনের কথা ভাবছিলে। তোমার মনে কি এখন এই কবিতাটা ঘুরছে?
মোহনা মেয়ের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
ওই যে- “কথা কও, কথা কও।/ কোনও কথা কভু হারাওনি তুমি,/ সব তুমি তুলে লও–/ কথা কও, কথা কও।/ তুমি জীবনের পাতায় পাতায়/ অদৃশ্য লিপি দিয়া/ পিতামহদের কাহিনী লিখিছ/ মজ্জায় মিশাইয়া।/ যাহাদের কথা ভুলেছে সবাই/ তুমি তাহাদের কিছু ভোল নাই,/ বিস্মৃত যত নীরব কাহিনী/ স্তম্ভিত হয়ে বও।/ ভাষা দাও তারে হে মুনি অতীত,/ কথা কও, কথা কও।”
মা… এত ইমোশনাল হওয়ার দরকার নেই। আমি দায়িত্ব নিতে এখনও দশ বছর। ততদিন আপনি ম্যাডাম মোহনা চৌধুরী, যদি একটু অনুগ্রহ করে আইসক্রিমটা খান তবে আমি ধন্য হই।
মোহনা মেয়ের মুখের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
– কী হল?
– তুই দেখছি রবীন্দ্রনাথে ডুবে গেছিস। এত বড় কবে হলি তুই? আমি তো অবাক হয়ে যাচ্ছি।
– আফটার অল চৌধুরী সাহিত্য কুটীরের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। আমাকে তো এগুলো জানতেই হবে।
– ঠিক। বলে রাইয়ের হাতে মৃদু চাপ দিয়ে মাথাটা টেনে একটা চুমু দিল মোহনা।
– মা… এত ইমোশনাল হওয়ার দরকার নেই। আমি দায়িত্ব নিতে এখনও দশ বছর। ততদিন আপনি ম্যাডাম মোহনা চৌধুরী, যদি একটু অনুগ্রহ করে আইসক্রিমটা খান তবে আমি ধন্য হই।
মোহনা হেসে উঠল রাইয়ের কথা শুনে।
খেতে খেতে রাই বলল- মা তুমি তো ছোটবেলা থেকে এই জায়গায় আসছ। একটা উপন্যাস লিখবে?
– উপন্যাস? আমি? রাই আমি অন্যের লেখা প্রকাশ করি, নিজে লিখতে পারি না।
– আমি বলছি তুমি পারবে। একটা থ্রিলার ধরনের। যেমন রবীন্দ্রনাথ এখানে খেতে আসেনি বা নেতাজী কফিহাউসে কফি খেয়েছিলেন এই ধরনের কিছু।
– ছ্যাবলামি হচ্ছে? মোহনা হাসতে হাসতে বলে উঠল।
স্নেহলতার শরীরটা একদম ভাল যাচ্ছে না। ডাক্তার এসে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করে একগাদা টেস্ট করতে বলে গেছেন। আজকাল কোনও ডাক্তার পরীক্ষা না করে রোগ ধরতে পারে না। তাও আবার এক-একটা বিষয়ের জন্য একেক স্পেশালিস্ট। সাধারণ এমবিবিএস ডাক্তারের এখন আর চাহিদা নেই। সবই কর্পোরেট কালচার।
– একদম না মা। তুমি লিখবে প্রিন্সেপঘাটে এসেছিল। তারপর একটা বিস্ময়বোধক চিহ্ণ দেবে। পাঠক অবাক হয়ে ভাববেন মোহনা চৌধুরী কি বলতে চাইছেন? প্রিন্সেপঘাট নাম! অথচ… দেখবে তোমার উপন্যাস সুপার হিট।
– প্রিন্সেপ কিন্তু সত্যি এ ঘাটে আসেননি রাই। তখন এখানে কোনও ঘাটই ছিল না। তিনি অসুস্থ হয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে যান ১৮৪০ সালে। সেখানে মাত্র ৪১ বছর বয়সে মারা যান। এই ঘাট ও স্মৃতিসৌধ এদেশের মানুষের দেওয়া বারো হাজার টাকায় গড়ে ওঠে তারপর। কাজেই আমাকে লিখতে গেলে সত্যি লিখতে হবে, এ ঘাটে জেমস প্রিন্সেপ আসেননি। বলে মোহনা বলল, আইসক্রিমটা শেষ কর। রাত হয়ে যাচ্ছে। বাড়ি ফিরতে হবে। আম্মা চিন্তা করবেন বেশি দেরি হলে।

স্নেহলতার শরীরটা একদম ভাল যাচ্ছে না। ডাক্তার এসে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করে একগাদা টেস্ট করতে বলে গেছেন। আজকাল কোনও ডাক্তার পরীক্ষা না করে রোগ ধরতে পারে না। তাও আবার এক-একটা বিষয়ের জন্য একেক স্পেশালিস্ট। সাধারণ এমবিবিএস ডাক্তারের এখন আর চাহিদা নেই। সবই কর্পোরেট কালচার।
হাসপাতালগুলো দেখলে মনে হয়, কোনও মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানিতে ঢুকে পড়েছি। ডাক্তারের কাছে ঢোকার আগে রিসেপসনে কথা বলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া, তারপর লাইনে দাঁড়িয়ে কাউন্টারে গিয়ে ফিজ ভরা, স্লিপ নিয়ে অপেক্ষা। অবশেষে ডাক্তার দেখানো এবং হাজার একটা টেস্টের ফর্দ, তাও আবার সেখান থেকেই করতে হবে এবং রিপোর্ট চেম্বারে পৌঁছে যাবে তাদের মাধ্যমেই। ডাক্তার তাই দেখে পরদিন ট্রিটমেন্ট শুরু করবেন।
স্নেহলতার বিরক্ত লাগে, আবার হাসিও পায়। কোনও ডাক্তার সঠিক রোগ ধরতে পারে না। আর না সারলেই বলে বয়সজনিত অথবা মনঘটিত।
তোমার শ্বশুর বলতেন, ম্যানমেড ডিজিস। একদল বিজ্ঞানী দিনরাত তাদের ল্যাবটোরিতে এমন সব জীবাণু বানাচ্ছে, যা মানুষের শরীরে ঢুকে মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনছে।
– সে ছিল আমাদের শশী ডাক্তার। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করত। নাড়ি টিপেই বুঝে যেত কী হয়েছে। কোনও টেস্টের বালাই ছিল না। পুরিয়া দিয়েই রোগ সেরে সারিয়ে ফেলত, বুঝলে বউমা।
– তখন এত রোগবালাই ছিল না মা। বাড়ি ফিরে শাশুড়ির শরীর কেমন আছে জানতে তাঁর ঘরে ঢুকল মোহনা।
– ছিল না কি? ছিল, কিন্তু যতদিন যাচ্ছে তত রোগব্যাধির প্রকোপ বাড়ছে। তোমার শ্বশুর বলতেন, ম্যানমেড ডিজিস। একদল বিজ্ঞানী দিনরাত তাদের ল্যাবটোরিতে এমন সব জীবাণু বানাচ্ছে, যা মানুষের শরীরে ঢুকে মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনছে। এই যে এতরকম সার দিচ্ছে ফসলের উৎপাদন বাড়াতে, তার মধ্যে দিয়েই সেই সব ক্ষতিকর জিনিস আমাদের পেটে ঢুকে যাচ্ছে। ব্যস, রোগ সারছে না। ওষুধ কোম্পানি, হাসপাতাল, ক্লিনিকগুলোর এই সুযোগে রমরমা।
মোহনা বলল- আধুনিক সভ্যতার অবদান। বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ এই নিয়ে কম রচনা পড়েছি আর লিখেছি!
– এ হল মানুষের লোভের অবদান। বিজ্ঞানকে অসাধু উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা। ওই যেদিন থেকে মানুষ আগুন জ্বালাতে শিখল, তবে থেকেই তাকে একটু একটু করে লোভ গিলে ফেলল। এই লোভের মাসুল দিচ্ছে এখন কোটি কোটি মানুষ। এভাবেই একদিন এই সভ্যতার বিনাশ হবে দেখে নিও।
– বিনাশ হতে অনেক দেরি মা। তাছাড়া যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে, একদিন তার বিনাশ নিশ্চিত, এ কথা তো গীতাতেই রয়েছে।
মোহনা তাঁর এমন কথায় আশ্চর্য হয়ে গেল। বুকের ভিতরটা হঠাৎ করে কেমন ছ্যাঁৎ করে উঠল। তবে কি সেই অন্তিম সময় আসন্ন, এবার এঁকেও ছেড়ে দিতে হবে? খানিকক্ষণ স্নেহলতার দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠল, ‘আমি তো মেয়েই মা। বউমা হতে চাইনি কখনও।’
– সব ধর্মেই রয়েছে। তবে ওখানেও লোভ। ধর্মের নাম করে একদল মানুষ আরেকদল মানুষ নিধনের যজ্ঞ করছে সেই আদিকাল থেকেই। দিন দিন এই উগ্রতা আরও বাড়ছে। বড্ড অস্থির সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা। এবার ভালয় ভালয় চোখ বুজলে শান্তি।
– এখনই মহাপ্রস্থানের পথে যাওয়ার তাড়া কেন মা? আরও অনেকদিন ব্যাটিং করতে হবে তো!
স্নেহলতা আচম্বিতে মোহনার চিবুক ছুঁয়ে একটা চুমু খেল আলতো করে। তারপর বলল, তুই আমার পেটে না জন্মালেও আমাদের জন্য যা করলি, তার কোনও তুলনা হয় না।
মোহনা তাঁর এমন কথায় আশ্চর্য হয়ে গেল। বুকের ভিতরটা হঠাৎ করে কেমন ছ্যাঁৎ করে উঠল। তবে কি সেই অন্তিম সময় আসন্ন, এবার এঁকেও ছেড়ে দিতে হবে? খানিকক্ষণ স্নেহলতার দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠল, ‘আমি তো মেয়েই মা। বউমা হতে চাইনি কখনও।’

স্নেহলতা হাসলেন। এই মেয়েটার কাছে তাদের ঋণ রয়ে গেল অনেক। এ জন্মে তা শোধ করা হল না। পরের জন্মে যদি জন্মান্তরবাদ সত্য হয় তবে ফিরে আসতে হবে এই ঋণ শোধের জন্য। কিন্তু তখন কি পরস্পর পরস্পরকে চিনতে পারবে?
কোথায় যেন পড়েছিলেন সাত জন্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষগুলো কোনও না কোনও কারণে ফিরে আসে। তাদের কারওর দেনা মেটাতে হয়, কারওর গ্রহণ পর্ব চলে। সেই জন্যেই কোনও মানুষকে খুব কাছের লাগে, আর কাউকে দেখলেই মন বিরক্তিতে ভরে যায়। মোহনা কি কোনও জন্মে তাদের কাছে দেনা রেখে গিয়েছিল? সেই দেনা মেটাবার জন্যই এসেছে? আর তিনি? অপেক্ষা করবেন আবার কোনও জন্মে তা শোধ দেবেন বলে? কে জানে! একটা শ্বাস নিলেন।
সেগুলো বলতে গেলে আশেপাশের অনেককিছু সমীকরণ পালটে যেতে পারে। তাই চুপ থাকতে থাকতে সেইসব শব্দগুলোকে ঘুম পাড়িয়ে দিই। বুঝতেও পারি না তখন একদিন এইসব কথারা আমাদের চারপাশে ঘুরত-ফিরত, ডালপালা মেলে দিত ফল ফুল ছায়া দেওয়ার জন্য।
– মা তোমার কি শরীরটা বেশি খারাপ লাগছে? মোহনার প্রশ্নে ঘাড় নাড়লেন স্নেহলতা। বললেন, ‘না রে। তুই এবার বিশ্রাম নে। সারাদিন এত পরিশ্রম করিস। নিজেকে সময় দিতে হবে তো! যা ঘরে গিয়ে নিজের সঙ্গে কথা বল।’
– নিজের সঙ্গে কি কথা থাকে?
– থাকে, আমরা ধামাচাপা দিয়ে রাখি সে সব কথাদের। সেগুলো বলতে গেলে আশেপাশের অনেককিছু সমীকরণ পালটে যেতে পারে। তাই চুপ থাকতে থাকতে সেইসব শব্দগুলোকে ঘুম পাড়িয়ে দিই। বুঝতেও পারি না তখন একদিন এইসব কথারা আমাদের চারপাশে ঘুরত-ফিরত, ডালপালা মেলে দিত ফল ফুল ছায়া দেওয়ার জন্য। অনেকের মাঝে তখন তাকে পাত্তা দেওয়া হয়নি।

তারপর একদিন আমার মতো বয়সে পৌঁছে যাত্রা করার আগে সেইসব ঘুমন্ত কথাদের জাগাতে ভীষণ ইচ্ছে করবে। অথচ তখন যাদের সঙ্গে কথাগুলো বলার ছিল, যাদের নিয়ে বলার ছিল, সব ফুল এক এক করে ঝরে গেছে। চৈত্রের ঝরাপাতা হয়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পাড়ি দিয়েছে। হাজার চেষ্টা করলেও আর সেগুলো বলা যাবে না, বললেও তাদের কানে পৌঁছাবে কি না জানা হবে না।
মোহনা বারবার বিস্মিত হচ্ছে স্নেহলতার কথায়। এত বছর পাশাপাশি থেকেও সে কখনও অনুভব করেনি শাশুড়ি মায়ের ভিতরে কোনও গোপনীয়তা, তিনি যাকে বলছেন, কথা লুকিয়ে থাকতে পারে। বরং বারবার মনে হয়েছে বড্ড বেশি সহজ, ভালমানুষ, সংসারের আর পাঁচটা নারীর মতোই আলাদা করে চিহ্নিত করা যায় না তাঁকে।
সে কথার উত্তর না দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন ঘরের পশ্চিম দেওয়ালের দিকে রাখা সেগুন কাঠের আলমারির দিকে। আঁচলে বাঁধা চাবির গোছা থেকে চাবি নিয়ে পাল্লা খুললেন। পুরনো শাড়ির নিচ থেকে বের করে হাতে নিলেন লাল কাপড় দিয়ে মোড়া একটা বান্ডিল।
স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি, সন্তানের মধ্যেই তাঁর সীমারেখা। তাঁদের আড়ালেই থাকতে স্বচ্ছন্দ। কিন্তু এতটা সরলীকরণ করাটা বোধহয় ঠিক নয়। অন্তত এখন যেভাবে কথা বলছেন, তাতে একটা জিনিস বোঝা যাচ্ছে মনের মধ্যে অনেক উথালপাতাল চলেছে তাঁরও। বলতে পারেননি কাউকে। সেগুলো তাঁর ভাষাতেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
সে বলল- তুমি লেখনি কেন কিছু এতবছর? কত গল্প তোমার ঝুলিতে। নিজেদেরই প্রকাশনা, পত্রিকা…
স্নেহলতা কথাটা শুনে খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
– কোথায় যাবে মা? বাথরুম?
সে কথার উত্তর না দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন ঘরের পশ্চিম দেওয়ালের দিকে রাখা সেগুন কাঠের আলমারির দিকে। আঁচলে বাঁধা চাবির গোছা থেকে চাবি নিয়ে পাল্লা খুললেন। পুরনো শাড়ির নিচ থেকে বের করে হাতে নিলেন লাল কাপড় দিয়ে মোড়া একটা বান্ডিল।
পিছন থেকে মোহনা ঠিক বুঝতে পারছিল না, স্নেহলতা কী বের করছেন! তার মনে হচ্ছিল কোনও শাড়ি হয়তো তাকে উপহার দিতে চাইছেন। এর আগেও আলমারি খুলে বেশ কিছু শাড়ি শাল তাকে দিয়েছেন। সেই শাড়ি বা শালের পেছনের গল্প বলে হেসে কুটোপুটি খেয়েছেন।
তিনি এক অদ্ভুত মানুষ ছিলেন। তখনকার দিনে সত্যি বিরল। মানুষজন চলে গেলেই আমাকে জড়িয়ে ধরে হাসতে হাসতে বলতেন, ‘বেচারা! লিখে আর কত বোঝাবে হৃদয়ের কথা! শাড়িতেই লেখা হোক!’
– জানিস তো লেখক এসে আমার হাতে শাড়িটা তুলে দিলেন। আমার তখন অল্প বয়স। লজ্জায় মরে যাই। শাড়ি নেব কী! এদিকে শাশুড়ি দেখি সেই লেখককে বলছেন, ‘বা! তোমার রুচির তারিফ করতে হয়।’
আমার তখন লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। শাশুড়ি মা তখনও বলছেন, ‘বউমা অমুক দিন শাড়িটা পরে ও বাড়ি যেও। সেদিন সান্ধ আড্ডায় তো সকলে থাকেন। দেখবেন সবাই।’
– আর লেখকের অবস্থা তখন কেমন হত মা?

সে কি আর আমি দেখছি পাচ্ছি! আমার মনে কত কিছু চলছে। তোমার শ্বশুর কী ভাবছেন, সবাই চলে গেলে শাশুড়ি কী বলবেন… এসব ভাবনায় তখন আমি সাহস করে মুখই তুলতে পারছি না।
– তা বড় দিদা কিছু বলতেন?
– তিনি এক অদ্ভুত মানুষ ছিলেন। তখনকার দিনে সত্যি বিরল। মানুষজন চলে গেলেই আমাকে জড়িয়ে ধরে হাসতে হাসতে বলতেন, ‘বেচারা! লিখে আর কত বোঝাবে হৃদয়ের কথা! শাড়িতেই লেখা হোক!’ আসলে মা বুঝতেন, এগুলো সবই পত্রিকায় নিয়মিত লেখার জন্য কৌশল মাত্র।
আমি তখন আরও কুঁকড়ে যেতাম।
– এই তেল দেওয়ার যুগ তখনও ছিল?
স্নেহলতা লাল শালু দিয়ে মোড়া বাণ্ডিল নিয়ে ফিরে এলেন। সেটাকে বিছানার ওপর রেখে ধীরে ধীরে গিঁট খুলে সেখান থেকে বের করে আনলেন বড় বড় বাঁধানো কয়েকটা খাতা। সেগুলো একটা একটা করে হাতে তুলে গন্ধ নিলেন।
– সবই ছিল। সবই আছে, থাকবে। এবার তুমি কীভাবে তা সামলাবে, সেটা রপ্ত করাটাই একটা বড় বিষয়।
– তুমি কখনও এসব লেখকদের কারওর প্রেমে পড়নি?
এ কথার উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে গিয়ে স্নেহলতা বললেন, সময় কখন ছিল এসব ভাবার!
মোহনা আর তা নিয়ে না ঘাঁটিয়ে শাড়ি বা শাল নিয়ে নিজের আলমারিতে তুলে রাখে। এখন কি তেমনই কোনও কিছু দিচ্ছেন তিনি?
স্নেহলতা লাল শালু দিয়ে মোড়া বাণ্ডিল নিয়ে ফিরে এলেন। সেটাকে বিছানার ওপর রেখে ধীরে ধীরে গিঁট খুলে সেখান থেকে বের করে আনলেন বড় বড় বাঁধানো কয়েকটা খাতা। সেগুলো একটা একটা করে হাতে তুলে গন্ধ নিলেন। সযত্নে আবার রেখে দিলেন সেই কাপড়ের মধ্যেই। তারপর বাঁধা কাপড়টা এগিয়ে দিলেন মোহনার দিকে।
মোহনা হাতে নিয়ে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে জানত চাইল, কার লেখা? পড়ব?
– না এখন নয়। এগুলো আমি চলে যাওয়ার পর যদি সময় পাও খুলে দেখ। হয়তো তোমার অনেক প্রশ্নের উত্তর এখানে পাবে। তবে এ কথা আমি যত দিন বেঁচে আছি গোপন থাক।
– তুমি চলে যাওয়ার কথা বড্ড বেশি ভাবছ। তেমন কিছুই হয়নি তোমার। রিপোর্ট তো সব নর্মাল।
স্নেহলতা হেসে মোহনার মাথায় চুমু খেয়ে বললেন, ‘বেলা যে পড়ে এল, জলকে চল…’
একথা শোনার পর থেকে বারবার আম্মার ঘরে গিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে দেখে আত্মা ফিরেছে তো! প্রতিদিনের অভ্যাসে আজও গিয়েছিল। কিন্তু আত্মা আজ আর ফেরেনি। দেহরূপী অস্থায়ী বাসস্থানের সদর দরজা আজ আর খোলেনি।
ঘুমের মধ্যে চলে গেলেন স্নেহলতা দেবী। রাই রাতে বা ভোরে বাথরুম করতে উঠলে নিয়ম করে একবার দেখে যায় তার আম্মাকে। আম্মা একবার বলেছিল, ‘বেশিরভাগ মানুষ সূর্য ওঠার আগের মুহূর্তে কাক ডাকা ভোরে তার যাত্রা শুরু করে অনন্তের দিকে। আসলে বয়স যত বাড়ে, আত্মারা তত নিজের দেশে ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়। তাই সে মানুষ ঘুমিয়ে গেলে পরিভ্রমণে বেরিয়ে পড়ে। যাদের তাড়া থাকে তারা ফেরে না, আর যারা ভাবে আর ক-দিন থেকে যাই, তারাই আবার বাসায় ফেরে।’
একথা শোনার পর থেকে বারবার আম্মার ঘরে গিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে দেখে আত্মা ফিরেছে তো! প্রতিদিনের অভ্যাসে আজও গিয়েছিল। কিন্তু আত্মা আজ আর ফেরেনি। দেহরূপী অস্থায়ী বাসস্থানের সদর দরজা আজ আর খোলেনি।

মোহনা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল শাশুড়ির দিকে। ভোর হচ্ছে, একটু একটু করে সূর্যের লাল আলো ছড়িয়ে পড়ছে দিগন্তে। রাই ভেজানো জানলাটা উঠে গিয়ে খুলে দেওয়া মাত্র আম্মার মুখটা একটা অপার্থিব আলোয় ভরে গেল। এতক্ষণ অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে রেখে একের পর এক ফোন করেছে সে। বাবাকেও জানিয়েছে।
অনেকেই পিস হোমে দেহ রাখার কথা বলছে বাবা আসা অব্দি। কিন্তু সে জানে তাকে কী করতে হবে। আম্মা তাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, তার স্থাবর অস্থাবর এমনকি মুখাগ্নি করার একমাত্র অধিকারী তার মেয়ে মোহনা। এই আদেশ সে কোনও কিছুর বিনিময়েই অমান্য করতে পারবে না।
(সমাপ্ত)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত