(Baishnabdas Mallick)
গল্পটা আজকের নয়, আজ থেকে আনুমানিক ২৬০ বছর আগের। সাবেক কলকাতার পোস্তা অঞ্চলে সেদিন বেজে উঠেছিল আগমনী ঢাক, যার পুরোধা ব্যাক্তি ছিলেন চুঁচুড়া থেকে আগত স্বর্ণ ব্যবসায়ী শ্রী বৈষ্ণবদাস মল্লিক। আজও তাঁর তৈরি বসতবাটিতে মহাসমারোহে মহামায়ার আগমন ঘটে।
বিরাট বাড়ি, সবুজ রেলিংওয়ালা লাল বারান্দা। দুই দালানের পাঁচ খিলানের ঠাকুরদালান। সারা উঠোন জুড়ে ঢালাই লোহার গ্যাসবাতি। সেগুলো এখন আর সন্ধ্যা হলে জ্বলে না। পুরনো আমলের বাহারি সব বেঞ্চ, তবু বর্ষার মেঘ কেটে গিয়ে শরতের আলো বাড়িটার উপর পড়লেই কী করে যেন পালটে যায় সব! খুশির হাওয়া ভেসে বেড়ায় গোটা বাড়িতে। আগমনীর রং লাগে বাড়ি জুড়ে।


স্বর্ণব্যবসায়ী বৈষ্ণবদাস মল্লিকের টাকাপয়সা, প্রভাব-প্রতিপত্তি কোনওটাই কম ছিল না। দর্পনারায়ণ স্ট্রিটের এই বাড়িটা যখন তিনি তৈরি করছেন, তখনই এক রাতে স্বপ্নে দেখেন দেবীকে। অভয়া মূর্তিতে মা এসেছিলেন তাঁর কাছে। বড় শান্ত অথচ দীপ্তিময়ী রূপ।
সেই থেকে শুরু পুজো। এই বাড়িতে শ্রাবণ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে কাঠামো তৈরির কাজ শুরু হয়। পুজোর ১৫ দিন আগে থেকে চলে চণ্ডীপাঠ। পাঠ করেন তিনজন পুরোহিত। এই দিন থেকে দশমী পর্যন্ত বাড়িতে কোনও আমিষ ঢোকে না।
আরও পড়ুন: ফটো স্টোরি: চুনীমণি দাসীর রথ
বৈষ্ণবদাস মল্লিক বাড়ির কুলদেবতা রাধাকৃষ্ণ। বাড়ি থেকে খানিক দূরে সেই মন্দির। পুজোর দিনগুলিতে যা কিছু দেবীকে অর্পণ করা হয়, সে সবই পৌঁছে দেওয়া হয় সেখানেও। অষ্টমীর দিন বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠা মহিলা ধুনো পোড়ান। দু’হাতে দুটো সরা আর মাথায় একটা সরা নিয়ে ধুনো পোড়ানো শুরু হয়। এই ভাবে ৭৭ সরা ধুনো পোড়ানো হয়। শেষ দু-একবার সাষ্টাঙ্গে শুয়ে পিঠে এবং সোজা হয়ে শুয়ে বুকে সরা রেখে পোড়ানো হয়।
ষষ্ঠীর দিন এই বাড়িতে ভিয়েন বসে। খাজা, গজা, বালুসাই, লাড্ডু, দরবেশ- সবই বানানো হয়। ক্ষীরের মুড়কি, চিঁড়ের মুড়কি, নাড়ুও দেওয়া হয়। এছাড়াও দেওয়া হয় ক্ষীর এবং দই। দেবীকে অন্নভোগ দেওয়া হয় না এ বাড়িতে। পরিবর্তে থাকে লুচি আর পাঁচরকম ভাজা। নবমীর দিন একটি পাত্রে ১৫ কিলো বাটা চিনি ভোগ দেওয়া হয়।


নবমীর দিনই সন্ধ্যাবেলা বাড়ির সবাই মিলে প্রতিমার সামনে উঠোনে নানারকম অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। পুজো শুরুর দিন থেকে এই নিয়ম চলছে। বৈষ্ণবদাস মল্লিক ওরিয়েন্টাল সেমিনারির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। শোনা যায়, তিনি এই স্কুলের বাচ্চাদের নিয়েও তাঁর বাড়ির পুজোয় নানা অনুষ্ঠান করাতেন।
দশমীর দিন বাড়িতে দেবীকে বরণ করার পরে কনকাঞ্জলি দেওয়া হয়। এর পরে প্রতিমা কাঁধে নিয়ে জগন্নাথঘাটে বিসর্জন দেওয়া হয়। আগে জোড়া নৌকায় দেবীর বিসর্জন হত, তখনই ছাড়া হত নীলকন্ঠ পাখি। এখন সে সব প্রথা আর নেই।
কালের নিয়মে অনেক প্রথা বন্ধ হলেও আজও একই ভাবে চলছে একটি প্রথা। হাতে আঁকা চালচিত্র। আজকের দিনে অধিকাংশ চালচিত্র হয় ডিজিটাল ছাপানো, সেখানেই ব্যতিক্রমী বৈষ্ণবদাস মল্লিক বাড়ির এই পুজো।
শুরুর দিন থেকেই একটি পটে আঁকা ছবির অনুকরণে তৈরি হয় দেবীর চালচিত্র। বৈষ্ণবদাসের সময় থেকেই পটটি রক্ষিত বাড়িতে। তিনি ছিলেন ঘোর বৈষ্ণব। এই পটটি দেখে দেবীর চালচিত্র আঁকা হবে বলে ঠিক করেছিলেন তিনিই।


এতে চিত্রিত রয়েছে বিষ্ণপুরাণ আর চণ্ডীপুরাণ। আজও এই বাড়ির বর্তমান প্রজন্মের হাতে সেজে ওঠে মহামায়ার চালচিত্র। নবেন্দু মল্লিক আর তার ভাই নীলাভ মল্লিকের হাতেই প্রতি বছর বিষ্ণপুরাণ, চণ্ডীপুরাণ, দশমহাবিদ্যা, মহিষাসুরমর্দিনী, রামায়ণের গল্পে সেজে ওঠে চালচিত্র।
এই চালচিত্রের বিষয়ে নবেন্দু মল্লিক জানাচ্ছেন, “যেহেতু আমাদের বাড়ির দুর্গা থাকেন শিবের কোলে, তাই চালচিত্রে মহাদেব থাকেন না, চালচিত্রে মাঝে দশভুজা থাকেন আর দুদিকে থাকে বিষ্ণপুরাণ, চণ্ডীপুরাণ এবং রামায়ণের কথা ছোট করে আঁকা, আর মধ্যিখানের অংশে কালিকাপুরাণ, দশমহাবিদ্যা অংশ।’



নবেন্দু মল্লিকের কথায়, ‘আগে পটুয়ারাই আঁকতেন, যেমন গোপেন পাল। গোপেন পালের মৃত্যুর পর থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, আমি আর আমার ভাই যেহেতু আমরা আঁকতে পারি তাই আমরাই আঁকবো। আমাদের বাড়ির দেবী একচালার। মাঝে একটি কুলুঙ্গি আছে। তাতে অধিষ্ঠিত থাকেন শিব। তাঁর কোলে দেবী দুর্গা। দুই পাশে পদ্মের উপরে দাঁড়িয়ে আছেন লক্ষ্মী এবং সরস্বতী। দুইজনেই দেবীর থেকে আকারে অনেক বড়। কার্তিক-গণেশ দুই পাশে। পদ্মের উপরে গনেশ আর ময়ূরের উপরে কার্তিক অধিষ্ঠিত।’
মায়ের রূপ নিয়ে নবেন্দু মল্লিক জানালেন, ‘আমাদের বাড়ির মা কিন্তু শিবের কোলে অবস্থান করেন, অনেক বাড়িতেই দেখবেন ষাঁড়ের ওপর শিব এবং তার কোলে দুর্গা অর্থাৎ হরগৌরী। আমাদের তা নয় আমাদের বাড়ির মায়ের অভয়া রূপ, আমাদের বাড়ির মেয়ে রূপেই পূজিত হন। ওই জন্যই মায়ের দুটি চোখ, তৃতীয় নয়ন যেহেতু রুদ্ররূপের প্রতীক, আর আমাদের মা অভয়া রূপে তাই ত্রিনয়ন নেই, এবং এক মাত্র কার্ত্তিক ছাড়া কারওর হাতের কোনও অস্ত্র নেই এবং গণেশেরও চার হাতে চারটে পদ্ম।’
কেন এই রূপ? নবেন্দু মল্লিকের কথায়, ‘এমন রূপের কারণ বলতে হলে, বলা যায় বৈষ্ণবদাস মল্লিক স্বপ্নে যেভাবে দেখেছিলেন সেই ভাবনাই পটুয়া ফুটিয়ে তুলেছিলেন। কুলুঙ্গির নিচে দেবীর বাহন সিংহ রয়েছে দু’টি। এ ছাড়া, দেবীর চালার বাইরে দুইদিকে থাকে জয়া-বিজয়ার মূর্তি। চালচিত্রের আঁকার একটা মাস্টার পট আছে বৈষ্ণবদাস মল্লিকের সময় থেকেই, সেটা দেখেই প্রতিবার আমরা আঁকি। মূলত কাজ থেকে ফিরে দু ভাই আঁকি, কখনও ১৫ দিন আবার কখনও একটু বেশি সময় লাগে। কিন্তু পুজোর আগেই হয়ে যায়, এইভাবেই চলে আসছে।” এবারেও তার কোনও ব্যতিক্রম হচ্ছে না, সঠিক সময়েই চালচিত্র সম্পূর্ণ হবে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত