(Religious Token)
অতীত থেকে বর্তমান। কালের যাত্রাপথে যুগযুগ ধরে চলে আসা তীর্থদর্শন ও তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ধর্মীয় প্রতীক বা Religious Token সম্পর্কে কিছু কথা রইল আজকের এই লেখায়।
ধর্মীয় টোকেন নানা ধর্মীয় চিহ্ন বা দেবদেবী বা কোনও ধর্মগুরুর ছবি উৎকীর্ণ করে তৈরি গোলাকার ধাতব চাকতি।

সারা ভারত জুড়ে নানা ধর্মের নানা তীর্থস্থান থেকে এক সময় পুণ্যার্থীদের মধ্যে এগুলি বিতরণ করা হত। কৈশোরে এমন নানা ধর্মীয় প্রতীক বা টোকেন যখনই দেখেছি, তখনই মনের মধ্যে নানা প্রশ্ন উঁকি দিত। কারা এগুলো তৈরি করাত? কাদের দিয়েই বা তৈরি করাত? কী উদ্দেশ্যে করাত? কোথায় এদের পাওয়া যায়? ইত্যাদি।
এই নিয়ে বাবা, কাকা, জ্যাঠা, ঠাকুরদা বা বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রশ্ন করে তাঁদের কাছে যা শুনেছি, তা আবার তাঁরা তাঁদের বাপ-ঠাকুরদাদের কাছে শুনেছিলেন। তাঁরা আবার সেকথা তাঁদের অগ্রজদের মুখে শুনেছেন।
আরও পড়ুন: ব্রিটিশ ভারতে দেশীয় রাজারা
জনশ্রুতি বোধহয় এই ভাবেই বংশপরম্পরায় বাহিত হয়। যাই হোক, এই সব থেকেই মনের মধ্যে এ সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলি সম্পর্কে একটা ভালবাসাও জন্মে গিয়েছিল। বড় হয়ে ভারতবর্ষের যেখানেই বেড়াতে গিয়েছি সেখানেই মঠ, মন্দির, মসজিদের আশেপাশে এগুলির খোঁজ করেছি। অনেক জায়গায় পেয়েও গিয়েছি নানা ধর্মের এমন মহার্ঘ্য বস্তু। এভাবেই বিগত ৫০ বছর ধরে এমন নানা টোকেন আমার সংগ্রহে স্থান পেয়েছে।

ভারতবর্ষ নানা ধর্মের মানুষের দেশ। এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ, মুসলমান, খ্রিস্টান, পারসিক প্রভৃতি নানা ধর্মের মানুষ বাস করেন। তাই আমরা সারা দেশ জুড়ে দেখতে পাই মন্দির, মসজিদ, দরগা, মঠ, গির্জা প্রভৃতি নানা ধর্মের মানুষের আরাধনার স্থান। স্মরণাতীতকাল থেকে এগুলি তৈরি হয়ে এসেছে।

নিচে পিকচার পোস্টকার্ডে শতবর্ষ আগে ক্যামেরায় তোলা নানা ধর্মের কয়েকটি পবিত্র স্থান


আজ থেকে দেড়শো-দুশো বছর আগে আমাদের দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনকার মতো উন্নত ছিল না। সমতলে চারদিক ছিল বনজঙ্গল, খানাখন্দ, বাঁশঝাড়, ডোবায় ভর্তি। ছিল বন্য জীবজন্তু, সাপখোপ ও বিষাক্ত পোকামাকরের উপদ্রবও। গ্রামবাংলার পরিবেশ তখন এমনই ছিল। তার ওপর ছিল কালাজ্বর, ম্যালেরিয়া, ওলাওঠা বা আমাশয়ের মতো ভয়ঙ্কর সব অসুখ।


আবার, অন্যদিকে ছিল দুর্গম শাপদসংকুল পাহাড়-পর্বত, খরস্রোতা নদী বা দুর্গম মরুঅঞ্চল। ফলে ব্যক্তিগত কাজ বা ব্যবসার প্রয়োজনে সাধারণ মানুষ বা বণিকসম্প্রদায়কে তাদের পণ্যদ্রব্য নিয়ে বিপদ মাথায় করেই একে স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করতে হত। ডাঙায় ভয় ছিল হিংস্র জীবজন্তুর, ঠ্যাঙারে বা ডাকাতের আর জলে ভয় ছিল জলদস্যুর, কুমির-কামট বা প্রাকৃতিক ঝড়-ঝঞ্ঝার।

এই সব বিপদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অবস্থাপন্ন ধনী মানুষেরা বা জমিদার বা সওদাগরেরা যাত্রাপথে বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানগুলিতে পুজো দিয়ে আগে থেকে বরাত দিয়ে বানানো সোনা, রুপা, তামা, পিতল বা অন্য কোনও সংকর ধাতুর ধর্মীয় প্রতীক (Religious Token) সেখানে দান করে গন্তব্যে পাড়ি দিতেন।
এই ধর্মীয় গোলাকার প্রতীকগুলি হত নানা রকম। যাঁরা বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ, তাঁরা শিব, মা কালী, মহাদেব, গনেশ, লক্ষ্মী প্রভৃতি আরাধ্য দেবতাদের ছবি উৎকীর্ণ গোলাকার ধর্মীয় প্রতীক (Token) মন্দিরে দান করতেন। যেহেতু এগুলি মন্দিরের দেবতার কাছে উৎসর্গ করা হত, তাই এদের Temple Token-ও বলা হয়।

আবার যাঁরা ওড়িয়া, তাঁরা তাঁদের ইষ্ট দেবতা জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার একত্রিত ছবি উৎকীর্ণ গোলাকার প্রতীক জগন্নাথ মন্দিরে জমা দিতেন।

বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের পুণ্যার্থী যাঁরা, তাঁরা মন্দিরে দান করতেন রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তিওলা প্রতীক বা টোকেন।

উত্তর ভারতের রামভক্ত ব্যবসায়ীরা ওখানকার মন্দিরগুলিতে জমা দিতেন রাম-সীতা বা রামসভার ছবি উৎকীর্ণ প্রতীক বা মুদ্রা। এদের এক কথায় ‘রাম-টঙ্কা’ও বলা হয়।

এই রামটঙ্কা যে কতরকমের হত, তার ঠিক নেই। এখানে মোটামুটিভাবে দেখা যায়, শ্রীরামচন্দ্র ও মা সীতা অযোধ্যার সিংহাসনে বসে আছেন। দুইপাশে দুজন রাম-সীতার মাথার উপর ঝালর দেওয়া রাজছত্র ধরে আছে। সিংহাসনের নিচে আছে রামভক্ত হনুমান।
এখানে একটি জিনিস লক্ষ করার। তা হল, মূল বিষয়টা এক হলেও কোনও এক টোকেনের ছবির সঙ্গে অন্য টোকেনের ছবির পুরোপুরি মিল পাওয়া ভার। একেক কর্মকার ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে তাঁর তৈরি ছাঁচে তাঁর পছন্দমতো ভঙ্গিমায় রাম-সীতাকে সিংহাসনে বসিয়েছেন।
আবার অনুচরদের হাতের সুন্দর সুন্দর ছাতাগুলো নানাভাবে রাম-সীতার মাথায় ধরিয়েছেন। যেখানে প্রয়োজন সেখানে ছাতার দণ্ডগুলোকে একটুখানি বেঁকিয়ে দিতেও দ্বিধা করেননি।
আর সর্বোপরি সিংহাসনের নিচে থাকা হনুমান যে কতভাবে আসীন! কখনও সোজা কখনওবা পাশ ফিরে বসা, অর্ধেক বসা, অর্ধেক শোয়া বা পুরোপুরি নানা ভঙ্গিমায় শোয়া। আবার একইসঙ্গে এসব অঞ্চলের মন্দির থেকে দেওয়া টোকেনে শুধুমাত্র রামভক্ত হনুমানের ছবিও দেখা গেছে।

এছাড়া কিছু দেবালয় থেকে পাওয়া টোকেনে রাম-লক্ষণের মূর্তি পাশাপাশি দাঁড়ানো অবস্থায় দেখা যায়। তাঁদের সঙ্গে আছে তীর ও ধনুক।

এখন ১২ মাস তথা ৩৬৫ দিনই সারা ভারত এমনকি বিদেশেও পর্যটন ব্যবসার রমরমা। কিছু পুঁজি ও কয়েকদিনের ছুটির বন্দোবস্ত করে মানুষ পরিবার নিয়ে বেরিয়ে পড়েন দেশ-বিদেশের পছন্দসই কোনও স্থানে ক’টা দিন কাটিয়ে একটু আনন্দ উপভোগ করতে।

যাওয়া-আসার পথে কোথাও কোথাও ধর্মস্থান দর্শন হয় বটে, কিন্তু সেই ভ্রমণ শুধু তীর্থদর্শনের জন্যই নয়। বরং বলা যেতে পারে, রোজকার ব্যস্ত জীবন থেকে বেরিয়ে ক’টা দিন পছন্দসই পাহাড়, সমুদ্র, বনাঞ্চল বা মরুপ্রদেশের দামি হোটেল বা রিসর্টে থেকে পছন্দসই ভাল ভাল খাবার খেয়ে দর্শনীয় স্থানগুলি ঘুরে আবার ফিরে আসা।
তবে পরিবারের বয়স্ক লোকেদের নিয়ে কয়েকদিনের জন্য কেউ কেউ কাশী, গয়া, কেদারনাথ, বদ্রীনাথ বা নিদেনপক্ষে পুরীধামে যে যান না, তা কিন্তু নয়। তবে তা সংখ্যায় খুবই কম।

এছাড়াও, কার্ডবোর্ডের তৈরি ‘মিনি’ দেশলাই বাক্সে বিদেশি ট্যুরিস্ট স্পটের ছবিও প্রকাশিত হত ভ্রমণার্থীদের ভ্রমণের ইচ্ছে খানিক উস্কে দেওয়ার জন্য। মধ্যবিত্ত বাঙালিদের মধ্যে যাঁদের আর্থিক অবস্থা একটু ভাল, তাঁরা অন্তত দু-একবার হলেও পরিবার নিয়ে পর্যটন সংস্থার সঙ্গে অল্পদিনের ভ্রমণে গিয়ে তাঁদের বিদেশ ভ্রমণের শখ-আহ্লাদ মিটিয়ে নেন।

আজ থেকে দেড়-দুশো বছর বা তারও আগেকার ছবি কিন্তু এমন ছিল না। তখন পর্যটন বলতে কিছুই ছিল না। মানুষজন জীবনের শেষপ্রান্তে এসে সাধ্যমতো কিছু টাকাপয়সা সম্বল করে তীর্থদর্শনে বার হতেন। একেকটি গ্রাম বা মহল্লা থেকে কয়েকজন যাত্রী একত্রিত হয়ে গ্রামের পণ্ডিতসমাজের কাছে তাদের তীর্থদর্শনের মনোবাসনা জানিয়ে অনুমতি চাইতেন। পণ্ডিতরা পাঁজিপত্তর ঘেঁটে শুভ দিনক্ষণ দেখে যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দিতেন। যাত্রা শুরুর আগে সবাই তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে শেষ দেখাসাক্ষাৎ করে নিতেন। কারণ যাত্রাপথ ছিল অতি দুর্গম। তাঁরা আদৌ আর ফিরে আসতে পারবেন কি না তার কোনও নিশ্চয়তা ছিল না।




দলের মধ্যেই একজনকে দলপতি নির্বাচন করে তাঁর নির্দেশ মতো সবাইকে চলতে হত। বনবাদাড়, খানাডোবা ভেঙেই যাতায়াত করতে হত বলে অনেকেই যাতায়াতের জন্য জলপথকে বেছে নিতেন। বণিকেরা তাঁদের পণ্যদ্রব্য নিয়ে কাঠের তৈরি বড়ো বড়ো পালতোলা জাহাজে করে বাণিজ্য করতে বেরোতেন। আর সাধারণ মানুষ ছোট-বড় নৌকাতেই দরকারি কাজ বা তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে পড়তেন।
নৌকাতেই রান্না, বিশ্রাম, ঘুমানো। নৌকাতেই সব। যে কোনও সময়ে ঝড়ঝঞ্ঝায় নৌকাডুবি হত বা জঙ্গলে কাঠ অথবা পানের উপযোগী কোনও জলাশয় থেকে জল সংগ্রহ করতে গিয়ে হিংস্র জন্তুর পেটে যাওয়া বা জলদস্যুর আক্রমণে নিহত হওয়া নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল।
যাত্রীরা সকাল সকাল উঠে স্নান সেরে ঘরের ঠাকুরকে প্রণাম করে একসঙ্গে চলে যেতেন গ্রামের মন্দিরে। তখন গ্রামে একাধিক দেবমন্দির থাকলেও শিব, কালী, চণ্ডী, শীতলা বা অন্য কোনও লৌকিক দেবতার বিশেষ কোনও একটি মন্দিরকেই গ্রাম-দেবতার মন্দির বলে মানা হত। অন্য সব মন্দিরে নিত্যপুজো হলেও ওই বিশেষ মন্দিরেই গ্রামবাসীরা কোনও শুভকাজ শুরু করার আগে পুজো দিতেন।
মন্দিরে পুজো দেওয়ার পর বিগ্রহকে প্রণাম করে ও প্রসাদ গ্রহণ করে তাঁরা রওনা দিতেন খাল বা নদীর ঘাটে। বাংলায়, বিশেষ করে পূর্ববাংলায় নদী-নালার অভাব ছিল না। সেখানে আগে থেকেই শক্তপোক্ত পাল খাটানো বা দাঁড়ে টানা নৌকা আর মাঝিমাল্লা নিয়ে হাজির হয়ে যেত অভিজ্ঞ প্রধান মাঝি।
যথাসময়ে পুরোহিত ঠাকুর এসে নৌকার গলুই ধুয়ে মুছে তেল, সিঁদুর, হলুদ মাখিয়ে নানা নকশা কেটে ফুল, মালা দিয়ে বিধিমতো পুজো সেরে নিতেন। তারপর তীর্থযাত্রীদের কপালে এঁকে দিতেন তিলক। যাত্রীরা পুরোহিতকে প্রণাম করে তাঁর আশীর্বাদ নিয়ে নৌকায় উঠে পড়তেন। ইতিমধ্যে তাঁদের পিছনে পিছনেই বিদায় জানাতে ঘাটে এসে উপস্থিত হন তাঁদের পরিবার-পরিজন, পাড়া-প্রতিবেশীরা। তাঁরা মনে করতেন, এঁদের তীর্থদর্শন সফল হলে সারা গ্রামের মঙ্গল সাধন হবে।

তখন বড় বড় জমিদারদের জমিদারি এলাকার মধ্যে থাকত একাধিক গ্রাম। এমনও শোনা যায় যে কোনও কোনও গ্রামের ঈশ্বরভক্ত ও দয়ালু জমিদারবাবু তাঁর বিশেষ প্রতিনিধি মারফৎ বজরায় তীর্থযাত্রীদের সিধে পাঠিয়ে দিতেন।

দীর্ঘযাত্রায় ব্যবহার করার জন্য সেখানে থাকত মাটির কলসিতে বেশ কিছু চাল, ডাল, বেতের ধামায় নানা মশলাপাতি, পিতলের কলসিতে কলুর ঘানির খাঁটি সরষের তেল ইত্যাদি। এ ছাড়াও পরিধানের জন্য কিছু ধুতি, ফতুয়া, উত্তরীয় আর সঙ্গে কিছু রুপোর টাকাপয়সা। অন্যদিকে ধর্মপ্রাণ সাধারণ গ্রামবাসীরা দিতেন টাটকা শাক-সবজি, বাড়িতে বানানো খই, মুড়ি, মুড়কি, চিড়ে, গুড়, বাতাসা আর মুড়ি, চিড়ের মোয়া বা নারকেল ও তিলের নাড়ু প্রভৃতি যার যেমন ক্ষমতা।
এবার যাত্রার শুভ সময় উপস্থিত। পুরোহিত যাত্রার নির্দেশ দিতেন। ধীরে ধীরে নৌকা ছেড়ে দিত। তীর্থযাত্রীদের আশৈশব কাটানো জন্মভূমি, ঝাপসা হয়ে যেত। দু-চোখ বেয়ে নেমে আসত অশ্রুধারা। ওদিকে পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলিও কোনও এক অজানা আশঙ্কায় জলভরা চোখে দু-হাত কপালে ঠেকিয়ে ঠাকুরের কাছে কৃপা প্রার্থনা করত।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
