(Shukhalata Rao Memorial)
বিশ শতকের গোড়ায় ঔপনিবেশিক ভারতে শিল্প এক নতুন মাত্রা পেয়েছিল। এই সময়ের আগে শিল্পের নান্দনিক মূল্যই ছিল প্রধান। বিশ শতক থেকে শিল্পের বার্তাবাহক পরিচয়টি উপনিবেশের মনিব ও বান্দা সকলের কাছেই স্পষ্ট হয়ে ধরা দিতে থাকল। রাজনৈতিক মতাদর্শ ব্যক্ত করার মাধ্যম হয়ে উঠল শিল্প। ১৯০৫ সালে বাংলার বুক জুড়ে বইছে বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশি আন্দোলনের ঢেউ। সেই সময় থেকে শিল্প হয়ে উঠল লড়াইয়ের অন্যতম বড় হাতিয়ার।
আরও পড়ুন: ক্ষুৎকাতর: দ্বিতীয় পর্ব
বিশ শতকের একেবারে গোড়াতেই, ১৯০১ থেকে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়-এর সম্পাদনায় চালু হয়েছিল ‘প্রবাসী’ পত্রিকা। পরে ১৯০৭ সালে ‘Modern Review’ পত্রিকা প্রকাশিত হতে শুরু করে। কিছুদিন পরে চালু হয় ‘রূপম’। এরপর একে একে ‘প্রদীপ’, ‘ভারতী’, ‘সাধনা’, ‘শিল্প ও সাহিত্য’ ইত্যাদি সব পত্রিকা প্রকাশ শুরু হল। পাশাপাশি পত্রিকার পাতা জুড়ে শুরু হয়ে গেল ভারতীয় শিল্প কাকে বলে তা নিয়ে বিস্তর বাগবিতণ্ডা।

প্রকাশ্যে তুমুল তর্কে নামলেন কলকাতার অবিস্তৃত বিদ্বৎসমাজ। একদিকে বেঙ্গল স্কুল, অন্যদিকে পশ্চিমী চিন্তার সমর্থক। একদিকে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ও সি গাঙ্গুলি; অন্যদিকে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ও তাঁর পরিবার। ভারতীয় আদর্শ শিল্প ভারত থেকেই তৈরি হয় ও হবে— এমনটা ছিল এক পক্ষের রায়। আর এক পক্ষের বক্তব্য ছিল— ঔপনিবেশিক মনিবদের শৈলী প্রশংসার দাবি রাখে তাই সে শিক্ষা তাদের কাছ থেকে নেওয়াই উচিত।
তবে এঁরা এক সঙ্গে কাজ করতে পিছপা হতেন না। একই পত্রিকা বিরোধী স্বরের লেখাও ছাপত। মুদ্রাকর হিসেবে উপেন্দ্রকিশোর বিরোধী পক্ষের ছবি ছাপতেন। মহিলারা এই তর্কে সরাসরি অংশ না নিলেও, ক্ষীণ স্বর ও বক্তব্য তাঁদেরও ছিল। সুখলতা রাও এই তর্কে এসেছিলেন তাঁর পিতা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর পদাঙ্ক অনুসরণ করেই। ছোট ভাই সুকুমার রায়কে সমর্থন করা ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।

সদ্য আবিষ্কৃত অজন্তার গুহাচিত্র সেই সময় তুমুল আলোড়ন ফেলেছিল নানা দেশে। ভারতীয় শিল্পের এই আদর্শ দেখে খুশি হননি সুখলতা, কারণ নগ্নপ্রায় অজন্তার নারীচিত্র ঠিক সর্বসমক্ষে দেখা বা দেখাবার নয় মনে হয়েছিল তাঁর। শিশুদের দেখাবার তো প্রশ্নই ওঠে না। এর চেয়ে মার্জিত রুচিশীল পশ্চিমী দৃশ্যচিত্র এবং pre-Raphaelite-দের চিত্রশিল্প তাঁকে টানত অনেক বেশি।
এখানে হয়তো এও ভুললে চলবে না যে, সুখলতার প্রজন্মই বাংলাদেশে প্রথম আধুনিক নিয়মে শাড়ি ব্লাউজ সেমিজ পরতে শিখেছিলেন। সে সাজের অবমাননা মেনে নেওয়া মোটেই সহজ নয়। উনি নিজে অবশ্য বলেছেন, ঘাগরা-চোলি ভারতীয় আদর্শ পোশাক হিসেবে অতি শিষ্ট। নিশ্চয় মনের ভিতরে রাজস্থানী চিত্রের কথা ভেবেছিলেন সেই সময়!
প্রবাসী পত্রিকাতে হয়তো তিনিই প্রথম মহিলা, যাঁর আঁকা ছবি ছাপা হয়। বাংলায় প্রথম শিল্পী এবং একই সঙ্গে লেখিকা হওয়ার কৃতিত্ব তাঁরই প্রাপ্য, কারণ সচিত্র গল্প লিখে ওঁর আগে কেউ ছাপাননি।
তৈলচিত্রে মানুষের প্রতিকৃতি আঁকার শখ তাঁর পূরণ হয়নি, কারণ মহিলা হিসেবে কারুর কাছে কারিগরি ওই প্রকৌশল শেখার সৌভাগ্য সেই সময় ছিল না। পাশের ঘরেই তরুণ ইতালি ফেরৎ তৈলচিত্র শিল্পী শশিকুমার হেশ থাকলেও সে বিদ্যা আয়ত্ত করার অধিকার পাননি তিনি। প্রথাগত শিল্পশিক্ষার উপায় ছিল না। ভাগ্য ভাল ছিল, তাই জন্মেছিলেন উপেন্দ্রকিশোরের ঘরে। বাবার কাছে হয়েছিল পারিবারিক হাতেখড়ি। খুব কম পরিবারেই সে সময় মহিলাদের এমত শিক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
২৬ অক্টোবর ১৮৮৬তে জন্ম উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ও বিধুমুখীর প্রথম সন্তান সুখলতা ওরফে হাসির। শিশু সাহিত্যিক হিসেবে বাঙালিরা সুখলতাকে মনে রাখে ঠিকই, কিন্তু সাহিত্য জগতে পদার্পণের আগেই তিনি হাতে নিয়েছিলেন তুলি।

১৯০৬-৭ সালে পান ভারতীয় কারিগরী ও কৃষি প্রদর্শনীতে মহিলা বিভাগে পদক, ১৯১০ সালে জলরঙের জন্য সংযুক্ত প্রদেশসমূহের প্রদর্শনীতে প্রথম পুরস্কার। এ ছাড়াও আরও অনেক পুরস্কার পেয়েছিলেন, কিন্তু ছবি আঁকার জগৎ থেকে বিদায় নেন অল্প বয়সেই। বেঁচে ছিলেন ৮৩ বছর। ১৯৬৯ সালে ৯ই জুলাই মারা যান সুখলতা।
প্রবাসী পত্রিকাতে হয়তো তিনিই প্রথম মহিলা, যাঁর আঁকা ছবি ছাপা হয়। বাংলায় প্রথম শিল্পী এবং একই সঙ্গে লেখিকা হওয়ার কৃতিত্ব তাঁরই প্রাপ্য, কারণ সচিত্র গল্প লিখে ওঁর আগে কেউ ছাপাননি।
শেষ যে সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়, তাতেও মনের মতো ছবি আঁকতে না পারার দুঃখের কথা বলেছিলেন। অথচ ওঁর ছবি হারিয়ে গেছে লেখক সুখলতা রাও বেঁচে থাকতে থাকতেই।
১৯১২তে যখন ওঁর প্রথম বই বেরোয়, তাতে ছিল নিজের হাতে আঁকা বাচ্চাদের জন্য সব সাদা-কালো ছবি। ১৯২০ সাল অব্দি নিজেই আঁকতেন বইয়ের ছবি। ক্রমশ তা হারিয়ে যায় (সম্ভবত) পেশাগত শিল্পীদের চাপে। শেষ ছবি আঁকেন বাচ্চাদের জন্য লেখা ইংরেজি বই বেহুলা-র জন্য, ১৯৩০ সালের পর। সে বইখানা নানা কারণে খুব ব্যতিক্রমী। এটি একমাত্র বই যাতে ওঁর আঁকা রঙিন ছবি দেখা যায়। সুখলতার ছবিতে যে বিদেশি ছবির প্রভাব চোখে পড়ে, সে কৌশল তিনি উপেন্দ্রকিশোরের কাছ থেকেই শিখেছিলেন। কাজের ধরন খেয়াল করলেই সাদৃশ্য বোঝা যায়— বিষয় ও আঙ্গিক দু’দিক থেকেই।

এরপর তাঁর দীর্ঘ জীবনে শুধু নিকট আত্মীয়স্বজন ছাড়া আর কারওর জন্য এঁকেছিলেন বলে জানা যায় না। নিজের জগতে নানা কাজে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন, যেগুলো নিঃসন্দেহে খুব মূল্যবান। কিন্তু প্রকাশ্য জগতে চিত্রশিল্পী কেন রইলেন না, এ এক আশ্চর্য রহস্য। পরবর্তী জীবনে সমাজ সেবায় মন দিয়ে ১৯৪৪ এ কাইজার-ই-হিন্দ পদক পান। আমৃত্যু শিশুদের জন্য লিখে গেছেন, অনুবাদ করেছেন গল্প কবিতা নাটক।
শেষ যে সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়, তাতেও মনের মতো ছবি আঁকতে না পারার দুঃখের কথা বলেছিলেন। অথচ ওঁর ছবি হারিয়ে গেছে লেখক সুখলতা রাও বেঁচে থাকতে থাকতেই। আজও ভারতীয় যাদুঘরে সবার অলক্ষ্যেই ঝোলে ওঁর একটা ছবি। ওঁর লেখা বইয়ের পাতায় ছবি আঁকেন অন্য শিল্পীরা। মহিলা বলেই কি এই পরিণতি সুখলতার প্রাপ্য ছিল?
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
