Sanatan Dharma
(Sanatan Dharma)

ইদানীং ‘ধর্ম’ নিয়ে আলোচনায় ‘সনাতন’ শব্দটি আমাদের দেশে খুব গুরুত্ব পাচ্ছে। দুটি শব্দ জুড়ে গিয়ে পূর্ব প্রচলিত ‘বৈদিক ধর্ম’, ‘পৌরাণিক ধর্ম’-এর স্থান নিচ্ছে বা নিতে চাইছে। সনাতন কী? পাণিনির একটি সূত্র আছে সেটি বিবেচনা করার জন্য। ‘সায়ংচিরংপ্রাহ্ণপ্রগেঽব্যয়েভ্যস্ত্যুট্যুলৌ তুট্ চ’। এই নিয়ম অনুসারেই ‘সনা’ অব্যয়ের সঙ্গে ‘ত্যুল’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘সনাতন’ শব্দটি তৈরি হয়েছে। এখানে ‘সনা’ একটি প্রাচীন বৈদিক অব্যয়, যার অর্থ সর্বদা, চিরকাল বা বহু পূর্বে। 

পাণিনীয় ধারা অনুযায়ী এই প্রত্যয়টি ‘তত্র ভবঃ’ অর্থাৎ সেখানে উৎপন্ন বা সেখানে বিদ্যমান— এই অর্থে ব্যবহৃত হয়। সেই হিসেবে পাণিনির ব্যাকরণ ‘সনাতন’ শব্দের দুটি মূল অর্থ প্রকাশ করে। চিরন্তন বা শাশ্বত অর্থাৎ যা চিরকাল ধরে বিদ্যমান বা সর্বদা থাকে। পুরাতন বা প্রাচীন, যা অনেক আগে বা বহু অতীত কাল থেকে চলে আসছে। একটু লক্ষ করলে এখানেই একটি বিরোধাভাস চোখে পড়ে।


আরও পড়ুন: কলকাতার দুর্গাপুজো: বদলে যাওয়া এক উৎসবের গল্প


চিরকাল ধরে চলা আর বহু অতীত থেকে চলা এক নয়। বিজ্ঞান জানিয়েছে, সময়েরও জন্ম আছে। আবার সাধারণ কল্পনাতেও ‘চিরকাল’-এর যে অপরিবর্তনীয় মাত্রা আছে, তা ‘বহু পূর্বে’ নেই। কারণ তারও পূর্বে গেলে ছেদ পাওয়া যেতেই পারে। তাহলে কোন অর্থটিকে নেব? এর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যাস্ক। তবে তাঁর ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে আমরা ‘ধর্ম’-এর অর্থগত সমস্যাকেও খানিক খতিয়ে দেখব।

Sanatan Dharma
ব্রাহ্মণ ঋষিমুনিদের সম্পদ কম ছিল না কখনই

মহাভারতে ধর্ম শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ দুটি। ‘ধন’ পূর্ব্বক ‘ঋ’ ধাতুর উত্তর ‘মক্’ প্রত্যয় যোগ করলে যে ধর্ম হয়, তার অর্থ— যা থেকে ধনপ্রাপ্তি ঘটে। দ্বিতীয় ধর্ম শব্দটি ধারণার্থক ‘ধৃঞ’ ধাতুর সঙ্গে ‘মন্’ প্রত্যয় যোগ করায় নিষ্পন্ন হয়। অর্থ— যা সকলকে ধারণ করে।

তাহলে ধর্ম বলতে কোন অর্থকে আমরা নেব? চুরি-ডাকাতিতেও ধনলাভ হয়, ধনলাভ হয় রাজ্য ও পররাজ্য লুণ্ঠনেও। সে-ও কি ধর্ম? যা ধারণ করেছে, সেই অত্যাচার এবং অন্যায়, তা-ও কি ধর্ম? উত্তরটা সহজ নয়। মহাভারতও এর উত্তর দিতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছে। তাই দস্যুর ধর্মও নির্ধারণ করতে বসেছে।

Sanatan Dharma
দ্রৌপদী ও যুধিষ্ঠিরের বাক্যালাপ

শান্তিপর্বে আছে কায়ব্য নামক এক দস্যুর কথা। তিনি ইন্দ্রের কাছে মান্ধাতার জানা দস্যুধর্ম মেনে চলতেন। সে ধর্ম কী? একদিন তাঁর দলের দস্যুগণ তাঁর কাছে দস্যুধর্ম জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘স্ত্রীলোক, শিশু, তপস্বী, অযুধ্যমান পুরুষ এবং ভীরুকে বধ করতে নেই। স্ত্রীলোকের গায়ে কখনও হাত দিও না, ধর্মরক্ষার নিমিত্ত দস্যুতা করবে। সর্ব্বতোভাবে ব্রাহ্মণ ও তপস্বীদের কল্যাণ চিন্তা করতে হবে। পিতৃগণ, দেবগণ ও অতিথির পূজায় নিত্য অবহিত থাকবে। যারা সাধু পুরুষগণকে কষ্ট দিয়ে থাকে, কেবল তাদেরকে শাস্তি দেওয়াই দস্যুধর্ম। যাদের ধন সৎকাজে ব্যয়িত হয় না, তাদের ধন হরণ করলে কিছুমাত্র পাপ নেই। অসাধুর থেকে ধন হরণ করে সাধু পুরুষের পোষণ করা ধর্মকর্মের অন্তর্গত।’ এই ধর্ম পালন করে তিনি সিদ্ধি লাভ করেছিলেন।

বিপরীতের মিলন ঘটাতে চেয়েছেন নিরুক্তকার যাস্কও। প্রাচীন ভারতের শব্দব্যুৎপত্তিবিদ্যার অন্যতম আচার্য যাস্ক তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘নিরুক্ত’, যা বেদের অঙ্গ বা বেদাঙ্গ, তাতে কোনও শব্দের দার্শনিক বা ধর্মীয় ব্যাখ্যার চেয়ে তার ব্যবহারিক উৎস ও মূল ক্রিয়ামূলের উপর জোর দিয়েছেন বেশি।

মহাকাব্য-পুরাণাদির সব জায়গাতেই ব্রাহ্মণ-তপস্বীদের যে কারণে সুবিধে থাকে, এখানেও সে কারণেই আছে। বর্ণাশ্রমধর্মে শ্রেষ্ঠত্বের কথা তো মুখে বললে শুধু হবে না, কার্যেও পরিণত করাতে হবে। অতএব ব্রাহ্মণদের সুরক্ষার জন্য এই উপদেশ। ব্রাহ্মণ ঋষিমুনিদের সম্পদ কম ছিল না কখনই। বশিষ্ঠের কামধেনু থেকে জমদগ্নির সম্পদ- সবই হরণ করতে চেয়েছে ক্ষত্রিয়রা বারবার। এ তো পুরাণেই আছে।

অতএব এই বলে সুরক্ষা পাওয়ার চেষ্টা মহাকাব্যে। কিন্তু সে কথা বাদ দিলেও মহাভারত মহাকাব্যের আরেকটি বিরাট ধর্ম যে আনৃশংসী তথা অহিংসা, তার কী হবে? দস্যু হিংসা করেও ধর্মাচরণ করছে, আবার সাধকে অহিংসা মেনেও করছে? এমন বিপরীতের মিলন হবে কেমন করে?

Sanatan Dharma
দ্যূতসভায় দ্রৌপদী

বিপরীতের মিলন ঘটাতে চেয়েছেন নিরুক্তকার যাস্কও। প্রাচীন ভারতের শব্দব্যুৎপত্তিবিদ্যার অন্যতম আচার্য যাস্ক তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘নিরুক্ত’, যা বেদের অঙ্গ বা বেদাঙ্গ, তাতে কোনও শব্দের দার্শনিক বা ধর্মীয় ব্যাখ্যার চেয়ে তার ব্যবহারিক উৎস ও মূল ক্রিয়ামূলের উপর জোর দিয়েছেন বেশি।

সনাতন সম্পর্কে তিনি বলছেন— সনাতনং তমাহুঃ যঃ সর্বদা নব এব ভবতি। অর্থাৎ, ‘তাকেই সনাতন বলা হয়, যা প্রাচীন হওয়া সত্ত্বেও সর্বদা নতুন বা সতেজ থাকে।’ সর্বদা, চিরকাল বা বহুপূর্বের মধ্যে যে কালের মাত্রার বিরোধ, তার সমাধান এই ব্যাখ্যা তো হলই না, বরং জুড়ে গেল সর্বদা সতেজ থাকার দায়।

যখন দ্রৌপদী দ্যূতসভায় প্রশ্ন করেছিলেন, যুধিষ্ঠির নিজে পরাজিত এবং দাস হয়ে কেমন করে তাঁকে পণ রাখতে পারেন, তখন এই ভীষ্মই স্পষ্ট কোনও উত্তর দিতে অপারগ ছিলেন। ধর্মের গতি সূক্ষ্ম-টূক্ষ্ম বলে উত্তর দেননি।

এই একই জ্বালা মহাভারতের প্রচলিত পাঠেও ভোগ করতে হচ্ছে, ধর্ম সম্পর্কে আলোচনায়। তাতে যত ধর্মসম্পর্কিত উপদেশ আছে, তাদের মধ্যে বিরোধও অজস্র। সেই বিপুল উপদেশকে কোনও একটি সংজ্ঞার অধীন করা অসম্ভব। সেই অসম্ভবকে বুঝেই মহাভারতের মধ্যে ধর্ম শুধু সনাতন নয়, আরও নানারকম।

বর্ণাশ্রম ও দস্যুধর্মের কথা বলেছি আগেই। এখানে আরও নানা শাখা জুড়তে হবে। যেমন সমাজধর্ম, রাজধর্ম, লৌকিক ধর্ম, কুলধর্ম, জাতিধর্ম, দেশধর্ম ইত্যাদি। এর ফলে বারবার ধর্ম কী, এই প্রশ্নটা ঘুরে ফিরে আসছে মহাভারতের মহোপাখ্যানে। যুধিষ্ঠির-যক্ষ সংবাদ থেকে ভীষ্ম-যুধিষ্ঠির সংবাদ সর্বত্র একই প্রশ্ন।

Sanatan Dharma
যুধিষ্ঠির ও ভীষ্ম

যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নের উত্তরে শান্তিপর্বে ভীষ্ম বলছেন, ‘অনেকেই ধর্ম বিষয়ে সন্দিহান; ধর্মের বিধিপ্রণালী লৌকিক ব্যবহারের উপর অনেকাংশে নির্ভর করে। আপৎকালে অধর্মকেও ধর্ম বলে স্বীকার করতে হয়। ধর্ম নির্ণয় করা দুঃসাধ্য। কিন্তু এই কথা নিঃসংশয়ে বলা যায় যে, ধর্ম ইহলোকে ও পরলোকে কল্যাণ বহন করে আনে। লোকস্থিতি এবং আত্মশুদ্ধির নিমিত্তই সকল ধর্মের উপদেশ। অনুষ্ঠানের দ্বারা চিত্তশুদ্ধি হয়, চিত্তশুদ্ধি চরম পুরুষার্থের অনুকূল। সুতরাং যিনি উভয় লোকের কল্যাণ আকাঙ্ক্ষা করেন, তিনি ধর্মাচরণে নিশ্চয়ই আত্মনিয়োগ করবেন।’

যখন দ্রৌপদী দ্যূতসভায় প্রশ্ন করেছিলেন, যুধিষ্ঠির নিজে পরাজিত এবং দাস হয়ে কেমন করে তাঁকে পণ রাখতে পারেন, তখন এই ভীষ্মই স্পষ্ট কোনও উত্তর দিতে অপারগ ছিলেন। ধর্মের গতি সূক্ষ্ম-টূক্ষ্ম বলে উত্তর দেননি। দেবেন কেমন করে! ধর্ম নির্ণয় করা দুঃসাধ্য, নিজেই বলছেন পরে। এও বলছেন আপদ্ধর্ম বলে একটা বিষয় আছে। আপৎকালে অধর্মকেও ধর্ম বলে মানতে হয়।

মুশকিল হচ্ছে, এমন ব্যক্তিদেরও তো ভিন্নমত থাকবে। কারণ সৎ যিনি, তিনি সত্য অনুসারী হবেন। আপেক্ষিকতার সূত্র আবিষ্কারের আগে বা কুরোসাওয়ার ‘রশোমন’ চলচ্চিত্র তৈরি হওয়ার আগেও মানুষ জানত সত্য বলে একরকম কিছু নেই।

নইলে দ্যূতসভা থেকে কুরু-পাণ্ডব যুদ্ধে, নিজেদের তৈরি যাবতীয় নিয়ম ভেঙে, উভয়পক্ষ জয়লাভের জন্য যে নিন্দনীয় আচরণ করেছেন, তাকে ধর্মসম্মত বলে ব্যাখ্যা করবেন কেমন করে? এবং করতে গিয়ে এইভাবে মানতে বাধ্য হচ্ছেন— ‘সনাতন’ তথা ‘সর্বদা, চিরকাল’-এর সঙ্গে ‘বহু পূর্বে’-র বিরোধ মেটানো অসম্ভব। তখন হিসেব মেলাতে ধর্মের পাশে আপদ্ধর্মও লাগে। এসবের ফলে অনেকেই ধর্ম বিষয়ে অবশ্যই সন্দিহান হতেন সে যুগেও।

সেই সন্দেহ আবার দূর করার চেষ্টা করে মহাভারত। সেখানে যক্ষ-যুধিষ্ঠির সংবাদ আসে। যক্ষরূপী ধর্ম, বনে যুধিষ্ঠিরের ভাইদের হত্যা করেছেন। প্রশ্নোত্তরে যুধিষ্ঠিরের পরীক্ষা নিচ্ছেন। যক্ষরূপী ধর্ম জানতে চাইলেন, ‘কঃ পন্থা?’ অর্থাৎ, মানুষের চলার প্রকৃত পথ বা ধর্মের পথ কোনটি? তখন যুধিষ্ঠির এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বলেন, ‘তর্কোঽপ্রতিষ্ঠঃ শ্রুতয়ো বিভিন্না, নাসাবৃষির্যস্য মতং না ভিন্নম্।/ ধর্মস্য তত্ত্বং নিহিতং গুহায়াং, মহাজনো যেন গতঃ স পন্থা।।’

Sanatan Dharma
স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী

অর্থাৎ, কেবল তর্কের দ্বারা ধর্মের প্রকৃত সত্য প্রতিষ্ঠা করা যায় না, কারণ তর্কের কোনও শেষ নেই। বিভিন্ন বেদ, উপনিষদ বা ধর্মগ্রন্থে নানারকম মত ও পথ নির্দেশ করা আছে, যা সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। এমন কোনও মুনি বা ঋষি নেই, যাঁর মত অন্যের চেয়ে আলাদা বা ভিন্ন নয়। তাই ধর্মের আসল রহস্য বা তত্ত্ব অত্যন্ত গভীর এবং হৃদয়রূপ গুহায় লুকিয়ে আছে, যা সাধারণ বুদ্ধিতে বোঝা কঠিন। ফলে, মহাজনো যেন গতঃ স পন্থা। এই পরিস্থিতিতে, অতীত এবং বর্তমানের পরম জ্ঞানী, সৎ ও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ বা মহাজন যে পথ দিয়ে চলে গেছেন, সাধারণ মানুষের জন্য সেটি অনুসরণই একমাত্র সঠিক পথ।

মুশকিল হচ্ছে, এমন ব্যক্তিদেরও তো ভিন্নমত থাকবে। কারণ সৎ যিনি, তিনি সত্য অনুসারী হবেন। আপেক্ষিকতার সূত্র আবিষ্কারের আগে বা কুরোসাওয়ার ‘রশোমন’ চলচ্চিত্র তৈরি হওয়ার আগেও মানুষ জানত সত্য বলে একরকম কিছু নেই।

সবচাইতে উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার এটাও হবে যে এই ‘সনাতন’ শব্দটি বেদ, মহাভারত ছাড়াও আর কোথাও আছে কি না তা জানা! ধর্মের ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ জানা! খুঁজলে দেখা যায়, বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ সুত্ত নিপাতের অন্তর্গত ‘সুভাষিত সুত্তম’-এ ‘সনাতন’ শব্দটির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উল্লেখ রয়েছে।

শুধু মহাভারতের প্রচলিত পাঠেই আছে তেরো রকমের সত্যের কথা। ভীষ্ম তার আগে যুধিষ্ঠিরকে বলেছেন সত্য কী, কী উপায়ে তা লাভ করা যায় এবং কীভাবে সত্য রক্ষিত হয়। ভীষ্ম বলছেন, ‘সত্য সাধুদের পরম ধর্ম, সত্য সনাতনস্বরূপ, সতত সত্যের সেবা করবে। সত্যই ধর্ম, সত্যই যোগ, সত্যই ব্রহ্ম। সত্যের উপাসনাই যাগযজ্ঞ।’

ভাল কথা। আবারও সনাতন শব্দটিকে পেলাম আমরা। তথাপি সমস্যা গেল না। কারণ, ‘সত্যং ত্রয়োদশবিধং সর্ব্বলোকেষুভারত’ ইত্যাদি। মহাভারতেই যদি তেরো প্রকার সত্য ও তার তালিকা থাকে, তবে যুগের বদলে তা আরও কত প্রকারের হবে কে জানে!

Sanatan Dharma
কায়ব্য দস্যুর লুঠ এবং দলের মধ্যে সম্পদ ভাগ

সবচাইতে উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার এটাও হবে যে এই ‘সনাতন’ শব্দটি বেদ, মহাভারত ছাড়াও আর কোথাও আছে কি না তা জানা! ধর্মের ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ জানা! খুঁজলে দেখা যায়, বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ সুত্ত নিপাতের অন্তর্গত ‘সুভাষিত সুত্তম’-এ ‘সনাতন’ শব্দটির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উল্লেখ রয়েছে।

বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ধম্মপদ-এর বিখ্যাত শ্লোক হল, ‘ন হি বেরেন বেরানি, সম্মন্তীধ কুদাচনং।/ অবেরেন চ সম্মন্তি, এস ধম্মো সনন্তনো।।’ এর অর্থ হল, এই পৃথিবীতে শত্রুতা দিয়ে কখনও শত্রুতাকে প্রশমিত করা যায় না, কেবল মৈত্রী বা অবৈরীভাব দিয়েই তা দূর করা সম্ভব এবং এটিই চিরন্তন ও শাশ্বত নিয়ম।

যাঁরা এমন একরৈখিক কোনও ধর্ম, কয়েকজনের বিধানে চলবে, এমনটা মানতে রাজি ছিলেন না, সেই সময়েও; তাঁদের মধ্যে আর্য-সমাজ প্রতিষ্ঠাতা দয়ানন্দ সরস্বতীও পড়েন। ব্রিটিশ ওরিয়েন্টালিজম, তথাকথিত উদারবাদ, জার্মান ভাববাদ, ভিক্টোরীয় নীতিবাগ্মিতা ইত্যাদির বিরুদ্ধে, খ্রিস্টিয় প্রচারের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, তিনি এক অপৌত্তলিক বৈদিক ধর্মের খোঁজ করেছেন।

উনিশ শতকে, যখন ব্রিটিশরা, তাদের উপনিবেশ ‘ইন্ডিয়া’ শাসন করার জন্য, ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহে ধাক্কা খেয়ে, নতুন করে এই অঞ্চলের পূর্বতন শাসনগুলিকে বুঝতে চাইল, তখন তারা শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব, ঐন্দ্র, গাণপত্যাদি সকল ধর্মধারাকে, বেদ-বেদান্ত-উপনিষদাদি ও ষড় দর্শনের সঙ্গে একটি ছাঁচে ফেলতে চাইল। একটি ‘হিন্দু’ সম্প্রদায় সৃষ্টি করলে, একটি ধর্মশাস্ত্রের (যেমন মনুস্মৃতি) অধীনেই শাসন করতে পারবে ভেবেছিল। তাদের ওরিয়েন্টালিজমে তাই বর্ণধর্ম মানা টেক্সটগুলিই চর্চায় বেশি আসে।

Sanatan Dharma
বৌদ্ধ ভিক্ষুদের পুঁথি রচনা

শাসনের যে থাকবন্দিটা তৈরি হয়, তাতে চতুর্বর্ণের মাথায় বসে ব্রিটিশ। ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়াদিদের একাংশ তো তাদের সহায়তা করবেই শাসনে, তা-ও নিশ্চিত হয়। এই অবস্থায় বৈদিক ধর্ম, পৌরাণিক ধর্ম ইত্যাদি সরে গিয়ে চলে আসে ‘সনাতন ধর্ম’। এর তীব্র ঘোষণা সেই ঔপনিবেশিক শাসক সমর্থক অংশ থেকে। যেখানে ‘সনাতন’ এবং ‘ধর্ম’ দুটি শব্দেরই স্থির ও নির্দিষ্ট কোনও ব্যাখ্যাই অসম্ভব হলেও, একে জোর করেই মেলানো হয়।

যাঁরা এমন একরৈখিক কোনও ধর্ম, কয়েকজনের বিধানে চলবে, এমনটা মানতে রাজি ছিলেন না, সেই সময়েও; তাঁদের মধ্যে আর্য-সমাজ প্রতিষ্ঠাতা দয়ানন্দ সরস্বতীও পড়েন। ব্রিটিশ ওরিয়েন্টালিজম, তথাকথিত উদারবাদ, জার্মান ভাববাদ, ভিক্টোরীয় নীতিবাগ্মিতা ইত্যাদির বিরুদ্ধে, খ্রিস্টিয় প্রচারের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, তিনি এক অপৌত্তলিক বৈদিক ধর্মের খোঁজ করেছেন। যেমন করেছেন রামমোহন বাংলায়। তিলক, মহারাষ্ট্রে আবার গণেশ পূজার মতো উৎসবকে কাজে লাগিয়ে, মারাঠি হিন্দুদের বর্ণগত বিভেদ ভুলিয়ে আরেক হিন্দুত্ব নির্মাণ করতে চেয়েছেন। এমন নানা চেহারায় দেখা দিয়েছে, সেকালের ধর্ম ভাবনা।

Sanatan Dharma
কুরোসাওয়ার ‘রশোমন’

এখন আবার সনাতন ধর্মকে ডাকাডাকি চলছে। খবরের নানা মাধ্যমে, সমাজমাধ্যমে, শিক্ষাব্যবস্থায় ভারতের একটা চেহারা তুলে ধরার কাজ চলছে, যা যেন সর্বাবস্থাতেই অপরিবর্তনীয় ছিল। নানা বৌদ্ধ এবং জৈন ধারা, ইসলামের নানা চেহারা, ভক্তি আন্দোলনের সাম্যবাদ, মূলনিবাসীদের ধর্ম ও সংস্কৃতি সব কিছুকে গুঁড়িয়ে দিতে চাইছে এই নতুন আয়োজন।

মিথ বা পুরাণ বা মহাকাব্যের চরিত্রদের সামনে এনে, শাসনের কোনওরকম বিরোধ করাকেই ‘দেশবিরোধী’ বলে দেগে দিতে চাইছে ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধের আড়ালে। অথচ আমরা দেখেছি, অপরিবর্তনীয় কোনও ধর্ম নেই, ধারণা নেই।

মিথ বা পুরাণ বা মহাকাব্যের চরিত্রদের সামনে এনে, শাসনের কোনওরকম বিরোধ করাকেই ‘দেশবিরোধী’ বলে দেগে দিতে চাইছে ‘সনাতন ধর্ম’ শব্দবন্ধের আড়ালে। অথচ আমরা দেখেছি, অপরিবর্তনীয় কোনও ধর্ম নেই, ধারণা নেই।

তাহলে কী হচ্ছে? মহাভারতেই দ্রৌপদী-যুধিষ্ঠিরের বাদানুবাদের সময় একটি শ্লোকে এর ইঙ্গিত রয়েছে। ‘ধর্মো বাণিজ্যকো হীনো জঘন্যো ব্রহ্মবাদিনাম্।/ ন ধর্মফলমাপ্নোতি যঃ সংশয়িতুমিচ্ছতি।’ অর্থ, ‘যে ব্যক্তি ধর্মকে কোনও ফল পাওয়ার বা লাভ করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে, সে হল “ধর্মবাণিজ্যিক” বা ধর্মের ব্যবসায়ী। ব্রহ্মবাদী জ্ঞানীদের দৃষ্টিতে এমন ব্যক্তি অত্যন্ত হীন, অধম ও নিন্দনীয়।’

অষ্টাধ্যায়ী – পাণিনি
নিরুক্ত এবং নিঘন্টু – যাস্ক
মহাভারতম -ভারতভাবদীপক – নীলকন্ঠ চতুর্ধর
সুত্তপিটক – থানিসসারো ভিক্ষু অনূদিত
ধম্মপদ – থানিসসারো ভিক্ষু অনূদিত
সত্যার্থ প্রকাশ – দয়ানন্দ সরস্বতী
মহাভারতের সমাজ (খণ্ড ১-৪) – সুখময় ভট্টাচার্য

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Please login to bookmark Close
Picture of শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ

শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ

শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। পরবর্তীকালে মূলত নাটক, মহাভারত ও পুরাণ বিষয়ক গবেষণার কাজে মনোনিবেশ করেছেন। লেখালেখি ও নাট্য গবেষণার পাশাপাশি শিক্ষকতা করেন। ওঁর লেখা মহাভারত একাধিক খণ্ডে প্রকাশিত ও পাঠকমহলে সমাদৃত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Please login to bookmark Close

The Banglalive's Picks

Weekly Newsletter

Enjoy our flagship newsletter as a digest delivered once a week.

By signing up, you agree to our User Agreement and Privacy Policy & Cookie Statement.

Please login to bookmark Close
পশ্চিমবঙ্গের সমাজ ও রাজনীতিতে 'সংস্কৃতি' একটি অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র। বই তার অন্যতম উপাদান। রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের পাশাপাশি cultural hegemony দখল করতে পারলে সমাজকে অনেকখানি হাতের মুঠোয় রাখা যায়। লিখছেন সৌমী ধর...
Please login to bookmark Close
প্রবাসী পত্রিকাতে হয়তো তিনিই প্রথম মহিলা, যাঁর আঁকা ছবি ছাপা হয়। বাংলায় প্রথম শিল্পী এবং একই সঙ্গে লেখিকা হওয়ার কৃতিত্ব তাঁরই প্রাপ্য, কারণ সচিত্র গল্প লিখে ওঁর আগে কেউ ছাপাননি। লিখছেন জয়িতা বাগচী...
Please login to bookmark Close
অতীত থেকে বর্তমান। কালের যাত্রাপথে যুগযুগ ধরে চলে আসা তীর্থদর্শন ও তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ধর্মীয় প্রতীক বা Religious Token সম্পর্কে কিছু কথা রইল আজকের এই লেখায়। লিখছেন সুধীন্দ্র কুমার চক্রবর্তী...

Subscribe

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com