(Eli Cohen 23)
দামাস্কাস হল এলি কোহেনের জীবনের চূড়ান্ত পর্ব। ঐতিহাসিকদের মতে, এই সুপ্রাচীন আরব মহানগরী আদতে কোহেনের কাছে তাঁর অর্জিত জ্ঞানের ফলিত প্রয়োগের ক্ষেত্রও বটে। বস্তুত পরবর্তীকালে মোসাদের প্রশিক্ষণ পাঠক্রমে এলির বুয়েন্স এয়ার্স ও দামাস্কাস অভিযান একজন এজেন্টের যথার্থ কার্যকলাপ রূপে মান্যতা পায়। অজানা অচেনা লোকের ভিড়ে ঠিক মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে তার কাছ থেকে কীভাবে তথ্য বার করতে হয়, কোনও জায়গা পর্যবেক্ষণ করে কীভাবে তার নিখুঁত বিবরণ দিতে হয়, কোনও কথোপকথন কীভাবে হুবহু স্মৃতি থেকে লিখতে হয়, এসবের জীবন্ত উদাহরণ হয়ে ওঠেন এলি কোহেন।
পড়ুন এলি কোহেনের আগের পর্ব – (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯) (১০), (১১), (১২), (১৩), (১৪), (১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯), (২০), (২১), (২২)
আরেকটা কথা।
এলি কোহেন কাহিনির পরবর্তী পর্বে যাওয়ার আগে কিছু জিনিস খেয়াল রাখলে ভাল হয়। গুপ্তচর দুনিয়া এমনিতেই গোপনীয়তায় ভরা। সেখানে কোনটা বাস্তব, কোনটা কল্পনা, কোনও ঘটনা আদৌ ঘটেছে কি না, ঘটলেও তার কতটা প্রকাশ্যে এসেছে, সবই রহস্যময়তার মোড়কে মোড়া। মনে রাখতে হবে, ঘটনার ছয় দশক পরে এই কাহিনি লিখতে বসা। এই দীর্ঘ সময়ে পশ্চিম এশিয়া তথা বিশ্বের ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রচুর পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। সেই সব পরিবর্তনকে মাথায় রেখে, বিভিন্ন আপাত পরস্পরবিরোধী তথ্য বিশ্লেষণ করে, সর্বশেষ পাওয়া তথ্যের আলোকেই এই কাহিনি লেখা। আশার কথা, এখনও পর্যন্ত এলি কোহেনকে নিয়ে আধুনিক ঐতিহাসিক ও বিশ্লেষকদের উৎসাহে কোনও ভাটা পড়েনি।
শুরু হল এলি কোহেন ত্রয়োবিংশ পর্ব

‘এ খেলার নিয়ম হল ধৈর্য্য’
১৯৬২ সালের জানুয়ারিতে এলি কোহেন যখন দামাস্কাসে পা রাখলেন, তখন সিরিয়াতে নির্বাচনের পরে নাজিম অল-কুদসির জমানা শুরু হয়েছে। এই নির্বাচনে বাথরা তেমন সুবিধা না করতে পারলেও সারা দেশে এতদিন ধরে আত্মগোপন করে থাকা দলীয় কর্মী-সমর্থকরা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করল। মিটিং মিছিলও শুরু হল।
কুদসি সরকার অবশ্য বাথদের এই উত্থানে মোটেও খুশি ছিল না। তাদের প্রবল সন্দেহ ছিল, এর পিছনে সেনাবাহিনীর বাথপন্থী অফিসারদের মদত রয়েছে। বাথদের এইসব রাজনৈতিক কার্যকলাপ আদতে আরেকটা সামরিক অভুত্থানের গোপন প্রস্তুতিরই অঙ্গ।
বাথরা যে ক্ষমতায় আসছে, তা ততদিনে দামাস্কাসের ধনী আর প্রভাবশালী শ্রেণি বুঝে ফেলেছে। তাই স্বাভাবিকভাবে বাথপন্থীদের জন্য দামাস্কাসের সব অভিজাত প্রাসাদের দরজা খুলে যেতে লাগল, সব অভিজাত নৈশ পার্টিই সাদরে আমন্ত্রণ জানাতে লাগল। কোহেনের বেলাতেই বা ব্যতিক্রম হবে কেন?
ইতিহাস অবশ্য পুরোপুরি কুদসি সরকারের সন্দেহকে উড়িয়ে দেয় না। ১৯৬২ সালের মার্চ মাসের শেষে বাথপন্থী সামরিক অফিসাররা সত্যিই ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে, যদিও কুদসির অনুগত সেনা দু’দিনের মধ্যে এই সামরিক অভুত্থান দমন করে ফেলে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। ওই অভুত্থানের নেতা লেফটেনেন্ট কর্নেল আব্দুল করিম অল-নহলাহিকে কোর্ট মার্শাল করা তো দূরস্থান, তাকে বিদেশি দূতাবাসে সামরিক অ্যাটাসে করে পাঠানো হয়। অর্থাৎ কুদসি জমানাও তখন বাথপন্থীদের খুব বেশি ঘাঁটানোর রাস্তায় হাঁটেনি। অবশ্য এত করেও কুদসি সরকারের পতন ঠেকানো যায়নি। ১৯৬৩ সালেই আরেক সামরিক অভুত্থানের মাধ্যমে বাথপন্থীরা সরাসরি ক্ষমতা দখল করে।
অর্থাৎ সুদূর আর্জেন্টিনায় বসে বাথপন্থীদের দলে নাম লিখিয়ে যে তাস খেলেছিলেন এলি কোহেন, তা ছিল একেবারে সঠিক। দামাস্কাসে পা রেখেই কোহেন বুঝলেন তখতে নির্বাচিত কুদসি সরকার থাকলেও তৃণমূলস্তরে হু হু করে বাথের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। আর ঠিক এই সময়ে বুয়েন্স এয়ার্সে বাথ সমর্থকদের সুপারিশপত্রগুলো তাঁর কাছে যাদুদণ্ড হয়ে দাঁড়াল।

বাথরা যে ক্ষমতায় আসছে, তা ততদিনে দামাস্কাসের ধনী আর প্রভাবশালী শ্রেণি বুঝে ফেলেছে। তাই স্বাভাবিকভাবে বাথপন্থীদের জন্য দামাস্কাসের সব অভিজাত প্রাসাদের দরজা খুলে যেতে লাগল, সব অভিজাত নৈশ পার্টিই সাদরে আমন্ত্রণ জানাতে লাগল। কোহেনের বেলাতেই বা ব্যতিক্রম হবে কেন? আর ঠিক এটাই তো তিনি চেয়েছিলেন।
সেই কথা মাথায় রেখেই এলি দামাস্কাসে পা রেখেছেন। প্রথম থেকেই কোহেন এমনভাবে চলাফেরা, জীবনযাপন করা শুরু করেছেন যেন মনে হয় লাতিন আমেরিকা থেকে ধনকুবের প্রবাসী ব্যবসায়ী কামেল আলি থাবেত দেশে ফিরেছেন, যার কাছে অর্থটা আদতে কোনও সমস্যাই নয়। ফলে এই রহস্যময় আগন্তুককে নিয়ে অভিজাত মহলে এমনিতেই যথেষ্ট আগ্রহ তৈরি হচ্ছিল। বাথ সম্পৃক্ততা তাতে ঘৃতাহুতি দিল।
অতএব বাড়ি খোঁজা শুরু হল। সীমান্ত পেরোনোর মতো এবারও ত্রাণকর্তা শেখ মজিদ। তারই সহায়তায় শহরের পশ্চিম প্রান্তের অভিজাত আবু রামানা মহল্লায় একটা ভিলা পেয়ে গেলেন এলি।
প্রথমে এসে অবশ্য আস্তানা জোটেনি এলির। যতটুকু জানা যায়, সম্ভবত দামাস্কাসের কেন্দ্রস্থলে থাকা পাঁচতারা হোটেল রয়্যাল সেমিরামিস-এ ওঠেন এলি। ১৯৫০ সালে তৈরি এই হোটেলে ওঠা মানেই কার্যত দামাস্কাসের ধনী আর ক্ষমতাশালীদের নজরে আসা। ঠিক এই পরিস্থিতিটাই চাইছিলেন এলি। কিন্তু শহরের অভিজাত মহলের নজরে পড়তে গেলে হোটেলটা খুব একটা পাকাপোক্ত আস্তানা নয়, তা সে যতই পাঁচতারা হোটেলের বিলাসবহুল স্যুটই হোক না কেন। মোসাদের পক্ষ থেকে ব্ল্যাঙ্ক চেক তাকে দেওয়াই আছে। রইস ব্যবসায়ী হিসাবে কামেল আলি থাবেতের ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে হবে যে কোনও মূল্যে।
অতএব বাড়ি খোঁজা শুরু হল। সীমান্ত পেরোনোর মতো এবারও ত্রাণকর্তা শেখ মজিদ। তারই সহায়তায় শহরের পশ্চিম প্রান্তের অভিজাত আবু রামানা মহল্লায় একটা ভিলা পেয়ে গেলেন এলি। কাসিয়ন পর্বতের পাদদেশে আবু রামান্না আদতে বিদেশি দূতাবাস আর সিরীয় সামরিক সদর দফতর থাকায় এমনিতেই জায়গাটা হাই সিকিউরিটি জোন।

শুধু কি তাই? ভিলার উল্টোদিকে সরকারি গেস্ট হাউস। বিদেশি অতিথি অভ্যাগত সিরিয়া এলে ওঠে এখানে। দামাস্কাসের সব হোমড়াচোমড়াদের ভিলাও এখানেই। তবে সেনা সদর আর গেস্ট হাউসের লাগোয়া বলেই হয়তো এলির ভিলার ভাড়াটা সবচেয়ে বেশি। তাই বাড়িওয়ালা যখন এক বছরের অগ্রিম ভাড়া চেয়ে বসল, তখন দ্বিরুক্তি না করে তার হাতে কড়কড়ে ১৩০০ সিরীয় পাউন্ডের নোট গুঁজে দিলেন এলি।
এক গাল হেসে বাড়িওয়ালা বিদায় নিল। মনে মনে এলিও হাসলেন। আরবরা সবসময়ই পড়শির ব্যপারে একটু বেশি কৌতুহলী। তাই তাঁর এই ফস করে পাউন্ডের গোছা বার করার খবরটা যে নিমেষে চারিদিকে চাউর হয়ে যাবে, তা তিনি জানতেন। এটা কামেল আমিন থাবেতের ধনী হিসাবে ভাবমূর্তি তৈরির প্রথম ধাপ।
আপাতত কামেল আমিন থাবেতের কাজ হবে এক প্রবাসী ধনকুবের হিসাবে নিজের ভাবমূর্তি দেখানো যে দেশের টানে সিরিয়া ফিরে এসেছে শুধু নয়, দেশের জন্য কাজও করতে চায়। তৎকালীন সিরীয় রাজনীতিতে কুদসি প্রশাসন তখন সদা তটস্থ, আবার কবে সামরিক অভুত্থান ঘটে যায় সেই শঙ্কায়।
এলি তাঁর নতুন আস্তানায় জোর দিলেন রুচিশীলতার উপরেও। ভিলার সামনে ছোট একটা বাগান। সেখানে সুন্দরভাবে ঘাস ছাঁটার মেশিন দিয়ে আগাছা নির্মূল করা হল। স্থানীয় হস্তশিল্পের কাজ দিয়ে সাজালেন ভিলার ঘর। তাকে রইল বাছাই করা আরবি আর ফরাসি ভাষার বই। ঘরের এক কোনে রেকর্ড প্লেয়ার। পাশেই থরে থরে সাজানো আরবি ও পশ্চিমি ধ্রুপদী বাদ্যযন্ত্রের রেকর্ড। মেঝেতে পারস্য থেকে আনানো কার্পেট। বইয়ের তাকের পাশে স্টাডি টেবিলে দাঁড় করানো ফটোস্ট্যান্ড। তাতে আবছা হয়ে আসা কয়েকটা ছবি। বোঝাই যাচ্ছে, কামেল আমিন থাবেতের দূর দেশে ফেলে আসা আত্মীয় পরিজনের ছবি। অর্থ্যাৎ যারা থাবেতের ভিলায় পা রাখবেন তারা এক রুচিশীল ধনকুবেরের পরিচয় পাবেন।
তবে এলি একটা ব্যাপারে নিজেও প্রথম থেকেই সতর্ক হলেন। তিনি যতই বাথপন্থী বলে লোকজনকে বোঝান না কেন, মনে রাখতে হবে বাথদের হটিয়ে তখন কুদসি সরকার তখতে। অতিরিক্ত বাথ-প্রীতি সরাসরি কুদসি সরকারের বিষ নজর এনে ফেলতে পারে তাঁর উপরে। আর তাহলে তাঁর আসল মিশনই জলে ভেসে যাবে। অনেক ভেবেচিন্তে সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না গোছের এক উপায় বার করলেন এলি।

প্রকাশ্যে আপাতত কামেল আমিন থাবেত বাথপন্থীদের ঢাক পেটাবে না। সে পরিচয় বরং একান্ত আলাপচারিতায় উন্মুক্ত হোক। আপাতত কামেল আমিন থাবেতের কাজ হবে এক প্রবাসী ধনকুবের হিসাবে নিজের ভাবমূর্তি দেখানো যে দেশের টানে সিরিয়া ফিরে এসেছে শুধু নয়, দেশের জন্য কাজও করতে চায়। তৎকালীন সিরীয় রাজনীতিতে কুদসি প্রশাসন তখন সদা তটস্থ, আবার কবে সামরিক অভুত্থান ঘটে যায় সেই শঙ্কায়।
ফলে কোনও ধনকুবেরের আগমন তাদের কাছে হঠাৎ লটারি পাওয়ার মতো, যার কোনও বিনিয়োগকে সরকারি সাফল্য বলে ঢাক পেটানো যাবে। এই পাউণ্ডের ঝনঝনানির আড়ালে গুপ্তচর কার্যকলাপও যে হতে পারে এটা তাদের চিন্তাতেও আসেনি। অন্যদিকে বাথদেরও জনান্তিকে জানিয়ে দেওয়া যে ‘আমি তো তোমাদেরই লোক’। অর্থাৎ, ১৯৬২-এর জানুয়ারিতে দামাস্কাসে কামেল আমিন থাবেত হল সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় সঠিক লোক। আগামী ৩৬ মাস এই সুসময় চলবে এলি কোহেনের।
এলিকে খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। বুয়েন্স এয়ার্সের থেকে আসা সুপারিশের দৌলতে দামাস্কাসের সান্ধ্য পার্টিগুলোতে আমন্ত্রণ আসা শুরু হল এলির কাছে। এক অর্থে এ হল সম্পূর্ণ অজানা অচেনা পরিবেশে কামেল আমিন থাবেতের পরীক্ষা।
মোসাদের আরও একটা সাবধানবাণী এলির কানে বাজছিল। ইউরোপ রওনা হওয়ার আগে শেষ ব্রিফিংয়ে তাঁকে বলা হল, ‘এ খেলার নিয়ম হল ধৈর্য্য। তুমি অপেক্ষা করবে। পার্টিতে ডাক পাওয়ার জন্য অস্থির হতে হবে না। দেখবে তোমাকেই পার্টিতে ডাকবে। সেক্ষেত্রে কামেল আমিন থাবেতের সুবিধাই হবে স্থানীয়দের আড্ডায় মিশে যেতে। দেখবে তোমার সামনেই অবলীলায় এমন সব কথা আলোচনা হচ্ছে, যা তোমার কাছে আশাতীত।’
‘আপনার নাম তো এখন দিকে দিকে, কামেল’
এলিকে খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। বুয়েন্স এয়ার্সের থেকে আসা সুপারিশের দৌলতে দামাস্কাসের সান্ধ্য পার্টিগুলোতে আমন্ত্রণ আসা শুরু হল এলির কাছে। এক অর্থে এ হল সম্পূর্ণ অজানা অচেনা পরিবেশে কামেল আমিন থাবেতের পরীক্ষা। তার এই ভেক পরিচিতির টেঁকার কষ্ঠীপাথরে যাচাই। তাই এই সব পার্টিতে যথেষ্ট সাবধানে কথাবার্তা বলা শুরু করলেন এলি। কয়েকদিনের মধ্যেই বুঝলেন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী আর সামরিক অফিসারে ভরা এই সব পার্টিতে অত রাখঢাক করে কেউ কথা বলে না।

আড্ডা মারতে মারতে অনেক গোপন তথ্যও বেরিয়ে আসে। যেমন এক সামরিক অফিসার পার্টিতে কয়েক পেগ চড়িয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলেন, ‘আরে ছোঃ। ইহুদিগুলো ভাবতেও পারবে না এবার গোলান হাইটে এমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা করা হয়েছে, যে দখল করতে এলেই থোঁতা মুখ ভোতা করে দেওয়া হবে।’
পাশের টেবিলে বসে এলি মন দিয়ে কর্নেলের কথা শুনছিলেন।
‘তাই নাকি? তাহলে তো দারুণ ব্যাপার।’
খালেদের মনে ধরল কথাটা, ‘একেবারে যথার্থ জ্ঞানীর কথা। দোস্ত, তোমার পরিবারের ব্যবসার কথা বলো। দাঁড়াও, তোমার সঙ্গে এখনকার সরকার আর ফৌজের হোমড়া চোমড়াদের মোলাকাৎ করাচ্ছি।’
উৎসাহ পেয়ে কর্নেল গড়গড় করে বলে গেলেন কোথায় কোথায় নতুন বাঙ্কার করা হয়েছে, কোথায় কোথায় নতুনভাবে কামান বসানো হয়েছে। শ্রুতিধর এলি সবই শুনে নিলেন। রাতে গোলান হাইটের নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ চলে গেল তেল আভিভে মোসাদের কাছে।
আবার খালেদ নামক ব্যবসায়ীর পার্টিতে গিয়ে কামেল আমিন থাবেতের পরিচিতির পরিধি এক লাফে অনেকটাই বেড়ে গেল। খালেদের সঙ্গে ব্যবসা নিয়ে কথা বলতে বলতে এলি জানালেন তাঁর সিরিয়ায় আদি বাড়ির কথা। কথাটা শুনে খালেদের মনোযোগ বেড়ে গেল বুঝে এলি এক মোক্ষম চাল চাললেন, ‘বাবা বলতেন সাফল্যের চাবিকাঠি হল কাকে তুমি জান, কী তুমি জান নয়।’
খালেদের মনে ধরল কথাটা, ‘একেবারে যথার্থ জ্ঞানীর কথা। দোস্ত, তোমার পরিবারের ব্যবসার কথা বলো। দাঁড়াও, তোমার সঙ্গে এখনকার সরকার আর ফৌজের হোমড়া চোমড়াদের মোলাকাৎ করাচ্ছি।’
খালেদ তার কথা রেখেছিল। সরকার ও সেনাবাহিনীর যে সর্বোচ্চ মহলের সঙ্গে তাঁর ওঠাবসা, সেখানে প্রবেশাধিকার পেয়ে গেল কামেল আমিন থাবেত। এলি পার্টিতে হাসতে হাসতে এমন সব আমলা, ফৌজি অফিসার, রাজনীতিবিদদের সঙ্গে আড্ডা মারতে লাগলেন যারা প্রকৃত অর্থেই দেশ চালায়, সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে মোসাদের হাতে এমন সব তথ্য আসতে লাগল এলির গোপন ট্রান্সমিটার থেকে, যা তারা কল্পনাও করেনি। প্রতিটা আড্ডা এলির কাছে তথ্য সংগ্রহের সোপান হয়ে দাঁড়াল।
এলি প্রমাদ গুনলেন। দামাস্কাসের গলির বাচ্চারাও জানে বাথ আর সরকার এই দু’পক্ষে সেনা ভাগ হয়ে রয়েছে। এখন হোসাম কোন পক্ষের, তা এলির অজানা। এটা হতেই পারে ধূর্ত কর্নেল তাঁকে বাজিয়ে দেখছে যে তিনি কোনদিকে।
এই রকমই এক সান্ধ্য পার্টিতে কর্নেল হোসামের দেখা পেলেন এলি। লোকটা যে ব্যক্তিত্ত্বসম্পন্ন, তা এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায়।
এলি পানপাত্র তুলে টোস্ট করলেন, ‘কর্নেল। ইটস অ্যান অনার। আপনার সব কৃতিত্বের কথা তো এখন দামাস্কাসের সবাইয়ের মুখে মুখে।’
হোসাম স্মিত হাসলেন। এই ফৌজিও যে এই তারিফের খেলায় পাকা খেলোয়াড়, তা এলি মালুম পেলেন তক্ষুনি।
‘আর আমি তো আপনার সম্বন্ধেও বিস্তর শুনেছি, কামেল। আপনার নাম তো এখন দিকে দিকে। তা আপনিই বলুন, আমাদের সেনার ভবিষ্যৎ কেমন?’

এলি প্রমাদ গুনলেন। দামাস্কাসের গলির বাচ্চারাও জানে বাথ আর সরকার এই দু’পক্ষে সেনা ভাগ হয়ে রয়েছে। এখন হোসাম কোন পক্ষের, তা এলির অজানা। এটা হতেই পারে ধূর্ত কর্নেল তাঁকে বাজিয়ে দেখছে যে তিনি কোনদিকে। তাই ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ গোছের উত্তর দিলেন এলি, ‘আমার তো মনে হয় ঠিকঠাক বিনিয়োগ করা হলে আর সেনাবাহিনী এককাট্টা থাকলে আরও শক্তিশালী হবে।’
বোঝাই গেল উত্তরটা হোসামের মনে ধরেছে।
‘তবে কামেল, চারিদিকে শত্রু। আমাদের সদা সতর্ক থাকতে হবে।’
আলাপ জমে উঠল। সেনার শক্তিবৃদ্ধিতে কী কী করা হচ্ছে, তার খানিকটা আভাস কর্নেল হোসামের কথায় পেয়ে গেলেন এলি।
প্রতি রাতে দিনের রিপোর্ট মোসাদকে পাঠানো ক্রমে এলির অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়। মোসাদও ধীরে ধীরে দামাস্কাসের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির নিঁখুত খুঁটিনাটি বিবরণ পেতে শুরু করে, যা পরে তেল আভিভের রণকৌশল ঠিক করতে প্রভূত কাজে লাগে।
পার্টি থেকে রাতে ভিলায় ফেরার পথে দামাস্কাসের সুরক্ষার ব্যবস্থাও প্রতিদিন খেয়াল করেন এলি। কয়েক রাত দেখার পর তাঁর ভিভিআইপি এলাকার পুলিশি বন্দোবস্তের চিত্রটাও তাঁর প্রশিক্ষিত চোখে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। দেখে নিয়েছেন রাস্তায় কোথায় কোথায় পুলিশের বুথ রয়েছে, তাদের হাতে কী ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। কখন রাতে পুলিশের ডিউটি বদল, তা জেনে গিয়েছেন। তাঁর চোখে ধরা পড়ে গিয়েছে পুলিশি বন্দোবস্তের ফাঁকফোকরগুলো।
সুপ্রাচীন কাসিয়ন পর্বত যে দামাস্কাসের ঢাল হয়ে দাড়িয়ে রয়েছে, তা বুঝতেও অসুবিধা হয়নি এলির। দূর থেকেই পাহাড়ের উপরে যে একের পর এক সেনা বাঙ্কার রয়েছে, তা একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়। বিমান হামলা ঠেকানোর জন্য সেই সব বাঙ্কার যে তৎকালীন সেরা প্রযুক্তির সোভিয়েত কামানে সজ্জিত, তাও ক্রমে পরে বিভিন্ন সান্ধ্য পার্টির আড্ডায় স্পষ্ট হয়ে যায় এলির কাছে। রয়েছে টেলিযোগাযোগ টাওয়ারও।
আসলে তখন পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দ্রুত বদলাচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পশ্চিম এশিয়ায় পা রাখতে চাইছে। বছর কয়েক আগেই ১৯৫৩ সালের ১৯শে অগস্ট পড়শি ইরানে এক অভুত্থানে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ মোসাদেখ গদি হারিয়েছেন। ওয়াশিংটন আর তেল আভিভের দোস্ত ইরানের শাহ মহম্মদ রেজা পহলবী নিজের একচ্ছত্র ক্ষমতা কায়েম করেছেন।
ফলে ইরান যে আপাতত হাতের বাইরে, তা ক্রেমলিনের বুঝতে অসুবিধা হয়নি। মস্কোর নজর ঘুরে যায় ইরানের পড়শি সিরিয়ার উপর। ততদিনে দামাস্কাস মোটামুটি পশ্চিমী প্রভাবমুক্ত। এই সুযোগটাই কাজে লাগায় ক্রেমলিন। অন্যদিকে, দামাস্কাসেরও তখন টিঁকে থাকতে গেলে কোনও পরাশক্তির সহায়তা প্রয়োজন। ফলে দামাস্কাস-মস্কো দোস্তি শুরু হল, যা চলেছিল ২০২৪ সালে বাসার অল-আসাদের শাসনের অবসান পর্যন্ত। সেই থেকেই সোভিয়েত প্রযুক্তির অস্ত্রসম্ভার দিয়ে সিরীয় সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন শুরু হয়। এখানে বলে রাখা ভাল, উন্নত প্রযুক্তির সোভিয়েত রেডিও সিগনাল ডিটেকটরই তিন বছর পরে কাল হয়ে দাঁড়াল এলির জীবনে।
প্রতি রাতে দিনের রিপোর্ট মোসাদকে পাঠানো ক্রমে এলির অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়। মোসাদও ধীরে ধীরে দামাস্কাসের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির নিঁখুত খুঁটিনাটি বিবরণ পেতে শুরু করে, যা পরে তেল আভিভের রণকৌশল ঠিক করতে প্রভূত কাজে লাগে।
তথ্যসূত্র
(১) ড্যানিয়েল গর্ডিস-ইজরায়েল- আ কনসাইজ হিস্টরি অফ আ নেশন রিবর্ন
(২) জ্যাক্সন হ্যালে-এলি কোহেন- দ্য স্পাই হু নিয়ারলি বিকেম আ সিরিয়ান মিনিস্টার-
(৩) এলি কোহেন- আ লাইফ অফ এসপিওনাজ অ্যান্ড স্যাক্রিফাইস
(৪) এলি বেন-হানান- আওয়ার ম্যান ইন দামাস্কাস-এলি কোহেন
(৫) পিটার ম্যান্সফিল্ড, নিকোলাস পেলহাম- আ হিস্টরি অফ দ্য মিডল ইস্ট
(৬) মাইকেল বার- যোহার, নিসিম মিশাল-মোসাদ
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
