(Book Stall Attack)
পশ্চিমবঙ্গের কমবেশি সব উৎসবেই বিভিন্ন জেলায়, বিভিন্নভাবে বইয়ের স্টল দেওয়া হয়। ছোটবেলা থেকে নিজের এলাকায় ঠাকুর দেখতে বেরোলেও রাস্তায় কমপক্ষে দুটি বুকস্টল দেখতাম। সরস্বতী পুজো কিংবা ঈদে বামপন্থীদের বুকস্টল থাকত কলকাতা এবং অন্যান্য জেলার বিভিন্ন জায়গায়। দুর্গাপুজোর মণ্ডপের পাশে বামপন্থী ও বিভিন্ন প্রগতিশীল সাহিত্য সংগঠনের বইয়ের স্টল বঙ্গীয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল এভাবেই। কিন্তু এই বছর রাজ্য জুড়ে বইয়ের স্টল ভাঙল একদল মানুষ। বই ছিঁড়ে ফেলল, ভয় দেখাল সাধারণ মানুষকে, রাগিয়ে দিল বইপ্রেমীদের, এমনকি যারা বই পড়ে না তাদেরও।
আরও পড়ুন: কলকাতার দুর্গাপুজো: বদলে যাওয়া এক উৎসবের গল্প
ইদানীং শাসক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে একমাত্র যোগসূত্র রাজনৈতিক জটিলতা। তবু রাজনীতির ঘেরাটোপের বাইরে যে সামান্য পরিসর, সেখানে হইহই রব উঠল। প্রশ্ন উঠল একাধিক। প্রথমত, বই হঠাৎ শত্রু হয়ে গেল কেন? দ্বিতীয়ত, বই শত্রু না যারা বই পড়ে তারা শত্রু?
একজন সচেতন নাগরিক ও বইপ্রেমী হিসেবে বর্তমানে এহেন পরিস্থিতি হতাশ করে, তবে অবাক করে না। বরং ভাবা দরকার— কেন এই ঘটনা ঘটছে? বই এবং প্রগতিশীল চিন্তার প্রতি এক শ্রেণির শক্তির এত ভীতি কেন? এই পরিস্থিতির সব দিকগুলো সমান গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আজ সবচেয়ে বেশি জরুরি।

ধ্বংসাত্মক শক্তির বইকে ভয় পাওয়ার কতগুলো কারণ রয়েছে, এবং তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। একটি বইয়ের স্টল শুধুমাত্র পয়সার লেনদেনের জায়গা, তেমনটা নয়। যেকোনও বুকস্টল আসলে উন্মুক্ত চিন্তার বাজার। বলা যায়, ‘এ মার্কেটপ্লেস অফ আইডিয়াস’। বিভিন্ন মতাদর্শের বই সেখানে থাকে। মানুষ সেখান থেকে শুধু বই কেনে না, সেখানে দাঁড়িয়ে বই নিয়ে আলোচনা করে, চিন্তার খোরাক পায়। এখানেই এসে পড়ে হীরক রাজার অভিসন্ধির প্রসঙ্গ। দেশের মানুষ যত কম পড়বে, তত কম জানবে, তত কম ভাববে, তত কম প্রশ্ন করবে, তত বেশি মানবে। ফলে মানুষের নাগাল থেকে আগেই সরিয়ে দিতে হবে বই।
এক শতক আগের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালেও দেখা যায়, ডানপন্থী বা রক্ষণশীল মতাদর্শ গোটা পৃথিবী জুড়ে সমাজকে একটি স্থবির, অনুন্নত এবং একক কাঠামোর মধ্যে বেঁধে রাখতে চাইত। মনুস্মৃতির মতো মানুষের মাথাতেও যেন চিরকাল, বংশপরম্পরায় খোদাই করা থাকে কিছু বাক্য তথা অনুশাসন— নারীরা পুরুষের সম্পত্তি, তারা সর্বদাই পুরুষের অধীন, বর্ণভেদ, জাতিভেদের মতো প্রথা সমাজের মঙ্গলের জন্যই নির্মিত ইত্যাদি ইত্যাদি।
আসলে যারা পুঁজিবাদী ও ফ্যাসিবাদের সৈনিক, তারা বহুত্ববাদ মেনে নিতে পারে না। তারা শুধু বই কিংবা প্রগতিশীল ভাবনা নয়, বাঙালি ঐতিহ্যকেই ভয় পায়। ভয় পায় বাঙালির দুর্গাপুজোয় সর্বধর্মসমন্বয়ের ধারাকে।
যখনই কোনও বই মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, তখনই এসব চিরাচরিত বিশ্বাস ও কুসংস্কারের গালে থাপ্পড় পড়ার আশঙ্কা বাড়ে। তখনই, ডানপন্থী নিয়ন্ত্রকদের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয় বই বিক্রি। বইয়ের স্টল ভাঙচুর করা মানে তো শুধুমাত্র ভৌত কাঠামো ভাঙা নয়, বরং মানুষের প্রশ্ন করার স্বাধীনতাকে স্তব্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ। মনস্তাত্বিক স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত।
আসলে যারা পুঁজিবাদী ও ফ্যাসিবাদের সৈনিক, তারা বহুত্ববাদ মেনে নিতে পারে না। তারা শুধু বই কিংবা প্রগতিশীল ভাবনা নয়, বাঙালি ঐতিহ্যকেই ভয় পায়। ভয় পায় বাঙালির দুর্গাপুজোয় সর্বধর্মসমন্বয়ের ধারাকে। কারণ সেই ধারাকে প্রাধান্য দিলে তো ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসিতে ব্যাঘাত ঘটবে। নতুন করে তেল দিতে হবে মেশিনে। সমস্যা তৈরি হবে পুঁজিবাদের চাকাকে সচল রাখতে। আঙুল উঠবে নিপীড়নের বিরুদ্ধে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রশ্ন তুলবে অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা প্রায় সকল অংশের নিপীড়িত মানুষ। তাই, বই হল জুজু। আর যারা বই পড়তে উৎসাহ দেয়, তারা চন্দ্রবিন্দু। অতএব, ভাঙো দল, গুঁড়িয়ে দাও স্টলের প্যান্ডেল।

পশ্চিমবঙ্গের সমাজ ও রাজনীতিতে ‘সংস্কৃতি’ একটি অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র। বই তার অন্যতম উপাদান। রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের পাশাপাশি cultural hegemony দখল করতে পারলে সমাজকে অনেকখানি হাতের মুঠোয় রাখা যায়। বছরের পর বছর যখন প্রগতিশীল বইয়ের স্টলগুলো সাধারণ মানুষের সঙ্গে এক ধরনের সাংস্কৃতিক সংযোগ রক্ষা করে চলেছে, তখন একদল দস্যু সহিংস উপায়ে সেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে আসে।
এখন প্রশ্ন, এই দস্যু দলের মাথা কে? যদিও শাসক গোষ্ঠীর বিভিন্ন পদাধিকারী এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছে। আমরা, বইপ্রেমীরা আমাদের প্রশ্নের উত্তর না পেলেও বুকস্টল ঘিরে দাঁড়িয়েছি। বাচ্চা থেকে বুড়ো, সবাই বিভিন্নরকম বই কিনে বইয়ের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করে তুলেছি।
একজন সচেতন নাগরিক ও বইপ্রেমী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব উৎসবের আলোয় যখন মুক্তচিন্তার আলো নেভানোর চেষ্টা চলছে, তখন আরও সাংস্কৃতিক, আরও চিন্তাশীল এবং আরও গঠনমূলক পথে প্রতিবাদ করা।
বই আমাদের ইতিহাস, বিকৃত ইতিহাস, সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক জটিলতা, সাংবিধানিক অধিকার এবং হাজার হাজার অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন করতে শেখায়। অন্ধ আনুগত্যের বিরোধিতা করতে শেখায়। এসব আবার মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, ভয়-ঘৃণা তৈরি করার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই, বই ছিঁড়ে ফেলা, বুকস্টল ভাঙা সস্তায় পুষ্টিকর উপায়। প্রগতিশীল সাহিত্য ও মতাদর্শ মানুষকে শেখায়, পরিবর্তনই নিয়ম এবং সমাজকে সকলের জন্য যতদূর সম্ভব সমান করে তোলাই ধর্ম। রক্ষণশীল কাঠামোর ভিতকে নাড়িয়ে দেওয়াই তার লক্ষ্য।
আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এটি বামপন্থীদের স্টলের ওপর আক্রমণ। সত্যিই কি তাই? এ আসলে পুরো নাগরিক সমাজের গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর আক্রমণ নয়? একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের বইয়ের স্টল ভাঙা যদি এত সহজ হয়, তবে আগামী দিনে যে কোনও লিটল ম্যাগাজিন, স্বাধীন লেখকের মতামত বা যে কোনও গণতান্ত্রিক আলোচনার পথও বন্ধ করা যাবে এক নিমেষে। এই পূর্বাভাস আমাদের কি ইঙ্গিত দেয় না, সমাজকে ধীরে ধীরে পরমতসহিষ্ণুতার বদলে একমুখী চিন্তার দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে?
একজন সচেতন নাগরিক ও বইপ্রেমী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব উৎসবের আলোয় যখন মুক্তচিন্তার আলো নেভানোর চেষ্টা চলছে, তখন আরও সাংস্কৃতিক, আরও চিন্তাশীল এবং আরও গঠনমূলক পথে প্রতিবাদ করা। বিশ্বাসের পাশাপাশি কিছু অবিশ্বাস করার আগে, তা পড়তে হয়, জানতে হয়, বুঝতে হয়। না হলে, অবিশ্বাসের ভিত্তিও ভঙ্গুর হয়ে যায়।
মানুষ তখনই ন্যারেটিভ-নির্ভর হয়ে পড়ে যখন গ্রহণ-বর্জনের বিবেচনা তার কাছে কঠিন হয়ে যায়। আর এই বিবেচনা কঠিন হয় তখনই, যখন মানুষকে সত্য থেকে দূরে রাখা যায়, পড়ে জানবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা যায়, কেড়ে নেওয়া যায় স্বাধীন চিন্তার অধিকার।
পুজোর মধ্যে বুক স্টল ভাঙার খবরের পাশাপাশি এ-ও সত্যি যে, নানা জায়গায় বহু সাধারণ নাগরিক হাতে হাত লাগিয়ে নতুন করে স্টল গড়েছেন। দলীয় রাজনীতির অংশ না হয়েও নির্ভীকভাবে বুলডোজারের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেছেন। তাদের সবাইকে কুর্নিশ।
এক নির্দিষ্ট শ্রেণির রাজনীতি বাঙালি তথা যে কোনও জাতির সাংস্কৃতিক তথা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের বিধাতা হয়ে ওঠার চেষ্টা করলে, স্বাভাবিকভাবেই জলঘোলা হয়। ভুগতে হয় পিরামিডের নিচের দিকে থাকা মানুষদের। পৃষ্ঠপোষকতার পোকা সেখানে এমন গিজগিজ করে যে, সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কী ঘটেছে এবং কেন ঘটেছে, তা নিয়ে আপামর জনগণের মাথায় সফলভাবে পঁচিশরকম ভুয়ো গল্প গেঁথে দেওয়া যায়।
এই ‘কী?’ আর ‘কেন?’-এর উত্তর পেতে হলে সমস্তরকম ধর্মরাজনৈতিক পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে হাতে তুলে নিতে হবে বই। জানতে হবে ইতিহাস ও বর্তমান। জানতে হবে যা বিকৃত সেটাও, জানতে হবে বিকৃতির কারণ। তবেই বোঝা যাবে, বাংলা ও বাঙালি অথবা ভারত ও ভারতীয়রা ঠিক কতটা বাঁও জলে আছেন।
সাধারণ মানুষের কাছে এই সময় আরও বেশি করে বই পৌঁছে দেওয়া দরকার, পৌঁছে দেওয়া দরকার বিভিন্ন উপায়ে। যেসব বুকস্টলে কমলা শামিয়ানা টাঙিয়ে বইয়ের বদলে ফুচকা, পাপড়ি চাট, বেলুন বিক্রি হয়, সেই স্টলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দরকার হলে বই ফেরি করতে হবে। ফুচকা-পাপড়ি চাটের চটকের সঙ্গে যাঁরা বইয়ের চটককে মিলিয়ে দেন, তাদের চটক ভাঙাতে হবে আরও বেশি সংখ্যায় বই বিক্রি করেই।
দুর্গাপুজোর মণ্ডপে বা যেকোনও উৎসব-অনুষ্ঠানে বইয়ের স্টল বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব কেবল কোনও রাজনৈতিক দলের নয়, আমার আপনার মতো সাধারণ মানুষের, প্রত্যেক সচেতন বাঙালির। এই অন্ধকার সময়েও বই পড়ার গুরুত্ব যাঁরা বোঝেন, বইয়ের শালীনতা রক্ষা তাঁদের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার মধ্যে পড়ে।
পুজোর মধ্যে বুক স্টল ভাঙার খবরের পাশাপাশি এ-ও সত্যি যে, নানা জায়গায় বহু সাধারণ নাগরিক হাতে হাত লাগিয়ে নতুন করে স্টল গড়েছেন। দলীয় রাজনীতির অংশ না হয়েও নির্ভীকভাবে বুলডোজারের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেছেন। তাদের সবাইকে কুর্নিশ। তাঁরা আসলে মনে করিয়ে দিয়েছেন, মস্তিষ্ক বিক্রির এই অপচেষ্টা রোখাই এখন সচেতন উদারমনস্ক বাঙালির অন্যতম লক্ষ্য।
ছবি ও ভিডিয়ো সৌজন্য: লেখক ও ফেসবুক
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
