(Social Media Positivity)
ছেলেটা প্রতিবার ইন্টারভিউ দেওয়ার আগে বটতলার মন্দিরে এগারো টাকা দিয়ে পুজো দিয়ে যেত। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়ে ফিরত। সেই ব্যর্থতার গ্লানি গায়ে লেপ্টেও ফের একই প্রার্থনা করত। মাথা নিচু করে বারবার বলত, ‘একবার আমার ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দাও ভগবান, প্লিজ একবার আমার সহায় হও।’
ভাগ্যের চাকা সত্যিই একদিন ঘুরল। তবে ইন্টারভিউ দিয়ে নয়, সমাজমাধ্যমে একটা কুড়ি সেকেন্ডের রিল বানিয়ে, যে রিলের মুখ্য বিষয় ছিল সারমেয়। তার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ল দেশে বিদেশে। ভাইরাল সেই ভিডিও খুলে দিল উপার্জনের রাস্তা। ছেলেটার জীবন থেকে বিষণ্ণতা মুছে গেল ধীরে ধীরে।
আরও পড়ুন: আর্জেন্টিনার সুন্দরী ও বহরমপুরের রোম্যান্টিক তরুণ
একটা স্মার্টফোন, কয়েকটি ক্লিক এবং ইন্টারনেট সংযোগ বদলে দিতে পারে একজন মানুষের পরিচয়, জীবিকা, সম্পর্ক, এমনকী সমাজে তাঁর অবস্থানও। যে তরুণের গান শোনার মতো শ্রোতা একসময় ছিল না, তার গান পৌঁছে যেতে পারে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে। যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বিজ্ঞাপনের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করার সামর্থ্য নেই, তিনিও খুঁজে পেতে পারেন নিজের ক্রেতা। আবার কোনও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে বৃহত্তর সামাজিক আলোচনার সূত্রপাত।
একুশ শতকের এই বাস্তবতায় সমাজমাধ্যম আর নিছক বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ছবি ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যম নয়। এটি মানুষের আত্মপ্রকাশ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের এক নতুন পরিসর।

একটা সময় ছিল, প্রতিভা থাকলেই প্রতিভার প্রকাশ ঘটত না। গায়ক হতে গেলে প্রয়োজন হত সঙ্গীত প্রযোজকের নজরে আসা, লেখক হতে গেলে প্রকাশকের স্বীকৃতি এবং ব্যবসা বাড়াতে গেলে বিজ্ঞাপনের জন্য বিপুল অর্থ। অর্থাৎ, নিজের কাজকে বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা অনেকাংশেই নির্ভর করত নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান ও মধ্যস্থতাকারীর উপর।
সোশ্যাল মিডিয়া সেই ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ভেঙে না দিলেও, তার একচেটিয়া রকমটায় আঘাত করেছে। এখন একজন মানুষ নিজেই নিজের কাজের প্রদর্শক, প্রচারক এবং কখনও কখনও বিক্রেতা। পরিচিতির জন্য তাকে আর সব সময় কোনও প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের অপেক্ষায় বসে থাকতে হয় না।
এই পরিসংখ্যানের তাৎপর্য কেবল নতুন পেশার জন্মের মধ্যে নয়, সুযোগের ভৌগোলিক সীমানা প্রসারিত হওয়ার মধ্যেও রয়েছে। কোনও ছোট শহরের তরুণের যদি ভাল ক্যামেরা, দামি স্টুডিয়ো কিংবা প্রভাবশালী যোগাযোগ না-ও থাকে, তবু একটি স্মার্টফোনের সাহায্যে সে নিজের কাজ প্রকাশ করতে পারে।
ইন্ডিয়ান স্কুল অব বিজনেসের অন্তর্গত শ্রীনি রাজু সেন্টার ফর আইটি অ্যান্ড দ্য নেটওয়ার্ক ইকোনমি (SRITNE) এবং হ্যাশফেমের ২০২৬ সালের গবেষণা অনুযায়ী, ভারতে ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতার সংখ্যা ২০২০ সালের ছিল প্রায় ৯.৬ লক্ষ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৪১.২ লক্ষ হয়েছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ২০২৫ সালে এই নির্মাতাদের ৬৬% ছিলেন মেট্রোপলিটন শহরের বাইরের অঞ্চলের। অর্থাৎ, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাণের জগৎ আর কেবল দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু কিংবা কলকাতার মতো বড় শহরকেন্দ্রিক নয়; ছোট শহর ও মফস্বলের মানুষও এই অর্থনীতিতে জায়গা করে নিচ্ছেন।
এই পরিসংখ্যানের তাৎপর্য কেবল নতুন পেশার জন্মের মধ্যে নয়, সুযোগের ভৌগোলিক সীমানা প্রসারিত হওয়ার মধ্যেও রয়েছে। কোনও ছোট শহরের তরুণের যদি ভাল ক্যামেরা, দামি স্টুডিয়ো কিংবা প্রভাবশালী যোগাযোগ না-ও থাকে, তবু একটি স্মার্টফোনের সাহায্যে সে নিজের কাজ প্রকাশ করতে পারে।
স্থানীয় খাবার, লোকসংগীত, আঞ্চলিক ইতিহাস, হস্তশিল্প কিংবা দৈনন্দিন জীবনের যে বিষয়গুলি একসময় বৃহত্তর বাজারের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ কম পেত, সেগুলি এখন সহজেই পৌঁছে যেতে পারে বৃহৎ পরিসরে। ফলে সোশ্যাল মিডিয়া সাংস্কৃতিক উৎপাদন ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের ভৌগোলিক মানচিত্রও বদলে দিচ্ছে।
কোনও হস্তশিল্পী নিজের তৈরি সামগ্রীর ছবি প্রকাশ করে সরাসরি সম্ভাব্য ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। কোনও শিক্ষক নির্দিষ্ট বিষয়ে শিক্ষামূলক ভিডিও তৈরি করে নিজের পরিচিতির পরিসর বাড়াতে পারেন।
একটা সময় বিনোদন এবং জীবিকার মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন ছিল। কেউ গান গাইতেন শখে, কেউ রান্না করতেন পরিবারের জন্য, কেউ ছবি আঁকতেন নিজের আনন্দে। এই কাজগুলির কোনওটি থেকে পেশা তৈরি করা সম্ভব হলেও, তার জন্য প্রয়োজন হত আলাদা পরিকাঠামো, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং মধ্যস্থতাকারীর সহায়তা। সোশ্যাল মিডিয়া এই ব্যবধান কিছুটা কমিয়েছে।
ধরা যাক, কোনও গৃহবধূ ভাল রান্না করেন। তাঁর তৈরি খাবারের ছবি বা ভিডিও দেখে স্থানীয় মানুষ যেমন তাঁর কাছে অর্ডার দিতে পারেন, তেমনই তাঁর রান্নার কনটেন্ট বৃহত্তর দর্শকের কাছেও পৌঁছতে পারে।

কোনও হস্তশিল্পী নিজের তৈরি সামগ্রীর ছবি প্রকাশ করে সরাসরি সম্ভাব্য ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। কোনও শিক্ষক নির্দিষ্ট বিষয়ে শিক্ষামূলক ভিডিও তৈরি করে নিজের পরিচিতির পরিসর বাড়াতে পারেন। আবার কোনও তরুণ স্থানীয় পর্যটনস্থল নিয়ে নিয়মিত তথ্যসমৃদ্ধ ভিডিও তৈরি করে পর্যটন ব্যবসা, হোটেল কিংবা পরিবহণ পরিষেবার সঙ্গে কাজের সুযোগ পেতে পারেন।
সোশ্যাল মিডিয়ার গুরুত্ব শুধু কেউ ভাইরাল হয়ে কত টাকা উপার্জন করলেন, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব ছড়িয়ে রয়েছে পণ্য নির্মাতা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বিজ্ঞাপনদাতা, পরিবেশক এবং ক্রেতাদের মধ্যেও। ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি ও বাণিজ্যের এই সংযোগ একটি নতুন অর্থনৈতিক পরিসর তৈরি করেছে, যেখানে মানুষের মনোযোগ, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং নির্দিষ্ট বিষয়ে তার জ্ঞানও সম্পদে পরিণত হতে পারে।
একক অভিজ্ঞতা যখন অন্য মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন একটি বিচ্ছিন্ন সমস্যা সামাজিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। এই দিক থেকে সমাজমাধ্যম নাগরিকের সামাজিক ভূমিকারও পরিবর্তন ঘটিয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক পরিবর্তনকে শুধু অর্থনীতির মাপকাঠিতে বিচার করলে একটি বড় দিক বাদ পড়ে যায়। এই মাধ্যম মানুষের কথা বলার এবং নিজের অভিজ্ঞতা অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগও বাড়িয়েছে।
কোনও সমাজে বহু সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান থাকতে পারে, অথচ সেগুলি নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা সীমিত থাকতে পারে। কারণ, সমস্যা সম্পর্কে জানার সুযোগ এবং সেই সমস্যাকে প্রকাশ্যে তুলে ধরার ক্ষমতা সব মানুষের সমান নয়। সোশ্যাল মিডিয়া এই পরিস্থিতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

কোনও নাগরিক রাস্তার ভাঙা অংশ, পানীয় জলের সংকট কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের পরিষেবায় অনিয়মের ছবি তুলে ধরতে পারেন। কোনও কর্মী কর্মক্ষেত্রের সমস্যার কথা বলতে পারেন। কোনও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দৈনন্দিন চলাচলের বাধাগুলি নিজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বৃহত্তর সমাজের সামনে তুলে ধরতে পারেন।
একক অভিজ্ঞতা যখন অন্য মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন একটি বিচ্ছিন্ন সমস্যা সামাজিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। এই দিক থেকে সমাজমাধ্যম নাগরিকের সামাজিক ভূমিকারও পরিবর্তন ঘটিয়েছে। মানুষ আর শুধু অন্যের তৈরি খবরের পাঠক নন; তিনি কোনও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, তথ্যের প্রাথমিক সরবরাহকারী কিংবা জনস্বার্থের প্রশ্ন উত্থাপনকারীও হতে পারেন।
ভৌগোলিক দূরত্ব বহুদিন ধরেই মানুষের সম্পর্কের পথে একটি বাস্তব বাধা। কাজের প্রয়োজনে অন্য শহরে চলে যাওয়া, জীবিকার জন্য দেশান্তর, পরিবারের সদস্যদের আলাদা জায়গায় বসবাস কিংবা পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলা এইসব অভিজ্ঞতা নতুন নয়।
তাঁর বক্তব্যের গুরুত্ব অবশ্যই তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা ও ঘটনার প্রমাণের উপর নির্ভরশীল। তবু সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের এই প্রসারকে গণপরিসরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা যায়।
ভৌগোলিক দূরত্ব বহুদিন ধরেই মানুষের সম্পর্কের পথে একটি বাস্তব বাধা। কাজের প্রয়োজনে অন্য শহরে চলে যাওয়া, জীবিকার জন্য দেশান্তর, পরিবারের সদস্যদের আলাদা জায়গায় বসবাস কিংবা পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলা এইসব অভিজ্ঞতা নতুন নয়।
কিন্তু ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তার সেই দূরত্বের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ধরন বদলে দিয়েছে। এখন অন্য শহরে থাকা পরিবারের সদস্যের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, সন্তানের পড়াশোনার খবর জানা, পুরনো বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ পুনরুদ্ধার করা কিংবা কোনও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত সরাসরি ভাগ করে নেওয়া অনেক সহজ।
একই সঙ্গে এমন মানুষের সঙ্গেও পরিচয় তৈরি করা সম্ভব, যাঁদের সঙ্গে ভৌগোলিক নৈকট্য না থাকলেও আগ্রহ, অভিজ্ঞতা কিংবা চিন্তার মিল রয়েছে। প্রচলিত সামাজিক পরিসরে মানুষ সাধারণত পরিবার, পাড়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মক্ষেত্রের নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সোশ্যাল মিডিয়া সেই গণ্ডির বাইরে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে।
আজ কোনও ছাত্র নিজের বাড়িতে বসেই গণিতের জটিল সমস্যা সমাধানের ভিডিও দেখতে পারে, কোনও তরুণ বিদেশি ভাষা শেখার প্রাথমিক পাঠ নিতে পারে, কোনও সাধারণ পাঠক ইতিহাস, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আলোচনা শুনতে পারেন।
কোনও বিরল শখের অনুরাগী, নির্দিষ্ট ভাষার পাঠক, স্বাধীন শিল্পী একই ধরনের পেশাগত সমস্যায় থাকা মানুষ অনলাইনে নিজেদের একটি কমিউনিটি বা সম্প্রদায় খুঁজে পেতে পারেন। এই সম্প্রদায় সব সময় বাস্তব জীবনের সম্পর্কের বিকল্প নয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তা নতুন বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও পারস্পরিক শেখার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
একটা সময় ছিল, জ্ঞান অর্জনের সুযোগ অনেকাংশেই নির্ভর করত মানুষের আর্থিক সামর্থ্য, বসবাসের জায়গা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগের উপর। বড় শহরের ভাল গ্রন্থাগার, নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বিশেষজ্ঞ শিক্ষকের কাছে পৌঁছনোর সুযোগ সকলের ছিল না। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনও ছাত্রের কাছে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ভাল শিক্ষক পাওয়া যেমন কঠিন ছিল, তেমনই কোনও জটিল বিষয় সম্পর্কে জানার জন্য নির্ভর করতে হত সীমিত বই কিংবা স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার উপর।

ইন্টারনেটের প্রসার সেই বাস্তবতায় পরিবর্তন এনেছে, আর সোশ্যাল মিডিয়া সেই পরিবর্তনকে আরও বিস্তৃত করেছে। আজ কোনও ছাত্র নিজের বাড়িতে বসেই গণিতের জটিল সমস্যা সমাধানের ভিডিও দেখতে পারে, কোনও তরুণ বিদেশি ভাষা শেখার প্রাথমিক পাঠ নিতে পারে, কোনও সাধারণ পাঠক ইতিহাস, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আলোচনা শুনতে পারেন।
চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, অধ্যাপক, গবেষক এবং বিভিন্ন পেশার অভিজ্ঞ মানুষেরা নিজেদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার কিছু অংশ সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরাও প্রশ্ন করতে, আলোচনা করতে এবং অন্যদের সঙ্গে শেখার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারেন।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনও ছাত্রের শিক্ষার সমস্যা, কোনও প্রতিবন্ধী মানুষের দৈনন্দিন প্রতিবন্ধকতা কিংবা কোনও আদিবাসী সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের কথা বৃহত্তর সমাজের কাছে পৌঁছে যেতে পারে সমাজমাধ্যমের হাত ধরে।
নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং বৃহত্তর সমাজের ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও সমাজমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা বহু নারীর দক্ষতা আজ সমাজমাধ্যমের সাহায্যে বৃহত্তর বাজারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছে।
বাড়িতে তৈরি খাবার, পোশাক, গয়না কিংবা হাতের কাজ বিক্রির মাধ্যমে তাঁরা যেমন উপার্জনের সুযোগ পাচ্ছেন, তেমনই গড়ে তুলছেন নিজস্ব পরিচয় ও আত্মবিশ্বাস। একইভাবে ভৌগোলিক দূরত্ব, অর্থনৈতিক অসাম্য, সামাজিক পরিচয়ের কারণে যাঁদের অভিজ্ঞতা মূলধারার আলোচনায় প্রায়শই উপেক্ষিত থেকে যায়, তাঁরাও নিজেদের কথা সরাসরি প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছেন।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনও ছাত্রের শিক্ষার সমস্যা, কোনও প্রতিবন্ধী মানুষের দৈনন্দিন প্রতিবন্ধকতা কিংবা কোনও আদিবাসী সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের কথা বৃহত্তর সমাজের কাছে পৌঁছে যেতে পারে সমাজমাধ্যমের হাত ধরে। ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চাতেও এই মাধ্যম নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
সমাজমাধ্যমের সাফল্য কতগুলি রিল ভাইরাল হল, কতজন অনুসারী বা ফলোয়ার বাড়ল, কত লক্ষ মানুষ কোনও পোস্ট দেখলেন, তার হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। তার প্রকৃত সাফল্য লুকিয়ে রয়েছে সেই সব সম্ভাবনার মধ্যে, যা এতদিন সুযোগের অভাবে অপ্রকাশিত থেকে গিয়েছিল।
অবশ্য এই পথ সর্বদা মসৃণ নয়, সাফল্যও নিশ্চিত নয়। তবু এর গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। প্রযুক্তি নিজে কোনও সমাজকে বদলে দেয় না; পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করে, আর সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব মানুষেরই।
যে তরুণের প্রতিভা কোনও প্রতিষ্ঠানের দরজায় স্বীকৃতি পায়নি, যে নারী নিজের দক্ষতাকে উপার্জনের উপায় করে তুলতে পারেননি, যে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের অভিজ্ঞতা বৃহত্তর সমাজের কাছে পৌঁছনোর সুযোগ ছিল না, সমাজমাধ্যম তাদের সামনে বিকল্প পথ খুলে দিতে পারে।
অবশ্য এই পথ সর্বদা মসৃণ নয়, সাফল্যও নিশ্চিত নয়। তবু এর গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। প্রযুক্তি নিজে কোনও সমাজকে বদলে দেয় না; পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করে, আর সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব মানুষেরই।

তাই সমাজমাধ্যমকে কেবল বিনোদনের উপকরণ কিংবা জনপ্রিয়তা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখলে তার বৃহত্তর তাৎপর্য অধরা থেকে যাবে। প্রয়োজন একে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা, তথ্যের সত্যতা যাচাই করা এবং ভিন্ন মত ও মানুষের মর্যাদাকে সম্মান জানানো। কারণ, একটি সমাজমাধ্যম তখনই সত্যিকার অর্থে ইতিবাচক হয়ে ওঠে, যখন তা কেবল কয়েকজনকে পরিচিতির আলোয় নিয়ে আসে না, বরং আরও বেশি মানুষকে নিজের কথা বলার, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এবং সমাজের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ করে দেয়।
যে তরুণ একদিন ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর আশায় মন্দিরের দরজায় বারবার মাথা নত করেছিল, তার জীবনে পরিবর্তন এসেছিল একটি ছোট্ট ভিডিওর হাত ধরে। এই গল্পের তাৎপর্য ভাইরাল হওয়ার সাফল্যে যতটা, তার চেয়েও বেশি মানুষের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যাওয়ার মধ্যে। সমাজমাধ্যমের সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি সম্ভবত এখানেই, এটি ভাগ্য বদলানোর নিশ্চয়তা দেয় না, কিন্তু ভাগ্য গড়ে তোলার একটি পথ খুলে দিতে পারে।
তথ্যসূত্র
১. Srini Raju Centre for IT and the Networked Economy (SRITNE), Indian School of Business (ISB), এবং Hashfame. (2026).
India’s Creator Economy: A Structural Analysis of Supply, Engagement, Monetisation, and Economic Opportunity.
২. Boston Consulting Group (BCG). (2025, May 3).
From Content to Commerce: Mapping India’s Creator Economy.
৩. Internet and Mobile Association of India (IAMAI) ও Kantar. (2025, January 17). Internet in India Report 2024.
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
