(Kalna Jagannathbari)
দিল্লির মসনদে তখন মুহম্মদ শাহ। নাদির শাহের দিল্লি আক্রমণের স্মৃতি বহন করে চলেছে তাঁর রাজত্বকাল। বলা হয়, নাদির বাদশাহকে পরাজিত করে ময়ূর সিংহাসন, কোহিনূর ও কীনূর হিরের সঙ্গে বিপুল সম্পদ লুঠ করেছিলেন। সেই মুহম্মদ শাহই বর্ধমানের চিত্রসেন রায়কে ‘মহারাজা’ উপাধি দেন।
বাংলায় মারাঠা হাঙ্গামা রুখতে চিত্রসেন খনন করান পরিখা। রাজার দুই রানি ভাগীরথীর তীরে কালনায় নির্মাণ করেন টেরাকোটার জোড়া আটচালা শিব মন্দির। সঙ্গে আরও একটি মন্দির। ভাগীরথীর মানচিত্র বদলে যাওয়ায় নদী ক্রমশ এগিয়ে আসছে ভগ্ন মন্দিরগুলির দিকে।
আরও পড়ুন: বর্ধমান রাজপরিবারের জোড়া রথ
প্রাচীন স্থাপত্য ও টেরাকোটা শিল্পের অপূর্ব নিদর্শন হিসেবে জগন্নাথ বাড়ির রাজেশ্বর ও ভুবনেশ্বর মন্দির দুটি বাংলার এক গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় বহন করে। বর্ধমানের তৎকালীন রাজা জগৎরাম রায়ের স্ত্রী ব্রজকিশোরীদেবী পুরীর শ্রীক্ষেত্র থেকে ফিরে গঙ্গাতীরে জগন্নাথের একটি মন্দির নির্মাণ করেন। সেই থেকে গোটা চত্বরটির নাম হয় জগন্নাথ বাড়ি। সেখানেই পরবর্তীতে এই মন্দিরগুলো নির্মাণ হয়েছিল।
মূল জগন্নাথ মন্দিরটি ভাগীরথীর ভাঙনে নষ্ট হয়ে গেছে। এখানকার মন্দির নিদর্শনের গায়ে পৌরাণিক কাহিনি, দেবদেবী, লতাপাতার নকশা, নান্দনিক কাজগুলো শিল্পকলার অংশ। এই শিল্পকর্মগুলি তৎকালীন শিল্পীদের কারিগরি দক্ষতার পরিচয় দেয়।

ওই অঞ্চলে একেবারে যমজ দুই মন্দিরে টেরাকোটা শিল্পে দেওয়ালের প্যানেলের মধ্যে দেবদেবী, জমিদারের গমন দৃশ্য, নর্তক নর্তকী, যোগী পুরুষ, বিদেশি নৌবহর, ঘোড়া, হাতি, সৈন্যবাহিনী ইত্যাদি বিভিন্ন কাজ পাওয়া যায়। দুই মন্দিরে সামনের দেওয়ালে ত্রি-খিলানের উপরে টেরাকোটা প্যানেলের মধ্যে রয়েছে বারোটি ক্ষুদ্র শিব মন্দির। এই সারি গুলো আসলে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ বা শিবের দ্বাদশ রূপের প্রতীকী হিসেবে শিল্পীরা নির্মাণ করতেন। তখনকার দিনের মন্দির নির্মাতাদের শিল্পভাবনা সত্যিই বিস্ময়কর। এই সমস্ত শিল্পনিদর্শন বাংলার মন্দির স্থাপত্যের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে আজও সজীব করে রেখেছে।
শ্রীচৈতন্যদেবের নবপ্রবর্তিত বৈষ্ণব ধর্মে বর্ধমান বাঙালিমানসে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রাধান্য পায়। বৃন্দাবন দাসের লেখায় ‘আম্বুয়া মুলুক’ আসলে আজকের অম্বিকা কালনা। এখানে মহাপ্রভু ভক্তি প্রচারে ভ্রমণ করেছিলেন। আর এই মুলুকেই আসলে বাংলার প্রথম গৌরাঙ্গ পূজা হয়।
রানি ছিলেন মূলত উত্তর প্রদেশের বাসিন্দা। তাঁর পরিবার বাংলায় এসে বসবাস শুরু করেন। ইন্দ্রকুমারী বাংলার মন্দির স্থাপত্যচর্চায় বিশেষ অবদানের জন্য পরিচিত। এই সময় বর্গীর দল প্রায়ই বাংলায় লুটপাঠ করতে আসত।
মুঘল ও সাহেবদের আমলে বর্ধমান মহারাজারা কালনাতে একাধিক দেবদেবী মন্দির নির্মাণ করেন। এদের মধ্যে অন্যতম শ্রীযুক্ত মহারাজা চিত্রসেন। তাঁর আমলে নির্মিত কালনার সিদ্ধেশ্বরী দেবী মন্দিরটি সকলেই দর্শন করেন।
জগন্নাথ বাড়ির মন্দির দুটিও নির্মাণ করেছিলেন মহারাজ চিত্রসেনের দুই রানি ছঙ্গকুমারী দেবী ও ইন্দ্রকুমারী দেবী। ১৭৪৩-১৭৫৩ সালের মধ্যে এই জোড়া শিব মন্দির দুটি নির্মিত হয়েছিল। এর মধ্যে ভুবনেশ্বর মন্দিরটির প্রতিষ্ঠা ফলকে লেখা, ‘কানীয়সী’ কথাটি। মন্দির গবেষকদের মতে, এর অর্থ কানীয়সী হল কনিষ্ঠা (স্ত্রীলিঙ্গ রূপ)। যে হলেন সবচেয়ে ছোট বা বয়সে ছোট নারী। তাই ভুবনেশ্বর মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাতা রাজার সবচেয়ে কনিষ্ঠা রানি ইন্দ্রকুমারী দেবী।

রানি ছিলেন মূলত উত্তর প্রদেশের বাসিন্দা। তাঁর পরিবার বাংলায় এসে বসবাস শুরু করেন। ইন্দ্রকুমারী বাংলার মন্দির স্থাপত্যচর্চায় বিশেষ অবদানের জন্য পরিচিত। এই সময় বর্গীর দল প্রায়ই বাংলায় লুটপাঠ করতে আসত। মহারাজ চিত্রসেন বর্গীদের রুখতে দুর্গ গড়ে দেন। আর তাদের ওপর আক্রমণের জন্য দুর্গের ওপর একাধিক তোপ বসিয়েছিলেন। সেই তোপে রাজার নাম খোদিত ছিল।
পর্তুগিজ রণতরী বাংলার বেশ কিছু ঐতিহাসিক টেরাকোটা মন্দিরের দেওয়ালে পাওয়া যায়। রণতরীতে নাবিকদের দৃশ্য খোদাই করা থাকে। মধ্যযুগ ও ঔপনিবেশিক আমলে (১৬শ থেকে ১৯শ শতকের মাঝামাঝি সময়) স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা সমসাময়িক সমাজ ব্যাবস্থার নানা ঘটনা টেরাকোটার মাধ্যমে মন্দিরের গায়ে ফুটিয়ে তুলতেন। এই ফলকগুলোতে পর্তুগিজদের উপস্থিতি পাওয়া যায়।
তাদের বিশাল আর্মাডা বা ক্যারাক রণতরীগুলো বাংলার নদীগুলোতে যাতায়াত করত। পর্তুগিজদের সেইসব ঘটনা শিল্পীরা মন্দিরের প্যানেলে তুলে ধরেন। জগন্নাথ বাড়ির মন্দির স্থাপত্যে এই ধরনের পর্তুগিজ রণতরী দেখা যায়।
পর্তুগিজরা বাংলায় বাণিজ্য করতে আসে হুগলির সপ্তগ্রাম ও চট্টগ্রামের মতো অঞ্চলে। বাংলায় তাদের প্রথমদিকের ঘাঁটি ছিল চট্টগ্রাম বা পোর্ট গ্র্যান্ডি। দিয়াং নামক সমুদ্রবন্দরে তাদের বাণিজ্য কুঠি গড়ে ওঠে। এরপর বাংলায় তাদের অন্যতম বড় বাণিজ্য কুঠি সপ্তগ্রাম বা পোর্ট পিকানো।
মোঘল প্রশাসনে তাদের সহজেই ছিল প্রবেশাধিকার, ফলে সম্রাটের ছাড়পত্রে সহজেই চলত বাণিজ্য। দরিদ্র মানুষদের ওপর তারা লুঠপাঠ চালাতেন। এদেরকে বলা হত হার্মাদ।

তাদের বিশাল আর্মাডা বা ক্যারাক রণতরীগুলো বাংলার নদীগুলোতে যাতায়াত করত। পর্তুগিজদের সেইসব ঘটনা শিল্পীরা মন্দিরের প্যানেলে তুলে ধরেন। জগন্নাথ বাড়ির মন্দির স্থাপত্যে এই ধরনের পর্তুগিজ রণতরী দেখা যায়।
একসময় পর্তুগিজরা এশিয়া থেকে ইউরোপে হাতি পরিবহন করতেন। বিশাল হাতিগুলোকে মহাসাগর পাড়ি দিয়ে নিয়ে যাওয়া হত। এদের সঙ্গে থাকত পর্যাপ্ত খাবার। এই হাতিগুলো রাজ পরিবারগুলোর কাছে ছিল খুব মূল্যবান। জগন্নাথ বাড়ির মন্দির স্থাপত্যে পর্তুগিজ রণতরীর জানালার মধ্যে এই হাতিকে দেখতে পাওয়া যায়।
টেরাকোটা ফলকে রণতরীতে দেখা যায়, দুই বা তিন স্তরবিশিষ্ট মাস্তুল। সেই সঙ্গে বন্দুক বা কামান দাগার জন্য ছোট ছোট জানালার মতো খোলা অংশ (Matchlock openings)। সেই দৃশ্য, ফলকের মধ্যে এখানে উঠে এসেছে।
টেরাকোটা ফলকে রণতরীতে দেখা যায়, দুই বা তিন স্তরবিশিষ্ট মাস্তুল। সেই সঙ্গে বন্দুক বা কামান দাগার জন্য ছোট ছোট জানালার মতো খোলা অংশ (Matchlock openings)। সেই দৃশ্য, ফলকের মধ্যে এখানে উঠে এসেছে।
সম্প্রতি ভাগীরথী ও তার উপনদীগুলোয় জলের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার স্পষ্ট প্রভাব পড়েছে বাংলায়। জলস্তর বৃদ্ধির জন্য ভাগীরথীর গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিপুল পরিমাণ জলরাশি নদীতীরবর্তী বহু ফসলি জমি, ঘরবাড়ি ও স্থাপত্যকে গ্রাস করছে। জলের প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে নদীর তীরে কালনার এই মন্দির স্থাপত্যগুলো বন্যা ও তীব্র নদী ভাঙন দেখা দিলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এমনিতেই জগন্নাথ বাড়ির মন্দিরস্থাপত্যগুলি খুবই জীর্ণ দশায়। মন্দিরের মাথায় চালার অনেকখানি অংশে ফাটল ধরেছে। একটি আটচালা মন্দিরে ভিত্তি প্রস্তরের নিচের অংশ অনেকখানি ক্ষয় হয়ে গিয়েছে। যেকোনও সময় ভেঙে পড়তে পারে। সঠিক পর্যায়ে সংরক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।
বর্ষাতে কালনার বিস্তীর্ণ এলাকায় নদীর জল উপচে গ্রাম ও বেশ কিছু এলাকায় ঢুকে যায়। প্লাবিত হয় বিস্তীর্ণ জনপদ। নদী যেমন এই জনপদকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনই তার পরিবর্তনশীল গতিপথ অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। এই ইতিহাস কেবল বর্তমান সময়ের ঘটনা নয়। অতীতেও নদীর পথ পরিবর্তন ও চর গঠন হতে দেখা গিয়েছে।
ফলে মূল ভূখণ্ডের অনেকখানি অংশ নদী গ্রাস করে নিয়েছিল। কালনার জগন্নাথ বাড়ির রাজেশ্বর, ভুবনেশ্বর ও অন্যান্য মন্দির কেবল প্রাচীন স্থাপত্যশিল্পের নিদর্শন নয়, এগুলো বাংলার ইতিহাসের এক অধ্যায়।
পর্তুগিজ জাও ডি ব্যারস, স্টারভিনাস ও রেনেলের তৈরি মানচিত্রে সেই প্রমাণ উঠে আসে। ফলে মূল ভূখণ্ডের অনেকখানি অংশ নদী গ্রাস করে নিয়েছিল। কালনার জগন্নাথ বাড়ির রাজেশ্বর, ভুবনেশ্বর ও অন্যান্য মন্দির কেবল প্রাচীন স্থাপত্যশিল্পের নিদর্শন নয়, এগুলো বাংলার ইতিহাসের এক অধ্যায়।

মন্দিরের গায়ে ফুটে থাকা সমকালীন সমাজ বা পৌরাণিক কথা সেকালের শিল্পীদের দক্ষতাকে প্রমাণ করে। অথচ প্লাবন ও ভয়াবহ ভাঙনের আশঙ্কায় এই ঐতিহ্য আজ বিপন্ন। তাই সময় থাকতে মন্দিরগুলির যথাযথ প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ জরুরি। নাহলে ইতিহাসের এই অমূল্য অধ্যায় একদিন কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে।
তথ্যসূত্রঃ ডেভিড জন ম্যাককাচন / প্রণব রায়
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
