Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

জলকে চল পঞ্চবিংশ পর্ব

বিতস্তা ঘোষাল

জুলাই ২৩, ২০২৬

Jolke Chol 25
Bookmark (0)
Please login to bookmark Close
(Jolke Chol 25)

গাড়ি থেকে নেমে মোহনা দেখল, এর মধ্যেই রোটারি ক্লাবের দু’জন সদস্য লেফট্যানেন্ট বিশ্বাস আর মিস্টার মিত্র পৌঁছে গেছে সেখানে। দুটো টেবিলের সামনে চেয়ার পেতে দু’জন ডাক্তার আর সিস্টারও চলে এসেছেন। এই ডাক্তারদের সঙ্গেও তার ভালই পরিচয় আছে। ডাক্তার সুদীপ্ত ও ডাক্তার অমরনাথ এই মুহূর্তে দু’জনেই খুব নাম করা এমডি। তার দিকে তাকিয়ে দু’জনেই হাসল।

একটু দূর থেকে লাইন পড়েছে হেলথ চেকআপ করবে যারা, তাদের। দু’টো আলাদা লাইন। মোহনাকে দেখে লেফট্যানেন্ট বিশ্বাস এগিয়ে এলেন।

আরও পড়ুন: জলকে চল: পর্ব – (১) (২) (৩) (৪) (৫) (৬) (৭) (৮) (৯) (১০) (১১), (১২) (১৩), (১৪) ,(১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯), (২০), (২১), (২২), (২৩), (২৪)

– এবার শুরু করে দিই। নইলে রোদ বেড়ে গেলে এখানে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না।

– হ্যাঁ। আটটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি, ডট আটটায় শুরু করে দিন। বলে লাইনের দিকে তাকিয়ে বলল— ‘অনেক মানুষই এসেছেন দেখছি।’

লেফট্যানেন্ট ঠোঁট চিপে হাসলেন। হাসলে তার বিশাল গোঁফ দুটো নেচে ওঠে। চোখ দুটো ছোট হয়ে যায়। মোহনার সেই মুখটা দেখে হাসি পায়। কিন্তু নিজেকে সংযত করে একটা গাম্ভীর্যের মুখোশ পরে নেয়।

তার চোখ অবশ্য খুঁজছিল মিডিয়ার প্রতিনিধিদের। আজকাল সে যে অনুষ্ঠানেই যাক না কেন, যদি সেটা পাবলিক ইন্টারেস্ট বা পরিষেবা সংক্রান্ত কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়, মিডিয়াকে জানিয়ে যায়। এতে তার একটা প্রচার হয়। এইভাবে বারবার ক্যামেরার সামনে আসাটা তার এখন বেশ লাগে। নিজেকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মানুষ বলে মনে হয়।

Jolke Chol 25
একটু দূর থেকে লাইন পড়েছে হেলথ চেকআপ করবে যারা, তাদের

ওই দেশে থাকার সময় ভারতীয় রাষ্ট্রদূত হিসাবে বহু চ্যানেল, নিউজপেপার প্রমিতের সাক্ষাৎকার নিত। মাঝে মধ্যে সে স্ত্রী হিসেবে পাশে বসার অনুমতি পেত। তখন লক্ষ করেছে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় প্রমিতের আচরণ। আত্মবিশ্বাস, ক্ষমতার গরিমা চুঁইয়ে পড়ত তার প্রতিটি শব্দে, বাক্যে।

প্রমিতের জীবনদর্শনের সঙ্গে তার অনেক অমিল। কিন্তু এইটা সে দেখে দেখে রপ্ত করেছে। কর্পোরেট জগত তাকে শিখিয়েছে শুধু মেধা, পরিশ্রম দিয়ে একটা পর্যায়ে পৌঁছানো যায়, কিন্তু চূড়ান্ত সাফল্য পেতে গেলে তার সঙ্গে একটা অন্যরকম ব্যক্তিত্ব, গাম্ভীর্য রপ্ত করতে হয়, তাতে সে যে সুপিরিয়র, অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র সেটা বোঝানো যায়। সে এইসব কিছু থেকে নিজের মতো একটা পথ তৈরি করে নিয়েছে। 

মাইকে ঘোষণা করছিলেন ঘোষক। ঘোষণা শুনতে শুনতে মোহনা ভাবছিল— এই ক’বছরে তার জীবন কতটা বদলে গেল। কিন্তু ভিতর থেকে কতটা বদলেছে নিজেকে?

শুরু হল আজকের হেলথ চেক আপ ক্যাম্প। রোটারি ক্লাবের পক্ষ থেকে এই আয়োজনে উপস্থিত আছেন বিশিষ্ট ডাক্তার সুদীপ্ত দাশ ও ডাক্তার অমরনাথ চক্রবর্তী। তাঁদের সহযোগিতা করার জন্য আছেন সিস্টার নিবেদিতা ও মোনালিসা। রোটারি ক্লাবের পক্ষে রয়েছেন যাঁরা, তাঁদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ, এখানে এমন এক মেডিক্যাল ক্যাম্প করার জন্য।

মাইকে ঘোষণা করছিলেন ঘোষক। ঘোষণা শুনতে শুনতে মোহনা ভাবছিল— এই ক’বছরে তার জীবন কতটা বদলে গেল। কিন্তু ভিতর থেকে কতটা বদলেছে নিজেকে? নাকি সে চেয়েছে বদলাতে! সে মাঝে মাঝে নিজেকে মেলাতে পারে না আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। একটা মুখ, আরেকটা মুখোশ দুটোই তার চোখে পড়ে তখন। কখনও কখনও মুখোশগুলো ভারী লাগে। ইচ্ছে করে ছুঁড়ে ফেলে দিতে। কিন্তু খ্যাতির একটা মোহ আছে, যা সহজে চাইলেও আর ত্যাগ করা যায় না। অবশ্য সচেতনভাবে সে চায়ও না ছেড়ে বেরিয়ে আসতে। সে এমনটাই চেয়েছিল, এই ক্ষমতা, নাম, যশ…।

আমাদের মধ্যে উপস্থিত আছেন চৌধুরী সাহিত্য কুটীরের কর্ণধার, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ম্যাডাম মোহনা চৌধুরী। তিনি বাচ্চাদের হাতে তুলে দেবেন তাদের মন ভাল করার জন্য ছবির বই ও রং, তুলি। আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ।

ঘোষণাটা শুনে ঠোঁটের কোণে একটা হালকা হাসি খেলে গেল মোহনার। আর তখনই তার নজরে এল চ্যানেলের ছেলেটির দিকে। মোহনা দেখেও না দেখার ভাব দেখিয়ে যেদিকে চেকআপ চলছে সেদিকে তাকালো।

আমার? এটা তো একা আমার নয়। যৌথ উদ্যোগে হচ্ছে। রোটারি ক্লাবের পক্ষ থেকেও দু’জন আছেন। ডাক্তারবাবুরাও আছেন। আচ্ছা দাঁড়াও, ওঁদের ডেকে নিই।

– ম্যাডাম একটা বাইট নেব।

– আমার? এটা তো একা আমার নয়। যৌথ উদ্যোগে হচ্ছে। রোটারি ক্লাবের পক্ষ থেকেও দু’জন আছেন। ডাক্তারবাবুরাও আছেন। আচ্ছা দাঁড়াও, ওঁদের ডেকে নিই। বলে মোহনা একটু চিৎকার করে ডাকল, বিশ্বাসদা, মিত্রদা একবার এখানে আসবেন।

মোহনা ডাকল বটে, তবে সে ভাল করেই জানে মিত্রদা আসবেন না। তিনি কোনও রকম পাবলিসিটি পছন্দ করেন না। এক্স আর্মি অফিসার মিত্রদার মধ্যে কাজ করার নিরন্তর একটা খিদে আছে। কিন্তু সেটা নীরবে করতেই ভালবাসেন তিনি। তিনি বলেন, আর্মিতে থাকাকালীন একটা জিনিস শিখেছি নাথিং ইজ পার্মানেন্ট। তাই নির্লোভ, নিরুত্তাপ ও নিরাসক্তভাবে কাজ করা উচিত।

Jolke Chol 25
ম্যাডাম একটা বাইট নেব

মিত্রদার এই কথার আড়ালে সকলে হাসাহাসি করলেও দায়িত্বভার তার উপর ছেড়ে দিতে দু’বার ভাবেন না সংগঠনের মাথারা। প্রত্যেকেই জানেন, মিত্রদাকে যেখানেই পাঠানো হবে, তিনি সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে তবে ফিরবেন। রোদ, জল, ঝড়, বৃষ্টি, খরা, বন্যা সব কিছু উপেক্ষা করে তিনি পৌঁছে যাবেন গন্তব্যে। ত্রাণ, মেডিক্যাল ক্যাম্প, দুর্গতদের পাশে দেখা যাবে তাঁকে সবার আগেই।

মোহনার ডাকে বিশ্বাসদা এগিয়ে এলেন। মিত্রদা হাত নেড়ে বুঝিয়ে দিলেন তিনি ওখানেই ঠিক আছেন।

– ম্যাডাম ক্যামেরা অন করছি।

মানুষের শরীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক সময় নানা অসুবিধায় মানুষ ডাক্তার দেখাতে পারছেন না। পোস্ট কোভিড দিনে বাচ্চারাও মনের দিক থেকে ভাল থাকছে না। তাদের কথা ভেবেই এই উদ্যোগ।

মোহনা বলল— এই অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা যৌথভাবে রোটারি ক্লাব ও চৌধুরী সাহিত্য কুটীর। রোটারি ক্লাবের পক্ষ থেকে রয়েছেন লেফট্যানেন্ট বিশ্বাস ও প্রাক্তন আর্মি অফিসার মিস্টার মিত্র। এগুলো জানা কথা, তবুও আরেকবার বলছি, মানবতার সেবায় নিবেদিত রোটারি ক্লাবের যাত্রা শুরু হয় ১৯০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে। সে বছর রোটারির জনক পল পার্সিভাল হ্যারিসের উদ্যোগে ভিন্ন ভিন্ন পেশার মাত্র ৪ জন সদস্য নিয়ে রোটারি আন্তর্জাতিকের পথচলা শুরু হয়।

রোটারিয়ানরা বিশ্ব জুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা, সংঘর্ষ প্রতিরোধ, রোগ চিকিৎসা, শুদ্ধ পানীয় জল, স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, প্রাথমিক শিক্ষা ও সাক্ষরতা ও অর্থনৈতিক সামাজিক উন্নয়ন ছাড়াও বিশ্বকে পোলিওমুক্ত করা, আর্সেনিকমুক্ত বিশুদ্ধ পানীয় ব্যবস্থা, সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জন্য স্বল্প খরচে গৃহ নির্মাণ, পঙ্গুদের জন্য উন্নত চিকিৎসা ও হুইল চেয়ার বিতরণ, বিভিন্ন প্রকার প্লাস্টিক সার্জারি, বৃক্ষরোপণ, শীতবস্ত্র বিতরণ, বয়স্কদের শিক্ষার ব্যবস্থাসহ নানামুখী সামাজিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। গত পাঁচ বছর ধরে আমি নিজেও একজন রোটারিয়ান। তাই ভাল লাগছে এখানে এসে। 

মানুষের শরীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক সময় নানা অসুবিধায় মানুষ ডাক্তার দেখাতে পারছেন না। পোস্ট কোভিড দিনে বাচ্চারাও মনের দিক থেকে ভাল থাকছে না। তাদের কথা ভেবেই এই উদ্যোগ। বেলা এগারোটা অবধি আজ এই চেকআপ চলবে। আমরা কৃতজ্ঞ দুই বিশিষ্ট ডাক্তারের কাছে। তাঁরা আজ আমাদের সঙ্গী হয়েছেন এই কর্মকান্ড সফল করার জন্য। ধন্যবাদ আপনাদেরও, আমাদের সঙ্গী হওয়ার জন্য। মোহনা একনাগাড়ে বলে গেল।

– আমরা কথা বললাম চৌধুরী সাহিত্য কুটীরের কর্ণধার মোহনা চৌধুরীর সঙ্গে, বলে ক্যামেরা তার মুখ থেকে যেখানে চেক আপ চলছে সেদিকে ঘুরল।

ডাক্তার সুদীপ্তর বয়স অল্প, তাঁর নয় এখনও ক্লান্তি আসেনি পেশায়, কিন্তু ডঃ অমরনাথ! তাঁকে দেখে মনেই হয় না কোনও বিরক্তি আসে এত রোগী দেখতে দেখতে।

মোহনা জানে সে এখানে থাকবে সাড়ে নটা পর্যন্ত। ঘড়ির দিকে তাকালো। আর আধ ঘণ্টা বাকি। সে এগিয়ে গেল টেবিলের দিকে। সেখানে খানিকক্ষণ বসল। ক্লাবের একটা ছেলেকে জিজ্ঞেস করল, বাচ্চারা কখন আসবে?

– ম্যাডাম এসে যাবে এখনই। আমি দেখছি, বলে সে চলে গেল।

Jolke Chol 25
মোহনার অবাক লাগে ডাক্তারদের ধৈর্যশক্তি দেখে

একজন মাটির ভাঁড়ে করে চা দিয়ে গেল তাদের। সে চায়ে চুমুক দিয়ে ডাক্তারদের দিকে তাকাল। তারা এক ভাবে চেকআপ করে যাচ্ছেন। মোহনার অবাক লাগে ডাক্তারদের ধৈর্যশক্তি দেখে। কী করে এরা এত পরিশ্রম করতে পারে ভেবে সে মাঝে মাঝে আশ্চর্য হয়ে যায়। ডাক্তার সুদীপ্তর বয়স অল্প, তাঁর নয় এখনও ক্লান্তি আসেনি পেশায়, কিন্তু ডঃ অমরনাথ! তাঁকে দেখে মনেই হয় না কোনও বিরক্তি আসে এত রোগী দেখতে দেখতে।

সে সুদীপ্তর মুখের দিকে তাকালো। ত্রিশ বছরের আশেপাশে বয়স, চেহারাটা একটু মোটার দিকে, কিন্তু সেটা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে, বোঝা যায় তাঁকে দেখে। চোখে ভারী পাওয়ারের স্টাইলিস্ট হোয়াইট ফ্রেমের চশমা। অর্ধেকের বেশি মুখ জুড়ে মাস্ক পরে থাকলেও চোখ দুটোর ঔজ্জ্বল্য তাঁকে খুব সহজে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়। তবে ছেলেটার মধ্যে একটা অস্থিরতা কাজ করে, সেটা তাঁর দ্রুত কথা বলা, হাঁটা চলা থেকে বোঝা যায়। কিন্তু যখন রোগী দেখেন, তখন তাঁর নিবিষ্ট দৃষ্টি বুঝিয়ে দেয় পেশাটাকে দারুণ ভালবাসেন, ও একই সঙ্গে এনজয় করেন।

ক্লাবের সামনে আয়োজন করা হয়েছে এই ক্যাম্পের। মানুষগুলোর চেহারা ও দাঁড়ানোর ভঙ্গি বলে দিচ্ছে এরা একেবারেই নিম্ন মধ্যবিত্ত। অবশ্য সরকারি গৃহ প্রকল্পের কারণে এখন এদের বাড়িগুলো আগের থেকে উন্নত।

ডাক্তার অমরনাথ আবার স্লিম, লম্বা। চেহারায় একটা ডোন্ট কেয়ার ভাব আছে। রোগী দেখার সময় প্রচুর কথা বলেন। কিন্তু নিজের পেশায় ভীষণ কনফিডেন্ট। আর একটা বিষয় আছে তাঁর, যা তাঁকে সবার থেকে আলাদা করেছে। রোগী চেম্বারে, হাসপাতালে কিংবা যেখানে তিনি যুক্ত, সেখানে আসার মতো অবস্থায় না থাকলে তাঁর কানে গেলে তিনি যতদূরই হোক না কেন চলে যান সেই রোগীর বাড়ি। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তিনি দু’বার ভাবেন না। এর জন্য অতিরিক্ত চার্জও নেন না।

একটা জিনিস মোহনা লক্ষ করেছে অধিকাংশ ডাক্তারই ফিটনেস কনসার্ন। খাওয়াদাওয়া ভীষণ মেপে। জিম না গেলেও নিয়মিত হাঁটা অথবা ফিজিক্যাল এক্সাসাইজ করবেই। আসলে বিভিন্ন রোগী দেখার চাপ নিতে নিতে তাঁদের মনও অজান্তে ভীত হয়। হয়তো তখন তাঁরা নিজেদের ফিট রাখার চেষ্টা করেন। গত কয়েক বছর সামনে থেকে কোভিডের মতো লড়াইটা তাঁরাই লড়ল। একেবারে নিরস্ত্র অবস্থায় ঢাল তরোয়াল ছাড়া নিধিরাম সর্দার হয়ে বুক চিতিয়ে তাঁরাই আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন মানুষের প্রাণ বাঁচাতে। মনে মনে তাদের কুর্নিশ জানালো মোহনা। তারপর চারদিকে চোখ ঘোরালো।     

বাইপাশের ধারে এই অঞ্চলটা বস্তি অধ্যুষিত। একটা ক্লাবের সামনে আয়োজন করা হয়েছে এই ক্যাম্পের। মানুষগুলোর চেহারা ও দাঁড়ানোর ভঙ্গি বলে দিচ্ছে এরা একেবারেই নিম্ন মধ্যবিত্ত। অবশ্য সরকারি গৃহ প্রকল্পের কারণে এখন এদের বাড়িগুলো আগের থেকে উন্নত। তিন-চারটে ঘর পর পর বাথরুম বানিয়ে দিয়েছে সরকার।

এই মানুষগুলো কি সুখী? এভাবে বাস করে তারা কি আকাশচুম্বী স্বপ্ন দেখে! তার ইচ্ছে করছিল এদের ঘরগুলোতে ঢুকে দেখতে ঠিক কীভাবে দিন কাটায় এরা। এটা বুঝতে পারছে আধুনিক বিলাসিতার জিনিস এদের ঘরেও মজুত। টেনে নেওয়া ইলেকট্রিক লাইন, টিভির কেবলের লাইন যেনতেন প্রকারে এদের ঘরগুলোতে ঢুকেছে। এই কারণেই বস্তিতে প্রায়ই শীতকালে আগুন ধরে। শট সার্কিট হয়ে একটা জায়গায় স্ফুলিঙ্গ দেখা দিলে নিয়ন্ত্রণের কোনও জায়গা নেই। এতটাই গায়ে গায়ে লাগানো ঘরগুলো। কীভাবে এদের চলে কে জানে! নিজের মনেই ভাবছিল মোহনা। অবশ্য এখন এরাও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা শেখাচ্ছে। এটাই একটা আশার আলো।

আসলে যে কোনও দেশে মিশনারীদের লক্ষ থাকে গরিব, শোষিত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের সাহায্য করা, যাতে এরা ধর্মান্তরিত হয়।

– পৃথিবীর সব প্রান্তেই এইরকম বস্তি আছে। কোথাও প্রকাশ্যে, কোথাও কান্ট্রিসাইডে।

কীভাবে এত বস্তি তৈরি হল, এই নিয়ে সম্প্রতি রাই তাকে বোঝাচ্ছিল। তাদের প্রায়ই কলেজের পক্ষ থেকে শহরের বিভিন্ন বস্তি, ফুটপাতের বাসিন্দাদের নিয়ে কাজ করতে যেতে হয়। রাই বলে— মা, জাতিসংঘের সংস্থা ইউএন-হ্যাবিটেটের সংজ্ঞা অনুসারে, বস্তি হল কোনও শহরের রান ডাউন বা ভগ্নদশাগ্রস্থ এলাকা, যার বৈশিষ্ট্য নিম্নমানের বসতবাড়ি, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং স্থায়ী নিরাপত্তার অভাব। সারা বিশ্বে বর্তমানে একশো কোটি মানুষ বস্তিতে বাস করেন। ২০৩০ সালে এই সংখ্যা আনুমানিক দুশো কোটি স্পর্শ করতে চলেছে। 

– তোদের কি এদের ঘরে ঢুকে কাজ করতে হচ্ছে?

Jolke Chol 25
বাচ্চাগুলোর নিষ্পাপ মুখ দেখতে দেখতে সে নিজেকে বলল, এটাও কি রাজনীতি?

– অফ কোর্স মা। শুধু আমাদের নয়, যে কোনও খ্রিস্টান মিশনারী স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ম্যান্ডেটারি ওয়ার্ক, বস্তির বাচ্চাদের পড়ানো, তাদের সোশ্যাল ওয়েলফেয়ারের দিকে নজর দেওয়া, এসবের উপর আমাদের নাম্বার দেওয়া হয়। সেটা সোশ্যাল ক্রেডিট পেপারে যুক্ত হয়।

– আসলে যে কোনও দেশে মিশনারীদের লক্ষ থাকে গরিব, শোষিত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের সাহায্য করা, যাতে এরা ধর্মান্তরিত হয়।

– মা সব ধর্মই এভাবে নিজেদের কমিউনিটি বাড়াতে চায়। একমাত্র ব্যতিক্রম হিন্দু ধর্ম। কারণ এখানে ব্রাক্ষণ্যবাদ এখনও প্রচন্ড গোঁড়া। জাতপাত এসব নিয়েই মেতে থাকে হিন্দুরা। তুমি দলিত পীড়ন দেখলেই বুঝতে পারবে সিনারিওটা। এখন প্রতিদিন অত্যাচারিত হতে হতে তারা যদি ধর্ম বদলে সমাজের মূল স্রোতে ফিরতে পারে তাতে ক্ষতি কী!

সি টোল্ড মি হাউ ব্রাক্ষণ্যবাদ সোসাইটিকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই প্রাচীন কাল থেকে। বৌদ্ধধর্ম, বৈষ্ণবধর্ম এত তাড়াতাড়ি স্প্রেড করার কারণই কিন্তু এই গোঁড়ামির বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের মতো বাঁচার অধিকার লাভের ইচ্ছে।

– তুই এত কিছু ভাবিস? মেয়ের মুখের দিকে অবাক হয়ে দেখছিল মোহনা।

রাই বলল— অল ক্রেডিট গোস টু দিদুন। সি টোল্ড মি হাউ ব্রাক্ষণ্যবাদ সোসাইটিকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই প্রাচীন কাল থেকে। বৌদ্ধধর্ম, বৈষ্ণবধর্ম এত তাড়াতাড়ি স্প্রেড করার কারণই কিন্তু এই গোঁড়ামির বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের মতো বাঁচার অধিকার লাভের ইচ্ছে। নইলে কৃষ্ণনাম বা হরিবোলের কি এত জোর ছিল যে দলে দলে লোক বৈষ্ণব হয়ে গেল? জানো মা, আমার মনে হয় গৌতম বুদ্ধ থেকে চৈতন্যদেব সবাই আসলে ধর্মের আড়ালে সুপার পলিটিশিয়ান। রামকৃষ্ণ বা বিবেকানন্দের জনপ্রিয়তার কারণও কিন্তু অনেকটা সহজে সাধারণ মানুষকে কাছে টানা, গোঁড়ামি নয়।

– হুম। মোহনা সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয়। 

এদের মুখের হাসিটা কি আমাদের নাগরিক, ক্লান্ত, ভীত মনটাকে তৃপ্তি দেয় না? না রাই, তুই সবটা বোধহয় বোঝার মতো বড় এখনও হয়ে উঠিসনি।

দরিদ্রকে নারায়ণ জ্ঞানে পুজো করার কথা ধর্মে বলেছে। কিন্তু সেবা করার সঙ্গে ধর্মকে বেঁধে দেওয়া তার পছন্দ নয়। অথচ এখন সেবা, রাজনীতি, উন্নয়ন, সব কিছুতেই ধর্ম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। এখন বলে নয়, ধর্ম আর রাজনীতি বোধহয় চিরকাল পাশাপাশি হাত ধরে চলেছে। যদিও রাই বলে, মা ধর্ম হল আফিমের মতো, যত খাবে তত নেশা বাড়বে। কোনও ধর্ম কি বলেছে অন্য ধর্মের মানুষের উপর আঘাত হানতে, তাদের খুন করতে? কিন্তু যুগ যুগ ধরে এটাই হয়ে আসছে, আর রাজনীতিবিদরা এটাকেই হাতিয়ার করে ক্ষমতা দখল করেছে বার বার। কাজেই ধর্ম ও রাজনীতি একই মুদ্রার এদিক আর ওদিক। সো হোয়েন ইউ ডু সামথিং ফর জেনারেল পিউপিল সেখানে একটু হলেও রাজনীতি জড়িয়ে যাবেই। তুমি বিনা ইন্টারেস্টে শুধু ভালবেসে কেন সেবা করবে! হয়তো কনশাসলি তুমি করছ না, কিন্তু তোমার ইগো, তোমার অহং স্যাটিসফাই হচ্ছে। এইটাও এক ধরনের রাজনীতি, অন্তত রাষ্ট্রবিজ্ঞান সেটাই বলছে।   

Jolke Chol 25
সেবা করার সঙ্গে ধর্মকে বেঁধে দেওয়া পছন্দ নয়

চেয়ারে বসে সারিবদ্ধ মানুষগুলোকে দেখতে দেখতে এসব কথাই ভাবছিল মোহনা। মাইকে নিজের নাম শুনে উঠে দাঁড়ালো। অনেকগুলো বাচ্চা ক্লাবের সামনে এসে লাইন করে দাঁড়িয়ে। বাচ্চাগুলোর নিষ্পাপ মুখ দেখতে দেখতে সে নিজেকে বলল, এটাও কি রাজনীতি? এদের মুখের হাসিটা কি আমাদের নাগরিক, ক্লান্ত, ভীত মনটাকে তৃপ্তি দেয় না? না রাই, তুই সবটা বোধহয় বোঝার মতো বড় এখনও হয়ে উঠিসনি।

সে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। এবার তাদের হাতে বই, রঙ তুলে দিয়ে ক’টা ছবি তুলে আজকের মতো তার কাজ শেষ।

(ক্রমশ)

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Picture of বিতস্তা ঘোষাল

বিতস্তা ঘোষাল

বিতস্তা ঘোষাল ঔপন্যাসিক, গল্পকার, কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। আধুনিক ইতিহাসে এম এ, লাইব্রেরি সায়েন্সে বিলিস। কলেজে সাময়িক অধ্যাপনা। প্রকাশনা সংস্থা ভাষা সংসদের কর্ণধার। ও অনুবাদ সাহিত্যের একমাত্র পত্রিকা ‘অনুবাদ পত্রিকা’-র সম্পাদক। 'বাংলা আকাডেমি', 'সারস্বত সম্মান', 'বিবেকানন্দ যুব সম্মান', ‘একান্তর কথাসাহিত্যিক পুরস্কার', 'কেতকী' কবি সম্মান, ‘চলন্তিকা’, 'দুই বাংলা সেরা কবি সম্মান', 'বিজয়া সর্বজয়া', 'মদন মোহন তর্কালঙ্কার সম্মান', 'বই বন্ধু সেরা লেখক ২০২৪' সহ একাধিক পুরস্কার ও সম্মান প্রাপ্ত। বিতস্তার প্রকাশিত বই ৩৪টি। তাঁর কবিতা ও গল্প হিন্দি, ওড়িয়া, অসমিয়া ও ইংরেজি,ইতালি, গ্রীক ও স্প্যানিশে অনুবাদ হয়েছে। সম্প্রতি ওড়িয়া ভাষায় প্রকাশিত তার গল্প সংকলন রূপকথার রাজকন্যারা। দেশ বিদেশে কবিতা ও গল্প পড়ার ডাক পেয়েছেন একাধিকবার।বাংলা সবকটি জনপ্রিয় পত্রিকা ও সংবাদপত্রে তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত। নিজের কাজের গণ্ডীর বাইরে অফিস ও পরিবারেই স্বচ্ছন্দ বিতস্তা কাজের ফাঁকে অবসর সময় কাটান নানান সামাজিক কাজে। ভালোবাসা ছাড়া বাকি সব কাজ গুরুত্বপূর্ণহীন। তার নিজের কথায় ভালোবাসা ছাড়া কেউ কি বাঁচে?
Picture of বিতস্তা ঘোষাল

বিতস্তা ঘোষাল

বিতস্তা ঘোষাল ঔপন্যাসিক, গল্পকার, কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। আধুনিক ইতিহাসে এম এ, লাইব্রেরি সায়েন্সে বিলিস। কলেজে সাময়িক অধ্যাপনা। প্রকাশনা সংস্থা ভাষা সংসদের কর্ণধার। ও অনুবাদ সাহিত্যের একমাত্র পত্রিকা ‘অনুবাদ পত্রিকা’-র সম্পাদক। 'বাংলা আকাডেমি', 'সারস্বত সম্মান', 'বিবেকানন্দ যুব সম্মান', ‘একান্তর কথাসাহিত্যিক পুরস্কার', 'কেতকী' কবি সম্মান, ‘চলন্তিকা’, 'দুই বাংলা সেরা কবি সম্মান', 'বিজয়া সর্বজয়া', 'মদন মোহন তর্কালঙ্কার সম্মান', 'বই বন্ধু সেরা লেখক ২০২৪' সহ একাধিক পুরস্কার ও সম্মান প্রাপ্ত। বিতস্তার প্রকাশিত বই ৩৪টি। তাঁর কবিতা ও গল্প হিন্দি, ওড়িয়া, অসমিয়া ও ইংরেজি,ইতালি, গ্রীক ও স্প্যানিশে অনুবাদ হয়েছে। সম্প্রতি ওড়িয়া ভাষায় প্রকাশিত তার গল্প সংকলন রূপকথার রাজকন্যারা। দেশ বিদেশে কবিতা ও গল্প পড়ার ডাক পেয়েছেন একাধিকবার।বাংলা সবকটি জনপ্রিয় পত্রিকা ও সংবাদপত্রে তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত। নিজের কাজের গণ্ডীর বাইরে অফিস ও পরিবারেই স্বচ্ছন্দ বিতস্তা কাজের ফাঁকে অবসর সময় কাটান নানান সামাজিক কাজে। ভালোবাসা ছাড়া বাকি সব কাজ গুরুত্বপূর্ণহীন। তার নিজের কথায় ভালোবাসা ছাড়া কেউ কি বাঁচে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe To Newsletter

কথাসাহিত্য

বিতস্তা ঘোষাল
অর্ঘ্য কমল পাত্র

সংস্কৃতি

আহার

অমৃতা ভট্টাচার্য
শমিতা হালদার

বিহার

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
প্রদীপ্ত চক্রবর্তী

কলমকারী

ফোটো স্টোরি

নির্মাল্য চ্যাটার্জি
দেবার্চন চ্যাটার্জি

উপন্যাস

[adning id="384325"]
[adning id="384325"]

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com