(Burdwan Rajporibar Rath)
রাঢ়বঙ্গের ঐতিহ্যবাহী বর্ধমান রাজপরিবারের জোড়া রথ ও কাঞ্চননগরের ইতিহাস
রাঢ়বঙ্গের মাটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, সংস্কৃতি আর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। তার প্রবেশদ্বার হল বর্ধমান। স্টেশন চত্বরে পা রাখতেই বিস্তর গাড়ি, ট্রেকার, বাস, টোটো আর অটোদের জটলা সমবেতভাবে আপনাকে স্বাগত জানাবে। স্টেশন চত্বরে গাড়ি প্রচুরসংখ্যক দাঁড়িয়ে থাকে, নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য চালককে জানালে একেবারে স্থানীয় তথ্য দিয়ে সাহায্য করে দেয়।
আরও পড়ুন: বাংলায় যুদ্ধ বিগ্রহের বিধ্বংসী সব কামান
বর্ধমান রাজপরিবারের লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দিরের রথযাত্রা মহোৎসব বিখ্যাত। ঐতিহ্যবাহী রাজ পরিবারের এই রথযাত্রার গুরুত্ব নেহাত কম নয়। বলা হয়ে থাকে, বর্ধমানের সবচেয়ে পুরনো রথযাত্রা উৎসব। স্টেশন থেকে গাড়ি নিয়ে সোনাপট্টি এলাকায় এলেই দেখা মিলবে রাজবাড়ির লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দির। নাট মণ্ডপের একাংশ বর্তমানে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভেঙে পড়েছে। বেশ কিছুদিন আগেও মহারাজা মেহতাব চাঁদের নির্মিত আয়তনে বিশাল মণ্ডপটির সৌন্দর্য দেখবার মতো ছিল। এই মন্দিরের ভিতরেই থাকে দুটি রাজা ও রাণীর রথ।

ঐতিহাসিক বর্ধমান রাজবাড়ির আদি ইতিহাসের খোঁজে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে কাঞ্চননগরে, যেখানে এই রাজবংশের আদি বাসস্থান। দামোদরের বারবার বন্যার কারণে, নিরাপত্তার স্বার্থে পরবর্তীতে রাজারা তাঁদের মূল কেন্দ্রটি কাঞ্চননগর থেকে সরিয়ে শহরের উত্তর ফটক এলাকার এক নিরাপদ ও উঁচু স্থানে স্থানান্তরিত করেন। বর্ধমান জেলার এক ঐতিহাসিক জনপদ ছিল কাঞ্চননগর।
বাঙালির কাঞ্চননগরের নাম শুনলে সত্যজিৎ রায়ের ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ চলচ্চিত্রের সেই বিখ্যাত দৃশ্যটি মনে পড়বে। মগনলাল মেঘরাজের আস্তানায় জটায়ুর গলায় ছুরি ঘোরানোর সেই রোমহর্ষক খেলায় অবতীর্ণ হয়েছিল হরবন্সপুরের রাজার দল থেকে আসা এক খিলাড়ি। সেই ধারালো ছুরি দেখে জটায়ুর মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শোনা গিয়েছিল সেই কালজয়ী উক্তি- ‘কাঞ্চননগরের ছুরি?’। সত্যিই, এককালে কাঞ্চননগরের ছুরি-কাঁচি শিল্পের সুখ্যাতি ছিল আকাশছোঁয়া।

রাজা কীর্তিচাঁদ রায় চিতুয়াবরদার বিদ্রোহী শাসক শোহা সিংহকে যুদ্ধে পরাস্ত করে পুরনো রাজপ্রাসাদের চারপাশে বিজয় স্মারক হিসেবে বারোটি গেট নির্মাণ করেছিলেন। দামোদরের বিধ্বংসী বন্যার জলের তোড়ে এগারোটি গেট বিলীন হয়ে গেলেও, ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে কাঞ্চননগরের একমাত্র ‘বারোদুয়ারী গেট’।
বর্তমানে প্রতি বছর রথের দিন একটি পিতলের রথ টানা হয়। পিতলের রথটি সম্প্রতি নির্মিত হয়েছে। স্থানীয় মানুষের কাছে সেটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।
কাঞ্চননগরের রথযাত্রা ঐতিহাসিক। পুরনো রথ আজ আর নেই। এখানে রথতলা মোড় বলে একটি জায়গা রয়েছে, সেখানে একসময় রাজা কীর্তিচাঁদ রায়ের সময় রথযাত্রার প্রচলন হয়েছিল।
মহারাজা কীর্তিচাঁদ এই নগরকে নিজের মতো করে সাজিয়ে তুলেছিলেন। অতীতে দুটি কাঠের রথ এই নগরের রাজপথ দিয়ে যেত। সব থেকে আশ্চর্যের কথা হল, একটি ছিল ‘রাজার রথ’ এবং অন্যটি ‘রাণীর রথ’। দুটি অপূর্ব সুন্দর রথ নগর দিয়ে যাত্রা করত। সেই যাত্রাপথে জনগণ ব্যাপক ভিড় করে রথ দেখতেন। দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ রথের রশি টানতে আসতেন। রথ দুটি আজ আর নেই। তবে আজও এখানে রথের মেলা বসে।

বর্তমানে প্রতি বছর রথের দিন একটি পিতলের রথ টানা হয়। পিতলের রথটি সম্প্রতি নির্মিত হয়েছে। স্থানীয় মানুষের কাছে সেটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। পরবর্তীতে কাঞ্চননগর থেকে রাজারা তাদের বসবাস সরিয়ে নেন মেহতাব মঞ্জিলে। ১৮৫১ সালে মহারাজা মেহতাব চাঁদ নির্মাণ করেন এক অপরূপ ও সুদৃশ্য প্রাসাদ, যা ‘মেহতাব মঞ্জিল’ নামে পরিচিত।
আজ সেই মেহতাব মঞ্জিল বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রশাসনিক ভবন (রাজবাটি) হিসেবে এক নতুন রূপ পেয়েছে। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় কাঞ্চননগরের পুরনো কাঠের রথের বেশ কিছু অংশ রয়েছে। অনেকগুলি রথের কাঠের পুতুল সংগ্রহশালায় দেখতে পাওয়া যায়।
লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দিরে রথযাত্রা, জন্মাষ্টমী, বাসন্তী পুজো ও পটচিত্রে দুর্গাপুজো খুব বড় করে হয়। কালের নিয়মে রাজবাড়ির নাটমণ্ডপ কিংবা প্রাচীন রথযাত্রার জৌলুস কিছুটা মলিন হয়েছে।
সোনাপট্টি এলাকায় রাজপরিবারের লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দিরেও জোড়া রথ টানা হয়। এর পিছনেও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। এখানে রথে জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার বিগ্রহ থাকে না। একটি রথে গোপাল ও অন্য রথটিতে লক্ষ্মীনারায়ণ জিউকে বসানো হয়। মহারাজা মেহতাব চাঁদ এই রথযাত্রার সূচনা করেন।

এখানেও দুটি রথের একটিকে রাজার রথ ও অন্যটিকে রাণীর রথ বলা হয়ে থাকে। রাজার রথটি হয় পিতলের এবং রাণীর রথটি কাঠের নির্মিত। শোনা যায় রাণীর রথটি এক সময় ছিল রুপোর। পরিবারে রাণীরা সেই রথটি টানতেন।
লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দিরে রথযাত্রা, জন্মাষ্টমী, বাসন্তী পুজো ও পটচিত্রে দুর্গাপুজো খুব বড় করে হয়। কালের নিয়মে রাজবাড়ির নাটমণ্ডপ কিংবা প্রাচীন রথযাত্রার জৌলুস কিছুটা মলিন হয়েছে। তবু এই উৎসব অতীত ও বর্তমানকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। আজও রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রায় বহু লোকসমাগম হয়। এই রথযাত্রার সঙ্গে বহু আবেগ জড়িয়ে আছে। রাজবাড়ির মন্দিরের পুরনো রূপ ফিরে পাওয়ার আশায় মানুষ বুক বাঁধছেন।
তথ্যসূত্র: বর্দ্ধমান রাজবংশানুচরিত – নীরদবরণ সরকার
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত