(Rustic Cooking 27)
মাঠে মাঠে ঘাস পচানোর গন্ধ, ধান রোয়ার ব্যস্ততা। বর্ষার চাষ এখন শ্রাবণের প্রত্যাশায় দিন গোনে। তবু রোজ রোজ মেঘের দেখা কই! বর্ষাদিনেও মানুষের তাই নিম্নচাপের অপেক্ষা। কিন্তু বছরের ধান, সেটুকু না করলে কি আর চলে! ঘরে ঘরে এই বাংলায় তাই বর্ষার চাষ হয়ে চলেছে। বীজতলারা সবুজ ঘাসের গালচে হয়ে বিছিয়ে ছিল। গোছা গোছা তুলে নিলে আশ্চর্য দেখায় তখন। কেবল ধানি সবুজ রঙ তো নয়!
আরও পড়ুন: বনজ কুসুম: পর্ব – [১] [২] [৩] [৪] [৫] [৬] [৭] [৮] [৯] [১০] [১১] [১২] [১৩] [১৪] [১৫] [১৬] [১৭] [১৮] [১৯] [২০] [২১] [২২][২৩], [২৪], [২৫], [২৬]
বর্ষার মেঘের ছায়ায় করমচা আরও গাঢ় কালচে হয়ে ওঠে। সেই ছায়ায় আঁধার মাখে যূথবদ্ধ তালেরা। তারা কেউ কেউ ঝরেও পড়ছে। ঝরে পড়া তাল জমে জমে পাহাড় হয়। এত তাল খাবে কে! মাছি আর পোকাদের সে এক অপূর্ব মৌতাত তাই তালতলায়। সেই নেশা ধরানো গন্ধ পেরিয়ে যেতে যেতে দেখি একখানা মেটেরঙা খরগোশ ওই শরের ঝোপের আড়ালে কোথায় আড়াল হল। মানুষেরা বাড়ি ফিরে গেলে দু’একটা শামুকখোল আর মদনটাক এসব মেঠো কাদায় নেমে আসে। মানুষের সংস্রব এড়াতে সারা পৃথিবীর মাঠ ঘাট অরণ্যের কি ব্যকুলতা।
এসব ভাবলে কিছুটা মন খারাপ হয়। বাগানের বেড়ার ওই ধারে একখানা করমচার গাছ। জ্যৈষ্ঠের করমচা যেমন গোলাপি আভার, এখনকার করমচা তেমন নয়। গাঢ় লাল লাল করমচা তুলে এনে ইচ্ছে করে ছবি আঁকি। এই রান্নাঘর তো ছবিই আঁকে প্রতিদিন। তার কুটনো কেটে রাখার ঝুড়ি, ভাত ফোটার গন্ধ কী যেন এক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পৃথিবীর গন্ধকেই ছুঁতে চাইছে রোজ। সেই রঙ আর গন্ধের সঙ্গে কৃত্রিমতার কি তুলনা হয়! ঘরোয়া গেরস্থালি বহু বছরের সহাবস্থানে সেই আশ্চর্য পৃথিবীর গন্ধকে আত্মস্থ করেছে।
আমরা যখন বেশ ছোট, তখন সবে গ্রামে গ্রামে ফার্মের মুরগির বাজার গড়ে উঠছে। এমন বর্ষার দিনে না জানিয়ে কেউ এসে পড়লে খ্যাপলা জাল দিয়ে মাছ ধরাই দস্তুর ছিল। সেই মাছের ঝাল ঝোল অম্বলেও বর্ষার গন্ধ মিশে থাকত।
লম্বা লম্বা পাট গাছের ভিতরে নিবিড় ছায়া। দিনেরবেলাও সেখানে আলো পৌঁছায় না ভাল করে। বেছে বেছে পাট পাতা তুলে ধুয়ে বেছে শুকিয়ে রাখছে এই রান্নাঘর। কোন এক বহুবচনের কৌম দিয়ে ঘেরা জীবনের আশ্চর্য চর্যাপদ। এমন বর্ষার সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে মেঘরঙা শাড়ি পরবার মতো ক্ষমতা তার কোথায়! সে তাই ব্যক্তিগত মুন্সিয়ানায় নরম করে কচুর শাক রাঁধে, ঘ্যাটকোল পাতা তুলে এনে বাটে, থানকুনি আর ডুমুর দিয়ে পেঁপের শুক্তো রাঁধে।
আমরা যখন বেশ ছোট, তখন সবে গ্রামে গ্রামে ফার্মের মুরগির বাজার গড়ে উঠছে। এমন বর্ষার দিনে না জানিয়ে কেউ এসে পড়লে খ্যাপলা জাল দিয়ে মাছ ধরাই দস্তুর ছিল। সেই মাছের ঝাল ঝোল অম্বলেও বর্ষার গন্ধ মিশে থাকত। মানুষেরা জানত, গ্রীষ্মের ঝোলের চেয়ে এই ঝোল স্বরূপতই ভিন্ন। তেমনই এক বর্ষার দিনে শখ করে মাংস খাওয়ার বাই উঠল একদিন। বাজারে তখন ফার্মের মুরগি নতুন আকর্ষণ।

সেই মুরগি এলে কেউ বলল ঝোল হোক পাতলা করে, কেউ বলল মাখা মাখা করে হোক না! বৃষ্টি নামা বারান্দায় শিল পেতে জিরে আদা বেটে নিচ্ছিল কেউ। ভাজা মুগের ডাল দিয়ে মুরগির ঘণ্ট হল সেদিন। মাছের মাথার বদলে বাঙালির এও এক ফিউশন ছিল সেদিন। বর্ষার রাগ-রাগিনী নিয়ে যাঁদের চর্চা আছে, তাঁরা জানেন কেমন করে এই আলাপ জমাতে হয়। বাঙালির রান্নাঘর সেই গন্ধর্বলোককে ছুঁয়ে দেখার স্পর্ধা দেখিয়েছে বারবার।
গরম ভাতে ডাবুহাতা দিয়ে ঘন আমিষ ডাল ঢেলে দিলে দেখি এলিয়ে পড়া তেজপাতা শুকনো লঙ্কাকে ছাপিয়ে কোন সে অপার্থিব সুবাস মিশে যাচ্ছে ঘরের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে। বাগানে বাগানে তখন কুবো পাখিদের সাপের ডিম খোঁজার ব্যস্ততা। বর্ষাকে সকলেই পায় নিজের মতো করে আসলে। তাল গাছের তলায় উড়ে বেড়ানো মাছিই হোক বা নিভৃতচারী ডাহুক বা কুবো পাখিরা অথবা এই আমার মতো আরও অনেকের শৈশব যৌবন বার্ধক্য!
চুড়ো করা ভাতের থালায় গড়িয়ে পড়া গরম ডালে আর মুচমুচে পাট পাতার বড়ায় ফিরে এসো বর্ষা। বাটি ভরে করমচার টক রেঁধেছি, নাম না জানা অতিথির মতো– তুমি আসবে বলেই।
বর্ষার এই ভাষা ভারি ব্যক্তিগত। কৌমের যাপনকে সে স্বীকার করে, আবার করেও না। গড়িয়ে পড়া পাহাড়ের শানুদেশের মতো নিরন্তর সমগ্র শরীর দিয়ে মেঘ হয়ে উঠবার আকূলতা সে কি কেবল গাছেদের! মানুষের নয়! চুড়ো করা ভাতের থালায় গড়িয়ে পড়া গরম ডালে আর মুচমুচে পাট পাতার বড়ায় ফিরে এসো বর্ষা। বাটি ভরে করমচার টক রেঁধেছি, নাম না জানা অতিথির মতো– তুমি আসবে বলেই। এই মাঠ ঘাট অরণ্য তোমারই অপেক্ষায়। এসো বর্ষা। এসো।
গুড় দিয়ে করমচার টক
উপকরণ: কাঁচা ও পাকা করমচা পরিমাণমতো। আখের গুড় স্বাদমতো, সামান্য নুন, এক চামচ তেল, শুকনো লঙ্কা, কালো সর্ষে, সামান্য লেবুর খোসা।

পদ্ধতি: করমচা ভাল করে ধুয়ে কেটে ভিতর থেকে বীজগুলো বের করে নিন। জলে ধুয়ে ধুয়ে যতটা কষ বের করা যায়, করে দিন। কড়াইতে তেল দিয়ে কালো সর্ষে আর শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিন। ফোড়নের সর্ষে ফুটতে শুরু করলে করমচাগুলো দিয়ে একটু নেড়ে নিন। সামান্য নুন দিয়ে জল দিন। একটু পরেই ঝোল ফুটে উঠবে, করমচা নরম হয়ে এলে গুড় দিন। বেশ সুন্দর ঝোল হয়ে গেলে নামিয়ে ঠান্ডা হতে দিন। আজ বানিয়ে ফ্রিজে রেখে কাল খেলে খুব ভাল। পরিবেশনের সময় সামান্য লেবুর খোসা দিয়ে পরিবেশন করুন ঠান্ডা টক।
মুগের ডাল দিয়ে মুরগির ঘণ্ট
উপকরণ: মুগের ডাল ১০০-১৫০ গ্রাম, মুরগি ৭৫০ গ্রাম, নারকেল বাটা হাফ কাপ, আদা রসুন বাটা ১ চামচ, কুচানো ৩টে বড় পেঁয়াজ, সর্ষের তেল, তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা, গোটা জিরে, জিরে গুঁড়ো, ধনে গুঁড়ো, নুন, হলুদ, কাঁচা লঙ্কা, চাইলে অল্প লঙ্কা গুঁড়ো, গরম মশলা বাটা/গুঁড়ো, ঘি, নুন এবং সামান্য মিষ্টি।

পদ্ধতি: মুরগি ভাল করে ধুয়ে নুন হলুদ মাখিয়ে রাখুন, মুগের ডাল ভেজে ধুয়ে রাখুন। তেল গরম হলে জিরে তেজপাতা শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিন। পেঁয়াজ কুচি দিয়ে ভেজে নিন। ভাজা হলে আদা রসুন বাটা দিয়ে কষিয়ে নিন, যতক্ষণ না কাঁচা গন্ধ চলে যায়। এরপরে অল্প অল্প ধনে জিরে গুড়ো, হলুদ গুঁড়ো, লঙ্কা গুঁড়ো, নুন সব দিয়ে অল্প জল দিয়ে কষিয়ে নিন। কষে গেলে নারকেল বাটা দিয়ে কষান। কষানো হলে, মুরগি আর মুগের ডাল দিয়ে কষাতে থাকুন। তেল ছেড়ে দিলে গরম জল দিয়ে ঢাকা দিন। সেদ্ধ হয়ে বেশ মাখামাখা হয়ে এলে গরম মশলা, কাঁচালঙ্কা আর সামান্য চিনি দিন। একেবারে শেষে অল্প ঘি দিয়ে রান্না শেষ করুন। এই রান্নাটি চাইলে কেউ মুরগির ডানা বা অন্যান্য ছোট টুকরো দিয়েও করতে পারেন।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত