(Rabindranath Shakespeare)
‘শেক্সপীয়ারের নাটক বরাবর আমাদের কাছে নাটকের আদর্শ। তার বহু শাখায়িত বৈচিত্র্য, ব্যাপ্তি ও ঘাত-প্রতিঘাত প্রথম থেকেই আমাদের মনকে অধিকার করেছে।’ — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (‘মালিনী’ নাটকের ভূমিকা)
এই পৃথিবীর দুই মহান স্রষ্টার অন্তর্লীন সুর কতখানি গভীর, এই লেখার মর্মবাণী সেই দিকেই প্রবাহিত হবে। ফেলে আসা শতাব্দীর বহু ঘাতপ্রতিঘাত থেকে আমরা খুঁজে নেব মানবতার জন্য কলম কতখানি দৃপ্ত হতে পারে কবির সাদা পাতায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই বাল্যকাল থেকে শেক্সপীয়রে যে মুগ্ধ, তার ভাবনা পাওয়া যাচ্ছে ‘জীবনস্মৃতি’র (১৯১২) পাতায়— ‘তখনকার দিনে আমাদের সাহিত্য দেবতা ছিলেন শেক্সপীয়র, মিলটন ও বায়রন। ইহাদের লেখার ভেতরকার যে-জিনিসটা আমাদিগকে খুব করিয়া নাড়া দিয়াছে সেটা হৃদয়বেগের প্রবলতা।’
আরও পড়ুন: থিয়েটার আগে না থার্ড থিয়েটার!
রবীন্দ্রনাথের প্রথম সাহিত্যের শিক্ষক অক্ষয় চৌধুরীর কণ্ঠে ‘রোমিও জুলিয়েটের প্রেমোন্মাদ, লিয়রের অক্ষম পরিতাপের বিক্ষোভ, ওথেলোর ঈর্ষানলের প্রলয়দাবদাহ’ পাঠ শুনে প্রথম কান ও মন তৈরি হয় তাঁর শেক্সপীয়র নিয়ে চর্চা করার জন্য। কিশোর বয়সে শেক্সপীয়রের সঙ্গে কবির বিশেষ পরিচয় তৈরি করে আনন্দচন্দ্র বেদান্তবাগীশের পুত্র জ্ঞানচন্দ্র ভট্টাচার্যের অধ্যাপনা। তিনি অল্প অল্প করে কিশোর রবিকে বাংলায় শেক্সপীয়রের ‘ম্যাকবেথ’ পড়িয়ে এবং বুঝিয়ে দিতেন— তারপর থাকত ক্লাস ওয়ার্ক। যতক্ষণ না পর্যন্ত রবি এক একটি সংলাপ বাংলায় তর্জমা শেষ করে, ততক্ষণ তাঁকে বন্দী করে রাখতেন। এইভাবেই সমস্ত নাটক অনুবাদ করে ফেলেছিলেন সেই ছোট বয়সেই। রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃতের শিক্ষক রামসর্বস্ব ভট্টাচার্য ম্যাকবেথ-এর অনুবাদ পড়ে বড়ই খুশি হন। রবীন্দ্রনাথ সেই সব ফেলে আসা দিনের দিকে তাকিয়ে রোমাঞ্চিত হয়ে লিখছেন—
‘তিনি একদিন আমার ম্যাকবেথের তর্জমা বিদ্যাসাগর মহাশয়কে শুনাইতে হইবে বলিয়া আমাকে তাঁহার কাছে লইয়া গেলেন।…ইহার পূর্বে বিদ্যাসাগরের মত শ্রোতা আমি তো পাই নাই—অতএব, এখান হইতে খ্যাতি পাইবার লোভটা মনের মধ্যে খুব প্রবল ছিল। বোধ করি কিছু উৎসাহ সঞ্চয় করিয়া ফিরিয়াছিলাম। মনে আছে, রাজকৃষ্ণবাবু আমাকে উপদেশ দিয়াছিলেন, নাটকের অন্যান্য অংশের অপেক্ষা ডাকিনীর উক্তিগুলির ভাষা ও ছন্দের কিছু অদ্ভুত বিশেষত্ব থাকা উচিত।’

বারো বছর বয়সী একটি ছোট ছেলের পক্ষে এক সার্থক শেক্সপীয়র চর্চা, একটা গোটা নাটক অনুবাদ করা এবং বিদ্যাসাগর ও রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়-এর মতো মানুষের সামনে তা পড়ে শোনানো, সত্যিই অভাবনীয়। উনিশ শতক কেন, নবজাগরণীয় কাল— চিন্তা ও চর্চায় মানবের সঙ্গে মানবের গঠন পরিকল্পনা যে সেই সময় মানুষ তৈরি করতে পেরেছিলেন ইংরেজি সাহিত্য ও বিশেষ করে উইলিয়াম শেক্সপীয়রের চর্চার মধ্যে দিয়ে, তা সহজেই অনুধাবন করা যায়।
এরপর রবীন্দ্রনাথের শেক্সপীয়র পড়ার সুযোগ হয় বিশেষভাবে তাঁর প্রথম ইংল্যান্ড-প্রবাসে (২০ সেপ্টেম্বর ১৮৭৮)। সতেরো বছর বয়সে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে হেনরি মরলি’র কাছে ইংরেজি সাহিত্যে পাঠ নেন। ইংরেজ অধ্যাপকের অধ্যাপনা তাঁকে যে মুগ্ধ করেছিল, সে কথা তিনি আমৃত্যু স্মৃতিতে লিখে রেখেছেন— “সাহিত্য তাঁর মনে, তাঁর গলার সুরে প্রাণ পেয়ে উঠত— আমাদের সেই মরমে পৌঁছতো যেখানে প্রাণ চায় আপন খোরাক, মাঝখানে রসের কিছুই লোকসান হত না” (ছেলেবেলা, ১৯৪০)।
মাত্র ২৯ বছর বয়সে এই ধরনের নাটক যিনি লিখছেন, তাঁর পক্ষে একজন সাহিত্যিকে মুগ্ধ হয়ে থাকা অসমীচীন ও অযৌক্তিক। রবীন্দ্রনাথের একান্ত শেক্সপীয়র আসলে তাঁর নাট্যবোধে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।
রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় লন্ডন ভ্রমণ ১৮৯০ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে। এই সময়ে লন্ডনের নাট্যমঞ্চ মাতিয়ে রেখেছেন প্রবাদপ্রতিম শেক্সপীয়র নাট্যাভিনেতা হেনরি আরভিং। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু সবটা দেখছেন, স্ট্রাটফোর্ড আপন এভনে ইংরেজ মহাকবির জন্মভিটে ঘুরে আসছেন— কিন্তু কোথাও কোনও মুগ্ধতা দেখাচ্ছেন না। ১৫ সেপ্টেম্বরের দিনলিপিতে লিখছেন স্যাভয় থিয়েটারে ‘গন্ডোলিয়ের’ গীতিনাট্যের কথা, লিখছেন ওয়াল্টার স্কটের ‘দ্যা ব্রাইড অফ ল্যামারমুর’ দেখেছেন। কিন্তু শেক্সপীয়র নিয়ে একটি বাক্যও খরচ করেননি।
শেক্সপীয়র-গবেষকদের মনে হতেই পারে, প্রথম লন্ডন প্রবাসের তুলনায় দ্বিতীয় লন্ডন প্রবাসকালে রবীন্দ্রনাথ কোনও কারণে যেন ইংরেজ মহাকবির আকর্ষণ থেকে বিযুক্ত হয়ে গেছেন। তবে, ভুলে গেলে চলবে না দ্বিতীয় লন্ডন প্রবাসকালে তিনি নিজেও কিন্তু ‘বাল্মিকী প্রতিভা’ (১৮৮১), ‘রুদ্রচন্ড’ (১৮৮১), ‘কাল মৃগয়া’ (১৮৮২), ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’ (১৮৮৪), ‘নলিনী’ (১৮৮৪), ‘মায়ার খেলা’ (১৮৮৮), ‘রাজা ও রানী’ (১৮৮৯) ও ‘বিসর্জন’ (১৮৮৯) নাটকের নাটককার। মাত্র ২৯ বছর বয়সে এই ধরনের নাটক যিনি লিখছেন, তাঁর পক্ষে একজন সাহিত্যিকে মুগ্ধ হয়ে থাকা অসমীচীন ও অযৌক্তিক। রবীন্দ্রনাথের একান্ত শেক্সপীয়র আসলে তাঁর নাট্যবোধে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।

আলাদা করে তাঁকে দেখানোর কিছু জিনিস বলে রবীন্দ্রনাথ মনে করেননি। তিনি তখন নতুনের খোঁজে পাড়ি জমিয়েছেন। শেক্সপীয়র তো প্রবেশ করে গেছেন তাঁর নাট্যের মধ্যে। আলো ফেলা যাক সেইসব নাট্যের অন্দরে। ‘রাজা ও রানী’ (১৮৮৯) নাটকে রানি সুমিত্রার প্রতি রাজা বিক্রমদেবের সংযমহীন আসক্তির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ‘অ্যান্টনি এন্ড ক্লিওপেট্রা’ নাটকের রোমান অধিপতি অ্যান্টনির মন। যিনি রাজ্যের কল্যাণ কর্মের চেয়ে ক্লিওপেট্রার মন ও সান্নিধ্য অনেক বেশি কামনা করেছেন।
Ant: Let Rome in Tiber melt and the wide arch
Of the rang’d empire fall. Here is my space.
Kingdoms are clay; Our dungy earth alike
Feeds beast as man. The nobleness of life
Is to do thus; when such a mutual pair
And such a twain can do’t, in which I bind,
On pain of punishment, the world to weet
We stand up peerless. (Act-1/Sc-i)
একই নাটকে রেবতী ও চন্দ্রসেনের মধ্যে বাসা বাঁধছে শেক্সপীয়রের নাটকের সবচেয়ে রক্তলোলুপ দম্পতি ম্যাকবেথ ও লেডি ম্যাকবেথ। স্বামী চন্দ্রসেনের মনের পাপ ইচ্ছা এবং নিজের উচ্চাভিলাস রেবতী ক্রূর ও নগ্নভাবে প্রকাশ করে—
একই সুরে রাজ্য বা প্রজা বিষয়ে বিক্রমদেব যেন উচ্চারণ করেন—
বিক্রমদেব: রাজা রানী। কে রাজা? কে রানী?
নহি আমি রাজা। শূন্য সিংহাসন কাঁদে।
জীর্ণ রাজকার্যরাশি চূর্ণ হয়ে যায়
তোমার চরণতলে ধূলির মাঝারে।
একই নাটকে রেবতী ও চন্দ্রসেনের মধ্যে বাসা বাঁধছে শেক্সপীয়রের নাটকের সবচেয়ে রক্তলোলুপ দম্পতি ম্যাকবেথ ও লেডি ম্যাকবেথ। স্বামী চন্দ্রসেনের মনের পাপ ইচ্ছা এবং নিজের উচ্চাভিলাস রেবতী ক্রূর ও নগ্নভাবে প্রকাশ করে—

রেবতী: যেতে দাও মহারাজ। কী ভাবিছ বসি?
ভাবিছ কী লাগি? যাক যুদ্ধে তারপরে
দেবতাকৃপায়, আর যেন নাহি আসে
ফিরে।
চন্দ্রসেন: ধীরে, রানী, ধীরে।
রেবতী: ক্ষুধিত মার্জার
বসে ছিলে এতদিন সময় চাহিয়া,
আজ তো সময় এলো— তবুও আজো কেন
সেই বসে আছ!…
নিজ হাতে
উপায় রচনা করো অবসর বুঝে।
বাসনার পাপ সেই হতেছে সঞ্চয়,
তারপর কেন থাকে অসিদ্ধির ক্লেশ
অন্যদিকে ইলা এবং কুমারসেনের প্রণয়বৃত্তান্ত ও তাদের জীবনের পরিণতির সুর মিলে যায় ‘রোমিও জুলিয়েট’ ট্রাজেডির মধ্যে।
আবার ম্যাকবেথের উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখা দেয় চন্দ্রসেনের মধ্যেও—
Mac: …I have no spur
To prick the sides of my intent, but only
Vaulting ambition, which o’erleaps itself,
And falls on th’ other. (Act-1/Sc-vii)
আর চন্দ্রসেন বলে—
অতি ইচ্ছা চলে অতি বেগে। দেখিতে না
পায় পথ, আপনারে করে সে নিষ্ফল।
বায়ুবেগে ছুটে গিয়ে মত্ত অশ্ব যথা
চূর্ণ করে ফেলে রথ পাষাণ প্রাচীরে।
অন্যদিকে ইলা এবং কুমারসেনের প্রণয়বৃত্তান্ত ও তাদের জীবনের পরিণতির সুর মিলে যায় ‘রোমিও জুলিয়েট’ ট্রাজেডির মধ্যে।
সাহিত্যের ভিতর দিয়ে আমরা মানুষের ভাবের আকুতি অনেক পেয়ে থাকি এবং তা ভুলতেও বেশি সময় লাগে না। কিন্তু সাহিত্যের মধ্যে মানুষের মূর্তি যেখানে উজ্জ্বল রেখায় ফুটে ওঠে সেখানে ভোলবার পথ থাকে না। এই গতিশীল জগতে যা কিছু চলছে ফিরছে তারই মধ্যে বড় রাজপথ দিয়ে সে চলাফেরা করে বেড়ায়।
শেক্সপীয়রের চরিত্র সৃষ্টির ক্ষমতা সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ খুব বেশি না লিখলেও, বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন তাঁর ‘সাহিত্যের মূল্য’ প্রবন্ধে (প্রবাসী, জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ, ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ):
‘সাহিত্যের ভিতর দিয়ে আমরা মানুষের ভাবের আকুতি অনেক পেয়ে থাকি এবং তা ভুলতেও বেশি সময় লাগে না। কিন্তু সাহিত্যের মধ্যে মানুষের মূর্তি যেখানে উজ্জ্বল রেখায় ফুটে ওঠে সেখানে ভোলবার পথ থাকে না। এই গতিশীল জগতে যা কিছু চলছে ফিরছে তারই মধ্যে বড় রাজপথ দিয়ে সে চলাফেরা করে বেড়ায়। সেই কারণে শেকসপিয়রের লুক্রিস এবং ভেনাস অ্যান্ড অ্যাডোনিস-এর কাব্যের স্বাদ আমাদের মুখে রুচিকর না হতে পারে, সে-কথা সাহস করে বলি বা না বলি; কিন্তু লেডি ম্যাকবেথ অথবা কিং লীয়র অথবা অ্যান্টনি ও ক্লিয়োপেট্রা এদের সম্বন্ধে এমন কথা যদি কেউ বলে তা হলে বলব তার রসনায় অস্বাস্থ্যকর বিকৃতি ঘটেছে, সে স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। শেক্সপিয়র মানব-চরিত্রের চিত্রশালার দ্বারোদ্ঘাটন করে দিয়েছেন, সেখানে যুগে যুগে লোকের ভিড় জমা হবে।’ (‘সাহিত্যের স্বরূপ’, ১৯৪৩, পৃ: ৫১-৫২)

শেক্সপীয়রের কমেডির চরিত্র সম্বন্ধেও রবীন্দ্রনাথ এই কথাই বলেছেন: ‘দেখতে পাই, ফলস্টাফের সঙ্গে কন্দর্পের তুলনা হয় না, অথচ সাহিত্যের চিত্রভাণ্ডার থেকে কন্দর্পকে বাদ দিলে লোকসান নেই, লোকসান আছে ফলস্টাফকে বাদ দিলে।’ (‘সাহিত্যের স্বরূপ’, পৃ: ৫)
‘সাহিত্যের মূল্য’ প্রবন্ধেও ফলস্টাফ সম্বন্ধে লিখলেন: ‘মিডসামার নাইটস ড্রীম নাট্যের মূল্য কমে যেতে পারে কিন্তু ফলস্টাফের প্রভাব বরাবর থাকবে অবিচলিত।’ (‘সাহিত্যের স্বরূপ’, পৃ: ৫২)
‘বিসর্জন’-এর আলোচনা প্রসঙ্গে শেক্সপীয়রের ট্রাজেডির কথা এসে যায়। যেমন, ‘টিমোন অফ আথেন্স’-এর চতুর্থ অঙ্কের তৃতীয় দৃশ্যে টিমোন তিনটি চোরকে চৌর্যবৃত্তির ব্যাপকতা সম্বন্ধে এক নতুন শিক্ষা দেয়:
‘বিসর্জন’-এর আলোচনা প্রসঙ্গে শেক্সপীয়রের ট্রাজেডির কথা এসে যায়। যেমন, ‘টিমোন অফ আথেন্স’-এর চতুর্থ অঙ্কের তৃতীয় দৃশ্যে টিমোন তিনটি চোরকে চৌর্যবৃত্তির ব্যাপকতা সম্বন্ধে এক নতুন শিক্ষা দেয়:
Timon: …I’ll example you with thievery:
The sun’s a thief, and with his great attraction
Robs the vast sea: the moon’s an arrant thief,
And her pale fire she snatches from the sun:
The sea’s a thief, whose liquid surge resolves
The moon into salt tears: the earth’s a thief,
That feeds and breeds by a composture stolen
From general excrement: each thing’s a thief.
জয়সিংহকে দেওয়া রঘুপতির শিক্ষা কেমন অনায়াসে মিলে যায়—

রঘুপতি: কে বলিল হত্যাকাণ্ড পাপ!
এ জগৎ মহা হত্যাশালা। জানো না কি
প্রত্যেক পলকপাতে লক্ষকোটি প্রাণী
চির আঁখি মুদিতেছে। সে কাহার খেলা?
হত্যায় খচিত এই ধরণীর ধূলি।
প্রতিপদে চরণে দলিত যত কীট—
তাহারা কি জীব নহে?…
জয়সিংহের মধ্যে কত গভীরভাবে হ্যামলেটের চরিত্রের রেখা ফুটে ওঠে। হ্যামলেটের দ্বিধায় ভরা মনের স্বগতোক্তি মিশে যায় জয়সিংহের দোলাচলের সঙ্গে—
Hamlet: To be, or not to be — that is the question.
Whether ’tis nobler in the mind to suffer
The slings and arrows of outrageous fortune,
Or to take arms against a sea of troubles
And, by opposing, end them?
আর রবীন্দ্রনাথের জয়সিংহ বলে—
দূর হোক চিন্তাজাল! দ্বিধা দূর হোক!
চিন্তার নরক চেয়ে কার্য ভাল,
যত ক্রূর, যতই কঠোর হোক। কার্যের তো
শেষ আছে, চিন্তার সীমানা নাই কোথা—
চারিদিকে যতই সে
পথ খুঁজে মরে, পথ তত লুপ্ত হয়ে
যায়।
আজকের জেন জি সভ্যতার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপর নির্ভরশীলতার একটা বড় কারণ সামাজিক নির্ভরশীলতার কমে আসা। চিন্তার দৈন্য দেখা যাচ্ছে সমাজের শিক্ষককুলের মধ্যেও। ফলত ধীরে ধীরে মূল পাঠ থেকে সরে গিয়ে আলোচনামূলক গ্রন্থের সাহায্যে একটি বিষয় ধরা দিচ্ছে নয়া প্রজন্মের কাছে।
সলিল বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন:
‘এমন কি, ত্রিপুরেশ্বরীর মন্দিরে একাকী প্রার্থনারত রাজাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েও জয়সিংহ যে শেষ পর্যন্ত পারে না তাঁকে আঘাত করতে, এই পরিস্থিতি-পরিকল্পনা রবীন্দ্রনাথ Hamlet- the prince of Denmark নাটকের তৃতীয় অঙ্ক তৃতীয় দৃশ্য—যেখানে প্রার্থনারত ক্লডিয়াসকে সুযোগ পেয়েও হত্যা করতে পারে না হ্যামলেট—থেকে সরাসরি নিয়েছেন, এমন ধারণাতেও বদ্ধমূল কেউ কেউ। আর, জয়সিংহের আত্মবলিদান দৃশ্যের ঝড় তো অতি স্পষ্টতই তুলনীয় বলে মনে হতে পারে King Lear নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কের চতুর্থ দৃশ্যের শেষে শুরু হয়ে তৃতীয় অঙ্কের প্রথম, দ্বিতীয় এবং চতুর্থ দৃশ্য পর্যন্ত বয়ে-চলা প্রবল ঝড়ের সঙ্গে।’ (‘বিসর্জন: একটি অকথিত কাহিনি’, থিয়েটারের ক্লাস, পৃ.- ২৩৬-২৩৭)
রবীন্দ্রনাথ বা শেক্সপীয়র পাঠ করার জন্য সবার আগে যা প্রয়োজন তা হল, তাঁদের মূল পাঠ মনোযোগ দিয়ে পড়া ও পড়তে শেখা। তবেই তাঁদের সৃষ্টির মনটা ধরতে পারা যায়। শেক্সপীয়ারের বিখ্যাত কমেডি ‘আ মিড সামার নাইটস ড্রিম’-এর রহস্য শ্যামল ছোঁয়ায় রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’ (১৮৯২) নৃত্যনাট্যের জাদুকরী মুহূর্তের ভাবনা সহজেই অনুভব করা যায়। চিত্রাঙ্গদা তার কুরূপের পরিবর্তে যে এক বছরের জন্য অনঙ্গদেবের কাছ থেকে অপূর্ব রূপ লাবণ্য ও প্রেম-সোহাগের চাবিকাঠি সংগ্রহ করেছে; তা যেন ইংরেজ মহাকবির ‘ড্রিম’ নাট্যে পাকের সাহায্যে লাইস্যান্ডার, দিমিত্রাস, হেলেনা ও হার্মিয়ার, কিছুকালের জন্যও অন্তত, প্রেমময় স্বপ্ন জগতে বসবাস করার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। গঠনের দিক থেকে দেখলে, রবীন্দ্র-নাটকে পঞ্চাংক বিভাগ, অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহার, কিংবা জনতা ও সাধারণের মুখে গদ্য সংলাপ— শেক্সপীয়রের অনুপ্রেরণারই ফলাফল।

আজকের জেন জি সভ্যতার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপর নির্ভরশীলতার একটা বড় কারণ সামাজিক নির্ভরশীলতার কমে আসা। চিন্তার দৈন্য দেখা যাচ্ছে সমাজের শিক্ষককুলের মধ্যেও। ফলত ধীরে ধীরে মূল পাঠ থেকে সরে গিয়ে আলোচনামূলক গ্রন্থের সাহায্যে একটি বিষয় ধরা দিচ্ছে নয়া প্রজন্মের কাছে। এতে বিষয়ের মূল ছবিটাই তরুণ প্রজন্মের মস্তিষ্কপটে আবছা হয়ে যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা উইলিয়াম শেক্সপীয়রের রচনা পাঠ করার জন্য মূল কাব্য বা নাটকের উপর নির্ভর না করে যদি সেই সব বিষয়ের প্রবন্ধের বই পড়া হয়, তাহলে মার্কশিটে নম্বর উঠতে পারে, তবে সাংস্কৃতিকভাবে একটা বিরাট শূন্যতা তৈরি হয়ে যায়, বা বলা ভাল, তৈরি হয়ে গেছে।
শেক্সপীয়র চর্চার অবনমন রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন আজ থেকে ১১৮ বছর আগে থেকেই। সেই বেদনার কথা লিখে গেছেন ‘সমাজ’ (১৯০৮) গ্রন্থে স্পষ্টভাবে। তখনকার জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, ইংরেজ মহাকবিসহ সেই দেশের অমূল্য সাহিত্যের সম্ভার থেকে বিমুখ করেছিল দেশবাসীকে, আর আজকের জাতীয়তাবাদী পরিবেশে ধর্মের আফিম ও অপরিকল্পিত শিক্ষা সেই একই জায়গায় আমাদের দাঁড় করিয়ে রেখেছে। রবীন্দ্রনাথের শঙ্কা তাই আজও আমাদের জন্য সাবধানবাণী:
সেকালের ছাত্রগণ যেরূপ আন্তরিক অনুরাগের সহিত শেক্সপীয়ার, বায়রণের কাব্যরসে চিত্তকে অভিসিক্ত করিয়া রাখিয়াছিলেন এখন তাহা দেখিতে পাই না। সাহিত্যের ভিতর দিয়া ইংরেজ জাতির সঙ্গে যে প্রেমের সম্বন্ধ সহজে ঘটিতে পারে, তাহা এখন বাধা পাইয়াছে।
‘একদা ডেভিড হেয়ারের মতো মহাত্মা অত্যন্ত নিকটে আসিয়া ইংরেজ চরিত্রের মহত্ত্ব আমাদের হৃদয়ের সম্মুখে আনিতে পারিয়াছিলেন—তখনকার ছাত্রগণ সত্যই ইংরেজ জাতির নিকট হৃদয় সমর্পণ করিয়াছিল। এখন ইংরেজ অধ্যাপক স্বজাতির যাহা শ্রেষ্ঠ তাহা কেবল যে আনিয়া দিতে পারেন না তাহা নহে তাঁহারা ইংরেজের আদর্শকে আমাদের কাছে খর্ব করিয়া ইংরেজের দিক হইতে বাল্যকাল হইতে আমাদের মনকে বিমুখ করিয়া দেন। তাহার ফল এই হইয়াছে পূর্বকালের ছাত্রগণ ইংরেজের সাহিত্যে ইংরেজের শিক্ষা যেমন সমস্ত মন দিয়া গ্রহণ করিত, এখনকার ছাত্ররা তাহা করে না। সেকালের ছাত্রগণ যেরূপ আন্তরিক অনুরাগের সহিত শেক্সপীয়ার, বায়রণের কাব্যরসে চিত্তকে অভিসিক্ত করিয়া রাখিয়াছিলেন এখন তাহা দেখিতে পাই না। সাহিত্যের ভিতর দিয়া ইংরেজ জাতির সঙ্গে যে প্রেমের সম্বন্ধ সহজে ঘটিতে পারে, তাহা এখন বাধা পাইয়াছে।’
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত