(Gloria Steinem)
গতকাল চলে গেলেন গ্লোরিয়া স্টাইনেম, ৯২ বছর বয়সে, নিউ ইয়র্কে নিজের ব্রাউনস্টোন বাড়িতে, যেখানে তিনি ছয় দশক ধরে বাস করতেন। এই বাড়িটি হয়ে উঠেছিল আমেরিকার নারী স্বাধীনতা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। যাঁদের ভালবেসেছিলেন তাঁরাই পাশে ছিলেন শেষ সময়ে।
আরও পড়ুন: ডিম বিপ্লব: থালায় নীরবে ঘটে যাওয়া এক বিপ্লবের কাহিনি
আমার বন্ধু মকবুল জামিলের ফেসবুক ওয়ালের একটা ছবি আমাকে যেন ভাসিয়ে নিয়ে গেল। মনে হল, এই নাইলন শাড়িতে যেন আমার মা দাঁড়িয়ে আছেন। বারবার ছবিটা দেখলাম— ১৯৫৮ সালের এক বিজ্ঞাপন। ডিসিএম-এর ‘ফেয়ারি নাইলন’ শাড়ির বিজ্ঞাপনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন এক তরুণী, শাড়ির আঁচল সামলাচ্ছেন, পিছনে দিল্লির স্কাইলাইন। সেই তরুণীই পরে হয়ে উঠবেন বিশ শতকের নারীবাদের সবচেয়ে চেনা মুখ। তখনও তিনি জানতেন না তাঁর ভবিষ্যতের কথা।

আমার কাছেও একটা ছবি আছে প্রায় ওই একই সময়ের। আমার মায়ের, ঠিক এই রকম একটা নাইলন শাড়িতে। সেই একই দশক, সেই একই দেশ— একদিকে এক আমেরিকান তরুণী দিল্লিতে, শাড়ি পরে বিজ্ঞাপনের ফ্রেমে হাসছেন, অন্যদিকে আমার মা, নিজের জীবনে, পায়ের তলার জমি দখলের লড়াই করছেন। দুটো আলাদা জীবন, তবে লড়াইটা শেষ পর্যন্ত ভিন্ন হলেও এক।
গ্লোরিয়া তখন সবে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের স্মিথ কলেজ থেকে পাশ করে বেরিয়েছেন, ২২-২৩ বছর বয়স। চেস্টার বোলস এশিয়া ফেলোশিপ নিয়ে চলে আসেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৯৫৭-৫৮ সাল— দুটো বছর। একটি আমেরিকান মেয়ে, সদ্য কলেজ পেরিয়ে, একা এসে পড়েছেন সম্পূর্ণ অচেনা এক দেশে, যেখানে ভাষা আলাদা, রাস্তাঘাট আলাদা, জীবনযাপনের ছন্দটাই আলাদা। এই দুটো বছরই, আমার মনে হয়, তাঁর গোটা জীবনের ভিত গড়ে দিয়েছিল।

তিনি যুক্ত হন বিনোবা ভাবের ভূদান আন্দোলনে— গান্ধীর মৃত্যুর পর যে আন্দোলন তাঁরই অহিংস দর্শনকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছিল, জমির অসাম্য মেটানোর লড়াই, রক্তপাত ছাড়াই। গ্লোরিয়া গ্রাম থেকে গ্রামে হাঁটতেন, রোদে পুড়ে, ধুলোমাখা পথ ধরে, কৃষক নারীদের পাশে পাশে, ধনী জমিদারদের বোঝাতেন— জমি দাও নিচু জাতের চাষিদের। রাতে থাকতেন গ্রামের মাটির ঘরে, খেতেন যা জুটত। নিজের খরচ চালাতেন লিখে— ‘দ্য থাউজ্যান্ড ইন্ডিয়াজ’ নামে একটা ভ্রমণ নির্দেশিকা লিখেছিলেন সেই সময়।
গান্ধীবাদী অহিংস প্রতিরোধের কৌশল, জাতপাত পেরিয়ে সংহতি গড়ার পথ, আর গোল হয়ে বসে সবার কথা মন দিয়ে শোনার অভ্যাস— এই তিনটে জিনিস তিনি শিখেছিলেন এই দেশের মাটিতে বসে। পরে এই তিনটে জিনিসই নিয়ে গিয়েছিলেন আমেরিকায়, গড়ে তুলেছিলেন নাগরিক অধিকার আর নারী আন্দোলনের কাঠামো— যে কাঠামো আজও দাঁড়িয়ে আছে।
বসুদেব যখন কৃষ্ণকে কোলে নিয়ে উত্তাল যমুনা পার হচ্ছিলেন, সাপের ফণা মাথার উপর ছাতার মতো ধরে, তখন যমুনার জল নিজে থেকে সরে পথ করে দিয়েছিল বলে আমরা শুনেছি। সেই একই নদী, সেই একই রাত, সেই একই ঐশ্বরিক নাটক— কিন্তু মেয়েটির জন্য কোনও পথ তৈরি হয়নি।
আমি যখন এই তথ্যগুলো পড়ছি, একটা কথা বারবার মনে আসছে— তিনি ওই গ্রামের মেয়েদের, ওই নাম-না-জানা কৃষক নারীদের কথা শুনেছিলেন। শুনেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন এই মেয়েদের কথা শোনার লোক প্রায় ছিলই না। আমার মায়েরও ছিল না। তবু মা চাকরি করেছেন মাল্টিন্যাশনাল ফিলিপস কোম্পানিতে। নিজের জমি ছাড়েননি। ঝড়ে, জলে, বৃষ্টিতে— পায়ে স্যান্ডাক জুতো, পরনে ডিসিএমের নাইলন শাড়ি। গতকাল থেকে এরকম পরিচিত অনেক মায়ের ছবি চোখের সামনে ভেসে চলেছে।

আর এইখানেই, আজ জন্মাষ্টমীর দিন, আমার মনে পড়ে যায় আরেকটি মেয়ের কথা। যে মেয়ের জন্মদিন কেউ পালন করে না। যোগমায়া। আহ্লাদিনী।
আজকের দিনটা তো সেই গল্পের দিন। জন্মাষ্টমী। আজ সারা ভারত জুড়ে মন্দিরে মন্দিরে ঘণ্টা বাজছে, কৃষ্ণের মূর্তি সাজানো হচ্ছে নতুন পোশাকে, দোলনা দোলানো হচ্ছে মাখন-মিছরি সাজিয়ে, রাত বারোটায় শঙ্খধ্বনি উঠবে জন্মমুহূর্তের উদযাপনে। মথুরা-বৃন্দাবনে এই দিনটি একরকম উৎসবের প্লাবন— লক্ষ লক্ষ মানুষ আসেন, রাস্তায় রাস্তায় আলো, গান, নাচ। এক শিশুর জন্মকে এমন জাঁকজমকে স্মরণ করা, এত শতাব্দী পরেও। এই ভালবাসা, ভক্তি সত্যিই অসাধারণ।

কিন্তু সেই একই রাতে, একই ঝড়ে, গোকূলে জন্ম নিয়েছিল আরেকটি শিশু। একটা মেয়ে। বসুদেব যখন কৃষ্ণকে কোলে নিয়ে উত্তাল যমুনা পার হচ্ছিলেন, সাপের ফণা মাথার উপর ছাতার মতো ধরে, তখন যমুনার জল নিজে থেকে সরে পথ করে দিয়েছিল বলে আমরা শুনেছি। সেই একই নদী, সেই একই রাত, সেই একই ঐশ্বরিক নাটক— কিন্তু মেয়েটির জন্য কোনও পথ তৈরি হয়নি।
তাকে চুপচাপ তুলে নিয়ে বদলে রাখা হয়েছিল যশোদার পাশে, যাতে কৃষ্ণ বাঁচেন। সে কোনওদিন নিজের মায়ের কোল পায়নি, বাবার আদর পায়নি। কংস যখন তাকে মারতে গেলেন পাথরের দেওয়ালে আছড়ে, সে হাত ফসকে বেরিয়ে গেল, দেবী হয়ে আকাশে মিলিয়ে গেল। তারপর? কেউ তার খোঁজ রাখেনি। তার নিজের মা-বাবাও না।
দুটো গল্প— একটা পুরাণের, একটা রক্তমাংসের ইতিহাসের। কিন্তু কেন্দ্রে একই প্রশ্ন। যে মেয়েদের গল্প সবসময় ‘বড় গল্পের’ পিছনে চাপা পড়ে যায়— কারা তাঁদের কথা শোনে? কারা তাঁদের খোঁজ রাখে?
আজ যখন কোটি কোটি মানুষ কৃষ্ণের জন্মদিনে প্রদীপ জ্বালাচ্ছেন, তখন ক’জন মনে রাখছেন এই জন্মটা সম্ভব হয়েছিল একটা মেয়ের নিঃশব্দ, অস্বীকৃত ত্যাগের বিনিময়ে? তার নামে কোনও শোভাযাত্রা নেই। তার জন্য কোনও রাত জাগা নেই। এই বৈপরীত্য আজও আমাকে ভাবায়।

দুটো গল্প— একটা পুরাণের, একটা রক্তমাংসের ইতিহাসের। কিন্তু কেন্দ্রে একই প্রশ্ন। যে মেয়েদের গল্প সবসময় ‘বড় গল্পের’ পিছনে চাপা পড়ে যায়— কারা তাঁদের কথা শোনে? কারা তাঁদের খোঁজ রাখে?
যোগমায়ার বেলায়, কেউ রাখেনি। তার গল্প রয়ে গেছে একটা আকাশবাণীতে বাঁধা, একটা মন্দিরে সীমাবদ্ধ, মেহরৌলির এক কোণে।
কিন্তু গ্লোরিয়া স্টাইনেম বিন্ধ্যের কোনও এক প্রান্তরে হাঁটতে হাঁটতে ঠিক করে ফেলেছিলেন— তিনি খোঁজ রাখবেন, শুনবেন। ভারতের সেই গ্রামের মেয়েরা তাঁকে শিখিয়েছিল, ক্ষমতা সবসময় উপর থেকে নামে না— গাছ যেমন মাটি থেকে ওঠে, তেমনই পরিবর্তনও ওঠে নিচু থেকে, সাধারণ মানুষের হাত ধরে। এই শিক্ষাটাই তিনি সারাজীবন বয়ে বেড়িয়েছিলেন।
সেই ফেয়ারি নাইলনের বিজ্ঞাপনের হাসিমুখ তরুণীটি তখনও জানতেন না, তিনি কী হতে চলেছেন। আমরাও তো জানি না, আজ যে মেয়েটা নিঃশব্দে নিজের জায়গার জন্য লড়ছে, আগামীকাল তার লড়াইটা কার জীবন বদলে দেবে।
যে মেয়েরা কোনওদিন যোগমায়ার মতো নিঃশব্দে হারিয়ে যাননি, বরং লড়াই করে নিজেদের কথাটা শুনিয়ে ছেড়েছেন— তাদের কথা আলাদা করে বলা দরকার। গ্লোরিয়া শুধু একটা আন্দোলনের জন্য লড়েননি, লড়েছিলেন এই সহজ, নির্মম সত্যের বিরুদ্ধে যে— একটা মেয়েকে নিজের অস্তিত্ব স্বীকার করিয়ে নেওয়ার জন্যও লড়তে হয়। যে অধিকার একটা ছেলের জন্মগত, একটা মেয়েকে তা দাবি করে, রাস্তায় হেঁটে অর্জন করে নিতে হয়।
শুধু মেয়ে হয়ে জন্মেছিলেন বলেই যে মূল্য তাঁকে চোকাতে হয়েছিল— সেই ত্যাগটুকুর জন্যই তিনি শ্রদ্ধা পাওয়ার যোগ্য। আন্দোলন গড়ার আগেই, শুধু নিজের জায়গাটুকু দাবি করার লড়াইটাই তো তাঁর জীবনের প্রথম যুদ্ধ ছিল। ঠিক আমার মা, মানি, পিসিদের মতন।

সেই ফেয়ারি নাইলনের বিজ্ঞাপনের হাসিমুখ তরুণীটি তখনও জানতেন না, তিনি কী হতে চলেছেন। আমরাও তো জানি না, আজ যে মেয়েটা নিঃশব্দে নিজের জায়গার জন্য লড়ছে, আগামীকাল তার লড়াইটা কার জীবন বদলে দেবে।
তাই আজ, গ্লোরিয়াকে বিদায় জানানোর দিনে, আমি যোগমায়ার কথাও ভাবি, স্মরণ করি আমার প্রজন্মের পথপ্রদর্শক মায়েদের। তাঁদের উদ্দেশ্যে বলি—
তোমাদের গল্প আমরা মনে রাখব, মনে রাখব আমাদের আলোর পথযাত্রীদের।
বিজ্ঞাপন ঋণ: আর্কাইভ থেকে মকবুল জামিল এর সৌজন্যে
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত