(Popular Pujabarshiki)
শারদীয় সংখ্যা পড়তে পড়তেই আমি বড় হয়েছি। পুজোয় নতুন জামাকাপড় পাওয়া যতটা আনন্দের, ততটাই একটি শারদীয় পাওয়াও। আমার শৈশবে তা ছিল দেব সাহিত্য কুটিরের পূজাবার্ষিকী। ‘তপোবন’, ‘আলপনা’, ‘মনোবীনা’… কিশোর সাহিত্য সেই প্রথম পড়া হয়তো। লিখতেন সেরা লেখকরা। লীলা মজুমদার, আশাপূর্ণা দেবী তো পড়তামই, আরও কয়েকজনের কথা খুব মনে আছে যেমন, ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্যর বিজ্ঞাননির্ভর গল্প। এছাড়া ধীরেন্দ্রলাল ধরের শিকার কাহিনি, বিধায়ক ভট্টাচার্যর নাটক, যার প্রধান চরিত্রের নাম অমরেশ, আর ছিলেন শিবরাম চক্রবর্তী। হর্ষবর্ধন, গোবর্ধন কিংবা ঝাঁঝাঁ থেকে আসা আত্মীয়। এক ভাগ্নি ছিল গল্পে, নাম রিনি। বাল্যকালের হাহা হিহি গল্প।
আনন্দমেলা শারদীয় আসতে আরম্ভ করল যখন, তখন বড় হয়ে গেছি। কিন্তু ছোটদের জন্য নির্ধারিত পূজাবার্ষিকীতে বড়দের আগ্রহই বেশি। সত্যজিৎ রায়ের গল্পই ছিল আমার কাছে প্রধান আকর্ষণ। প্রফেসর শঙ্কু নিয়ে ক্রমশ আনন্দমেলা হয়ে উঠল পুজোর বড় আকর্ষণ। মতি নন্দীর উপন্যাস ‘স্ট্রাইকার’, ‘স্টপার’, ‘কোনি’ তো আনন্দমেলায় পড়েছি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাকাবাবুকে নিয়ে ‘খালি জাহাজের রহস্য’ উপন্যাস এখনও মনে গেঁথে আছে। আর আনন্দময় ভূতের সব গল্প, উপন্যাস শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কলমে।
সত্যজিৎ রায়ের ‘ফ্রিৎস’, ‘ব্রাউন সাহেবের বাড়ি’ পড়তে পড়তে শারদীয় দেশ পত্রিকার প্রধান আকর্ষণ হলেন মানিকবাবু এবং তাঁর ফেলুদার কাণ্ডকারখানা। প্রথম লেখাটি খুব সম্ভবত ‘বাদশাহি আংটি’। এসবের বাইরে ঈষৎ ব্যতিক্রম ‘সন্দেশ’। তার আভিজাত্যই আলাদা। সত্যজিৎ রায়, লীলা মজুমদার থেকে শ্রেষ্ঠ বাঙালি লেখকরা লিখতেন, এখনও লেখেন সন্দেশ পত্রিকায়। এখানেই অনুবাদে প্রথম পড়েছিলাম রে ব্র্যাডবেরির গল্প। অনুবাদক সত্যজিৎ রায়। আনন্দমেলায় সত্যজিৎ থাকতেন প্রফেসর শঙ্কুর কাহিনি নিয়ে। সত্যজিতের অন্য সব গল্প সন্দেশ পত্রিকায়।

দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘কিশোর ভারতী’র বিজ্ঞাপন ছিল মনকাড়া। অষ্টবজ্র সম্মেলন, আট লেখকের আট রকম কিশোর উপন্যাস। ‘দুরন্ত ঈগল’-এর লেখক দীনেশচন্দ্র ছিলেন অবশ্যই সেই আট লেখকের ভিতরে। সেই অমল কিশোরবেলায় ছোটকাকা কিনে দিয়েছিলেন শারদীয় ‘অলিম্পিক’ একবার, একবার ‘খেলার মাঠ’ বা ‘গড়ের মাঠ’। শারদীয় ‘গড়ের মাঠ’ এমন কাঠের ব্লকের কালি দিয়ে পত্রিকা ছাপত, ছবিতে হাত পড়লে হাতে কালি লেগে যেত। কিন্তু বড় বড় খেলোয়াড়, ক্রীড়া সাংবাদিকদের লেখা থাকত। কিশোরের এতেই ছিল সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ।
সেই সময় বাড়িতে আসত ‘প্রসাদ’, ‘উল্টোরথ’ শারদীয়। এইসব সিনেমা পত্রিকায় সে আমলের বড় লেখকরা লিখতেন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বনফুল নিয়মিত লিখতেন ‘নবকল্লোল’ পত্রিকায়। তাঁদের লেখা পড়ার জন্যই নবকল্লোল আসত বাড়িতে।
‘অমৃত’ পত্রিকা কয়েক বছর শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় বেরিয়েছিল। সেখানে শ্যামলের ‘অলীকবাবু’, ‘জলপাত্র’, ‘চন্দনেশ্বর জংশন’ পড়েছি, পড়েছি বরেন গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘নদীর সঙ্গে দেখা’ উপন্যাস। বরেনদা প্রতি বছর হিমালয় ভ্রমণে যেতেন।
শারদীয়র বিক্রি নিয়ে একটি কথা না বললেই নয়, শারদীয় নবকল্লোল প্রকাশিত হলে কলেজ স্ট্রিটে তা কেনার জন্য দীর্ঘ লাইন পড়ে যেত। বনফুলের অধিকলাল উপন্যাসের কথা মনে পড়ে, ছোটবেলায় পড়তে চেয়েছিলাম। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ক্লাসিক উপন্যাস ‘ঈশ্বরীতলার রূপোকথা’, ‘স্বর্গের আগের ষ্টেশন’, ‘হিম পড়ে গেল’ পড়েছি নবকল্লোল শারদীয়তেই। ‘প্রসাদ’ শারদীয়তেই মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাস পড়েছিলাম ১৯৭২ সালে। শারদীয় ‘ঘরোয়া’ পত্রিকায় অমিয়ভূষণ মজুমদার লিখেছিলেন উপন্যাস, ১৯৭২-৭৩ হবে।
শারদীয়র স্মৃতি কোনও এক ফ্রেমে আটকানো যায় না। সে যেন এক মহাসমুদ্র। কূল খুঁজে পাই না। বাল্যকালে বিমল মিত্র, সুবোধ ঘোষ পড়েছি না বুঝে, আবার বুঝেও। তারপর তাঁরা চলে যেতে লাগলেন, নতুন নাম এল। বিমল মিত্রর একটি উপন্যাস কোন শারদীয়তে কৈশোরে পড়েছিলাম, ‘রাজা বদল’। পড়ে খুব ভাল লেগেছিল। এক অপমানিত শিক্ষকের কথা ছিল সেই উপন্যাসে। সুবোধ ঘোষের ‘জিয়া ভরলি’ এক প্রেমের উপন্যাস, পড়েছিলাম। জানতাম না জিয়া ভরলি এক নদীর নাম।

‘অমৃত’ পত্রিকা কয়েক বছর শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় বেরিয়েছিল। সেখানে শ্যামলের ‘অলীকবাবু’, ‘জলপাত্র’, ‘চন্দনেশ্বর জংশন’ পড়েছি, পড়েছি বরেন গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘নদীর সঙ্গে দেখা’ উপন্যাস। বরেনদা প্রতি বছর হিমালয় ভ্রমণে যেতেন। ‘যুগান্তর’-এ লিখেছিলেন ‘পিন্ডারী ভ্রমণ’। প্রফুল্ল রায় লিখতেন ‘নবকল্লোল’, ‘অমৃত’ এবং ‘যুগান্তর’-এ। এঁদের লেখা পড়ার জন্য মুখিয়ে থাকতাম। মনে পড়ে, মহাশ্বেতা দেবী ‘অমৃত’ শারদীয়তে লিখেছিলেন এক অসামান্য নভেলেট ‘জগমোহনের মৃত্যু’। দেহাত এলাকার এক হাতি ও তার মাহুতকে নিয়ে ছিল সেই উপন্যাস। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘মানুষের ঘরবাড়ি’ উপন্যাস শুরু করেন অমৃত শারদীয়তে।
দেশ পত্রিকার প্রধান আকর্ষণ ছিল রবীন্দ্রনাথের কাছে লেখা চিঠি ও তার উত্তর। একবার জামাই নগেন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথের পত্রবিনিময় পড়েছিলাম। জামাইয়ের সেই সব কঠিন পত্রাবলীতে কবির বিপন্ন ও বিমর্ষ রূপ ধরা পড়েছিল। উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের হিমালয় ভ্রমণও ছিল সমান আকর্ষণের। ৬০-এর দশকের মাঝামাঝি দেশ পত্রিকায় অমিতাভ চৌধুরী লিখতেন রবীন্দ্রনাথ নিয়ে নানা আলেখ্য— ‘শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ’, ‘রবীন্দ্রনাথের পরলোক চর্চা’, ‘রবি ঠাকুরের পাগলা ফাইল’ ইত্যাদি। পরে অমিতাভ চৌধুরীর এই সংক্রান্ত আলেখ্য অমৃত শারদীয়তে পড়েছি।
বিমল কর ‘শমীক’, ‘একা একা’, ‘ভুবনেশ্বরী’ লিখেছিলেন শারদীয়তে। সেই পাঠের আবেশ এখনও লেগে আছে প্রাচীন এই পাঠকের মনে। রমাপদ চৌধুরী তাঁর ‘খারিজ’ উপন্যাস লিখেছিলেন দেশ শারদীয়তে। মনে আছে শঙ্করের ‘সীমাবদ্ধ’, বুদ্ধদেব গুহর ‘বাতিঘর’, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘উজান’ উপন্যাসের কথা।
উপন্যাস এখনও শারদীয়র বড় আকর্ষণ। সেকালে সমরেশ বসু, বিমল কর এবং রমাপদ চৌধুরীর উপন্যাসে ছিল প্রবল আগ্রহ। সমরেশ বসু পুজোয় কী লিখলেন, কালকূট কী লিখলেন তা নিয়ে ছিল গভীর কৌতুহল। শারদীয়তেই সমরেশ লিখেছিলেন ‘মহাকালের রথের ঘোড়া’। ‘শেকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে’, ‘খণ্ডিতা’— এই সব সত্তর-আশির দশকের কথা। কিন্তু ষাটের দশকের শেষে তিনি ‘বিবর’ লেখেন দেশ পত্রিকায়। প্রজাপতি, পাতকও লিখেছিলেন শারদীয়তেই। পাতক খুব সম্ভবত অমৃত পত্রিকায়। এই তিন উপন্যাস নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। কালকূট সমরেশ তাঁর ‘শাম্ব’ উপন্যাস লিখেছিলেন খুব সম্ভবত শারদীয় দেশ পত্রিকায়।
বিমল কর ‘শমীক’, ‘একা একা’, ‘ভুবনেশ্বরী’ লিখেছিলেন শারদীয়তে। সেই পাঠের আবেশ এখনও লেগে আছে প্রাচীন এই পাঠকের মনে। রমাপদ চৌধুরী তাঁর ‘খারিজ’ উপন্যাস লিখেছিলেন দেশ শারদীয়তে। মনে আছে শঙ্করের ‘সীমাবদ্ধ’, বুদ্ধদেব গুহর ‘বাতিঘর’, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘উজান’ উপন্যাসের কথা। একই সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল একই পত্রিকায়।
ষাটের দশকে দুই লেখকের জন্ম দেখেছিলাম আমরা। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখলেন তাঁর উপন্যাস ‘আত্মপ্রকাশ’। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ‘ঘুণপোকা’। দেশ বা আনন্দবাজার শারদীয়তে প্রতি বছর একজন নবীন লেখকের আবির্ভাব হত। তাঁদের কেউ কেউ রয়ে গেছেন, কেউ কেউ হারিয়ে গেছেন। ‘দৌড়’ উপন্যাস লিখে সমরেশ মজুমদারের আরম্ভ সত্তর দশকে।
শারদীয় আনন্দবাজার পত্রিকায় গল্প ছাপা হত অনেক। কতসব ভাল গল্প পড়েছি আনন্দবাজারে। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘একটি বানুকের উপকথা’ শারদীয়তেই পড়েছি। পড়েছি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘দেবদূত’ ও ‘বারো হাটের কানাকড়ি’। শুনেছি একসময় শারদীয় সংখ্যায় একটিই উপন্যাস ছাপা হত। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হাঁসুলীবাঁকের উপকথা’ শারদীয় আনন্দবাজারে প্রকাশিত হয়েছিল। দেশ পত্রিকা নাটক প্রকাশ করে ১৯৮০-র পরে হয়তো। মনোজ মিত্রর ‘রাজদর্শন’ নাটক দেশ শারদীয়তেই প্রকাশিত হয়েছিল। কবির লেখা অপূর্ব গদ্য আলেখ্যর কথা মনে পড়ে, ১৯৯১ সালে জয় গোস্বামী লিখেছিলেন ‘হৃদয়ে প্রেমের শীর্ষে’। উপন্যাস লিখেছিলেন ১৯৯৩-এ, ‘সেইসব শিয়ালেরা।’
গত শতকের ৮০-র দশকের মাঝামাঝি তিনটি পত্রিকার জন্ম হল। ‘বর্তমান’, ‘আজকাল’ পত্রিকা এবং ‘প্রতিক্ষণ’ সাহিত্য পত্রিকা। প্রতিক্ষণ পত্রিকায় উপন্যাসের অলঙ্করণ করতেন প্রখ্যাত শিল্পীরা। তাঁদের ভিতরে ছিলেন যোগেন চৌধুরী, শুভাপ্রসন্ন, সুধাংশু।
দেশ পত্রিকার বহুবর্ণ চিত্রও ছিল আকর্ষণের। সত্তর, আশির দশকে গল্প বা উপন্যাসের অলঙ্করণ করতেন সুবোধ দাশগুপ্ত, সুধীর মৈত্র, সমীর সরকাররা। পরে সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়, সুব্রত চৌধুরী, কৃষ্ণেন্দু চাকীর মতো গুণী শিল্পীরা। সুধীর মৈত্রর রেখাচিত্রর কথা আজও মনে পড়ে। কী অপূর্ব রেখায় নরনারীর রূপ ফুটিয়ে তুলতেন তিনি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব গুহ, রমাপদ চৌধুরী, বিমল করের উপন্যাসে তাঁদের অঙ্কন নতুন এক মাত্রা যোগ করত।
গত শতকের ৮০-র দশকের মাঝামাঝি তিনটি পত্রিকার জন্ম হল। ‘বর্তমান’, ‘আজকাল’ পত্রিকা এবং ‘প্রতিক্ষণ’ সাহিত্য পত্রিকা। প্রতিক্ষণ পত্রিকায় উপন্যাসের অলঙ্করণ করতেন প্রখ্যাত শিল্পীরা। তাঁদের ভিতরে ছিলেন যোগেন চৌধুরী, শুভাপ্রসন্ন, সুধাংশু। যোগেন চৌধুরী ১৯৯০-এর শারদীয় প্রতিক্ষণে আমার উপন্যাস ‘হাঁসপাহাড়ি’ চিত্রিত করেছিলেন। সে ছিল অপূর্ব চিত্রণ। ছবিগুলির প্রিন্ট প্রতিক্ষণ আমাকে উপহার দিয়েছিল। তিরিশ বছরের নাড়াচাড়ায় সেই অমূল্য সম্পদ হারিয়ে গেছে।

১৯৯৪ সালে ‘নিসর্গের শোকগাথা’ উপন্যাসের অলঙ্করণ করেছিলেন সুধাংশু। প্রতিক্ষণের শিল্পনির্দেশক ছিলেন পূর্ণেন্দু পত্রী। কবিতায় অলঙ্করণ প্রতিক্ষণেই তিনি শুরু করেছিলেন। প্রতিক্ষণ-এ প্রকাশিত উপন্যাসের স্মৃতি, দেবেশ রায়ের ‘লগন গান্ধার’, মহাশ্বেতা দেবীর ‘টোরাড্যাকটিল পৃথা ও পূরণ সহায়’, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ‘হিরোসিমা মাই লাভ’, স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘নবম পর্ব’, অভিজিৎ সেনের ‘হলুদ রঙের সূর্য’, আফসার আমেদের ‘ধান জ্যোৎস্না’, সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের ‘নিখিলের অন্ধকার পাখি’। একেবারে ব্যতিক্রমী শারদীয় বের করত প্রতিক্ষণ। সেখানে শ্যামল, দেবেশ, সন্দীপন থেকে আমাদের প্রজন্মের লেখকরা লিখতেন। অনুবাদ, ভ্রমণ কাহিনি, নিবন্ধ, রিপোর্টিং নিয়ে প্রতিক্ষণ ছিল একেবারে আলাদা শারদীয়।
সংবাদপত্রের শারদীয় কতটা আলাদা হতে পারে, তার উদাহরণ ছিল ‘শারদীয় আজকাল’। উপন্যাস লিখতেন শ্যামল, দেবেশ, সন্দীপন, শৈবাল মিত্র এবং সুব্রত সেনগুপ্ত। একটি নির্ভেজাল গোয়েন্দা উপন্যাস লিখতেন অশোক দাশগুপ্ত। আজকাল পত্রিকায় ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ উপন্যাসের একটি পর্ব ‘মাদারি মায়ের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র’ লিখেছিলেন দেবেশ ১৯৮৬-র শারদীয়তে। সন্দীপনের ‘স্বর্গের নির্জন উপকূলে’, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘বালকের ভালবাসা’, ‘হননের আয়োজন’, শৈবাল মিত্রর উপন্যাস ‘অন্তঃকরণ’ মনে দাগ ফেলে গেছে।
আজকাল শারদীয়তে গল্প ছাপা হত নিশ্চিতভাবে ২৫টি। বড় গল্প চারটি। নিবন্ধে আজকাল একেবারেই ব্যতিক্রমী। বাঙালির সংস্কৃতির নানা বিষয়ে চমৎকার সব লেখা থাকত। গান, চিত্রকলা, অভিনয় নিয়ে কী অপূর্ব সব লেখা।
আজকাল সম্পাদক সেই লেখকদের নিয়ে শারদীয় করতেন যাঁরা গুণমানে অতি উচ্চ, কিন্তু সেই অর্থে পপুলার ছিলেন না। লেখকরাও উপন্যাস গল্প স্বাধীনভাবে লিখতেন। দেবেশ রায়ের ‘উচ্ছিন্ন উচ্চারণ’, ‘ইতিহাসের লোকজন’ আজকাল শারদীয়তে পড়ি। উপন্যাস লিখনের ধারাই বদলে গিয়েছিল এই দুই আখ্যানে। আজকাল সম্পাদক যেমন সাহস করে ছেপেছিলেন, লেখকের স্বাধীনতাও ছিল নিজের মতো লেখার। পরীক্ষা নিরীক্ষায় যাওয়ার।
আজকাল শারদীয়তে গল্প ছাপা হত নিশ্চিতভাবে ২৫টি। বড় গল্প চারটি। নিবন্ধে আজকাল একেবারেই ব্যতিক্রমী। বাঙালির সংস্কৃতির নানা বিষয়ে চমৎকার সব লেখা থাকত। গান, চিত্রকলা, অভিনয় নিয়ে কী অপূর্ব সব লেখা। যাঁর শতবর্ষ হত, তাঁকে নিয়ে ক্রোড়পত্র হত। আর ছাপা হত বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের আত্মজীবনী। পড়তে তা অতি মধুর। আজকালে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, মোহিত চট্টোপাধ্যায়, মনোজ মিত্র, দেবাশিস মজুমদার লিখেছেন নাটক। আজকাল শারদীয় পাঠের আনন্দই ছিল আলাদা। আত্মজীবনী আমার প্রিয় পাঠ ছিল।
‘বর্তমান’ যে শারদীয় সংখ্যা প্রকাশ করতে শুরু করে গত শতকের ৮০-র দশকের মাঝামাঝি, তা ছিল অন্য সব সংবাদপত্রের শারদীয়র থেকে আলাদা। বর্তমান শারদীয়তে নানা বিষয়ে নিবন্ধ ছিল আকর্ষণের। ধর্ম একটি প্রধান বিষয়। সুমন গুপ্ত ভারতের সব তীর্থস্থানগুলির কথা লিখতেন। উপন্যাস লিখতেন প্রফুল্ল রায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখতেন বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়। শ্যামলের একটি অসামান্য গল্প ‘রস’ পড়েছিলাম বর্তমান শারদীয়তে। বর্তমান বিক্রি হয় অনেক। প্রায়ই দেখেছি প্রকাশের পর পত্রিকা আর স্টলে নেই। বিক্রি হয়ে গেছে। তবে নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় সীমা স্থির করে এই লেখা লিখছি বলে এখনকার কথা বলছি না।
বর্তমান শারদীয়তে আমার প্রথম লেখা ২০০০ সালে। ‘সংবাদ প্রতিদিন’ প্রথম প্রকাশিত হয় সম্ভবত নব্বই দশকের মাঝামাঝি। গল্প, উপন্যাস, নিবন্ধে ভরা শারদীয়। নবীন প্রবীণ উভয়েই লিখতেন শারদীয় সংবাদ প্রতিদিন পত্রিকায়। নবীনদের জন্য একটি উন্মুক্ত লেখার জায়গা হয়ে উঠেছিল এই পত্রিকা।
একটি লুপ্ত সাহিত্যপত্রের কথা বলি, ‘গল্প কবিতা’। সম্পাদক কৃষ্ণগোপাল মল্লিক। অপূর্ব শারদীয় সংখ্যা প্রকাশ করতেন তিনি। গল্প কবিতা শারদীয়তে আমি অসীম রায়ের ‘অসংলগ্ন’ কাব্য উপন্যাস পড়েছিলাম ১৯৭৩ নাগাদ।
গত শতকের ৮০-র দশকে কলেজ স্ট্রিটের প্রকাশকরা একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেন। তার নামও ‘কলেজ স্ট্রিট’। কলেজ স্ট্রিট চমৎকার সব শারদীয় সংখ্যা বের করত। একবার বের করল বাংলাদেশের গল্প সংখ্যা। দ্রুত শেষ হয়ে গিয়েছিল। কলেজ স্ট্রিট শারদীয় সংখ্যা গল্প উপন্যাস প্রবন্ধে উন্নত মানের হত। মনে পড়ে শারদীয় কলেজ স্ট্রিট পত্রিকায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘ভগবান বুনো রায়ের বংশধর’-এর কথা।
‘সত্যযুগ’ সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে গেলে তার কর্মীরা একটি সমবায় করে পত্রিকার সান্ধ্য সংস্করণ বের করতেন। তাঁরাই খুব ভাল পুজো সংখ্যা প্রকাশ করতেন বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করে। সেই শারদীয়তে উপন্যাস লিখেছি। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে অনেক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়ে বন্ধও হয়ে গেছে। যতদিন তারা বেঁচেছিল, শারদ সংখ্যা বের করত। ‘দৈনিক প্রতিবেদন’, ‘ওভারল্যান্ড’ ইত্যাদি পত্রিকার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে কয়েক বছরে সাড়া জাগানো পত্রিকা সমরেশ বসু সম্পাদিত ‘মহানগর’-এর কথা। সমরেশ বসু নবীন প্রজন্মকে তাঁর পত্রিকায় প্রশ্রয় দিতেন। আমিও লিখেছি সেই অপূর্ব শারদীয়তে।

সম্পাদক চেয়ে নিয়েছেন, কিন্তু না ছেপে ফেরত দিয়েছেন গল্প, এমন ঘটনা বিরল নয়। ‘পরিচয়’ পত্রিকার সম্পাদক-লেখক দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প ‘শোক মিছিল’-এর ক্ষেত্রে এই ঘটনা ঘটেছিল। সেই গল্প সেই বছর ‘পরিচয়’ শারদীয়তে পড়েছিলাম। ১৯৭২-এর ঘটনা। এই ঘটনা বিজ্ঞাপনের কারণে বাদ যাওয়া নয়। আমন্ত্রিত লেখকের লেখা না ছাপার কারণ অজ্ঞাত। মনে হয় রাজনৈতিক।
এত সময় বলেছি বিখ্যাত সব পত্রিকার কথা। সবই বাণিজ্য সফল পত্রিকা। কিন্তু শারদীয় তো শুধু সংবাদপত্রের শারদীয় নয়। বাণিজ্যক সংবাদপত্রের শারদীয়তে মননশীল প্রবন্ধের জায়গা কম ছিল। এই জায়গাটি পূরণ করত লিটল ম্যাগাজিন, সাহিত্য সাময়িকপত্র। মনে পড়ছে অধুনা লুপ্ত ‘এক্ষণ’, ‘বারোমাস’ সাহিত্যপত্রের কথা। ‘অনুষ্টুপ’, ‘পরিচয়’ এখনও প্রকাশিত হচ্ছে। এইসব পত্রিকার প্রবন্ধ, গবেষণামূলক লেখা বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
একটি লুপ্ত সাহিত্যপত্রের কথা বলি, ‘গল্প কবিতা’। সম্পাদক কৃষ্ণগোপাল মল্লিক। অপূর্ব শারদীয় সংখ্যা প্রকাশ করতেন তিনি। গল্প কবিতা শারদীয়তে আমি অসীম রায়ের ‘অসংলগ্ন’ কাব্য উপন্যাস পড়েছিলাম ১৯৭৩ নাগাদ। অমিতাভ দাশগুপ্তর উপন্যাসও পড়েছি ‘গল্প কবিতা’ শারদীয়তে। অমল চন্দের উপন্যাস ‘অভিযোগ’ ভুলিনি। ১৯৭৬ সালে বহুদিন বাদে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় লিখতে এলেন সমরেশ বসু। সেই গল্পের নাম ‘পেলে লেগে যা’। আমার সৌভাগ্য ১৯৭৬ শারদীয়তে সম্পাদক দীপেন্দ্রনাথ আমার একটি গল্প ছেপেছিলেন, ‘রাজকাহিনি’।
শারদীয় উৎসব আজ থেকে চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগে নতুন গান, নতুন নাটক, গল্প উপন্যাস, সিনেমা সব সঙ্গে নিয়ে আসত। সেই অর্থে পুজোর গান আর পুজোর সিনেমা এখন আর নেই।
অশোক সেন সম্পাদিত ‘বারোমাস’ সাহিত্যপত্র ১৯৮০-র দশকের আরম্ভে প্রকাশিত হয়। গল্প, প্রবন্ধ, পুস্তক সমালোচনা সবকিছুতেই ছিল অনন্য। বিরল গোত্রের এই সাহিত্য পত্রিকায় শঙ্কর বসু (রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়)-র গল্প পড়েছি। নয়ের দশক থেকে আমি বারোমাস পত্রিকার শারদীয়তে নিয়মিত লিখেছি। লিখে আনন্দ হত। লেখার প্রতিক্রিয়া আসত ভাল। বারোমাস পত্রিকায় আমি পুস্তক সমালোচনা লিখেছি বেশ কয়েকটি। ভাল বইয়ের আলোচনা ছিল বারোমাস শারদীয়র বড় আকর্ষণ। বারোমাস ব্যতীত আর কোনও শারদীয়তে বই নিয়ে অত কথা থাকত না। বাংলা বইয়ের আলোচনা তেমন ভাবে আর হয় কোন পত্রিকায়?
তবে ‘অনীক’ পত্রিকার কথা না বললেই নয়। বহরমপুর থেকে বেরোত। এখন কলকাতা থেকে বের হয়। রাজনৈতিক প্রবন্ধে অনীক ছিল সেরা। তাঁদের নির্দিষ্ট মত ছিল। সব সময় তা মানতে বাধ্য না হয়েও অনীক পত্রিকায় লিখে, ছিল অপূর্ব আনন্দ। ১৯৮০ সালে অনীক পত্রিকায় ‘দানপত্র’ নামে একটি গল্প লিখি। তারপর টানা তিরিশ বছর লিখেছি, মধ্যে এক বছর বাদ। গল্পটি তাঁদের পছন্দ হয়নি।
কত পত্রিকা বের হত, কিন্তু টেকেনি বেশিদিন। আমাদের শারদীয় সংখ্যা আমাদের অহংকার তো নিশ্চয়। শারদীয় উৎসব আজ থেকে চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগে নতুন গান, নতুন নাটক, গল্প উপন্যাস, সিনেমা সব সঙ্গে নিয়ে আসত। সেই অর্থে পুজোর গান আর পুজোর সিনেমা এখন আর নেই। তবে বহু পত্রিকা, বহু লেখক নিয়ে যে বিপুল হয়ে উঠত শারদোৎসব, তার ধারাটি শুকিয়ে যায়নি, এইটুকুই আমাদের স্বস্তি।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত