(Teejan Bai Memoir)
‘আমি চলে যাবো। কিন্তু আমার প্রাণ দিয়ে গড়া পাণ্ডবাণী থেকে যাবে। ছোটা তীজন রইল যে।’
ঝিঁ ঝিঁ ডাকা সন্ধেয় কাকা সবল সিং চৌহান, ছত্তিশগড়ি হিন্দিতে সুর করে পড়ে চলেছেন মহাভারতের আখ্যান। সেই সুরেই মন মজেছে কিশোরী তীজনের। শুনে শুনেই কাহিনিগুলি মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল তাঁর। বাবা চুনুকলাল পাদ্রী এবং মা সুখবতীর প্রথম সন্তান তীজনের চোখে তখন স্বপ্ন, বড় হয়ে গায়ক হবে। কিছুদিন পর বড় হয়ে তিনি গায়কির শিক্ষা নিলেন উমেদ সিং দেশমুখের কাছে। পাঁচ ভাইবোনকে নিয়ে সুখের সংসার ছিল তীজনদের।
আরও পড়ুন: মেঘ-কুয়াশার শহর ও কিশোর শেরিং
মাত্র ১২ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। কিছুদিন পর দুর্গ অঞ্চলে প্রথম জনসমক্ষে মহাভারতের এই গান পরিবেশন করেছিলেন মাত্র ১০ টাকা দক্ষিণাতে। এই ছিল শুরু। এরপর তীজনের খ্যাতি ক্রমে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ডাক আসতে থাকে বিভিন্ন জায়গা থেকে।

সে সময় মহিলারা এই ধরনের গান করতেন না। ফলে এমন গান পরিবেশনের জন্য তাঁকে পাদ্রী সমাজ থেকে বহিষ্কৃত করা হয়। এরপর দূরত্ব বাড়ে স্বামীর সঙ্গে। বিবাহবিচ্ছেদের পর তীজন একটি ছোট্ট কুটির বানিয়ে বসবাস করতে থাকেন। কিন্তু গানের সঙ্গে তিনি কোনও আপোষ করেননি। পরে টুকা রামের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তীজন।
মধ্যপ্রদেশের বিশিষ্ট নাট্যকার হাবিব তনভীর এই সময় তাঁর প্রতিভায় আকৃষ্ট হন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হয়ে তিনি তীজনকে আমন্ত্রণ জানান। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তবে তীজনের পরিবার তাঁকে দু’দণ্ড শান্তি দেয়নি! ক্রমে তাঁর গানের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে পৈতৃক গ্রাম ছাড়িয়ে দেশের নানা প্রান্তে। এর পর দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও।

১৯৮০-র দশকে তিনি ভারতের সাংস্কৃতিক দূত হিসেবে ইংল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, তুরস্ক, সাইপ্রাস, মরিশাসসহ বিশ্বের নানা দেশে ভ্রমণ করেন। জওহরলাল নেহেরুর লেখা অবলম্বনে শ্যাম বেনেগালের পরিচালনায় দূরদর্শনে ‘ভারত এক খোঁজ’ ধারাবাহিকে অভিনয় করেন।
মহাভারতের কাহিনিনির্ভর ‘পাণ্ডবাণী’ পরিবেশনায় তিনি স্বচ্ছন্দ ছিলেন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ, দুঃশাসন বধ এবং মহাভারতের যুদ্ধের কথকতায়। তাঁর আরেক প্রিয় পরিবেশনা ছিল ‘অভিমন্যু বধ’ পালা।
গান পরিবেশনের সময় তাঁর সঙ্গে অপরিহার্যভাবে দেখা যেত একটি সুসজ্জিত তাম্বুরা। ময়ূরপুচ্ছ এবং রংবেরঙের সুতোর কাজ দিয়ে এটি সাজানো থাকত। মহাভারতের কথা প্রকাশের সময় এই তাম্বুরা কখনও হয়ে উঠত ভীমের গদা, কখনওবা অর্জুনের ধনুর্বাণ, কখনও আবার প্রাসাদের কারুকাজ করা শোভিত স্তম্ভ।

মহাভারতের কাহিনিনির্ভর ‘পাণ্ডবাণী’ পরিবেশনায় তিনি স্বচ্ছন্দ ছিলেন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ, দুঃশাসন বধ এবং মহাভারতের যুদ্ধের কথকতায়। তাঁর আরেক প্রিয় পরিবেশনা ছিল ‘অভিমন্যু বধ’ পালা। কিন্তু এই পালা সম্পর্কে একটি হৃদয়বিদারক কাহিনি শুনিয়েছিলেন কলকাতার বিশিষ্ট নাট্য পরিচালক এবং তীজন বাইয়ের অত্যন্ত কাছের মানুষ মণীশ মিত্র।

মধুসূদন মঞ্চে একবার অনুষ্ঠান করতে এসে প্রথমেই তাঁর ‘অভিমন্যু বধ’ করার কথা। সেবার প্রথমার্ধে পালাটি পরিবেশন করেন। তারপর গ্রিনরুমে গিয়ে বিষণ্ণ মুখ। প্রসঙ্গত, তীজন নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিলেন এই শহরের খ্যাতনামা অভিনেত্রী সীমাদেবীকে (সীমা ঘোষ)। সীমাদেবী সেদিন তাঁর কাছে যেতেই তিনি কেঁদে ওঠেন এবং জানান, সপ্তাহখানেক আগে তিনি সন্তানকে হারিয়েছেন।
তীজন বলতেন, ‘খুদ ডুব জায়ো, খুদ রং জায়ো। খুদ নহি রঙ্গোগে তো দুসরোঁ কো কৈসে রঙ্গোগে?’ মহান এই শিল্পী প্রয়াত হলেও তাঁর দিয়ে যাওয়া রঙে পাণ্ডবাণী চিরকাল রঙিন হয়ে থাকবে।
কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই সেদিনের পরিবেশনা করেছেন বলে জানান তিনি। তারপর আর ওই পালাটি করবেন না বলে জানান। বদলে এটি করবেন সীমা ঘোষ, তাঁর অন্তরের প্রিয় ‘ছোটা তীজন’- এমনটাই তাঁর ইচ্ছা ছিল। গুরুমায়ের প্রয়াণের পর গত ২৫শে জুলাই তীজন বাইকে স্মরণ করে ‘অভিমন্যু বধ’ মঞ্চস্থ করেন সীমা ঘোষ।

তীজন বাই তৃতীয়বার বিয়ে করেন নিজের দলের এক যন্ত্রশিল্পীকে। সেবারেও একই সমস্যা। ‘পাণ্ডবাণী’ বন্ধ করার জন্য রীতিমতো মারধর করতেন সেই স্বামী। সেই সময়ে তীজনজি বলেছিলেন, ‘এই সুর আমাকে কৃষ্ণ দিয়েছেন। যে দিন কৃষ্ণ সুর কেড়ে নেবেন, সে দিন এই শিল্প ছেড়ে দেব।’
কলকাতায় তীজন বাই শেষ অনুষ্ঠান করেছেন ২০২২ সালে, অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এ। ভারত সরকার তাঁকে ১৯৮৭ সালে পদ্মশ্রী, ২০০৩ সালে পদ্মভূষণ এবং ২০১৯ সালে পদ্মবিভূষণ সম্মানে ভূষিত করে। এছাড়া ১৯৯৫ সালে তিনি সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হন।

তীজন বলতেন, ‘খুদ ডুব জায়ো, খুদ রং জায়ো। খুদ নহি রঙ্গোগে তো দুসরোঁ কো কৈসে রঙ্গোগে?’ মহান এই শিল্পী প্রয়াত হলেও তাঁর দিয়ে যাওয়া রঙে পাণ্ডবাণী চিরকাল রঙিন হয়ে থাকবে।
ছবি ও অটোগ্রাফ – গোপী দে সরকার
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত