ক্যামেরা থেকে মাইক্রোফোন- লতায় ঘেরা এক যাত্রাপথ

Lata Mangeshkar Tribute
Lata Mangeshkar Tribute

ক্যামেরা থেকে মাইক্রোফোন- লতায় ঘেরা এক যাত্রাপথ

(Lata Mangeshkar Tribute)

দিনটা ছিল ১৯৩৮ সালের সেপ্টেম্বরের কোনও এক শুক্রবার। শোলাপুর জলসা উপলক্ষ্যে শহরের ‘নূতন নাট্য মন্দির’-এ উপচে পড়া ভিড়। শহরের সঙ্গীতরসিকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে বম্বের খ্যাতনামা ‘বলবন্ত নাট্য-সঙ্গীত মণ্ডলী’। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে গোটা বম্বে প্রেসিডেন্সি জুড়ে এই দলের নামডাক। এক শহর থেকে আরেক শহরে ঘুরে ঘুরে নাটক আর সঙ্গীতের আসর মাতিয়ে রাখাই তাদের পেশা। তবে এই দলের প্রধান চালিকাশক্তি এবং মূল আকর্ষণ ছিলেন দলটির কর্ণধার, সুরকার, অভিনেতা ও সাংলির প্রথিতযশা সঙ্গীতগুণী মাস্টার দীননাথ মঙ্গেশকর।

সময়ের নিয়মে দলের সেই বাঁধভাঙা জনপ্রিয়তায় সেই সময় কিছুটা ভাটার টান। তখন সবেমাত্র ‘টকি’ বা সবাক চলচ্চিত্রের যুগ শুরু হয়েছে। সেলুলয়েডের নতুন চমক একটু একটু করে ম্লান করে দিচ্ছিল পেশাদারি নাট্যমঞ্চের সুপ্রাচীন গৌরব আর ঐতিহ্যকে।


আরও পড়ুন: শিকড়ের সুরসারথি কালিকাপ্রসাদ


এমনই এক সন্ধিক্ষণে, জলসার উদ্যোক্তারা মাস্টার দীননাথের কাছে এক অপ্রত্যাশিত প্রস্তাব নিয়ে এলেন। তাঁরা চাইলেন, দীননাথের সঙ্গে যেন তাঁর ছোট্ট মেয়েটিও মঞ্চে শিশুশিল্পী হিসেবে কিছু পরিবেশন করে। একই মঞ্চে পিতা ও কন্যার যুগলবন্দি— দুই প্রজন্মের এই মেলবন্ধন শ্রোতারা নিশ্চয়ই আন্তরিকভাবে গ্রহণ করবেন।

প্রস্তাব শুনে মাস্টার দীননাথ তো আকাশ থেকে পড়লেন! কিছুতেই রাজি হলেন না। কেনই বা হবেন? মেয়ের বয়স যে সবে ন’বছর। গানের জগতে সে আর কতটুকুই বা বোঝে! এই তো সেদিন তাকে রেওয়াজের প্রথম পাঠ দেওয়া শুরু করেছেন। এখনই কী করে তাকে জলসায় অংশ নিতে বলবেন?

Lata Mangeshkar Tribute
প্রথম অভিনয় ১৯৪২ সালে এক মারাঠি ছবিতে

কিন্তু বাবার অগোচরেই প্রস্তাবটা পৌঁছে গিয়েছিল মেয়ের কানে। তার মনে ভারী আশা জেগেছিল— বাবা বোধহয় রাজি হয়ে যাবেন। কিন্তু বাবার সাফ ‘না’ শুনে সে দমে যাওয়ার পাত্রী ছিল না। সে মনে মনেই স্থির করল, নিজেই গিয়ে বাবাকে রাজি করাবে। সোজা গিয়ে সে ঢুকল গ্রিনরুমে। নিঃশব্দে বাবার ঠিক পাশের চেয়ারটিতে বসল। মাস্টার দীননাথ তখন নিমগ্ন হয়ে খাতার পাতায় কিছু একটা লিখছিলেন। অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিয়ে তখন এতটাই ব্যস্ত যে পাশে এসে কে বসল, তা খেয়ালই করেননি।

সংসারের বড় সন্তান, তাই এই মেয়ের প্রতি বাবার পক্ষপাত আর স্নেহ ছিল অসীম। বাবারও যেন ঠিক ছায়াসঙ্গী সে। দূরের সফর বাদ দিলে, সাংলির আশপাশে কোথাও অনুষ্ঠান থাকলে মেয়ের বাবার পিছু ছাড়ার কোনও উপায় ছিল না— সঙ্গে যাবেই।

মেয়ের সেই অচঞ্চল আত্মপ্রত্যয় আর জেদের কাছে হার মানতেই হল স্নেহশীল পিতাকে। অনুমতি মিলল। আর মঞ্চে পা রেখে ন’বছরের মেয়েটি প্রমাণ করে দিল, তার এই আত্মবিশ্বাস কোনও অবুঝ অহংকার ছিল না, ছিল আজন্ম ঈশ্বরপ্রদত্ত স্বরলিপি।

শুধু বড় মেয়েই বা কেন, নাটকের এই দলের যাযাবর জীবনের সঙ্গে দীননাথ তাঁর গোটা পরিবারকেই অনেক সময় শামিল করে নিতেন। কখনও পণ্ঢরপুর, কখনও সাতারা, কখনও কোলাপুর বা শোলাপুর— এক শহর থেকে আরেক শহরে দলবল নিয়ে ঘুরে ঘুরে চলত নাটকের প্রদর্শনী। আর এই ভবঘুরে নাট্যজীবনের আবহেই ছোট্ট মেয়েটির অন্তরে একটু একটু করে জায়গা করে নিচ্ছিল সুর, তাল ও মঞ্চের আলোছায়ার মায়াবী জগৎ। অবচেতনেই সে আত্মস্থ করে নিচ্ছিল সঙ্গীতের অনুশাসন, একনিষ্ঠ সাধনা আর শিল্পকলার গভীর নান্দনিকবোধ। এবার শোলাপুর আসার পিছনে অবশ্য মেয়ের আরও একটা মিষ্টি আবদার ছিল— অনেকদিনের ইচ্ছে, শোলাপুরের জাগ্রত শ্রীসিদ্ধেশ্বর মন্দিরটি দর্শন করা।

বাবার ভাবনার সুতো ছিঁড়ে দিয়ে শান্ত কিন্তু দৃপ্ত কণ্ঠে সে বলল, ‘বাবা, মি পণ আজ স্টেজভর গাণং গাণার আহে’— আমিও আজ স্টেজে গান গাইব।

মাস্টার দীননাথ মেয়ের দিকে ফিরে অবাক হয়ে তাকালেন। তারপর স্নেহে কাছে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে শুধোলেন, ‘গান গাইবি? কী গান গাইবি শুনি?’

Lata Mangeshkar Tribute
মেয়েটির অন্তরে একটু একটু করে জায়গা করে নিচ্ছিল সুর, তাল ও মঞ্চের আলোছায়ার মায়াবী জগৎ

‘কেন? রাগ খাম্বাবতী!’ পলক না ফেলে জবাব দিল মেয়ে।

দীননাথ যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারলেন না, ‘সে কী রে মা! তুই গাইবি খাম্বাবতী রাগ?’

‘হ্যাঁ বাবা, নিশ্চয়ই পারব! শুধু তো খাম্বাবতী নয়, আরও গান গাইতে পারব। তুমি অনুমতি দিয়েই দেখো না একবার!’

‘সত্যিই পারবি তো মা?’ দীননাথ তখনও দ্বিধাদ্বন্দ্বে। এতবড় আসর, অভিজ্ঞ সব শ্রোতার ভিড়— আগে তো মেয়ে কোনওদিন জনসমক্ষে গান গায়নি।

‘খুব পারব বাবা’, অটল আত্মবিশ্বাসে ঝলমল করে উঠল মেয়ের চোখমুখ, ‘তুমি আছ তো, আমার আবার কীসের ভয়?’

মেয়ের সেই অচঞ্চল আত্মপ্রত্যয় আর জেদের কাছে হার মানতেই হল স্নেহশীল পিতাকে। অনুমতি মিলল। আর মঞ্চে পা রেখে ন’বছরের মেয়েটি প্রমাণ করে দিল, তার এই আত্মবিশ্বাস কোনও অবুঝ অহংকার ছিল না, ছিল আজন্ম ঈশ্বরপ্রদত্ত স্বরলিপি।

তার কণ্ঠের জাদুতে সেদিন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল গোটা প্রেক্ষাগৃহ। গান শেষ হতেই চারদিক থেকে ভেসে এল হাততালির অবিশ্রান্ত গর্জন আর ভূয়সী প্রশংসা। সেদিন বাড়ি ফিরে দীননাথ তাঁর স্ত্রীকে মুগ্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আজ বলে রাখছি, আমি থাকি বা না থাকি— একদিন তোমার এই মেয়ে দেশের এক মস্ত বড় শিল্পী হবে। গোটা ভারতে ওর নাম ছড়িয়ে পড়বে। হবে নাই বা কেন বলো, ওর কণ্ঠে যে স্বয়ং মা সরস্বতী অধিষ্ঠান করছেন!’

বাবার সেই ভবিষ্যৎবাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্যি করে সেই ছোট্ট মেয়েটিই একদিন হয়ে উঠলেন সুর সম্রাজ্ঞী— লতা মঙ্গেশকর।

সেবার প্রথম পুরস্কারটি লতার হাতেই উঠেছিল, কিন্তু অন্তরের গভীরে বাবার সেই কথাটি এক আজীবন অতৃপ্তি আর আত্মানুসন্ধানের পাঠ হয়ে গেঁথে রইল। তাকে বাবার নামে নয়, নিজের সুরেই চিনিয়ে দিতে হবে এই ধরণীকে।

লতার চলার পথটি কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না; নানা ঘাত-প্রতিঘাত আর উত্থান-পতনের মধ্য দিয়েই তাঁকে এগিয়ে যেতে হয়েছিল। শৈশবে পরিবারের যে প্রাচুর্য আর স্বাচ্ছন্দ্য তিনি দেখেছিলেন, নিয়তির অমোঘ নিয়মে হঠাৎই সেখানে ঘনিয়ে আসে চরম অনিশ্চয়তা। ১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত দীননাথের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘বলবন্ত নাট্য-সঙ্গীত মণ্ডলী’ চল্লিশের দশকের শুরুতে এসে ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মুখে পড়ে। সবাক সিনেমার সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতায় কুলিয়ে উঠতে না পেরে অবশেষে চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় ওই দলটি। দেনায় ডুবে যাওয়া সেই দিনগুলোয় দীননাথকে ভিটেমাটি পর্যন্ত ছাড়তে হয়েছিল। সাংলির বাড়ি বিক্রি করে সপরিবারে পুনে চলে এসেছিলেন তিনি। সেই মেঘলা দিনগুলোর মধ্যেই লতার জীবনে এক টুকরো সোনালি রোদ হয়ে এসেছিল। 

১৯৪১-এর আরও এক ঘটনা। লাহোরের বিখ্যাত এক ফিল্ম কম্পানির প্রযোজিত ছবি ‘খাজাঞ্চি’ মুক্তির পরে বিপুল সাফল্য অর্জন করে। ছবির প্রচারের অঙ্গ হিসেবে, সেই ছবির গানের ওপর ভিত্তি করে পুনেতে আয়োজিত হয় এক সঙ্গীত প্রতিযোগিতা। সুরের জাদুকর গুলাম হায়দারের কম্পোজিশনে শমশাদ বেগমের গান তখন মুখে মুখে। প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল সেই ছবির গান গাওয়ার। বারো বছরের কিশোরী লতার মন উচাটন— তাকে গাইতেই হবে— এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেই হবে। কিন্তু বাবার অনুশাসন! তাঁর অনুমতি ছাড়া কী করে সম্ভব। অনেক ভেবে, মন-মস্তিষ্কের লড়াইয়ের শেষে, শহরে বাবার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে মনের ডাকে পা বাড়িয়ে একাই সে হাজির হল প্রতিযোগিতার প্রাঙ্গণে।

Lata Mangeshkar Tribute
সেই মেঘলা দিনগুলোর মধ্যেই লতার জীবনে এক টুকরো সোনালি রোদ হয়ে এসেছিল

শতাধিক সুরসন্ধানীর ভিড়ে ছোট্ট মেয়েটির ভিতর তখন বাজছিল এক অদৃশ্য দিকনির্ণয় যন্ত্র। প্রতিযোগিতার প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীদের বলা হয়েছিল, তারা সঙ্গীত পরিবেশনের আগে নিজেদের নাম বলবে। সবার মতো লতাও তাই করল। মঞ্চে উঠে আত্মবিশ্বাসী গলায় মাইকে বেশ কিছুটা জোর গলায় সে তার নিজের নাম ঘোষণা করল— ‘লতা দীননাথ মঙ্গেশকর’। মুহূর্তে পুরো হলঘরে যেন আবেগের ঢেউ খেলে গেল। সেই করতালি লতার অজানা ছিল না; সে বুঝেছিল, এ সম্মান তার নয়, এ তার পিতৃদেবের প্রতি মুগ্ধ শ্রদ্ধার অঞ্জলি। বাড়ি ফিরে বাবাকে সব জানাতেই দীননাথ মৃদু অনুযোগের সুরে বলেছিলেন, ‘প্রথম না হলে কিন্তু বড় লজ্জার ব্যাপার হবে রে! আর হ্যাঁ…নিজের পরিচয় শুধু ‘লতা মঙ্গেশকর’ বললেই আমি বেশি খুশি হতাম।’

লতা বুঝে গিয়েছিলেন, বাবা কী বলতে চাইলেন। জয় কখনও কারও অনুগ্রহ বা সাহায্যে আসে না— নিজের ক্ষমতায় অর্জন করতে হয়। সেবার প্রথম পুরস্কারটি লতার হাতেই উঠেছিল, কিন্তু অন্তরের গভীরে বাবার সেই কথাটি এক আজীবন অতৃপ্তি আর আত্মানুসন্ধানের পাঠ হয়ে গেঁথে রইল। তাকে বাবার নামে নয়, নিজের সুরেই চিনিয়ে দিতে হবে এই ধরণীকে।

লতা মঙ্গেশকর আবার শুরু করলেন নতুন করে জীবন গড়বার লড়াই। প্রথম অভিনয় ১৯৪২ সালে এক মারাঠি ছবিতে। পর পর চারটে ছবিতে ছোটখাটো অভিনয় করলেন। ছবির জন্য প্রথম গান রেকর্ড করেছিলেন ‘কিতি হসাল’ নামের ছবিতে, কিন্তু গানটি ছবি মুক্তির আগে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়।

ভাগ্যের লিখন যে বড় নির্মম। ১৯৪২ সালের ২৪শে এপ্রিল মাত্র ৪১ বছর বয়সেই মাস্টার দীননাথ পাড়ি দিলেন অনন্তের দেশে। সুরের যে বিরাট বটবৃক্ষ এতদিন পরিবারকে আগলে রেখেছিল, তা এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। সংসারের তরী তখন অথৈ জলে, আর দাঁড় হাতে একা তেরো বছরের কিশোরী লতা— পিছনে রোগশয্যায় মা আর একদল নিষ্পাপ ভাইবোন। শোককে বুকে চেপে রেখে পেটের জ্বালায় সুরের সাধিকাকে সেদিন রঙের প্রলেপ মেখে দাঁড়াতে হয়েছিল ক্যামেরার কৃত্রিম আলোয়।

পারিবারিক বন্ধু মাস্টার বিনায়কের হাত ধরে অভিনয় জগতে পা রেখেছিল ঠিকই, তবে মন পড়ে থাকত তানপুরা আর স্বরলিপির কাছেই। কিন্তু কী আর করা— দিনের শেষে যে তারই অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকত বাড়িতে আরও পাঁচটি মুখ। আর্থিকভাবে বিশেষ কিছু সুরাহা হয়নি, তাছাড়া অভিনয় করতে মেয়েটি তো চায়নি। 

লতা মঙ্গেশকর আবার শুরু করলেন নতুন করে জীবন গড়বার লড়াই। প্রথম অভিনয় ১৯৪২ সালে এক মারাঠি ছবিতে। পর পর চারটে ছবিতে ছোটখাটো অভিনয় করলেন। ছবির জন্য প্রথম গান রেকর্ড করেছিলেন ‘কিতি হসাল’ নামের ছবিতে, কিন্তু গানটি ছবি মুক্তির আগে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। সেই বছরই ‘পহিলি মঙ্গলাগৌর’ ছবিতে তাঁর গলা একটি ডুয়েট গানে শোনা গেল। ছবিতেও তিনি শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ করেছিলেন।

প্রথম হিন্দি গান তিনি রেকর্ড করেন ১৯৪৩ সালে— একটি মারাঠি ছবির জন্য। আরও দু’বছর পরে প্রথমবার একটি হিন্দি ছবির জন্য হিন্দিতে গান রেকর্ড করেন। ‘আপ কি সেবা মে’ নামের সেই ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৪৭ সালে।

নতুন করে আবার লড়াই শুরু হল। বম্বে বাণিজ্যনগরীর চলচ্চিত্র দুনিয়া তখন এক পাথুরে দেওয়াল। নূরজাহান, শমশাদ বেগমদের গমগমে, ভারিক্কি গলার স্বর্ণযুগ।

এক সময় ভাগ্যান্বেষণে পুনে ছেড়ে মায়ানগরী বম্বেতে পদার্পণ করতে হল। যে মাস্টার বিনায়েক তাঁর ত্রাতা হয়ে একদিন প্রকট হয়েছিলেন, তিনি তাঁর ফিল্ম কম্পানি ‘নবযুগ চিত্রপট’এর ব্যবসা কোলাপুর থেকে গুটিয়ে বম্বে নিয়ে আসেন। সঙ্গে বহু শিল্পীদেরও এনেছিলেন। সেই দলে ছিলেন লতা ও তাঁর পরিবার। অল্পবিস্তর অভিনয়ের কাজ চলছিল— কোনওক্রমে সংসারের জোয়াল কাঁধে লতা এগিয়ে চলছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, আবার একবার তাঁকে এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়াতে হল। যাঁর হাত ধরে বম্বে আসা, সেই মাস্টার বিনায়েক ১৯৪৭ সালের অগাস্ট মাসে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। তাঁর সঙ্গে শেষ কাজ ‘মন্দির’ নামক এক ছবি অর্ধসমাপ্ত হয়ে পড়ে ছিল। সেটি তাঁর মৃত্যুর পরে শেষ করা হয়।

নতুন করে আবার লড়াই শুরু হল। বম্বে বাণিজ্যনগরীর চলচ্চিত্র দুনিয়া তখন এক পাথুরে দেওয়াল। নূরজাহান, শমশাদ বেগমদের গমগমে, ভারিক্কি গলার স্বর্ণযুগ। সেখানে লতার স্নিগ্ধ, স্বচ্ছ কণ্ঠকে অবলীলায় খারিজ করে দিলেন বাঘা বাঘা সুর-বোদ্ধারা। স্টুডিওর বন্ধ দরজায় ধাক্কা খেতে খেতে শুনতে হল নির্মম রায়— “বড্ড পাতলা গলা, এ গলায় প্লেব্যাক চলে না!”

Lata Mangeshkar Tribute
যে কণ্ঠকে একদিন ‘ফিল্মের অযোগ্য’ বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই কণ্ঠই হয়ে উঠল ভারতীয় সুরের একক হিমালয়

আবার একবার সময়ের পৃষ্ঠা উলটে গেল— পুনের সেই সঙ্গীত প্রতিযোগিতার ফল প্রায় ছ’বছর পরে লতাকে নতুন পথের বাঁকে এনে দাঁড় করিয়ে দিল। সেখানে আবার আরেকজন তাঁর হাত ধরে তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবেন।

চলার পথে একদিন দেখা হয়ে যায় পুনার সেই প্রতিযোগিতার মুখ্য বিচারক— খ্যাতনামা সুরকার গুলাম হায়দারের সঙ্গে। তিনি মনে রেখেছিলেন সেই ছোট্ট প্রতিযোগীকে। সব শুনে তিনি এক এক করে তাঁকে বম্বে ফিল্ম জগতের বিভিন্ন মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিলেন। যদিও, সুফল কিছুতেই পাওয়া যায়নি। কিন্তু ঝিনুকের বুকেই যে মুক্তো জন্মায়, সেই মুক্তোকে চিনতে ভুল করেননি জহুরি সুরকার হায়দারজি। অবহেলার অন্ধকার ফুঁড়ে তিনিই আলো জ্বালালেন।

যে সুর আত্মাকে ছুঁয়ে যায়, তাকে কি কোনও কাল্পনিক নামে আটকে রাখা যায়? রেডিও স্টেশনে জমা হওয়া হাজার হাজার ব্যাকুল চিঠির বন্যায় অবশেষে ভাঙল সেই রহস্যের অর্গল।

১৯৪৮-এ ‘মজবুর’ ছবিতে সুরকার গুলাম হায়দার লতাকে দিয়ে গাওয়ালেন ‘দিল মেরা তোড়া…’। সে যেন ছিল তাঁর ভেতরের যাবতীয় কান্নার এক শৈল্পিক বিস্ফোরণ। সেই প্রথম সুরের আকাশে এক নতুন ভোরের আভাস পেল গোটা দেশ। সেই একই বছর গাইলেন আরেকটি ছবি ‘অনোখা পেয়ার’-এ অনিল বিশ্বাসের সুরে এবং তারপরেই খেমচাঁদ প্রকাশের সুরে গান করলেন ‘জিদ্দি’ ছবিতে। এই সেই ছবি, যেখানে তাঁর প্রথমবার কিশোরকুমারের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং একসঙ্গে গান করা। কিশোরের ছিল এটি প্রথম ছবি।

আর ঠিক এর পরের বছরগুলোয় ঘটল অলৌকিক সুর-বিপ্লব। মেহবুব খানের ‘আন্দাজ’, রাজ কাপুরের ‘বরসাত’, আর তারপরেই— কমল আমরোহীর ‘মহল’ আর সেই ছবির বিখ্যাত সেই গান ‘আয়েগা, আয়েগা, আয়েগা আনেওয়ালা’। সুরকার সেই খেমচাঁদ প্রকাশ।

রেডিওর তরঙ্গ বেয়ে যখন ভেসে এল ‘আয়েগা আনেওয়ালা…’, গোটা ভারতবর্ষের শ্বাস যেন কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিল। কে এই শিল্পী? রেডিয়োতে তো তার নাম ঘোষণা হল না? কী করেই বা হবে— ঘোষক তো নিজেই জানেন না। রেকর্ডের লেবেলে শিল্পীর কোনও নাম ছিল না, ছিল কেবল সিনেমার চরিত্রের নাম। কারণ গানের শিল্পী তো আর নিজে ছবিতে অভিনয় করেননি। তাই লেবেলে তার নামের চেয়ে চরিত্রের নামটা জরুরি ছিল। লতা তো অখ্যাত শিল্পী— তিনি তো নুরজাহান, শমসাদ বেগম, সুরইয়া কিম্বা কানন দেবীর মতো শিল্পী ছিলেন না তখনও।

তবে তাঁর এই গান আলোড়ন তুলেছিল। যে সুর আত্মাকে ছুঁয়ে যায়, তাকে কি কোনও কাল্পনিক নামে আটকে রাখা যায়? রেডিও স্টেশনে জমা হওয়া হাজার হাজার ব্যাকুল চিঠির বন্যায় অবশেষে ভাঙল সেই রহস্যের অর্গল। রেকর্ড কম্পানি জানাল, সেই শিল্পীর নাম ঘোষণা করল আকাশবাণী— লতা মঙ্গেশকর।

যে কণ্ঠকে একদিন ‘ফিল্মের অযোগ্য’ বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই কণ্ঠই হয়ে উঠল ভারতীয় সুরের একক হিমালয়। বাবার পুজোর ঘরের একলা অন্ধকারে বসে যে কিশোরী একদিন পথের দিশা খুঁজছিল, সে পথ যে তৈরি হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই— শোলাপুরের সেই গ্রিনরুমে, তাঁর বাবার আশীর্বাদে। লতা আর কেবল একটি নাম রইলেন না, হয়ে উঠলেন গোটা দেশের আনন্দ-বেদনার এক অমর, চিরন্তন সুরের প্রতিমা।

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Please login to bookmark Close
Picture of সুতীর্থ দাশ

সুতীর্থ দাশ

সুতীর্থ দাশ: জন্ম হরিয়ানার শিল্পনগরী ফরিদাবাদে। পিতার কর্মসূত্রে বাল্য-কৈশোর কেটেছে উত্তর-পশ্চিম ভারতের একাধিক শহরে। কলকাতায় এসে সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে শিল্পশিক্ষার পাঠ নেওয়ার পর বিজ্ঞাপন সংস্থায় চাকরি। পরবর্তীতে পেশা বদল করে আসেন বেসরকারি রেডিও প্রোগ্রামিং-এর চাকরিতে। বর্তমানে ভারতের স্বনামধন্য এক মিউজিক কম্পানির সঙ্গে কর্মসূত্রে যুক্ত। অজস্র প্রবন্ধ-নিবন্ধের পাশাপাশি, ইতিমধ্যেই তিনি লিখে ফেলেছেন বেশ কয়েকটি বইও। সেগুলোর মধ্যে শহর কলকাতার বিভিন্ন আখ্যান নিয়ে লেখা 'তিলোত্তমার গর্ভজাত' পাঠকদের মধ্যে বেশ সাড়াও জাগিয়েছে। রেডিয়ো নিয়ে তাঁর দুটি বই 'তরঙ্গে অন্তরঙ্গে - কলকাতা বেতারের উপকথা' এবং 'আধুনিক রেডিয়োর সেকাল একাল ইতিমধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। ২০২৫-এর বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তপন সিংহ-কে নিয়ে তাঁর উপন্যাস 'কাবুলিওয়ালার বার্লিনযাত্রা'।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

The Banglalive's Picks

Weekly Newsletter

Enjoy our flagship newsletter as a digest delivered once a week.

By signing up, you agree to our User Agreement and Privacy Policy & Cookie Statement.

Please login to bookmark Close
'রাজকুমার'-এর মধ্যে উত্তমের বাংলা ছবিকে একা টেনে নিয়ে যেতে হিন্দি ছবির আকাঙ্ক্ষায় পর্যদুস্ত হওয়া যেমন আছে, তেমনই আবার রয়েছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের তৎকালীন আন্দোলনে অংশগ্রহণের ঘটনা। ভাবতে অবাক লাগে, সেই সময় বসে সৌমিত্র এই নাটক লিখলেন কীভাবে। লিখছেন অমিতাভ নাগ...
Please login to bookmark Close
ঝিঁ ঝিঁ ডাকা সন্ধেয় কাকা সবল সিং চৌহান, ছত্তিশগড়ি হিন্দিতে সুর করে পড়ে চলেছেন মহাভারতের আখ্যান। সেই সুরেই মন মজেছে কিশোরী তীজনের। শুনে শুনেই কাহিনিগুলি মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল তাঁর। বাবা চুনুকলাল পাদ্রী এবং মা সুখবতীর প্রথম সন্তান তীজনের চোখে তখন স্বপ্ন, বড় হয়ে গায়ক হবে। লিখছেন গোপী দে সরকার...
Please login to bookmark Close
ওপেনিং সিনের সেই ঝাড়ু হাতের নাচ আর ‘চিচিং ফাঁক’, কেমন যেন রুপোলি রং নিয়ে এখনও চকচকে। ছবিটা ছিল পরিচালক দীনেন গুপ্তর ‘মর্জিনা আবদাল্লা’, সলিল চৌধুরীর সংগীত পরিচালনা। রাধা সিনেমা হলটা আজ আর নেই, আমাদের ছোটবেলার অজস্র সিঙ্গল স্ক্রিন থিয়েটারের মতোই হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। মাথার উপরের মানুষগুলোও আজ আর কেউ নেই। লিখছেন মৌসুমী দত্ত রায়...

Subscribe

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com