(Banedi Bari Durga Puja)
সাধারণত বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাড়ির মহিলাদের ব্যস্ততা— নৈবেদ্য সাজানো, ভোগ রান্না, পুজোর নানা আয়োজন। কিন্তু দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের কাছে কল্যাণপুরে বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির ছবিটা একেবারেই আলাদা। এখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দুর্গাপুজোর অধিকাংশ দায়িত্ব সামলান পরিবারের পুরুষ সদস্যরা। ফল কাটা থেকে শুরু করে নৈবেদ্য সাজানো— দুর্গাপুজোর প্রায় প্রতিটি পর্বেই তাঁদের সক্রিয় উপস্থিতি। এমনকি দেবীর নৈবেদ্য রান্নার অনুমতি পান কেবল সেই মহিলারা, যাঁরা তাঁদের গুরুর কাছ থেকে ধর্মীয় দীক্ষা নিয়েছেন।
আরও পড়ুন: শ্রীরামপুর গোস্বামী পরিবার: ইতিহাসের অন্দরমহলে তিন শতাব্দীর দুর্গাপুজো
এই ব্যতিক্রমী ঐতিহ্যের সূচনা জমিদার সহস্ররাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে। পরিবারের দাবি, তিনি পশ্চিম মেদিনীপুরের মহিষাদল থেকে কল্যাণপুরে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তাঁর হাতেই নির্মিত হয় বাড়ির পাঁচ খিলানবিশিষ্ট দুর্গাদালান। তার পাশেই রয়েছে নারায়ণ ও লক্ষ্মীর মন্দির। দুর্গাদালানের গায়ে থাকা একটি ফলক জানাচ্ছে, ১১৫৭ বঙ্গাব্দ অর্থাৎ ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দে এই দালানে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়েছিল। সেই হিসেবে এই বাড়ির দুর্গাপুজো আজ দুই শতকেরও বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে আসছে।

বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয় ‘কালিকাপুরাণ’ অনুসারে। পরিবারের সদস্য ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, মহিষাসুরবধের কাহিনি সম্বলিত ‘চণ্ডী’ পাঠ শুরু হয় প্রতিপদ তিথিতে এবং চলে নবমী পর্যন্ত। টানা নয় দিন ধরে চলে এই পাঠ। প্রতিপদেই স্থাপন করা হয় ঘট। দুর্গাপুজোর প্রস্তুতিও শুরু হয় তখন থেকেই। বকখালির কাছে নবগ্রাম থেকে আসা একদল মানুষ দুর্গাদালান ও তার সংলগ্ন এলাকা পরিষ্কার করে পুজোর উপযোগী করে তোলেন।
প্রতিপদ থেকে লক্ষ্মীপুজো পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের খাদ্যাভ্যাসেও থাকে কঠোর বিধিনিষেধ। এই সময় মাংস, ডিম, পেঁয়াজ ও রসুন সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা হয়। আমিষ খাবারের মধ্যে কেবল মাছ খাওয়া যায়। তবে দেবীর উদ্দেশ্যে বলি দেওয়া পশুর মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে আলাদা নিয়ম। সেই মাংস পেঁয়াজ-রসুন ছাড়াই রান্না করা হয়।

ষষ্ঠীর দিন বাড়ির বাইরে একটি বেলগাছের নিচে শুরু হয় দেবীর ‘বোধন’। নির্দিষ্ট স্থানটি বাঁশের চটা দিয়ে বোনা মাদুর বা ‘দরমা’ দিয়ে ঘিরে রাখা হয়। সপ্তমীতে নবপত্রিকার সমস্ত আচার সম্পন্ন হয় বাড়ির অন্দরে, দুর্গাদালানে।
প্রতিটি মহাস্নানের পর দেবীকে নতুন করে সাজানো হয় নানা ফুলের মালায়। জবা, শিউলি, পদ্ম ও অপরাজিতার পাশাপাশি থাকে আমলকি গাছের পাতা দিয়ে তৈরি একটি বিশেষ মালাও।
পুজোর সময় দেবী দুর্গার পাশে পারিবারিক দেবতা নারায়ণ ও লক্ষ্মীরও স্থান হয়। তবে পশুবলির সময় তাঁদের সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়িতে মোট চারবার ছাগবলি দেওয়া হয়— সপ্তমী, অষ্টমী, সন্ধিপুজো এবং নবমীতে। নবমীর বলির সঙ্গে শস্যও উৎসর্গ করা হয়।
এই বাড়ির দুর্গাপুজোর অন্যতম আকর্ষণ ‘মহাস্নান’। অষ্টমী, সন্ধিপুজো ও নবমীর দিন এই বিশেষ আচার পালিত হয়। দেবীর পায়ের কাছে রাখা হয় একটি রুপোর আয়না। একুশটি ছোট রুপোর পাত্রে সাজানো বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে আয়নায় প্রতিফলিত দেবীর প্রতিবিম্বকে স্নান করানো হয়।

পরিবারের সদস্য অভীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, মহাস্নানের উপকরণের তালিকাও বেশ দীর্ঘ। থাকে গঙ্গার ঈষদুষ্ণ ও সাধারণ জল, দুধ, দই, মধু, চিনি, দইয়ের নির্যাস, বিভিন্ন ধরনের ফুল, অগুরু সুগন্ধি এবং ‘সর্বৌষধি-মহৌষধি’ নামে একটি বিশেষ নির্যাস। বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদের চূর্ণ মিশিয়ে তৈরি হয় এই নির্যাস।
প্রতিটি মহাস্নানের পর দেবীকে নতুন করে সাজানো হয় নানা ফুলের মালায়। জবা, শিউলি, পদ্ম ও অপরাজিতার পাশাপাশি থাকে আমলকি গাছের পাতা দিয়ে তৈরি একটি বিশেষ মালাও।
কল্যাণপুরের বাসিন্দাদের কাছে বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির সন্ধিপুজোর সময় জানান দেওয়ার জন্য কোনও মাইক বা ঘণ্টাধ্বনির প্রয়োজন হয় না। একটি বন্দুকের গুলির শব্দই যথেষ্ট।
সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত মূল পুজো ও পশুবলির আচার শেষ হওয়ার পর যোগিনী, অপদেবতা এবং উপদেবতাদের সন্তুষ্টির জন্য ‘মাষভক্ত বলি’ দেওয়া হয়। এই আচারেও রয়েছে এই বাড়ির নির্দিষ্ট পদ্ধতি। একটি ‘ধুচুনি’— অর্থাৎ চাল ধোয়ার জন্য ব্যবহৃত বাঁশের চটা দিয়ে তৈরি ছিদ্রযুক্ত পাত্রে— আতপ চাল, ঘি, মধু এবং মাষকলাইয়ের ডাল মেশানো হয়। মাষকলাই এখানে আমিষ হিসেবে গণ্য হয়।

এরপর দেবীর সামনে রাখা কলাপাতার উপর সেই মিশ্রণ তিন ভাগে সাজানো হয়— ১০৮টি, ১০টি এবং ১টি অংশে। ১০৮টি ছোট অংশ নিবেদন করা হয় ডাকিনী-যোগিনীর মতো নারীশক্তির উদ্দেশ্যে। পরের ১০টি অপেক্ষাকৃত বড় অংশ উৎসর্গ করা হয় হিন্দুধর্মের লোকপাল— যেমন কুবের, যম, ইন্দ্র ও বরুণ— এবং বিভিন্ন গ্রহনক্ষত্রের উদ্দেশ্যে। সবচেয়ে বড় অংশটি নিবেদন করা হয় স্বয়ং দেবী দুর্গাকে। প্রতিটি অংশই হাতে চটকে বা মেখে তৈরি করা হয়।
কল্যাণপুরের বাসিন্দাদের কাছে বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির সন্ধিপুজোর সময় জানান দেওয়ার জন্য কোনও মাইক বা ঘণ্টাধ্বনির প্রয়োজন হয় না। একটি বন্দুকের গুলির শব্দই যথেষ্ট। সেই শব্দ শুনেই এলাকার মানুষ বুঝতে পারেন, শুরু হয়েছে সন্ধিপুজো। দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই প্রথা আজও পুজোর অন্যতম পরিচিত রীতি।

বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গাপুজোর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তার ভোগের আয়োজন। পরিবারের সদস্য শ্রাবণী বন্দ্যোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর সকালে দেবীকে দেওয়া হয় গোবিন্দভোগ চাল ও মুগ ডালের খিচুড়ি। সঙ্গে থাকে নারকেল, আলু, বেগুন, কুমড়ো বা পটলের মতো বিভিন্ন শাকসবজি ভাজা এবং মাছ ভাজা।
বিকেলে তিন দিনই দেবীকে দেওয়া হয় লবণবিহীন লুচি ও সাদা নারকেলের নাড়ু। অন্যান্য নৈবেদ্যের সঙ্গেও থাকে লাল নারকেলের নাড়ু।
তবে এখানে একটি বিশেষ নিয়ম রয়েছে। ঠাকুরদালানে দেবী দুর্গার পাশেই যেহেতু পারিবারিক দেবতা নারায়ণ বিরাজ করেন, তাই মাছ ভাজা ও মাছের অন্যান্য পদ কিছুটা দূরে রাখা হয়।

সপ্তমীর দুপুরের ভোগে থাকে আতপ চাল, অড়হর ডাল, পাঁচ রকম ভাজা, পটল-আলু ও ছোলার ডালের তরকারি, মাছের ঝোল এবং বলিপ্রদত্ত পশুর মাংসের ঝোল; সঙ্গে থাকে স্থানীয় জলপাইয়ের চাটনি। মিষ্টির তালিকায় থাকে চাল, দুধ ও চিনি দিয়ে তৈরি পায়েস, যার মধ্যে ভেজানো থাকে পুলি পিঠে; থাকে মুগ ডালের পুর দেওয়া ভাজা পুলি পিঠে এবং মিষ্টি দই।
অষ্টমীর ভোগ প্রায় একই রকম। শুধু তরকারিতে বদল আসে— আলু ও ফুলকপি দিয়ে তৈরি হয় পদটি। টমেটোর চাটনির জায়গা নেয় আমসত্ত্বের চাটনি। নবমীর মেনুতেও থাকে একই আয়োজন, তবে যোগ হয় মুগ ডাল এবং এঁচোড়ের তরকারি।

দশমীর ভোগ অপেক্ষাকৃত সরল— পান্তা ভাত, কচুর শাক ও জলপাইয়ের চাটনি।
বিকেলে তিন দিনই দেবীকে দেওয়া হয় লবণবিহীন লুচি ও সাদা নারকেলের নাড়ু। অন্যান্য নৈবেদ্যের সঙ্গেও থাকে লাল নারকেলের নাড়ু।
পরিবারের সদস্যরা পুষ্পাঞ্জলির মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে দেবীর চারপাশে প্রদক্ষিণ করেন। এরপর আসে বহুপ্রতীক্ষিত সিঁদুর খেলা। বারুইপুরের এই বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের সিঁদুর খেলার রীতি স্থানীয় মানুষের কাছেও বেশ জনপ্রিয়।
শ্রাবণী বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, কোনওদিন নির্দিষ্ট সময়ে বলিপ্রদত্ত পশুর মাংস রান্না করার মতো পর্যাপ্ত সময় না থাকলে একটি বিশেষ নিয়ম মানা হয়। বলি বা উৎসর্গের পরেই নারকেলের নাড়ু ও কলার সঙ্গে কাঁচা মাংস দেবীকে নিবেদন করা হয়।
দশমীতে বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির পুজোয় পালিত হয় ‘বরণাঞ্জলি’। পরিবারের সদস্যরা পুষ্পাঞ্জলির মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে দেবীর চারপাশে প্রদক্ষিণ করেন। এরপর আসে বহুপ্রতীক্ষিত সিঁদুর খেলা। বারুইপুরের এই বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের সিঁদুর খেলার রীতি স্থানীয় মানুষের কাছেও বেশ জনপ্রিয়।

বিকেলে বাড়ির মহিলারা বরণ পর্ব সম্পন্ন করার পর পুরুষ সদস্যরা কাঁধে তুলে নেন দেবীপ্রতিমা। শুরু হয় বিসর্জনের যাত্রা। নিকটবর্তী আদি গঙ্গার দিকে এগিয়ে যায় শোভাযাত্রা— আর সেই সঙ্গে দুই শতকেরও বেশি পুরনো এক পারিবারিক ঐতিহ্যের আরও একটি দুর্গোৎসব শেষ হয়।
তবে প্রতিমা জলে মিশে গেলেও শেষ হয় না এই পুজোর গল্প। পরের বছরের প্রতিপদে আবার ঘট স্থাপনের মধ্য দিয়ে ফিরে আসে সেই চেনা ছন্দ— চণ্ডীপাঠ, বোধন, বলি, মহাস্নান, ভোগ আর পারিবারিক আচার। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কল্যাণপুরের বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়িতে এভাবেই ইতিহাস শুধু সংরক্ষিত হয় না, জীবন্তও থাকে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্য়মে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
