(Sound Museum)
প্রথম পর্ব
ব্যাগ, ক্যাফে, আর কার্টুনিস্ট
প্রতিটি ভাল সংগ্রহশালা দর্শন শুরু হয় একটা ছোট্ট অস্তিত্ব সংকট দিয়ে, আর আমারটা শুরু হয়েছিল দরজাতেই, একটা ব্যাগ নিয়ে।
খুব বড় ব্যাগ নয়। সন্দেহজনক কিছু নয়। নেহাতই মামুলি একটা ব্যাগ, তাতে যা যা সাধারণত থাকে তা-ই ছিল। অথচ এমন একটা দার্শনিক সমস্যা তৈরি করল, যা জাতীয় গ্রন্থাগারের সদ্যোজাত শব্দ সংগ্রহশালা এখনও সমাধান করে উঠতে পারেনি। জমা রাখব? সঙ্গে নিয়ে যাব? কোথাও কি একটা কাউন্টার আছে, একটা টোকেন, এমন কেউ যাঁর একমাত্র কাজ আমার হাতে একটা নম্বর লেখা রসিদ ধরিয়ে দিয়ে ব্যাগটা সযত্নে গচ্ছিত রাখা, যেমনটা সভ্য পৃথিবীর প্রায় সব ছোট বড় সংগ্রহশালাতেই হয়? সে ব্যবস্থা ছিল না।
আরও পড়ুন: স্মৃতির সিন্দুকে ‘চিচিং ফাঁক’
ছিল একটা অস্পষ্ট, সম্মিলিত কাঁধ-ঝাঁকুনি, ‘এটাই নিয়ম’ গোছের প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা, আর শেষে একজন নিরাপত্তারক্ষী, যাঁর করুণাময় অথচ সম্পূর্ণ দায়হীন হাতে আমি তুলে দিলাম আমার মূল্যবান জিনিসপত্র আর আমার পরিচয়বহনকারী একটা ব্যাগ। কোনও রসিদ নেই। কোনও টোকেন নেই। প্রমাণ নেই যে আমার কাছে কখনও একটা ব্যাগ ছিল। অসতর্কভাবে অন্য কোনও দর্শকের কাছে সেই ব্যাগটা চলে গেলেও কিছু করার নেই।
ব্যাগটা দরজায় এক মহিলার কাছে রেখে আশা করলাম সব ঠিক থাকবে। যেমনটা মানুষ আশা করে, যখন আশাই একমাত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে হাজির থাকে। ব্যাগের বদলে আমি উদ্বেগ নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। তার জন্য কোনও টোকেন লাগেনি; সেটা বিনামূল্যেই আমার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরল, পুরো সংগ্রহশালা জুড়ে পৃথিবীর সবচেয়ে অকেজো অডিও গাইডের মতো।

এটা নেহাতই ভূমিকা।
ক্যাফেটা খোলা ছিল না। আমি বলছি না সেদিন বন্ধ ছিল। বলছি, সংগ্রহশালার পাশের ঘরেই অবস্থিত, বিশাল অলিন্দের মাঝামাঝি অবস্থায় স্পষ্টতই ‘ক্যাফে’ বলে চিহ্নিত করা রয়েছে, সেখানে ক্যাফের আসবাবপত্র আছে, হয়তো সদ্য বসানো ক্যাফের নতুন যন্ত্রপাতির গন্ধও আছে, অথচ সেখানে কাউকে, কখনও, কিছুই পরিবেশন করা হয়নি। স্মারক দোকানেরও একই দশা, সম্পূর্ণরূপে তৈরি, সম্পূর্ণরূপে শূন্য, যেন এমন একটা নাটকের জন্য অপেক্ষারত মঞ্চ, যেটা রিহার্সালের মাঝপথেই বাতিল হয়ে গেছে।
এরপর বিশাল টিকিটঘর। বিশাল মানে বিশালই, সেই ইংরেজ মহোদয়দের তৈরি আমাদের জাতীয় গ্রন্থাগার কক্ষ। সেখান থেকে বাহারি টিকিট কাটা পর্ব সারতে হল। কলকাতার মানদণ্ডে বেশ চড়া দাম, জন পিছু পঁচাত্তর টাকা, এমন একটা সংগ্রহশালার জন্য যেখানে ব্যাগ কোথায় রাখতে হয়, সেটাই এখনও ঠিক হয়নি।
টিকিটের দাম পুরোটা দিতে হল যদিও অর্ধেকের বেশি সুযোগ সুবিধা, যা সেই মাশুলে পাওয়া উচিত, তা এখনও চালু হয়নি।

অথচ নেহরু চিলড্রেনস মিউজিয়াম, একটা পূর্ণাঙ্গ, সচল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সেখানে, টিকিটের দাম নেয় কুড়ি টাকা। আর শব্দ সংগ্রহশালা, যে এখনও নিজের ক্যাফে, দোকান, আর ব্যাগ-নীতি জোড়া লাগাচ্ছে, তার চেয়ে প্রায় চারগুণ বেশি টাকা নিল, যা কি না গড়ে উঠেছে নাগরিকদের করের পয়সায়।
এখানে উল্লেখ করি যে, আজ থেকে ৩২৬ বছর আগে, ১৭০০ সালে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের নাতি যুবরাজ আজিম খান আসল বাগানবাড়িটি তৈরি করিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে, নবাব মীর জাফর সম্পত্তিটির দখল নেন এবং এস্টেটে বেশ কয়েকটি প্রাসাদোপম ভবন নির্মাণ করান এবং পরে তিনি বেলভেডিয়ার হাউসটি ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসকে উপহার দেন। ভারতের স্বাধীনতার পর, ১৯৪৮ সাল থেকে এই ঐতিহাসিক অট্টালিকাটি ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগারের আবাসস্থলে পরিণত হয়। সেই স্থাপত্য আজও বাইরে থেকে সত্যি সেরকমই নয়নাভিরাম।
শুরুতে এসব কিছুই যে কোনও মানুষের আগ্রহ নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। সংগ্রহশালা ঘুরে দেখার মেজাজটাই নষ্ট করে দেয়। তবুও।
বহু প্রত্যাশার এই প্রদর্শনী শুরু থেকেই ভুলে ভর্তি। ভুলগুলো বেশ বড়সড়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে, চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো ভুল ছড়িয়ে রয়েছে পরতে পরতে। বানান ভুল, তথ্যে ভুল, লেবেলে ভুল, এমনকি ভাষার ব্যবহারেও ভুল। কিছু ভুল যা দেখে বারবার মনে হচ্ছিল, কে কিউরেটর, কার দায়িত্ব ছিল এরকম একটা সংগ্রহশালা তৈরি করানোয়?
এত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও লেখা কেউ প্রুফরিড করেছিল কি? খারাপ লাগার সাথে সাথে মনখারাপ হচ্ছিল সাংঘাতিকভাবে। হাত নিশপিশ করছিল, কিছু কিছু ভুল শুধরে দেওয়ার জন্য। এসি নেই। জুলাই মাসের উনিশে যে মিউজিয়াম-এর উদ্ঘাটন হয়েছে, সেখানে বেশ কিছু বেলোয়ারি ঝাড়বাতিরা এর মধ্যেই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। আলো নিভু নিভু।
আর তারপরও মিলে যায় পরে পাওয়া দু-আনা।

এক কোণে, কাচের বাক্সে বন্দি, কয়েক দশকের ধকল সয়ে খানিকটা মলিন হয়ে বসেছিল ছোট্ট বিস্ময়: কাপড়-বাঁধাই একটা বই, নাম Ahmed’s Political Purri, এনভার আহমদের আঁকা কার্টুন আর স্ট্রিপের সংকলন, যিনি একসময় হিন্দুস্তান টাইমস-এর প্রধান রাজনৈতিক কার্টুনিস্ট ছিলেন। এমন একজন মানুষ, যাঁর দেশভাগ-পরবর্তী কার্টুন এতটাই তীক্ষ্ণ ছিল যে তাঁর কপালে জুটেছিল মৃত্যু-হুমকি, আর গান্ধীজির ব্যক্তিগত পরামর্শ ছিল কিছুদিনের জন্য দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার। কয়েক দশক পরে, তিনি চুপচাপ বসে আছেন এমনই একটা শব্দের সংগ্রহশালায়, উৎসাহী মন যাঁকে খুঁজে পেয়ে আনন্দে বলে ওঠে, ‘তবুও তো বাকি কিছু আছে এখনও!’
গোটা দুপুরটার জন্য এটাই, আমার মনে হয়, নিখুঁত রূপক। একটা সংগ্রহশালা তার আনাড়ি কৈশোরে, ক্যাফে বন্ধ, দোকান জনশূন্য, টিকিটের দামে প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য সম্মানের চেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাস, আর তারই ভেতরে, প্রায় দুর্ঘটনাক্রমে, এমন কিছু, যা সত্যিই দেখার মতো। শুধু নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে। কেউ আপনার হাতে মানচিত্র ধরিয়ে দেবে না। তারা এখনও দর্শককুলের ব্যাগ রাখার মানচিত্রটা খুঁজছে।
দ্বিতীয় পর্ব
যেখানে সংগ্রহশালা নিজের কাহিনিই হারিয়ে ফেলে
প্রথম অঙ্ক যদি প্রহসন হয়, দ্বিতীয় অঙ্ক সেই জায়গা, যেখানে প্রহসনটা আর মজার থাকে না— শুরু হয় করদাতার আসল টাকা খরচের গল্প।
চলুন, একটু নরমভাবেই, আপনাকে নিয়ে যাই সেই দেওয়ালটার কাছে, যেটার সঙ্গে প্রথম দেখা হয়— যে দেওয়াল ভারতীয় ভাষার সংগ্রহশালায় আপনাকে স্বাগত জানায় একটা বাংলা শব্দ ভুল লিখে। কোনও দুর্লভ শব্দ নয়। কোনও কঠিন শব্দ নয়। অনস্তিত্ব— যার অর্থ ‘না-থাকা’— ভুল বানানে, একদম প্রথম প্যানেলে।

দেওয়ালে যা লেখা আছে নিচে তা হুবহু তুলে দিলাম,
‘অনস্তিতের অস্তিত্ব ছিল না, অস্তিত্বের অস্তিত্ব ছিল না; তখন না ছিল পৃথিবী, না ছিল আকাশ, ছিল না আকাশের উপরে যা আছে তাও।
তাহলে সবকিছুর আধার ছিল কী, এবং কোথায়? তাহলে আনন্দ (হতে পারে) কী কারণে? কীভাবে (হতে পারে) গভীর অতল জল?’ ঋগ্বেদ
এই প্যানেলের বিষয় অনন্তত্ব। অস্তিত্ব না থাকার এই প্রত্যয়কে ঘোষণা করছে ব্যাকরণগতভাবে ‘না’ থেকে সরাসরি। বাকি অংশটা পড়ে মনে হল যেন কোনও অনুবাদ-যন্ত্র দিয়ে চালিয়ে এখানে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর তারপর একজন মানুষও— যিনি এই ভাষা জানেন— সেটার কোনও মুদ্রণ সংশোধন দেখেননি। বাংলাকে সম্মান জানানোর জন্য তৈরি একটা সংগ্রহশালার কাছে এটা কোনও সামান্য খুঁত নয়। এটা গোটা ভাবনার ঠিক বিপরীত।
তারপর আছেন কৃত্তিবাস ওঝা— পঞ্চদশ শতকের সেই কবি, যিনি বাংলাকে দিয়েছিলেন তাঁর রামায়ণ— দেওয়ালে যাঁকে দেখানো হয়েছে একটা ঝকঝকে স্টুডিও ফটোগ্রাফে: চশমা, কলারওয়ালা কুর্তা, এমন একজনের শান্ত হাসি যাকে সবে বলা হয়েছে তাঁর ছবি ভাল উঠেছে।
একটা ছোট্ট সমস্যা আছে— ফটোগ্রাফির আবিষ্কার হতে তখনও ৪০০ বছর বাকি, তাই কৃত্তিবাস ওঝা যদি একটা ভাষান্তরিত মহাকাব্যের চেয়েও অনেক বেশি অলৌকিক কিছু না করে থাকেন, তাহলে ছবির সেই মানুষটা তিনি নন।
একটা ছোট্ট সমস্যা আছে— ফটোগ্রাফির আবিষ্কার হতে তখনও ৪০০ বছর বাকি, তাই কৃত্তিবাস ওঝা যদি একটা ভাষান্তরিত মহাকাব্যের চেয়েও অনেক বেশি অলৌকিক কিছু না করে থাকেন, তাহলে ছবির সেই মানুষটা তিনি নন।
তিনি আসলে দীপ্তেন্দু প্রামাণিক— ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, জন্ম ১৯১০ সালে, বিংশ শতাব্দীর পুরোদস্তুর এক চলচ্চিত্র প্রশাসক, যাঁকে কারও অনুমোদন ছাড়াই, নিছক কারও অমনোযোগের সৌজন্যে, চুপচাপ পুনর্জন্ম দেওয়া হয়েছে এক মধ্যযুগীয় কবি হিসেবে।
জানতে ইচ্ছে করে, এটা কীভাবে ঘটে, বহু ব্যয় করে তৈরি এরকম আন্তর্জাতিক একটি সংগ্রহশালায়? আরও বেশি জানতে ইচ্ছে করে, এই সংগ্রহশালা দর্শক সম্মুখের দরজা খুলে দেবার সেই শেষ অনুমোদনপত্র কে সই করলেন— কারণ কেউ না কেউ তো দায়িত্বভার পালন করেছেন!
আর তারপর, প্রায় ‘স্নেহের’ সঙ্গেই, সংগ্রহশালা নিজের অধ্যয়নের বিষয়টাকেই অপমান করার একটা উপায় খুঁজে বের করে। ভারতের গ্রন্থাগার আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে যে গ্যালারি— যা সম্ভবত তৈরিই হয়েছে যাঁরা এটা গড়েছেন, তাঁদের সম্মান জানাতে— সেখানে অধ্যাপক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, ন্যাশনাল পলিসি অন লাইব্রেরি অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমের সভাপতি, যাঁকে পাশের ইংরেজি লেখায় তাঁরই আদ্যক্ষর ‘D.P.’ দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁকে বাংলায় লেখা হয়েছে ‘দীপী’। দেবীপ্রসাদ নয়। দেবীপ্রসাদের বিকৃত রূপও নয়। একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন শব্দ, ভুল শব্দ। এমন একটা দেওয়ালে, যা বোধহয় তৈরিই হয়েছিল বিশেষভাবে তাঁকে স্মরণ করার জন্য।

এসবের চারপাশে, সংগ্রহশালা নিজের রূপকটাই বারবার প্রদর্শন করে চলেছে। মূল হলের ঝাড়বাতিগুলো— যা বসানো হয়েছিল নিশ্চয়ই বেশ আড়ম্বরপূর্ণ খরচে, এমন একটা ছাদের নিচে যা গাম্ভীর্য বোঝানোর কথা— কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফিতে কাটার এক মাসের একটু বেশি সময়ের মধ্যেই বিকল হয়ে গেছে।
যে রং জানালার, সে রং ফ্রেমে ছিটকে পড়ে, যেমনটা এই শহরের অর্ধেক বাড়িতেই হয়। কিন্তু এটা তো যে সে বাড়ি নয়! বেলভেডিয়ার হাউসে (Belvedere House) অবস্থিত। আর সেটি আবার কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগার (National Library) ক্যাম্পাসের ভেতরেই, বা প্রাক্তন জাতীয় গ্রন্থাগার ভবন। বলুন তো, এতটুকু যত্ন নিয়ে সে কাজ সম্পন্ন হবে না? বারবার মনে এটাই ধাক্কা দিয়ে কষ্ট দিচ্ছিল আমাদের মতো মানুষদের।
ডিজিটাল নির্দেশ লেখা হয়েছে এমন একটা ভাষায় যা আসলে কারও নয়— কোনও স্পষ্ট যুক্তি ছাড়া লিপির এক জগাখিচুড়ি— আর মানচিত্র, যদি চান, তা এখনও কল্পনাতেই রয়ে গেছে।
উদাহরণস্বরূপ নিচের লেখাটা পড়ুন:
যদি আপনি অন্যকিছু ব্যাপারে ভাবতে না পারেন, শব্দের পরে যুক্ত প্রত্যয় এবং শব্দের পূর্বে যুক্ত উপসর্গগুলো ব্যবহার করে একটা নতুন শব্দ তৈরি করুন না কেন? বাংলাতে যেমন লোক-গুলি (বহু মানুষ)। আপনি নিজে এটা চেষ্টা করুন।
এসব দেখার পর আমি করার চেষ্টা করলাম দায়িত্বশীল কাজটা: কাউকে জানানো। অধিকর্তা অজিত পাল সিং-কে খুঁজলাম। পেলাম না। প্রধান গ্রন্থাগারিকের তালিকাভুক্ত নম্বরে চেষ্টা করলাম। পেলাম না।
এই প্রতিষ্ঠানের ইন্টারনেটে তালিকাভুক্ত প্রতিটা হেল্পলাইনে একের পর এক চেষ্টা করলাম। সেই বোকা বিশ্বাস নিয়ে যে একটা সরকারি নম্বর একজন সরকারি কর্মচারীর কাছে পৌঁছাবে। একটাও কাজ করল না।
ইন্টারনেট খুঁজে ফোন নম্বর জোগাড় করলাম, সেগুলো একটাও সচল না। এত বড় একটা সংগ্রহশালা তৈরি হয়েছে। দেশি, বিদেশি মানুষেরা সেখানে আসছে, আসবে, আর সেখানে যোগাযোগ করার কোনও ফোন নম্বর সচল নয়। পাড়ার মুদি দোকান, বা বাজারের মাছওয়ালাকেও এখন ইচ্ছে করলে যোগাযোগ করা যায়, সেখানে মিউজিয়াম উদ্ঘাটনের দেড় মাস বাদেও প্রকাশিত সব ফোন নম্বর এখনও অচল।
এই প্রতিষ্ঠানের ইন্টারনেটে তালিকাভুক্ত প্রতিটা হেল্পলাইনে একের পর এক চেষ্টা করলাম। সেই বোকা বিশ্বাস নিয়ে যে একটা সরকারি নম্বর একজন সরকারি কর্মচারীর কাছে পৌঁছাবে। একটাও কাজ করল না। এটা নিজের মতো করে সত্যিই একটা প্রশংসনীয় কীর্তি— শব্দের শক্তি নিয়ে একটা গোটা সংগ্রহশালা গড়া, আর সেখানে এমনভাবে কর্মী রাখা, যাতে ভেতরে থাকা কারও কাছেই একটা শব্দও যেন না পৌঁছায়।
আমি একজন শিক্ষাবিদ। আমি একজন সম্পাদক। পেশাগত জীবনের বহু বছর আমি বিশ্বাস করে এসেছি, ভাষাকে যথাযথভাবে ব্যবহার করা মানেই এক ধরনের শ্রদ্ধা প্রকাশ— কিন্তু যা দেখলাম, তাতে মনে হল প্রতিটা ছত্রে আছে অযোগ্য মানুষের কাজ, অযত্ন আর অশ্রদ্ধা। দুঃখ প্রকাশ করি হতভাগ্য জনগণের জন্য, যাদের করের কড়কড়ে টাকা ঢাকা হয়েছে দায়িত্বহীনভাবে। জানি না, এর জবাব কার দেওয়ার কথা। জানতে খুব ইচ্ছে করে— অবশ্য, যদি কখনও কেউ ফোনটা ধরেন।
‘অ 2 অনুস্বর’ থেকে পুনর্মুদ্রিত
