(Kumari puja)







দুর্গাপুজোর বিস্তৃত আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে কুমারী পুজো বাঙালি সংস্কৃতির এক গভীর ও প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্য। এর মূল নিহিত শক্তির সাধনায়, নিহিত কুমারী কন্যার মধ্যে দেবীশক্তির প্রকাশকে শ্রদ্ধা করার ধারণায়। বাংলায় দুর্গোৎসবের সঙ্গে এই আচার দীর্ঘকাল ধরে যুক্ত হয়ে পারিবারিক ও সর্বজনীন পুজোর পরিসরে একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক তাৎপর্য লাভ করেছে।
আরও পড়ুন: ফটো স্টোরি: চুনীমণি দাসীর রথ
মহাষ্টমীর সকালে একটি কুমারী কন্যাকে দেবীর প্রতীকরূপে আসনে প্রতিষ্ঠা করা হয়। পায়ে আলতা, পরনে শাড়ি, কপালে সিঁদুর, গয়নায় সজ্জিত সেই শিশুকে ঘিরে উচ্চারিত হয় মন্ত্র, জ্বলে ধূপ, বাজে শঙ্খ। ভক্তেরা তার মধ্যে দেবীর শক্তি ও পবিত্রতার আরাধনা করেন। শিশুটির স্বাভাবিক সারল্য এবং আচারটির গাম্ভীর্য একসঙ্গে তৈরি করে এক অনন্য আবহ।
কুমারী পুজোর অন্তর্নিহিত ভাবনা শক্তি সাধনার এক প্রাচীন ধারণার সঙ্গে যুক্ত— নারীর মধ্যে দেবীশক্তির উপস্থিতি। বিভিন্ন শাস্ত্র ও তান্ত্রিক পরম্পরায় কুমারী পুজোর বিধানে কিছু ভিন্নতা থাকলেও, একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় এক থেকে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত কন্যাদের বয়সভেদে পৃথক দেবীরূপে কল্পনা করা হয়েছে।
এই ধারায় এক বছরের কন্যাকে সন্ধ্যা, দুই বছরের কন্যাকে সরস্বতী, তিন বছরে ত্রিধামূর্তি, চার বছরে কালিকা, পাঁচ বছরে সুভগা, ছয় বছরে উমা, সাত বছরে মালিনী, আট বছরে কুব্জিকা, নয় বছরে কালসন্দর্ভা, দশ বছরে অপরাজিতা, এগারো বছরে রুদ্রাণী, বারো বছরে ভৈরবী, তেরো বছরে মহালক্ষ্মী, চৌদ্দ বছরে পীঠনায়িকা, পনেরো বছরে ক্ষেত্রজ্ঞা এবং ষোলো বছরে অম্বিকা নামে অভিহিত করার উল্লেখ পাওয়া যায়।
এই পার্থক্যগুলি থেকে বোঝা যায় যে, কুমারী পুজো কোনও একক, অপরিবর্তনীয় বিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিভিন্ন শাক্ত পরম্পরা ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে এর রূপ বিকশিত হয়েছে।
তবে সব শাস্ত্রে এই নাম ও বয়সের বিন্যাস এক নয়। অন্য একটি প্রাচীন ধারায় দুই থেকে দশ বছর বয়সী কন্যাদের কুমারী, ত্রিমূর্তি, কল্যাণী, রোহিণী, কালিকা, চণ্ডিকা, শাম্ভবী, দুর্গা ও সুভদ্রা নামে অভিহিত করা হয়েছে।
এই পার্থক্যগুলি থেকে বোঝা যায় যে, কুমারী পুজো কোনও একক, অপরিবর্তনীয় বিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিভিন্ন শাক্ত পরম্পরা ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে এর রূপ বিকশিত হয়েছে।
বাংলার দুর্গাপুজোর পরিসরে মহাষ্টমীর কুমারী পুজো সেই দীর্ঘ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরই একটি জীবন্ত প্রকাশ— যেখানে একটি কন্যাশিশুর মধ্যে দেবীশক্তিকে সম্মান জানানোর ভাবনা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই আচার আজও বাংলার দুর্গোৎসবকে তার ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত করে রেখেছে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত