কলকাতার দুর্গাপুজো: বদলে যাওয়া এক উৎসবের গল্প

Kolkata Durga Puja
Kolkata Durga Puja

কলকাতার দুর্গাপুজো: বদলে যাওয়া এক উৎসবের গল্প

(Kolkata Durga Puja)

কলকাতার দুর্গাপুজোর অভিজ্ঞতা আমার কাছে আর পাঁচজন বাঙালির অভিজ্ঞতার মতো হয়েও কিছুটা আলাদা। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে পুজো দেখার স্বাদ বদলেছে, বদলেছে পুজো দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও। একেবারে ছোটবেলায় বাড়ির বড়দের হাত ধরে পুজো দেখার অভিজ্ঞতা, একটু বড় হয়ে পাড়ার পুজোমণ্ডপে বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দে মেতে থাকার দিনগুলো, আর ছাত্রাবস্থায় স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে কলকাতার রাজপথে কখনও হেঁটে, কখনও বাসের দোতলায় চেপে, কখনও বা ট্রামে চড়ে নিজেদের ইচ্ছেমতো ঠাকুর দেখে বেড়ানো— এ সবই আমার পুজোর স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কর্মজীবনে ক্যামেরা কাঁধে বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে পুজো দেখা এবং পুজোর গল্প শোনার মধ্য দিয়ে লাভ করেছি এক সম্পূর্ণ অন্য অভিজ্ঞতা।


আরও পড়ুন: রহস্যের আড়ালে উত্তম


বিচারকের আসনে

পরবর্তী সময়ে আমার ওপর বর্তেছে বিচারকের দায়িত্ব। তখন শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে রাতের পর রাত জেগে পুজো দেখার এক নতুন অধ্যায় শুরু হল। সঙ্গী ছিলেন একদল পুজো-পাগল মানুষ, নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত, কৃতী ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। তাঁদের সঙ্গে পুজো দেখতে গিয়ে বুঝেছি, সাধারণের অলক্ষ্যে একদল মানুষ তাঁদের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নান্দনিক ভাবনায় কলকাতার দুর্গাপুজোকে নীরবে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন।

তখন মোবাইল ফোন বা অনলাইনে আবেদনের ব্যবস্থা ছিল না। ফলে ক্লাবের কাছে আমাদের আগাম পরিচিতি বা উপস্থিতির খবর পৌঁছত না। তাই বিচারক হিসেবে আলাদা খাতির-যত্ন পাওয়ার প্রশ্ন ছিল না। তৃতীয়া-চতুর্থীর রাতে যে যার নিজের কাজকর্ম সেরে দল বেঁধে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে পড়তাম। পঞ্চমীতে প্রত্যেকের জন্য আলাদা সাদা অ্যাম্বাসাডর গাড়ির ব্যবস্থা থাকত। সেই গাড়িতে চেপে যেখানেই আলোর ঝলকানি চোখে পড়ছে, সেখানে গিয়ে মণ্ডপের লাইনে দাঁড়িয়েছি।

Kolkata Durga Puja
কুমোরটুলিতে প্রতিমা নির্মাণ

নিজ নিজ এলাকার ঠাকুর দেখে মাঝরাতে মাইকেলনগর ধাবায় সব বিচারক একত্রিত হয়ে আলোচনায় বসতাম। কেউ নতুন কোনও পুজোর সন্ধান পেলে সেই খবর শুনে আবার গাড়ি ছুটিয়ে বেরিয়ে পড়তাম অজানা-অচেনা মণ্ডপের খোঁজে। ষষ্ঠীর সকালের আলো ফোটার আগেই উল্লেখযোগ্য পুজোগুলো দেখে নেওয়ার তাগিদ থাকত। কারণ, তার পরেই শুরু হত বিচারকদের সম্মিলিত মতামত জানানোর পর্ব।

সেই আলোচনায় উঠে আসত প্রতিমার রূপ ও দর্শন, ভক্তি ও ভঙ্গিমা, মণ্ডপের শিল্পকলা, সংস্কৃতি, পরিবেশ, নান্দনিকতা এবং দর্শনার্থীদের সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিতর্ক হত, যুক্তি-পাল্টা যুক্তিতে শান দেওয়া চলত। কখনও নিজের যুক্তিতে জয়ী হয়েছি, আবার কখনও অন্যের যুক্তির কাছে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে আনন্দের সঙ্গে পরাজয় মেনে নিয়েছি। সেই স্বীকারোক্তি আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। বিচারকের এই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, পুজো দেখা শুধু সৌন্দর্য উপভোগ করা নয়; এটা আমার জীবনে এক নিরন্তর শিক্ষা মাধ্যম।

ছোটবেলায় দেখা মুক্তধারার পুজোর কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে। সেখানে দেখেছিলাম, দুর্গা তাঁর হাতের ত্রিশূল ছুঁড়ে বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অসুরকে বধ করছেন। দেবী ও অসুরের মাঝখানে টিউবলাইট দিয়ে তৈরি হয়েছিল একাধিক ত্রিশূলের বিন্যাস। সেগুলো একের পর এক জ্বলে উঠত।

ছোটবেলার পুজো

ছোটবেলার পুজোয় বাঁশের কাঠামোর ওপর কাপড়ের কুচি দিয়ে মণ্ডপ সাজানো হত। প্যান্ডেলের এক পাশে থাকত পরিবারসহ মা দুর্গা, আর মাথার ওপরে ক্যালেন্ডারে ছাপা মহাদেবের ছবি। প্রতিমার দু’পাশে কয়েকটি হ্যালোজেন বাতি এবং রাস্তায় বিচ্ছিন্নভাবে কিছু টিউবলাইট জ্বালিয়েই পুজোর আলোকসজ্জা সম্পূর্ণ হত।

যেসব ক্লাব নিজেদের সামর্থ্য ও আভিজাত্যের পরিচয় দিতে চাইত, তারা মণ্ডপের আশপাশে চন্দননগরের কিছু আলোর কাজ করাত। দূর থেকে সেই আলোই আশেপাশের এবং কিছুটা দূরের দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করত। আলোকসজ্জায় ফুটে উঠত মূলত বিগত দিনের রেল বা বিমান দুর্ঘটনা থেকে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড— বিভিন্ন সমসাময়িক ও আলোচিত ঘটনা। রাস্তা জুড়ে চন্দননগরের আলোর তোরণ দেখা গেলেও মণ্ডপের ভিতরে প্রতিমার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চন্দননগরের আলোর ব্যবহার তখন ছিল না বললেই চলে।

Kolkata Durga Puja
কলকাতার দুর্গাপুজোর অভিজ্ঞতা আমার কাছে আর পাঁচজন বাঙালির অভিজ্ঞতার মতো হয়েও কিছুটা আলাদা

ছোটবেলায় দেখা মুক্তধারার পুজোর কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে। সেখানে দেখেছিলাম, দুর্গা তাঁর হাতের ত্রিশূল ছুঁড়ে বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অসুরকে বধ করছেন। দেবী ও অসুরের মাঝখানে টিউবলাইট দিয়ে তৈরি হয়েছিল একাধিক ত্রিশূলের বিন্যাস। সেগুলো একের পর এক জ্বলে উঠত। দেখে মনে হত, ত্রিশূলগুলো ছুটে গিয়ে অসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। অসুরও নানা কায়দায় এদিক-ওদিক থেকে দেবীর দিকে অস্ত্র ছুঁড়ে মারছে।

ধারাভাষ্যের সঙ্গে দেবীর মুখে কখনও লাল, কখনও নীল আলো জ্বলে উঠত। তারপর একসময় দেখতাম, সেই আলোর ত্রিশূল অসুরের বুকে বিঁধে গিয়েছে। যুদ্ধরত অসুর এবং পরাজিত অসুরের রূপ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। আসলে আলো-ছায়ার এই কৌশলে নির্দিষ্ট সময়ে যুদ্ধরত অসুরের মূর্তিটি ঘুরিয়ে দেওয়া হত। তার ঠিক উল্টো দিকে লুকিয়ে রাখা থাকত আরেকটি পরাজিত অসুরের মূর্তি, যার বুকে ত্রিশূল বিঁধে আছে।

এই শিল্পীদের চাহিদা ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পিছনে পাড়ার ক্লাব সদস্যদের মনস্তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা কাজ করেছিল। এক ক্লাবে যখন কোনও শিল্পী মণ্ডপ নির্মাণের কাজ করছেন, তখন পাশের ক্লাবের সদস্যরা স্থানীয় ডেকরেটর দিয়ে প্যান্ডেল তৈরি করাচ্ছেন— এই তুলনা থেকেই জন্ম নেয় এক অলিখিত প্রতিযোগিতা।

এই অভিনব দৃশ্য দেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েছি। মাত্র কয়েক মিনিটের শো দেখে বেরিয়ে আবার নতুন করে লাইনে দাঁড়িয়েছি। শুধু তাই নয়, তখন পুজোমণ্ডপে ঠাকুরের ছবিও বিক্রি হত। নিজের সংগ্রহে রাখব বলে সেই ছবিও কিনেছিলাম। আজও সেই স্মৃতি আমার কাছে অমূল্য।

থিমের যুগ

কলকাতার পুজোমণ্ডপের রূপান্তর শুরু হয় মূলত আশির দশকের শেষভাগ থেকে। প্যান্ডেলের সাজসজ্জায় কাপড়ের পরিবর্তে ক্রমশ জায়গা করে নেয় মাদুর, চাটাই, বেত, কঞ্চি, শোলা, মাটি এবং আরও নানা উপকরণ। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত সামগ্রীই শিল্পীর ভাবনায় নতুন রূপে মণ্ডপসজ্জার উপাদানে পরিণত হয়। এর মধ্য দিয়ে সারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের অজানা শিল্পধারা ও শিল্পীদের কাজ বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনায় পরিচিতি লাভ করে।

এই শিল্পীদের চাহিদা ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পিছনে পাড়ার ক্লাব সদস্যদের মনস্তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা কাজ করেছিল। এক ক্লাবে যখন কোনও শিল্পী মণ্ডপ নির্মাণের কাজ করছেন, তখন পাশের ক্লাবের সদস্যরা স্থানীয় ডেকরেটর দিয়ে প্যান্ডেল তৈরি করাচ্ছেন— এই তুলনা থেকেই জন্ম নেয় এক অলিখিত প্রতিযোগিতা। সেই প্রতিযোগিতা ক্রমে থিম-পুজোর প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ধীরে ধীরে থিম-শিল্পীরা তাঁদের নিজস্ব শৈল্পিক সত্তা, মেধা, পরিশ্রম, আন্তরিকতা এবং আধুনিকতার সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটিয়ে কলকাতার দুর্গাপুজোকে অন্য মাত্রা জুগিয়েছেন এবং আজ তাঁরা কলকাতার দুর্গাপুজোর অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আজ থিম-শিল্পীদের তালিকা করতে বসলে তা আদ্যিকালের পঞ্জিকার আকার ধারণ করবে। দুর্গাপুজোর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত নন, এমন বাঙালি শিল্পী খুঁজে পাওয়া কঠিন। কারণ এই কাজের মধ্যে লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত উত্তেজনা, যা ক্রমে নেশায় পরিণত হয়। বছরভর সেই নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন পুজো-পাগল ক্লাবসদস্য, আয়োজক, শিল্পী ও আলোকচিত্রীদের অনেকে। আর দর্শনার্থীরা সেই সৃষ্টির সামনে দাঁড়ানোর জন্য অপেক্ষা করেন। তাঁরা নিয়ম করে মণ্ডপে মণ্ডপে যান, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়ান, প্রতিমা ও মণ্ডপ দেখেন। তাঁদের মুখের অভিব্যক্তি, আনন্দ এবং মোবাইল ক্যামেরায় ছড়িয়ে পড়া ছবি-ভিডিয়োর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় ভাল লাগার অনুভূতি। শেষ পর্যন্ত প্রকৃত বিচারক তো এই সাধারণ দর্শনার্থীরাই।

এই পরিবর্তন কোনও জাদুকরের একদিনের ম্যাজিকে হয়নি। এর পিছনে রয়েছে বহু মানুষের বহু বছরের নীরব প্রচেষ্টা, সৃজনশীলতা ও শ্রম। আজ কলকাতার দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার অসংখ্য মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ পান।

আগে পুজো ছিল মূলত পাড়াকেন্দ্রিক। কিন্তু থিম-পুজোর প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে যোধপুর পার্ক, মহম্মদ আলি পার্ক, ম্যাডক্স স্কোয়ার, কলেজ স্কোয়ার ও একডালিয়া এভারগ্রিনের মতো মণ্ডপে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। তার প্রভাব পড়ে পাড়ার পুজোগুলিতেও। ঠাকুর দেখার সময়সীমা ক্রমশ দীর্ঘ হয়। থিম-পুজো যত আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, মানুষ তত পাড়ার গণ্ডি পেরিয়ে বেরিয়ে পড়ে ঠাকুর দেখতে। রাতের পর রাত জেগে ছুটে চলে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম কলকাতার নানা প্রান্তে।

এই পরিবর্তন কোনও জাদুকরের একদিনের ম্যাজিকে হয়নি। এর পিছনে রয়েছে বহু মানুষের বহু বছরের নীরব প্রচেষ্টা, সৃজনশীলতা ও শ্রম। আজ কলকাতার দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার অসংখ্য মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ পান। তাই এখনকার পুজো ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক উৎসবের গণ্ডি পেরিয়ে এক বিশাল সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে।

Kolkata Durga Puja
কলকাতার পুজোমণ্ডপের রূপান্তর শুরু হয় মূলত আশির দশকের শেষভাগ থেকে

একসময় প্যান্ডেল নির্মাণের মূল ভরসা ছিল বাঁশের কাঠামো। বর্তমানে অনেক বড় মণ্ডপে প্রাথমিক কাঠামো তৈরিতে বাঁশ ব্যবহার করা হলেও, পরবর্তী পর্যায়ে লোহার কাঠামোর ব্যবহার বেড়েছে। ছোটবেলায় দেখেছি, নারকেলের দড়ি দিয়ে প্যান্ডেল বাঁধা হত। এখন বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার পরিবর্তে কাপড়ের ফিতা বা অন্য উপকরণ ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে বাঁধাইয়ের উপকরণ ও পদ্ধতি মণ্ডপের নকশা এবং কাঠামোগত চাহিদার ওপর নির্ভর করে।

যাঁরা বাঁশের কাঠামো তৈরি করেন, তাঁদের অনেকেই গ্রামের মানুষ, প্রান্তিক কারিগর। তাঁদের মধ্যে অনেকের প্রথাগত বিজ্ঞান বা প্রকৌশলশিক্ষা নেই। তবু বছরের পর বছর কাজ করতে করতে তাঁরা কাঠামোর ভারসাম্য, চাপের বণ্টন, বাঁশের সহনক্ষমতা এবং বাঁধনের কার্যকারিতা সম্পর্কে অসাধারণ জ্ঞান অর্জন করেছেন। কোনও প্রকৌশলশিক্ষার্থী যদি তাঁদের কাজ মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন, তবে তিনি বুঝতে পারবেন, অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত এই জ্ঞান কতটা মূল্যবান।

মণ্ডপের বাইরের আলোকসজ্জা এক ধরনের হতে পারে, কিন্তু মণ্ডপের ভিতরের আলোর বিন্যাস সাধারণত থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পনা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই গোয়েন্দা সিনেমার মতো আলো-ছায়ার এই আলোকসজ্জা দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।

অবশ্যই আধুনিক কাঠামো নির্মাণে প্রকৌশলগত হিসাব, নির্ধারিত নিরাপত্তাবিধি এবং বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধান অপরিহার্য। কিন্তু প্রান্তিক কারিগরদের অভিজ্ঞতাকে অবহেলা করারও কোনও কারণ নেই। তাঁদের হাতে তৈরি কাঠামোর পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ, অনুশীলন ও বাস্তব বুদ্ধির পরিচয়।

আলোর কথা

দুর্গাপুজোর আলো নিয়ে ক্লাব ও থিম-শিল্পীরা নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক সময়ে। তাঁরা বুঝতে পেরেছেন, আলো শুধু মণ্ডপ আলোকিত করার উপকরণ নয়; আলো নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পমাধ্যম এবং থিমের ভাবনা প্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যম। আলোরও একটা গভীর নান্দনিক সূত্র রয়েছে, যা মণ্ডপের সামগ্রিক অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।

মণ্ডপের বাইরের আলোকসজ্জা এক ধরনের হতে পারে, কিন্তু মণ্ডপের ভিতরের আলোর বিন্যাস সাধারণত থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পনা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই গোয়েন্দা সিনেমার মতো আলো-ছায়ার এই আলোকসজ্জা দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। তবে এই আলোক-পরিকল্পনাকে অযথা রহস্যময় করে তুলতে কৃত্রিম ধোঁয়ার ব্যবহার নিয়ে আমার আপত্তি রয়েছে।

বিপুল জনসমাগমের মধ্যে কৃত্রিম ধোঁয়া দৃশ্যমানতা কমাতে পারে এবং শ্বাসকষ্টে ভোগা মানুষদের অস্বস্তি বাড়াতে পারে। তাই এমন কোনও উপকরণ ব্যবহারের আগে তার নিরাপত্তা, বায়ু চলাচল এবং দর্শনার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়গুলি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত। আমাদের মনে রাখতে হবে আলো উৎসবের অঙ্গ; অন্ধকার কোনওভাবেই নয়।

আলোর এই পরিবর্তনের পিছনে এলইডি বা লাইট-এমিটিং ডায়োডের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এখন ফিলামেন্টের বদলে অর্ধপরিবাহী ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করা হয়। এই ডিভাইসের মধ্য দিয়ে তড়িৎপ্রবাহ চালালে আলো নির্গত হয়।

আগে মেটাল হ্যালোজেন, হ্যালোজেন এবং PAR 64 ধরনের আলো ব্যবহারের ফলে বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেশি ছিল। কোনও কোনও বড় পুজোমণ্ডপে আলোকসজ্জার জন্য প্রায় চল্লিশ পঞ্চাশ কিলোওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ প্রয়োজন হত। নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বর্তমানে বড় মাপের মণ্ডপের অভ্যন্তরীণ আলোকসজ্জায় বিগত দিনের তুলনায় মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়ে থাকে। তবে এই চাহিদা মণ্ডপের আকার, আলোর সংখ্যা, উজ্জ্বলতা ও নকশার ওপর নির্ভরশীল।

আলোর এই পরিবর্তনের পিছনে এলইডি বা লাইট-এমিটিং ডায়োডের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এখন ফিলামেন্টের বদলে অর্ধপরিবাহী ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করা হয়। এই ডিভাইসের মধ্য দিয়ে তড়িৎপ্রবাহ চালালে আলো নির্গত হয়। তুলনামূলকভাবে কম বিদ্যুৎ খরচে প্রয়োজনীয় ঔজ্জ্বল্য পাওয়া যায় বলে এই প্রযুক্তি আলোকসজ্জায় বিদ্যুৎ খরচ প্রায় ৮০ শতাংশ কমিয়ে আনতে সহায়তা করেছে।

Kolkata Durga Puja
আলোকসজ্জায় ফুটে উঠত মূলত বিগত দিনের রেল বা বিমান দুর্ঘটনা থেকে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড

আলোকশিল্পীর সঙ্গে কাজ করা ইলেকট্রিশিয়ানদের দল গড়ার ক্ষেত্রেও বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন হয়। বয়স, অভিজ্ঞতা, উপস্থিত বুদ্ধি, ধৈর্য ও শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনা করে কাজ ভাগ করে দিতে হয়। উঁচুতে উঠে কাজ করার জন্য প্রশিক্ষিত ও শারীরিকভাবে সক্ষম যুবকদের প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে, মাটির কাছাকাছি বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন, পাওয়ার লোডের সঠিক বণ্টন এবং নিরাপদ বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাপনার জন্য অভিজ্ঞ কর্মীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কাজের সঙ্গে যুক্ত বহু দক্ষ কর্মী কলকাতা ও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসেন। বিশেষ প্রয়োজনে অন্য রাজ্য থেকেও কর্মী নিয়ে আসা হয়। তাঁদের শ্রম ছাড়া আধুনিক দুর্গাপুজোর বিপুল আয়োজন সম্ভব নয়।

পুজো ও অর্থনীতি

নামী-অনামী রেস্তোরাঁ, স্থানীয় ও ব্র্যান্ডেড পোশাকের দোকান, ফুটপাতের ব্যবসায়ী, ফুচকাওয়ালা, ঘুগনিওয়ালা, বেলুনওয়ালা, অটোচালক, নাগরদোলার মালিক— এমনকি বহুজাতিক সংস্থাগুলিও দুর্গাপুজোর জন্য অপেক্ষা করে থাকে। পুজোর সময় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে শহরের রাস্তা ও জনপরিসরের চেহারা বদলে যায়। এই বিশাল আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকেরই নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থ ও কর্মসংস্থানের সম্পর্ক রয়েছে।

এবার আসা যাক প্রশাসনিক ভূমিকার কথায়। থিম-পুজোর প্রস্তুতি সাধারণত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি থেকেই বিচ্ছিন্নভাবে শুরু হয়ে যায়। পুজোর মাস তিনেক আগে পুলিশ সব ক্লাবের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রশাসনিক নির্দেশিকা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিধিনিষেধ জানিয়ে দেয়।

থিম-শিল্পী, প্যান্ডেল নির্মাণের কারিগর, আলোকশিল্পী, ইলেকট্রিশিয়ান, পরিবহণকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পরিষেবা প্রদানকারী— সবাই মিলে গড়ে তোলেন এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। অল্প কয়েক দিনের উৎসবকে কেন্দ্র করে বহু মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছায়, বহু ব্যবসার বিক্রি বাড়ে এবং বহু অস্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।

তবে এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুফল কতটা বিস্তৃত, তা নির্ভর করে কাজের ন্যায্য পারিশ্রমিক, শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণের ওপরও। দুর্গাপুজোর সাফল্য তাই শুধু মণ্ডপের সৌন্দর্যে নয়, এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবন ও জীবিকার মধ্যেও প্রতিফলিত হওয়া উচিত।

প্রশাসনের ভূমিকা

এবার আসা যাক প্রশাসনিক ভূমিকার কথায়। থিম-পুজোর প্রস্তুতি সাধারণত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি থেকেই বিচ্ছিন্নভাবে শুরু হয়ে যায়। পুজোর মাস তিনেক আগে পুলিশ সব ক্লাবের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রশাসনিক নির্দেশিকা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিধিনিষেধ জানিয়ে দেয়। সেই নির্দেশিকা অনুযায়ী কলকাতা পুরসভা, পূর্ত দপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষ নিজেদের দায়িত্ব পালন করে থাকে।

এরপর প্যান্ডেল নির্মাণের শেষ পর্যায়ে প্রশাসনের প্রতিনিধিরা সরেজমিনে মণ্ডপ পরিদর্শন করেন। একসঙ্গে কতজন দর্শনার্থী প্রবেশ করতে পারবেন, কোন পথে তাঁরা ঢুকবেন ও বেরোবেন, মণ্ডপের ভিতরে কতক্ষণ থাকতে পারেন এবং ভিড়ের চাপ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, প্রাথমিক চিকিৎসা, দমকল— আপতকালীন সব বিষয় খতিয়ে দেখে বুঝে নেন। এমনকি দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যে প্রতিমা দর্শনের ব্যবস্থা মণ্ডপে রাখা হয়েছে কি না সেটাও।

এ বছর, অর্থাৎ ২০২৬ সালের পুজোয়, অন্যান্য বছরের তুলনায় বাঙালির পাশাপাশি অন্য ভাষাভাষী মানুষের উপস্থিতি আমার চোখে বেশি ধরা পড়েছে। পুজোর দিনগুলোতে পার্কিং জোনে অন্য রাজ্যের গাড়ির ভিড়ও সেই ধারণাকে জোরদার করেছে।

মণ্ডপের কোণ থেকে

আমি সাধারণত পুজোমণ্ডপের এক কোণে একা বসে যারা প্রতিমা দর্শনে আসছেন, সেই মানুষদের দেখতে ভালবাসি। নানা ধরনের, নানা বয়সের, নানা চরিত্রের মানুষের বিচিত্র সমাগম আমাকে আকর্ষণ করে। আগে মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে মূলত ঠাকুর দেখত। এখন ছবি তোলার ব্যস্ততায় প্রতিমার সামনে দাঁড়ানোর সময় কমেছে। মোবাইল ক্যামেরায় ছবি ও ভিডিয়ো তুলতে তুলতেই ঠাকুর দেখার এক নতুন অভ্যাস তৈরি হয়েছে।

তবুও আমার মানুষ দেখতে ভাল লাগে। নতুন পোশাক পরা, ঘামে ভেজা ভিড়ের মধ্যে আতরের সঙ্গে পারফিউম মিশে নানা স্তরের গন্ধ তৈরি হয়। সেই বিচিত্র, পরিচয়হীন গন্ধের ভিড়ে হঠাৎ কোনও সুগন্ধ যখন আভিজাত্যের ইঙ্গিত দেয়, আমার চোখ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেই মানুষটিকে খুঁজতে থাকে। আমার এই একান্ত অনুভূতির লুকোচুরি খেলায় অন্য কেউ অংশ নেন না; আনন্দটা একান্তই আমার নিজের।

Kolkata Durga Puja
২০২৬ সালের পুজোয়, অন্যান্য বছরের তুলনায় বাঙালির পাশাপাশি অন্য ভাষাভাষী মানুষের উপস্থিতি আমার চোখে বেশি ধরা পড়েছে

এ বছর, অর্থাৎ ২০২৬ সালের পুজোয়, অন্যান্য বছরের তুলনায় বাঙালির পাশাপাশি অন্য ভাষাভাষী মানুষের উপস্থিতি আমার চোখে বেশি ধরা পড়েছে। পুজোর দিনগুলোতে পার্কিং জোনে অন্য রাজ্যের গাড়ির ভিড়ও সেই ধারণাকে জোরদার করেছে। রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুন সরকারের আমলে হিন্দিভাষী দর্শনার্থীদের মধ্যে দুর্গাপুজো নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন। তবে বহু যুবককে দল বেঁধে বাইকে চেপে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরতে দেখেছি।

তাঁদের অনেকেই দৈনন্দিন পোশাকে ছিলেন। দুর্গাপুজো তাঁদের নিজস্ব ঐতিহ্যগত উৎসব নয় বলে তাঁরা নতুন পোশাক পরবেন না— এমন ধারণা অবশ্যই করা যায়। প্রত্যেকের উৎসব উদ্‌যাপনের ধরন আলাদা। তবে বাঙালিদের মধ্যেও এ বছর নতুন পোশাক পরার প্রবণতা বিগত কয়েক বছরের তুলনায় কিছুটা কম বলে আমার মনে হয়েছে। এর পিছনে কী কারণ রয়েছে, তা জানি না। কিন্তু বিষয়টি নতুন করে ভাবিয়েছে।

দুর্ঘটনার পরে যথারীতি প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার দায়িত্বের একটি বড় অংশ ক্লাবগুলির ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেল। বহু মণ্ডপের ভিতরে নতুন করে আলো জ্বালানো হয়। কিন্তু সেই আলো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় কিছু মণ্ডপে প্রতিমা দর্শনের পরিবেশটাই বদলে যায়।

২০২৬-এর পুজো

সত্যি বলতে, ২০২৬ সালের দুর্গাপুজো আমার তেষট্টি বছরের জীবনে ব্যক্তিগত এবং পারিপার্শ্বিক দিক থেকে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা প্রাপ্তি হল। পুজোর কয়েক দিন আগে থেকেই রাস্তায় শুরু হয় প্রবল যানজট। মহাসপ্তমীর রাতে উৎসবের ছন্দে নেমে এল এক গভীর বেদনা। যা কলকাতার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে বিরল ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

চোরবাগানের দুর্ঘটনার মতো দুর্ঘটনা সেদিন উত্তর কলকাতার অন্য কোনও মেট্রো স্টেশনেও ঘটতে পারত। সৌভাগ্যবশত, তেমনটা ঘটেনি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়— কলকাতা পুলিশের এত বছরের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হল কেন? যেখানে উৎসবের আনন্দের চেয়ে মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার গুরুত্ব অনেক বেশি, সেখানে বিপুল জনসমাগম হবে জানা সত্ত্বেও আগাম ঝুঁকি মূল্যায়ন, ভিড়ের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকল কেন? 

দুর্ঘটনার পরে যথারীতি প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার দায়িত্বের একটি বড় অংশ ক্লাবগুলির ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেল। বহু মণ্ডপের ভিতরে নতুন করে আলো জ্বালানো হয়। কিন্তু সেই আলো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় কিছু মণ্ডপে প্রতিমা দর্শনের পরিবেশটাই বদলে যায়। আলো-ছায়ার যে সূক্ষ্ম পরিকল্পনা থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছিল, তা অনেক ক্ষেত্রে আর উপভোগ করা সম্ভব হয়নি।

দুর্ঘটনার পরের দিন বহু মণ্ডপের সামনে ব্যারিকেড ভেঙে বা সরিয়ে নতুন করে চওড়া পথ তৈরি করা হয়। এর আগে ভিড়ের তুলনায় গার্ডরেলের সংখ্যা অপর্যাপ্ত ছিল, অথচ দুর্ঘটনার পরে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিশেষ কিছু মণ্ডপে অতিরিক্ত পুলিশকর্তা ও সিভিক ভলান্টিয়ার মোতায়েন করে নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং প্রয়োজনীয় গার্ডরেলও পৌঁছে দেওয়া হয়।

পুজো বদলেছে, আগামীতে আরও বদলাবে। কিন্তু পরিবর্তনের প্রতিটি ধাপে আমাদের মনে রাখতে হবে, উৎসবের প্রকৃত সার্থকতা শুধু তার জাঁকজমকে নয়; শিল্পের মর্যাদা, মানুষের আনন্দ এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তার মধ্যেই উৎসবের পূর্ণতা।

এখানেই আমার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এই ব্যবস্থা যদি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে করা সম্ভব হয়, তবে পুজোর আগে থেকেই তা পর্যাপ্ত মাত্রায় নিশ্চিত করা গেল না কেন? বিপুল জনসমাগমের সম্ভাবনা তো অজানা ছিল না। কোন মণ্ডপে কত মানুষের ভিড় হতে পারে, কোথায় প্রবেশ ও নির্গমনের পথ সংকীর্ণ, কোন মেট্রো স্টেশন বা রাস্তার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে— এই সব তথ্য আগাম বিশ্লেষণ করে নিরাপত্তাব্যবস্থা সাজানো কি সম্ভব ছিল না?

দুর্ঘটনা কখনও শহরের ঐতিহ্য হতে পারে না। কলকাতা পুলিশের ভিড় সামাল দেওয়ার দক্ষতা নিয়ে বাঙালিদের দীর্ঘদিনের গর্ব ছিল। সেই গর্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে অভিজ্ঞতার পাশাপাশি প্রয়োজন ছিল বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়।

Kolkata Durga Puja
কলকাতা পুলিশের ভিড় সামাল দেওয়ার দক্ষতা নিয়ে বাঙালিদের দীর্ঘদিনের গর্ব ছিল

যদি এ বছরের দুর্ঘটনা প্রশাসনিক প্রস্তুতির কোনও ঘাটতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে থাকে, তবে তার থেকে শিক্ষা নেওয়াই হবে সবচেয়ে জরুরি কাজ। দায় এড়িয়ে যাওয়া বা একে অপরের ওপর দোষ চাপানোর পরিবর্তে প্রয়োজন নিরপেক্ষ পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে যাঁদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাঁদের পরামর্শ ও বাস্তব জ্ঞানকে কাজে লাগাতে হবে। অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করে নতুন পরিকল্পনা করা যায়, কিন্তু তার মূল্য যেন মানুষের জীবন দিয়ে দিতে না হয়।

কলকাতার দুর্গাপুজো আজ শিল্প, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও জনসমাগমের এক বিশাল সংমিশ্রণ। এই পুজোকে বিশ্বজনীন করে তুলেছেন শিল্পী, কারিগর, আয়োজক, শ্রমিক, প্রশাসন এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষ। তাঁদের সম্মিলিত শ্রমেই গড়ে উঠেছে কলকাতার পুজোর গৌরব। সেই গৌরব রক্ষার প্রথম শর্ত হল মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

পুজো বদলেছে, আগামীতে আরও বদলাবে। কিন্তু পরিবর্তনের প্রতিটি ধাপে আমাদের মনে রাখতে হবে, উৎসবের প্রকৃত সার্থকতা শুধু তার জাঁকজমকে নয়; শিল্পের মর্যাদা, মানুষের আনন্দ এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তার মধ্যেই উৎসবের পূর্ণতা।

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Please login to bookmark Close
Picture of প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী

প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী

প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী বাংলা সিনেমা জগতে একজন দক্ষ চিত্রগ্রাহক হিসেবে বহু কালজয়ী এবং সমাদৃত ছবিতে কাজ করেছেন। তাঁর সিনেমাটোগ্রাফি, ছবির নান্দনিকতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁর বহু ছবিই সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ভূষিত হয়েছে বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে। পরবর্তীকালে, তিনি চলচ্চিত্র পরিচালনায় পদার্পণ করেন। পরিচালক হিসেবে মূলত পারিবারিক গল্প এবং মিষ্টি সম্পর্কের রসায়ন পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে ভালোবাসেন। পরিচালনার পাশাপাশি চলচ্চিত্র জগতের সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বর্ণময় কর্মজীবনে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ইস্টার্ন ইন্ডিয়া সিনেমাটোগ্রাফার্স অ্যাসোসিয়েশনের (EICA) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (KIFF)-এর টেকনিক্যাল কমিটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন সুদীর্ঘ সময়। চলচ্চিত্রের কারিগরি বিষয়ে তাঁর ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার আলোকে সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন চলচ্চিত্র শিক্ষাকেন্দ্রে একজন অতিথি অধ্যাপক (Guest Lecturer) হিসেবে আগামী প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সমৃদ্ধ করে চলেছেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Please login to bookmark Close

The Banglalive's Picks

Weekly Newsletter

Enjoy our flagship newsletter as a digest delivered once a week.

By signing up, you agree to our User Agreement and Privacy Policy & Cookie Statement.

Please login to bookmark Close
অনেক ঢাকঢোল বাজিয়ে শুরু হয়েছিল দশম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (২০০২-২০০৭)। গড়ে ৮ শতাংশ বার্ষিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। দারিদ্র্য হ্রাস ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়। কৃষি, শিল্প ও পরিষেবা খাতে সুষম উন্নয়নের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। পড়ুন প্ল্যানিং কমিশন প্রবর্তন থেকে বিসর্জন পর্ব ৮। লিখছেন অমিতাভ রায়...
Please login to bookmark Close
দামাস্কাস হল এলি কোহেনের জীবনের চূড়ান্ত পর্ব। ঐতিহাসিকদের মতে, এই সুপ্রাচীন আরব মহানগরী আদতে কোহেনের কাছে তাঁর অর্জিত জ্ঞানের ফলিত প্রয়োগের ক্ষেত্রও বটে। বস্তুত পরবর্তীকালে মোসাদের প্রশিক্ষণ পাঠক্রমে এলির বুয়েন্স এয়ার্স ও দামাস্কাস অভিযান একজন এজেন্টের যথার্থ কার্যকলাপ রূপে মান্যতা পায়। শুরু হল এলি কোহেন ত্রয়োবিংশ পর্ব। লিখছেন কিংশুক বন্দ্যোপাধ্যায়...
Please login to bookmark Close
ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় ছিল ১৯৮৯ থেকে ১৯৯১ সাল। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মেয়াদ ১৯৯০-এর মার্চ মাসে শেষ হয়ে গেলেও অস্থির সময়ে পরবর্তী পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। ১৯৯০-৯১ এবং ১৯৯১-৯২ আর্থিক বর্ষে শুধুমাত্র বার্ষিক পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পড়ুন প্ল্যানিং কমিশন প্রবর্তন থেকে বিসর্জন পর্ব ৭। লিখছেন অমিতাভ রায়...

Subscribe

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com