নিপ্পণ দেশে কয়েকটি দিন – ৫ম পর্ব

Japan Travel 5
Japan Travel 5

নিপ্পণ দেশে কয়েকটি দিন – ৫ম পর্ব

(Japan Travel 5)

ওসাকা শহর পরিক্রমার জন্য গাইড কোজি হাজির। গুড স্লিপ ম্যাম? নিজের ভাঙা ইংরেজি নিয়ে তার বেশ গর্ব।

– গুড মর্নিং কোজি, কোথায় যাব এখন?

– নারা ম্যাম। নারা ন্যাশনাল পার্ক। লটস অফ ডিয়ার। বাত, ডোন্ট ফিড দেম ইয়োর ফুড। বাই সাম ক্র্যাকারস।

বাস চলতে শুরু করল। কত পুরনো এই নারা শহর, অষ্টম শতকের গোড়ায় জাপানের প্রথম স্থায়ী রাজধানী। চিনা শহরের অনুকরণে তৈরি নারাতে ৭১০-৭৮৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জাপ সম্রাট পরিবারসহ বাস করতেন। এই যুগেই জাপানের প্রথম ইতিহাস লেখা হয়। ৭৫ বছর পর নারা থেকে রাজধানী সরে এল কিয়োতোতে। আধ ঘণ্টার বাস জার্নির পর এসে গেল ১২০০ একর জমির ওপর সেই বিখ্যাত নারা ডিয়ার পার্ক।


আরও পড়ুন: নিপ্পণ দেশে কয়েকটি দিন – ১ম পর্ব, ২য় পর্ব, ৩য় পর্ব, ৪র্থ পর্ব


পার্কে রয়েছে প্রচুর ফুলন্ত চেরি গাছ, শিশুরা খেলা করছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে ল্যাজহীন, শিং ভাঙা হরিণ। মিয়াজিমা দ্বীপেও এই জাপানি হরিণ বা সিকা ডিয়ার (Cervus nippon)-এর দেখা পেয়েছি। ন্যাড়া জমিতে ঘাস নেই। বুভুক্ষু হরিণেরা পারলে আমাদের জামার প্রান্ত চিবিয়ে খায়। পার্ক থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তার ফুটপাথ ধরে হাঁটতে গিয়ে দেখলাম, বিরাট এক প্রস্তরখণ্ডের গায়ে লেখা ওয়ার্লড হেরিটেজ, হিস্টোরিক মন্যুমেন্টস অফ এনশেন্ট নারা, ইনক্ল্যুডিং তোদাইজি টেম্পল। ১৯৯৮ সালে স্থানটি ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের মর্যাদা পেয়েছে।

কিছুটা দূরে তোদাইজি বৌদ্ধ মন্দির। সুদৃশ্য বিশাল গেট পেরোতেই সামনে প্রশস্ত চত্ত্বরে অজস্র গোলাপি সাদা চেরি গাছ, আপন মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঈশ্বরের দূত হরিণেরা, অনেকে তাদের খাইয়ে পুণ্য অর্জন করছে। দেশকে বসন্ত মহামারি, ফসল উৎপাদনের অভাব, রাজনৈতিক বিদ্রোহের হাত থেকে বাঁচাবার আশায় এই মন্দিরে ভগবান বুদ্ধের বিশাল ব্রোঞ্জ মূর্তি স্থাপন করে উপাসনার সিদ্ধান্ত নেন সম্রাট শোমু ৭৫২ খ্রিস্টাব্দে।

Japan Travel 5
তোদাজি মন্দিরের প্রবেশ দ্বার

ইতিহাস বলছে, আমাদের দেশে গুপ্তযুগের সময়, চিন আর কোরিয়ার মধ্য দিয়ে বৌদ্ধধর্ম জাপানের নারাতে আসে। পরে ছড়িয়ে পড়ে সারা জাপানে। নারার তোদাইজি মন্দির উদ্বোধন অনুষ্ঠান নাকি পরিচালনা করেন ভারতের বৌদ্ধ মহাশ্রমণ বোধিসেন।

মন্দির প্রাঙ্গণে রয়েছে কাঠের দুটি পাঁচতলা প্যাগোডা। ভিতরে হলঘর, মূল মন্দিরের বুদ্ধমূর্তির মাথা, তৈরির ১০০ বছর পরেই ভূমিকম্পে ভেঙে পড়ে। ১২ আর ১৬ শতকে মন্দির ধ্বংস হল, আগুনে পুড়ে গেল। পরে তৈরি হল, যদিও আকারে আগের থেকে ছোট।

পৃথিবীতে বুদ্ধের বৃহত্তম ব্রোঞ্জমূর্তি। তার দুই হাতে বরাভয়ের ইঙ্গিত, সামনে দীপাধারে জ্বলছে প্রদীপ। মন্দির ঘরে রয়েছে কাঠের তৈরি দুটি বোধিসত্ত্বের মূর্তি, আর ধাতুর তৈরি নানা ভঙ্গির একাধিক বুদ্ধ মূর্তি। মন্দির চত্বরে বাঁশের নল বেয়ে আসা শীতল পানীয় জল খেয়ে খুব তৃপ্তি পেলাম।

মন্দিরের প্রধান হলঘরে আছে বেদীর ওপরে পদ্মাসনা বিরাট বুদ্ধের মূর্তি, এখানে তার নাম ‘নারা –ন –দাইবুতস্যু’। বসা মূর্তি, উচ্চতায় ৫৩ ফুট ৯ ইঞ্চি। এক একটা চোখ ৩ ফুট ৯ ইঞ্চি, কানের দৈর্ঘ্য ৮ ফুট ৫ ইঞ্চি, মুখমণ্ডল দৈর্ঘ্যে ১৬ ফুট লম্বা, প্রস্থে ৯ ফুট ৫ইঞ্চি। সব মিলিয়ে দৈর্ঘ্য প্রায় ৭১ ফুট, ওজন পাঁচশ টন।

পৃথিবীতে বুদ্ধের বৃহত্তম ব্রোঞ্জমূর্তি। তার দুই হাতে বরাভয়ের ইঙ্গিত, সামনে দীপাধারে জ্বলছে প্রদীপ। মন্দির ঘরে রয়েছে কাঠের তৈরি দুটি বোধিসত্ত্বের মূর্তি, আর ধাতুর তৈরি নানা ভঙ্গির একাধিক বুদ্ধ মূর্তি। মন্দির চত্বরে বাঁশের নল বেয়ে আসা শীতল পানীয় জল খেয়ে খুব তৃপ্তি পেলাম।

Japan Travel 5
ওসাকা দুর্গ

পরের গন্তব্য ত্রিশ কিলোমিটার দূরের প্রাচীন ওসাকা দুর্গ, বা ওসাকা-জো। নিরেট পাথরের প্রাচীরে ঘেরা। ওসাকা বাণিজ্যিক শহর, ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দে এখানে জাপানের রাজধানী ছিল। ওসাকা দুর্গ গড়ে ওঠে ১৫৮৩ খ্রিস্টাব্দে, জাপানের অন্যতম এক বৃহত্তম দুর্গ। অনেক আগে এখানে ছিল ইশিয়ামা হোঙ্গানি মন্দির। পরে এটিকে দুর্গ করে তোলেন টয়োটোমি হিডেয়োশী। তার মৃত্যুর পর টোকুগাওয়া হিডেটাদা নতুন করে ওসাকা দুর্গ তৈরি করেন এখানে ১৬২০ খ্রিস্টাব্দে।

প্রবেশপথেই নিশিনোমারু গার্ডেন দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। অজস্র সাদা চেরি গাছে ঢাকা পথের পরে সবুজ ঘাসে ছাওয়া লন গার্ডেন। এখানে নাকি শ-ছয়েক চেরি গাছ আছে। ঘাসের জমির ওপর স্থানীয় জাপানি ভ্রমণার্থীর পরিবার চাদর পেতে বসে খাওয়া দাওয়া সারছে। চতুর্দিকে বেশ পিকনিকের মেজাজ, স্থানীয় খাবারের দোকান কিছু আছে। আরও কিছুটা পথ পেরোতে নজরে এল আটতলা ওসাকা দুর্গ। পুরনো দুর্গ ১৯৩১ সালে একবার পুনর্নির্মিত হয়, ১৯৯৭ সালে পেয়েছে আধুনিক রূপ।

শেষ দুপুরে চললাম দোতনবড়ি মার্কেট। জনমানব পরিপূর্ণ বাজার। মাঝে চলে গেছে শিনসাইবাশি –সুজি শপিং স্ট্রিট। জাপানি জিনিসের দাম আকাশ-ছোঁয়া। তুলনায় চীনে জিনিস কিছুটা সস্তা। দোতনবড়ি মার্কেটটি স্থানীয় ব্যবসাদার ইয়াসুই দোতনের নামে তৈরি।

বিরাট লাইন দিয়ে টিকিট কাটার পর দুর্গের ভিতরে প্রবেশ করলাম। এখন এটি আধুনিক মিউজিয়াম। ছয় তলা অবধিই হেঁটে উঠলাম, জন বাহুল্যে লিফটে চড়ার সুযোগ সীমিত। সাজানো আছে সামুরাইদের পোশাক পরিচ্ছদ, তরোয়াল, শিরস্ত্রাণ আর আদি দুর্গ-নির্মাতা টয়োটোমি হিডেয়োশীর জীবন ছবি, কিছু জাপানি পেন্টিং।

জাপানে আগে বাঘ ছিল না, তাই পেন্টিং-এর বাঘের চেহারাটা এক কিম্ভুত দর্শনের। পুরো এলাকায় প্রচুর সাদা চেরি গাছ। আটতলায় ডেকে দাঁড়িয়ে চারদিক পর্যবেক্ষণ করা যায়। কিন্তু হাঁটু বিদ্রোহ করতে লাগল। এই চত্ত্বরেই নতুন গড়ে ওঠা টয়োটোমি স্টোন ওয়াল মিউজিয়াম দেখতে হবে। সেখানে ছবি তোলা বারণ। দেখলাম চারশো বছর আগেকার ভেঙে যাওয়া দুর্গের ধ্বংবশেষের অজস্র স্মারক।

Japan Travel 5
ওসাকা দুর্গে প্রবেশ পথের চেরি

শেষ দুপুরে চললাম দোতনবড়ি মার্কেট। জনমানব পরিপূর্ণ বাজার। মাঝে চলে গেছে শিনসাইবাশি –সুজি শপিং স্ট্রিট। জাপানি জিনিসের দাম আকাশ-ছোঁয়া। তুলনায় চীনে জিনিস কিছুটা সস্তা। দোতনবড়ি মার্কেটটি স্থানীয় ব্যবসাদার ইয়াসুই দোতনের নামে তৈরি। বাজারের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে সরু আকারের দোতনবড়ি নদী, যার মধ্যে দিয়ে কুড়ি মিনিট জলবিহার করা যায়। ভাল লাগল রাস্তার শিল্পকর্মের নিরিখ ম্যানহোলের ঢাকনা।

নদীর ওপর এবিসু ব্রিজে দাঁড়িয়ে কোজিকে বললাম অনেক কিছু দেখালে, কিন্তু জাপানি ধারার ফুলসজ্জা ইকেবানা, দেখব না? কোজি বলল, তুমি মার্কেটিং না করে ইকেবেনা দেখবে? বেশ চলো, মিনিট পনেরো পথ হাঁটতে হবে, সেবং বিল্ডিং এ মাইকোয়াতে চা-প্রস্তুতি, কিমানো পরে ছবি তোলা, ইকেবেনার ওয়ার্কশপ হয়, সাতটা অবধি খোলা থাকে। যদি তোমার কপাল ভাল থাকে, এক্সট্রা ফি দিয়ে দেখতে পারো।

সত্যি! ভাগ্যে থাকলে ইচ্ছে পূরণ হয়। মেয়েটির নাম সাকুরা-কো। ছেলেটি নোনোগাকি। ওদের কাঠের বাড়ির, ছিমছাম বসার ঘর পেরিয়ে ভিতরে আরেকটি ঘরে দেখলাম জাপানি ফুলসজ্জা ইকেবেনার ব্যবস্থা।

সেবং বিল্ডিং-এর নিচের তলার কাঠের দরজা আর কাপড়ের পর্দা পেরোতেই ভিতরে একেবারেই ট্রাডিশনাল চেহারা ছোট ছোট পাথর আর বাসের চারা দিয়ে তৈরি বাগান। বেশ আশান্বিত হলাম। কিন্তু রিসেপশনে জিজ্ঞাসা করে জানা গেল যে সমস্ত বুকিং সম্পূর্ণ। তুমি যতই বিদেশি টুরিস্ট হও, আগে থেকেই রিজার্ভ করা না থাকলে কিছুই দেখতে পাবে না। রিসেপশনে দাঁড়িয়ে ছিল দুটি অল্পবয়সি ছেলেমেয়ে। ইংরেজি বোঝে। আমার হতাশ মুখ দেখে বলল, সত্যি দেখতে চাও?

মহা উৎসাহে ঘাড় নাড়ি। ওরা তখন কোজির সঙ্গে কথাবার্তা বলতে লাগল। জানলাম, ওরা এখানে ইকেবেনার আডভ্যান্সড কোর্সের স্টুডেন্ট। কাছেই ওদের বাড়ি, ইচ্ছে করলে অল্প কিছু টাকা দিলেই ওরা আধঘণ্টা সময় দিয়ে আমাদের প্রাইমারি আরেঞ্জমেন্ট দেখাতে পারে।

Japan Travel 5
তদাজি মন্দিরে বুদ্ধের রেপ্লিকা

সত্যি! ভাগ্যে থাকলে ইচ্ছে পূরণ হয়। মেয়েটির নাম সাকুরা-কো। ছেলেটি নোনোগাকি। ওদের কাঠের বাড়ির, ছিমছাম বসার ঘর পেরিয়ে ভিতরে আরেকটি ঘরে দেখলাম জাপানি ফুলসজ্জা ইকেবেনার ব্যবস্থা। বিচিত্র ঢঙে ফুলদানিতে ফুল সাজানো রয়েছে। জাপানের এই বিশিষ্ট শিল্পের জন্ম ত্রয়োদশ শতকে। ছেলেটি ইংরেজিতে বলে যাচ্ছিল, মেয়েটি হাতে-কলমে দেখাচ্ছিল।

এই টেকনিকে ফুলের জীবন, জীবনের সংগ্রাম, সৌন্দর্যের প্রকাশ ইত্যাদি এমনভাবে সাজিয়ে দেওয়া হয় যাতে মানুষ তার থেকে অনুপ্রাণিত হতে পারে। শুধু ফুল নয়, পাতা, ডাল, শুকনো গাছের ছাল সবই লাগে। এই পুষ্পসজ্জার নিয়ম যেমন কোন ডাল কত দীর্ঘ হবে, কত ডিগ্রি বেঁকে থাকবে, তেমনি কোথায় কাকে বসাতে হবে, এ শুধু নিছক মাপজোখ নয়, নিয়ন্ত্রণের বেড়াজালে শিল্পী এখানে বাঁধা, কারণ ঈশ্বর স্বয়ং মানুষের শরীরে আগে থেকেই সব স্থির করে রেখেছেন।

পুষ্পসজ্জায় মনে রাখতে হয়, বাহ্যিক গঠনের মূল সূত্র হচ্ছে তাই শিন-(মানুষ) সো-(স্বর্গ) তাই-(মর্ত্য)। এই তিনটি স্তর। সবার নিচে স্বর্গ আর সবচেয়ে উপরে মানুষ। পুষ্পসজ্জার অনেক আধুনিকীকরণ হয়েছে। সেসব অনেক জটিল বিষয়।

তা বলে কি তাদের মধ্যে বৈচিত্র নেই? ইকেবেনার মূল সূত্র হল ইন বা নেগেটিভ আর ইউ বা পজিটিভ, —এদের মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করা। সৃষ্টির মূলেও আছে এই অস্তি আর নাস্তির বাহার। মৃত্যু হল ইন, জীবন হল ইউ। অন্ধকার ইন, আলো ইউ। গাছের পাতার যে অংশে ক্লোরোফিল, পাপড়ির সামনের অংশ, তারা ইউ, বিপরীত দিক ইন।

পুষ্পসজ্জায় মনে রাখতে হয়, বাহ্যিক গঠনের মূল সূত্র হচ্ছে তাই শিন-(মানুষ) সো-(স্বর্গ) তাই-(মর্ত্য)। এই তিনটি স্তর। সবার নিচে স্বর্গ আর সবচেয়ে উপরে মানুষ। পুষ্পসজ্জার অনেক আধুনিকীকরণ হয়েছে। সেসব অনেক জটিল বিষয়। ছবি তুলতে চাইলাম। দেখলাম রাজি নয়।

কারণ হিসেবে বলল, ওরা যেহেতু এখন ট্রেনিং নিচ্ছে, তাই এসবের ডক্যুমেন্ট করা যাবে না। জাপানি চা খাইয়ে আসর শেষ হল। ওরা দু’জনে এখন সহবাস করছে, পরে হয়তো বিয়ের পর এইটা নিয়েই কেরিয়ার করবে। আমরা দু’হাজার ইয়েন সাম্মানিক দিলাম। দু’জনেই হেসে কোমর ঝুঁকিয়ে বলল, ‘দোমো আরিগাতো’ (অসংখ্য ধন্যবাদ)। মাতা আইমাসো (আবার দেখা হবে)।

মন বেশ খুশি। আমাদের সহযাত্রীরা প্রচুর কেনাকাটি করেছে। আমি তৃপ্ত অন্যভাবে। একটা সংস্কৃতির কিছু অন্তত দেখা হল।

এরা নিজেদের ভাষা ছাড়া অন্য ভাষা শিখতে নারাজ। শরীরী ভাষায় বরং স্বচ্ছন্দ। সে ওসাকার বুদ্ধ মন্দির প্রাঙ্গণে হোক, অথবা শহরে, গ্রামে সর্বত্র। হোটেলে বরং বাংলাদেশি, নেপালি, ভারতের গুজরাটি, উত্তরপ্রদেশবাসীরা ইংরেজি বলে, আর বলে রেল স্টেশনে, এয়ারপোর্টে।

রাতের ডিনার ছিল বিরাট এক ইন্ডিয়ান রেস্ট্যুরেন্টে, কিন্তু খাবার ইন্ডিয়ান, জাপানি, কন্টিনেন্টাল সব ছিল আর ছিল প্রচুর ড্রিংকসের ব্যবস্থা। খাওয়ার পর বেশ অনেক রাত অবধি নাচের হুল্লোড় চলল, সুরা আর আনন্দের সম্মিলিত প্রভাবে। রাতে যখন হোটেলে ফিরলাম, ফোনের অ্যাপ জানাল, আজ আমি ষোল কিলোমিটার পথ হেঁটেছি। তা হোক, অদ্য শেষ রজনী।

গত রাতের নির্ভার ঘুমের পর সকালে উঠেই মনে হল, গত কয়েকদিন ধরে জাপানের কয়েকটি শহরে ঘোরার স্মৃতি নিয়ে আজ ফিরে যাব। জাপান ভ্রমণ যেন তড়িঘড়ি রবীন্দ্র রচনাবলী শেষ করে ফেলার চেষ্টা। দু’চারটে গীতিকবিতা, গুটিকয়েক গল্প, খানকয় প্রবন্ধ, আর উপন্যাস খামচে খামচে দেখা। এখানে আসার আগে ১৯১৬ সালে রবীন্দ্রনাথের জাপান যাত্রী শিরোনামের লেখাটি পড়ে এসেছিলাম। কবির দেখা জাপান গত একশো বছরের পরে স্বভাবতই অনেক বদলে গেছে। তবে বদলায়নি তাদের পরিশ্রম ক্ষমতা, অধ্যাবসায়, নিয়মানুবর্তিতা, খাদ্যাভ্যাস।

Japan Travel 5
দুর্গে প্রবেশের পথে

এরা নিজেদের ভাষা ছাড়া অন্য ভাষা শিখতে নারাজ। শরীরী ভাষায় বরং স্বচ্ছন্দ। সে ওসাকার বুদ্ধ মন্দির প্রাঙ্গণে হোক, অথবা শহরে, গ্রামে সর্বত্র। হোটেলে বরং বাংলাদেশি, নেপালি, ভারতের গুজরাটি, উত্তরপ্রদেশবাসীরা ইংরেজি বলে, আর বলে রেল স্টেশনে, এয়ারপোর্টে। দর্শনীয় স্থানেও নিজের ভাষার প্রতাপ বেশি। না হলে প্রাকৃতিক তাড়নায় ব্যস্ত হয়ে হিরোশিমা মিউজিয়ামের ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জডদের ওয়াশরুমে ঢুকে মস্ত বিপদে পড়ি? জাপানিতে লেখা কমোড ব্যবহারের নিয়ম না বুঝে ভুল বোতাম টিপে, সিকিউরিটির কাছে নিজের শরীর স্বাস্থ্যের গাদা গাদা জবাবদিহি করতে হয়?

কয়েকদিনের অনেক স্মৃতি। বিভিন্ন রঙের চেরি ফুল, মাচা-চা-পানের স্মৃতি, জাপানি গাইড কোজি, ভারতীয় গাইড সাগ্নিক, কদিনের যাত্রা সঙ্গী, সবার কথা স্মৃতির ঝুলিতে ভরে নিয়ে ভোরেই ওসাকার হোটেল ছাড়লাম। বাইরে তখন জাপানের বিখ্যাত ঘ্যানঘেনে বৃষ্টি আর কনকনে হাওয়া। চল্লিশ কিলোমিটার পথ আর প্রায় চার কিলোমিটার লম্বা স্কাই-গেট ব্রিজ পেরিয়ে এলাম কৃত্রিম দ্বীপ কানসাই ইন্টারন্যাশানাল এয়ারপোর্টে। এখান থেকে কুয়ালালামপুর হয়ে কলকাতা যেতে রাত বারোটা বাজবে।

কলকাতায় নামলাম, রাত বারোটা বেজে গেছে। গাড়ি ছুটছে বাড়ির দিকে। কানে বাজছে কোজির সঙ্গে শেষ কিছু কথোপকথন

ভাল কথা, এদেশে ভিক্ষাজীবী দেখতে পাইনি। সবাই এখানে প্রচুর ভাত খায়, না খেটে আমাদের দেশের মতো ভাতাজীবী হয়ে বাঁচতে চায় না।

কলকাতায় নামলাম, রাত বারোটা বেজে গেছে। গাড়ি ছুটছে বাড়ির দিকে। কানে বাজছে কোজির সঙ্গে শেষ কিছু কথোপকথন, তানোশি ওমেওইডো

মানে?

ও ইংরেজিতে বলল, হ্যাপি মেমোরিস।

স্বশিক্ষিত কায়দায় কোমর ঝুঁকিয়ে উত্তর দিই, আরিগাতো।

ও আবার বলল, মাতা নে।

আমি হাসি, হন তো? (সত্যি নাকি?)

ও হাত নেড়ে হাসে, আরিগাতো! আরিগাতো!

গাড়িতে পাশের মানুষটি প্রশ্ন করে, রাত দুপুরে কি বিড়বিড় করছ?

বাড়ি এসে গেছে।

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Please login to bookmark Close
Picture of কৃষ্ণা রায়

কৃষ্ণা রায়

কৃষ্ণা রায় ছোট গল্পকার ও প্রাবন্ধিক। পেশা শারীরবিদ্যায় অধ্যাপনা। বেথুন কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ্যা। গত দুই দশকের বেশি সময় সৃজনমূলক বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত। নবকল্লোল, শিলাদিত্য, সাপ্তাহিক বর্তমান, শুকতারা, প্রমা, বসুমতী, আনন্দবাজার রবিবাসরীয় সংখ্যা, চিরসবুজ লেখা, অনুবাদ পত্রিকা প্রভৃতিতে লেখা প্রকাশিত। ছোটগল্প, উপন্যাস, জীবনী গ্রন্থ, প্রবন্ধ সংকলন ইত্যাদি নিয়ে সাহিত্য বিষয়ক প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২০। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ 'উপেক্ষিত নারী বিজ্ঞানী', 'আগুন ডানার পাখি সরলা দেবী চৌধুরাণী', 'যে দিন গেছে ভেসে'।

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Please login to bookmark Close

The Banglalive's Picks

Weekly Newsletter

Enjoy our flagship newsletter as a digest delivered once a week.

By signing up, you agree to our User Agreement and Privacy Policy & Cookie Statement.

Please login to bookmark Close
ভ্রমণের নবম দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই মনে হল আজ জাপানের সভ্যতার আদিপর্ব চাক্ষুষ করব। ব্রেকফাস্ট সেরে ওসাকা শহর ভ্রমণের জন্য রেডি হতেই আমাদের নির্দিষ্ট কোচ হোটেলের সামনে এসে হাজির। জাপানি ড্রাইভার হাসি মুখে বলল, ও-হা-য়ো! অর্থাৎ গুড মর্নিং। প্রত্যুত্তর দিয়ে হাসি। লিখছেন কৃষ্ণা রায়...
Please login to bookmark Close
নামিবিয়া এমন একটি দেশ যেখানে আটলান্টিক মহাসাগরের নীল জল এসে আছড়ে পড়ে পৃথিবীর প্রাচীনতম মরুভূমির বুকে। সেই বৈপরীত্যের সুরে তাল মিলিয়ে শুরু হল এই নামিবিয়া যাত্রা। আকাশ থেকে দেখে মনে হচ্ছিল কেউ যেন বিস্তীর্ণ এক ক্যানভাসে লাল, হলুদ আর কমলার আবির ছড়িয়ে দিয়েছে। লিখছেন বন্দনা দাশগুপ্ত সেন...
Please login to bookmark Close
টোকিওর পশ্চিম দিকের এই শিজুয়োকা এলাকাটা জাপানের বিখ্যাত গ্রিন টি চাষের জন্য। আজ মেঘলা দিন। আমাদের গন্তব্য একটি বিখ্যাত বিস্তৃত চা বাগান। যাত্রাপথের দু’ধারে ঘন জঙ্গল আর শুধু সাদা চেরি ফুলের গাছ। লিখছেন কৃষ্ণা রায়...

Subscribe

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com