(Homestay Earning)
সম্প্রতি দার্জিলিং বেড়াতে গিয়েছিলাম আমার তিন অতি প্রিয় বন্ধু মৌসুমী, কুমকুম এবং কাজলের সঙ্গে। এইখানে চুপি চুপি বলে রাখি, এটাই আমার প্রথম দার্জিলিং দর্শন। পাহাড়ে আগে কয়েকবার বেড়াতে এলেও, দার্জিলিং-এ আসার সুযোগ এতদিন হয়নি। পাহাড়ি রাস্তার চুলের কাঁটার মতো তীক্ষ্ণ বাঁক ধরে শহরের দিকে যেতে যেতে একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম– সেটা হল যত্রতত্র ছোট-বড়-মাঝারি হরেক কিসিমের বাড়ির গায়ে সাইনবোর্ড, যাতে লেখা নানা শব্দ, কমন শুধু: ‘___ হোমস্টে’। ত্রিশ বছর আগে পাহাড়ে বেড়াতে এসে এই দৃশ্য দেখিনি!
আমার ছোটবেলা অর্থাৎ সত্তর-আশির দশকে, সপরিবারে কলকাতার বাইরে বেড়াতে যাওয়া মানে ছিল কোনও নিকটাত্মীয়, বা বাবার বিশেষ কোনও বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে ওঠা। অনেক বাঙালি পরিবার বছরে অন্তত দু’বার ‘চেঞ্জে’ যেতেন পশ্চিমের দিকে নিজস্ব বাড়িতে। আর ছিল বাঙালির চিরকালের কুন্ডু স্পেশাল, এবং বহু পরিচিত অতিথি নিবাস বা ‘Guest House’।
আরও পড়ুন: মধুসূদন দাদা ও মিউচুয়াল ফান্ড
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবন পাল্টে গেছে। পর্যটন শিল্পও বাঙালির ভ্রমণের নেশার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। নিত্যনতুন গন্তব্যস্থল, আতিথেয়তা পরিষেবার সঙ্গে তৈরি হয়েছে নতুন পরিভাষা। এসেছে সোলো বা গ্রুপ ট্যুর প্যাকেজ, ট্যুর অপারেটর, ট্রাভেল এজেন্ট, রিসর্ট, হোটেল ইত্যাদি। সর্বোপরি, ২০১২-২০১৩ সাল থেকে ইন্টারনেটের দৌলতে প্রায় সব কিছুই অনলাইন হয়ে গেছে। সবরকম বুকিং আজকাল হাতের নাগালের মধ্যে চলে এসেছে– স্রেফ একটা ক্লিকের অপেক্ষা। তারপর একে একে এসেছে ওয়ো (২০১২), এয়ারবিএনবি (বিশ্বে ২০০৮, ভারতবর্ষে ২০১২), এবং অতি অবশ্যই হোমস্টে।
যদিও হোমস্টে শিল্প যে আজকের নয়, তা জানতে পারলাম শান্তিনিকেতনের কাছে বিশ্বভারতী শিক্ষাঙ্গন থেকে ৭-৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রেয়ার আর্থ ফার্মস ও হোমস্টে-র মালিক শ্রী সুব্রত ঘোষ চৌধুরীর কাছ থেকে। অমায়িক, মৃদুভাষী মানুষটি কলকাতার বিখ্যাত আতিথেয়তা এবং শিক্ষা সংস্থার মালিক।

সুব্রতবাবুর মুখেই শুনলাম ১৯৯৪ সালে কীভাবে শ্রী রাজ বসুর নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল দার্জিলিং-কালিম্পং জেলাকে কেন্দ্র করে অ্যাসোসিয়েশন ফর কনসার্ভেশন অব ট্যুরিজম, যার মূল লক্ষ্য ছিল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে উৎসাহ দেওয়া এবং স্থানীয় মহিলাদের রোজগারের সুযোগ করে দেওয়া। পশ্চিমবঙ্গের পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসীদের নিজের বাড়িতেই একাধিক অব্যবহৃত কামরাকে অতিথিশালায় পরিণত করার যাত্রা সেই থেকে শুরু।
এবার ২০২০ সালে এল কোভিড-১৯ নামক দুর্যোগ; তার সঙ্গে এল সংক্রমণের আতঙ্ক এবং দমবন্ধ করা লকডাউন। চলল ২০২২ সাল অবধি। তার থেকে বেরিয়ে কোভিড পরবর্তীকালে বাঙালির ভ্রমণের ধারা এবং গতিপ্রকৃতিতে এল গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
এই সবকিছুই আছে হোমস্টেতে; এবং পশ্চিমবঙ্গের অসাধারণ ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এই ধরনের স্বল্পদৈর্ঘ্যের সফরের জন্য আদর্শ। বাংলার জল, বাংলার মাটির সুগন্ধে ভরপুর অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝে ঘরের বাইরে ঘরের আস্বাদ– এর মাদকতা অনস্বীকার্য।
আধুনিক পর্যটকরা- বিশেষত মিলেনিয়ালস এবং অতিমারি-পরবর্তী ভ্রমণকারীরা— আজকাল ক্রমশই খরচসাপেক্ষ, বাঁধাধরা বড় হোটেল বা রিসর্টের বদলে অন্তরঙ্গ আতিথেয়তা পছন্দ করছেন। তাঁরা চান স্থানীয় খাবার, সাংস্কৃতিক মিলন, প্রকৃতির সান্নিধ্য এবং পারিবারিক উষ্ণতা।
এই সবকিছুই আছে হোমস্টেতে; এবং পশ্চিমবঙ্গের অসাধারণ ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এই ধরনের স্বল্পদৈর্ঘ্যের সফরের জন্য আদর্শ। বাংলার জল, বাংলার মাটির সুগন্ধে ভরপুর অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝে ঘরের বাইরে ঘরের আস্বাদ– এর মাদকতা অনস্বীকার্য।

সহজ ভাষায়, একটি পরিবার তাদের দরজা খুলে দেয় অতিথিদের জন্য— শুধু একটি শয়নকক্ষ নয়, কাঠের উনুনে রান্না করা খাবার, আগুনের পাশে বলা গল্প, স্থানীয়দেরই চেনা কোনও বনপথ দিয়ে হাঁটা। এই মডেল— যেখানে আতিথেয়তা আর লোকসংস্কৃতি মিলেমিশে একাকার— দ্রুত হয়ে উঠছে পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
দার্জিলিং-এর পাহাড়ে, ডুয়ার্সের চা বাগানে, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যে এবং বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা গ্রামে এক নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটে চলেছে। নদী ও ধানখেতের ধারে বসতিগুলিতে অতিরিক্ত শোবার ঘরে, পরিবর্তিত কুটিরে— পশ্চিমবঙ্গের হোমস্টে শিল্প বদলে দিচ্ছে পর্যটকদের দৃষ্টিকোণ, আর বদলে দিচ্ছে স্থানীয় পরিবারগুলির জীবিকার পথ।
তবে অবশ্যই অন্যান্য ব্যবসার মতোই হোমস্টে উদ্যোগের উপরেও কোভিডের আঘাত পড়েছিল। ২০২০ এবং ২০২১ সাল বিশ্বব্যাপী পর্যটন ছিল বিপর্যয়গ্রস্ত। ২০২০ সালের মার্চ-এপ্রিলে ভারতের পর্যটন শিল্পের পতনের হার ছিল ৯৭ শতাংশ।
এবার আসা যাক কিছু তথ্য ও সংখ্যায়। তিন দশক আগে শুরু হওয়া সেই যাত্রা যে এতদিনে একটা লাভজনক ব্যবসায়িক লগ্নির জায়গা হয়ে উঠছে, সেটা আশ্চর্যজনক নয়। গত ২০২৪ সালে ভারতের হোমস্টে খাত থেকে প্রায় ৪,৭২২ কোটি টাকা রাজস্ব উৎপন্ন হয়েছে। ২০৩১ সাল পর্যন্ত এই রাজস্ব বার্ষিক প্রায় ১১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
সারা বিশ্বে ২০২৪ সালে হোমস্টে বাজারের মূল্য ছিল ১৯,৫৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল— যেখানে পশ্চিমবঙ্গ অবস্থিত— সেখানে এই শিল্প সবচেয়ে দ্রুত গতিতে বাড়ছে। ২০৩১ সাল পর্যন্ত অনুমানিক ৯.২ শতাংশ CAGR (Compound Annual Growth Rate)-এ।

এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ আলাদাভাবে নজর কেড়েছে। রাজ্য পর্যটন দফতরের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের মতে, পশ্চিমবঙ্গে হোমস্টেগুলি ৩০ শতাংশেরও বেশি CAGR-এ প্রসারিত হচ্ছে— জাতীয় গড়কে অনেক পিছনে ফেলে। রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রক থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু উত্তরবঙ্গেই প্রায় ৩,০০০টি নিবন্ধিত (রেজিস্টার্ড) হোমস্টে রয়েছে, যেগুলি পাহাড়, ডুয়ার্স এবং বনের প্রান্তভাগে কেন্দ্রীভূত। অনানুষ্ঠানিক ও অনিবন্ধিত হোমস্টেগুলিকে নিয়ে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
তবে অবশ্যই অন্যান্য ব্যবসার মতোই হোমস্টে উদ্যোগের উপরেও কোভিডের আঘাত পড়েছিল। ২০২০ এবং ২০২১ সাল বিশ্বব্যাপী পর্যটন ছিল বিপর্যয়গ্রস্ত। ২০২০ সালের মার্চ-এপ্রিলে ভারতের পর্যটন শিল্পের পতনের হার ছিল ৯৭ শতাংশ।
২০২০ সালের পিক সিজন— অক্টোবর থেকে মার্চ— পর্যটন ছিল সম্পূর্ণ বন্ধ এবং ২০২১ সালেও গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের হোমস্টে পরিচালকদের জন্য (যাঁদের অধিকাংশেরই কোনও আর্থিক সঞ্চয়, কর্পোরেট সহায়তা বা বিকল্প আয়ের পথ ছিল না), এ ছিল প্রাণ ধারণের সংকট।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিজস্ব মূল্যায়ন বলছে, রাজ্যের সামগ্রিক পর্যটন শিল্পের ৭৫ শতাংশ-এরও বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শ্রেণিতে পড়ে, এবং বিশেষত উত্তরবঙ্গে গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণের ক্ষতি সমগ্র অঞ্চলের পরিচালকদের পঙ্গু করে দিয়েছিল।

কিন্তু মেঘের আড়ালেও সূর্য হাসে। কোভিডের ফলে এমন কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছিল যার দৌলতে বৃহত্তর এবং প্রচলিত ধরনের আতিথেয়তার তুলনায় হোমস্টে মডেলের পক্ষে সুবিধাই হয়েছে।
পর্যটকের দৃষ্টিভঙ্গিতে অতিমারির ফলে ভ্রমণের উদ্দেশ্য এবং চরিত্র অনেক বদলে গেছে। উন্মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ, শহরের ভিড়ভাট্টা থেকে দূরে, একান্ত নিজস্ব একটি শান্তির নীড় (কিছুদিনের জন্য হলেও) মানুষকে বেশি করে টানছে। অতিমারির জন্য ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ থেকে উদয় হয়েছে ওয়ার্কেশন (workcation) অর্থাৎ কর্ম-অবকাশ। বিদেশযাত্রার থেকে মানুষ এখন দেশীয় ভ্রমণের দিকেই ঝুঁকছেন।
দার্জিলিং পাহাড় ও কালিম্পং, ডুয়ার্স (পূর্ব হিমালয়ের পাদভূমি ও ভুটান সীমান্তবর্তী বন্যা-সমতলভূমি), সুন্দরবন, পুরুলিয়া ও বাঁকুড়া, দক্ষিণ ২৪ পরগণা (সুন্দরবনের বাইরে)– এই সব জায়গাগুলিতে হোমস্টে শিল্প ফুলেফেঁপে উঠেছে গত কয়েক বছরে।
হোমস্টে মালিকদের মধ্যে অতিমারির বিধ্বংসী প্রভাব কাটিয়ে যাঁরা ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, তাঁরা ২০২০-২০২১ সালের পতন থেকে বেঁচেছেন তাঁদের উদ্ভাবনী শক্তি এবং সংগঠনের জোরে। অনেকেই এনেছেন পরিষেবাতে নানা বৈচিত্র্য যেমন organic ফুড প্যাকেজ, স্থানীয় অভিজ্ঞতার সংযোজন, অগ্রিম বুকিং ব্যবস্থায় জোর দেওয়া, সমাজমাধ্যমের সাহায্যে নেটওয়ার্কিংয়ের সুবিধা।
তা ছাড়া কোভিডের কারণে হোমস্টে মালিকদের কিছুটা বাধ্য হয়েই অফিসিয়াল রেজিস্ট্রেশন করতে হয়েছিল— তা সে সরকারি ত্রাণ পেতেই হোক, বা অতিথিদের নিরাপত্তার বিষয়ে আশ্বস্ত করার জন্যই হোক। ডিজিটাল মাধ্যম অবলম্বন করার সুফল যেভাবে হোমস্টে শিল্পকে সাহায্য করেছে, সেটাও শিক্ষণীয়। OTA প্ল্যাটফর্ম, গুগল রিভিউ এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে নিজস্ব উপস্থিতি গড়ে তোলা যে কত জরুরি সেটা অতিমারির পর থেকেই হোমস্টে মালিকরা আরও গভীরভাবে বুঝেছেন।

তাই ২০২২ সাল থেকে সব বিধিনিষেধ উঠে যাওয়ার পর যে পুনরুজ্জীবন হল, সেটা অসাধারণ। দার্জিলিং পাহাড় ও কালিম্পং, ডুয়ার্স (পূর্ব হিমালয়ের পাদভূমি ও ভুটান সীমান্তবর্তী বন্যা-সমতলভূমি), সুন্দরবন, পুরুলিয়া ও বাঁকুড়া, দক্ষিণ ২৪ পরগণা (সুন্দরবনের বাইরে)– এই সব জায়গাগুলিতে হোমস্টে শিল্প ফুলেফেঁপে উঠেছে গত কয়েক বছরে।
এবার প্রশ্ন হল, এই ব্যবসা কতটা লাভজনক?
পিক সিজন পাহাড়ে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এবং মার্চ থেকে মে, ও সুন্দরবনে শীতকালীন মাসগুলিতে। পর্যটক বেশি হতে পারে, এবং তিনটি ঘর চালানো একটি পরিবার মাসে ১৫,০০০ থেকে ২৫,০০০ টাকা বা তারও বেশি উপার্জন করতে পারে।
বেশি পরিসংখ্যানের মধ্যে না গিয়েও এটুকু বলা যায় যে অর্থনীতি মোটামুটি অনুকূল। একটি হোটেল নির্মাণের তুলনায় প্রাথমিক বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম: এক থেকে তিনটি অতিরিক্ত ঘর রূপান্তরকারী একটি পরিবারের খরচ মূলত আসবাবপত্র, জল-বিদ্যুতের সংযোগ এবং সম্ভবত দেওয়ালে এক প্রস্থ রং। দার্জিলিং অঞ্চলে হোমস্টে মালিকদের গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৫৬ শতাংশ হোমস্টে মালিক এই খরচ ব্যক্তিগত সঞ্চয় থেকে দিয়েছেন, ঋণের প্রয়োজন সামান্যই হয়েছে।
পিক সিজন পাহাড়ে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এবং মার্চ থেকে মে, ও সুন্দরবনে শীতকালীন মাসগুলিতে। পর্যটক বেশি হতে পারে, এবং তিনটি ঘর চালানো একটি পরিবার মাসে ১৫,০০০ থেকে ২৫,০০০ টাকা বা তারও বেশি উপার্জন করতে পারে। ডুয়ার্সে, পিক সিজনে জোগানের চেয়ে চাহিদা অনেক বেশি থাকে, অতিথির অভাব হয় না।

তবে সব ব্যবসার মতোই এতে সুবিধা-অসুবিধা দুইই আছে। একদিকে আছে সামান্য বিনিয়োগ, স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ, মহিলাদের ক্ষমতায়ন, পরিবেশ আনুকূল্যের মতো সুবিধা। তাছাড়া, এখানে পর্যটন রাজস্ব সরাসরি স্থানীয় মানুষদের হাতেই থাকছে, কোনও কর্পোরেট মধ্যস্থতা ছাড়াই।
অপর দিকে আছে নানারকম চ্যালেঞ্জ। মরশুমি চাহিদা আয়ের অনিশ্চয়তা তৈরি করে। যাঁরা শুধুমাত্র হোমস্টে আয়ের উপর নির্ভর করেন, তাঁরা নগদের সংকটে পড়তে পারেন। বুদ্ধিমান পরিচালকরা অন্যভাবে (যেমন ট্রেকিং প্যাকেজ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা জৈব খামারের অভিজ্ঞতা দিয়ে) অতিথি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেন।
এর থেকেও বড় সমস্যা হল, পরিবেশকে তোয়াক্কা না করেই মুনাফার লোভে খেয়ালখুশি মতো গৃহনির্মাণ। যেখানে নির্মাণকাজ করলে পাহাড়, নদী, বনজ সম্পদের ক্ষতি হবে, সেখানে শুধুমাত্র পর্যটন শিল্পকে প্রাধান্য দিলে যে সমূহ বিপদ, সেটা অনেক হোমস্টে মালিক বোঝেন না।
পরিকাঠামোর ঘাটতি (দুর্বল সড়ক সংযোগ, অনিয়মিত বিদ্যুৎ, সীমিত জল সরবরাহ এবং দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ), ঋতুনির্ভরতা, মানের অসামঞ্জস্য, নিবন্ধনের জন্য একাধিক নথি (অগ্নি নিরাপত্তা সনদ, স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন সনদ, পুলিশ যাচাই, স্থানীয় পঞ্চায়েত বা পৌরসভার এনওসি এবং আরও অনেক কিছু) এই সবই ব্যবসার ক্ষেত্রে নানা জটিলতা সৃষ্টি করে। এই সব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন সরকারি সাহায্য।
এর থেকেও বড় সমস্যা হল, পরিবেশকে তোয়াক্কা না করেই মুনাফার লোভে খেয়ালখুশি মতো গৃহনির্মাণ। যেখানে নির্মাণকাজ করলে পাহাড়, নদী, বনজ সম্পদের ক্ষতি হবে, সেখানে শুধুমাত্র পর্যটন শিল্পকে প্রাধান্য দিলে যে সমূহ বিপদ, সেটা অনেক হোমস্টে মালিক বোঝেন না।
অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গ সরকার নানা ভাবে সহায়তার চেষ্টা করছে। অতিমারি পরবর্তী কালে চালু হয় ২০২১-এর পর্যটন সহায়তা প্রকল্প। এটি একটি কার্যকরী মূলধন (working capital) সহায়তা প্রকল্প, যা বিশেষভাবে পর্যটন ব্যবসাগুলিকে অতিমারি থেকে পুনরুদ্ধারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এই প্রকল্পে দেওয়া হয়েছিল জাতীয় ব্যাংক ও সমবায় ব্যাংকের মাধ্যমে প্রথম বছরে ঋণের উপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ ভর্তুকি।
২০২২ সালে আনা পশ্চিমবঙ্গ হোমস্টে পর্যটন নীতি-র মাধ্যমে প্রতিটি নিবন্ধিত হোমস্টেকে সরকার থেকে দেওয়া হয় দুটি কিস্তিতে ১ লাখ টাকা নগদ, তিন বছরের বিলাসিতা করছাড়, গার্হস্থ্য হারে বিদ্যুৎ ও জলের চার্জ। এই মডেলের পারিবারিক চরিত্র সংরক্ষণের জন্য বেঁধে দেওয়া হয় প্রতি ইউনিটে সর্বোচ্চ ছয়টি ঘরের (১২টি বিছানা) সীমা। এ ছাড়াও আছে দক্ষতা উন্নয়ন, উৎসব-কেন্দ্রিক পর্যটন প্রচার, ইকোট্যুরিজম টাস্ক ফোর্স এবং অন্যান্য প্রতিশ্রুতি।
জল-বিদ্যুৎহীন, পরিত্যক্ত সেই জমিতেই একটি মাটির বাড়ি দিয়ে স্থাপনা করলেন ওঁর হোমস্টে– আশেপাশের সাঁওতাল গ্রামগুলির অধিবাসীদের সাহায্যে। পরিবেশ রক্ষার্থে লাগালেন কয়েক হাজার গাছ।
সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে হোমস্টে শিল্পের ভবিষ্যৎ বেশ উজ্জ্বল। শ্রী ঘোষ চৌধুরীর কথাই ধরা যাক। চোদ্দ বছর আগে ২০১১ সালে শান্তিনিকেতন থেকে কিছুটা দূরে নিজের পরিবারের জন্য ভ্যাকেশন হোম বানানোর এই অভিলাষে শুরু করেছিলেন যাত্রা। খুঁজতে গিয়ে পেয়ে গেলেন একটি জনহীন অনুর্বর প্রান্তরের মাঝখানে এক বিশাল গাছ, আর কিছু কাঁটাঝোপ।
জল-বিদ্যুৎহীন, পরিত্যক্ত সেই জমিতেই একটি মাটির বাড়ি দিয়ে স্থাপনা করলেন ওঁর হোমস্টে– আশেপাশের সাঁওতাল গ্রামগুলির অধিবাসীদের সাহায্যে। পরিবেশ রক্ষার্থে লাগালেন কয়েক হাজার গাছ। সুব্রত বাবুর মতে, হোমস্টে শিল্প পশ্চিমবঙ্গে খুবই সম্ভাবনাময় কিন্তু স্থানীয় মানুষজন এবং এলাকার ভৌগলিক, প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে উপেক্ষা বা নষ্ট করে নয়।
এই সাবধানবাণী মাথায় রেখেই হোমস্টে পরিচালকদের এবং সরকারকে এগোতে হবে সামনের দিকে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
