(Shirshendu Mukhopadhyay)
২০২৪ সালের জুন মাস। যোধপুর পার্কের একতলার ফ্ল্যাটে সন্ধ্যা আটটা। কলকাতা গরমে ফুটছে। লেখকের তৃতীয়বার পেসমেকার পাল্টানোর ৭ দিনও হয়নি। চিকিৎসকের তাই নির্দেশ ছিল, সাতদিন পর দেখাসাক্ষাতের অনুমতি। কিন্তু সেদিন আমার রাত দু’টোয় ফ্লাইট বলে, ছ’দিনের মাথায় ভক্তের জন্য এযুগের এক জীবন্ত কিংবদন্তী কলমেশ্বরের ডাক এল।
‘যাও পাখি’ বইয়ের প্রচ্ছদের একটি আঁকা বসার ঘরে। এদিক ওদিক কিছু পুরস্কার স্মারক। একটিতে আবার কাঠের ওপর একটা বড় নিব। তিনদিকে সোফায় বসার ব্যবস্থা। হাতের ডানপাশে একটা চেয়ার।
আরও পড়ুন: কল্লোল যুগপিতার পরম্পরা
আমি প্রাণভরে ঘ্রাণ নেওয়ার চেষ্টা করছি চারপাশের। এই বাতাসেই জন্ম নেয় শব্দ, লেসের মতো নরম শব্দ জুড়ে গড়ে ওঠে একেকটি অমর উপন্যাস। মনোজগতের অদ্ভুত চরিত্রায়নের গপ্পো। সেলফোনে নয়, মেমোরি গেমের মতো সর্বশক্তি দিয়ে ঘরটির ছবি মাথায় গেঁথে নেওয়ার চেষ্টা করছি। চোখ বন্ধ করেও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
সেই প্রেক্ষাপটে লেখকের প্রবেশ। এখনও তীক্ষ্ণ স্মৃতি, তীব্র বুদ্ধিমত্তাপুষ্ট মগজ, স্পষ্ট কথা, উজ্জ্বল হাসিমুখ। এই সেই লেখক, যে মেয়েকে খোলা গলায় ডাকেন ‘মা—-মা—-’ বলে। ছেলেমেয়েরা সস্নেহে বাবাকে লেখার চাপ আর নিতে বারণ করেন। লেখক বলেন, “সারাজীবন ওরা দেখেছে লেখার ব্যাপারে কত নির্মম ও অমানুষিক খাটিয়ে ছিলাম আমি। খুব পরিশ্রম করেছি। সংসারের জন্য রাত দুটো তিনটে অবধি লিখেছি। এখন এই বয়সে আমার শ্রমের কষ্ট আর দেখতে চায় না ওরা।”

পাঠক তো ‘সন্তান’ নয়। তাঁরা ‘ভালবাসায়’ ও ‘উপাসনায়’— এক ‘নিষ্ঠুর দাবীদার’। তাই এক আর্তস্বর বেড়িয়েই পড়ে, “সে কী? আর লিখবেন না? ফরমাইসি না লিখলেও নিজের মতো করে?”
লেখক বোঝেন পাঠক মন, জানেন শান্ত করতে। বলেন, “লিখি তো, এমন নয় যে লিখি না। লিখবও। এবছরের পুজোসংখ্যায় হয়তো লিখব না।”
তুমি আসামের? আমি ওই জায়গাটি খুব ভাল করে চিনি। অনেকবার শিলচর গিয়েছি বাবার আশ্রমে ও কাজে। ছেলেবেলায় বদরপুর স্টেশনে আমার বাবা ছিলেন দু’বছর। রেললাইনের পাশে টিলা দেখেছ? তার ওপর বাড়ি ছিল।
নাছোড় পাঠক তবু আবার লেখার পথকেই উসকে দেয়, লেখকের সঙ্গে সম্পর্কের এই একটি পথই যে তার চেনা। সেই যোগসূত্র ছিঁড়ে যাওয়ার ভয় হয়।
পাঠক: “জীবনী লিখলেন না কেন?”
লেখক শূন্যে তাকিয়ে বলেন, ‘জীবনের কথা অনেক জায়গায় লিখেছি। কিন্তু ‘জীবনী’ লিখতে গেলে অনেক সমস্যা সামনে এসে দাঁড়ায়। কাজটি সোজা নয়।”
পাঠক তবু ‘অভিযানের’ রাস্তায় ঠেলে দেন লেখককে। বলি, “আপনার কথা আপনি না লিখলেও তো অনেকেই লিখবে। তাঁর চাইতে যাঁকে আপনি সবচাইতে বেশি চেনেন, তাঁর কথা আপনি লিখলেই তো ভাল।”

“ঠিকই বলেছ এটা।”- লেখকের মনের পালে হাওয়া লাগে।
পাঠকের নিজের ‘নির্মমতায়’ নিজের ‘পরাজয় অনুভব’ হয়।
লেখক: তুমি আসামের? আমি ওই জায়গাটি খুব ভাল করে চিনি। অনেকবার শিলচর গিয়েছি বাবার আশ্রমে ও কাজে। ছেলেবেলায় বদরপুর স্টেশনে আমার বাবা ছিলেন দু’বছর। রেললাইনের পাশে টিলা দেখেছ? তার ওপর বাড়ি ছিল। লামডিং-এ ছিলেন সবচাইতে বেশি। চার বছর।
সবুজেই বড় হয়েছি। তাই বর্ণময় জীবন। কত মানুষ দেখেছি জীবনে। কত মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে! পড়াশোনার অনেক ব্যাঘাত হয়েছে, কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও, জীবনের অভিজ্ঞতায় এগিয়ে চলেছি হয়তো।
পাঠক: আর আপনি?
লেখক: আমি বদরপুরে পড়াশোনা করে কুচবিহার চলে যাই। ছুটিতে ওইসব জায়গায় মা-বাবার সঙ্গে দীর্ঘদিন থাকতাম।
পাঠক: বদরপুরে থাকাকালীন আপনার বয়স কত ছিল?
লেখক: এই চৌদ্দ পনেরো।
পাঠক: তাহলে তো আপনি সবুজের সঙ্গে বড় হয়েছেন। সেই জন্যই আপনার লেখায় শব্দের অঙ্গ এত নরম, শিশির ভেজা ও স্নিগ্ধ।

লেখক: তা হয়েছি। সবুজেই বড় হয়েছি। তাই বর্ণময় জীবন। কত মানুষ দেখেছি জীবনে। কত মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে! পড়াশোনার অনেক ব্যাঘাত হয়েছে, কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও, জীবনের অভিজ্ঞতায় এগিয়ে চলেছি হয়তো। বাবা রেল-এ ছিলেন। সেই সময় সে অঞ্চলে এমন বুনো পাহাড় কেটে রেললাইন বানানো এবং সুরঙ্গ তৈরি, অনেক কঠিন কাজ ছিল। কতটা যে ভাবা যায় না। মিটার গেজ ছিল। ব্রিটিশরা তৈরি করেছিল। মনে আছে ইঞ্জিন পাল্টানো হত? দেখার মতো।
পাঠক: হ্যাঁ। ঢিমেতালে ট্রেনের জানলায় নিসর্গ দৃশ্যরা খুব আস্তে আস্তে পাল্টাত। জানেন, ‘লা নুইট বেঙ্গলী’- তে পড়েছিলাম যে, মির্চা ইলিয়াড ওই সময় এই লামডিং-এর রেলপথের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। লামডিং জাংশনে রেলের ইঞ্জিন পাল্টাতে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হত। সেই ‘মিটার গজের’ দিনগুলো পেরিয়ে ‘ব্রড গেজ’-কে সময়ের প্রয়োজন জেনেও আমি অন্তত উদযাপন করতে পারিনি। আপনার পাঠক হিসেবে আপনাকে একটা কথা জানাই। আমার ছোট কন্যার নাম ‘রেমি’। বড় কন্যার নাম ‘রু’। আমার স্বামী নিজেকে সংস্কারশূন্য মনে করেন। দাবিও করেন। কিন্তু যেদিন আমি জানালাম যে, আমার কন্যার নাম ‘রেমি’ রাখতে চাই, সেদিন তিনি তীব্র প্রতিবাদ করে ওঠেন, অনেক চাপাচাপিতে বলেন, এই নামের মেয়ে সুখী হয় না, হবে না।”
ধারাবাহিকের এই সংখ্যাটি পড়ে খুব রাগ হল কিছু অবিচারকারী চরিত্রদের ওপর। মনে হত এঁদের মুখও দেখব না আর। পরের সংখ্যায় আপনি এঁদের দৃষ্টিকোণ ও ব্যথা এমন করে বললেন, যে আজও আমি কোনও অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে ‘স্ট্যান্ড’ নিতে পারি না।
লেখকের মুখের উজ্জ্বল নিরুচ্চার হাসিতে ভরে গেল ঘর।
পাঠক: আপনার লেখার বিরুদ্ধে অভিযোগও আছে, যা আমি পুষে রেখেছি প্রায় চার দশক। সে জন্যই আসা।
লেখক তাকান। শোনার অপেক্ষায়।
পাঠক: ওই ‘দেশ’ পত্রিকায় উপন্যাস প্রকাশকালীন। ধারাবাহিকের এই সংখ্যাটি পড়ে খুব রাগ হল কিছু অবিচারকারী চরিত্রদের ওপর। মনে হত এঁদের মুখও দেখব না আর। পরের সংখ্যায় আপনি এঁদের দৃষ্টিকোণ ও ব্যথা এমন করে বললেন, যে আজও আমি কোনও অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে ‘স্ট্যান্ড’ নিতে পারি না। জীবনে খুব কষ্ট যে দেয়, তাঁরও দুঃখের দিকের দৃষ্টিকোণ খুঁজে বেড়াই।

লেখক হাসেন, শুধুই হাসেন। নিঃশব্দ সেই হাসি মুখ উপচে পড়ে নির্মল আলোয়।
পাঠক: আজকাল যে ধরনের উপন্যাস লেখা হয়, ভাষার ব্যাপারে আপনার কী মনে হয়?
লেখক: ভাষা তো পাল্টাবেই। সেটাই তো অভিপ্রেত। হওয়া উচিতও।
পাঠক: কিন্তু উপন্যাসের গঠনটাই যে পাল্টে গেল!
লেখক: দেখ, লেখা আসে, লেখক জীবনে কী দেখছে, কী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তার ওপর। এ তো বই পড়ে পড়াশোনা করে হয় না। জীবন যা দেখাচ্ছে, জীবনে যা দেখছ… তাই উপন্যাসে বা লেখায় উঠে আসবে। এবার সমাজ পাল্টাচ্ছে, প্রযুক্তির প্রভাব বাড়ছে। অভিজ্ঞতাগুলো যেমন হচ্ছে, তার ভিত্তিতেই উপন্যাসের ‘বিষয়’ ও ‘গঠন’ পাল্টে যাচ্ছে। যত দেখবে, যত অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্যে দেখার চোখ বাড়বে, তত লেখাতেও তার প্রতিফলন আসবে।
আমেরিকা, কাতার, অষ্ট্রেলিয়া, চিন সব ঘুরেছি। সবচেয়ে ভাল লেগেছে পরিচ্ছন্নতা এবং সাহায্যের হাত বাড়ানো। কোনও কাজে ফাঁকিবাজি নেই, যে যে-কাজটিই করেন, বেশ দায়িত্ব নিয়ে করেন। মালয়েশিয়া ও চিনের মতো এশিয়ার দেশগুলি এই সংস্কৃতি গ্রহণ করেছে। আমরা আমাদের দেশে এটা পারিনি।
পাঠক: আপনার প্রিয় লেখক?
লেখক: জীবনানন্দ, টলস্টয়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাফকা, কামু কত বলি? এলিয়েট আমার ভীষণ প্রিয়। খুব।
পাঠক: অনেকবার বিদেশে গেছেন, বিদেশের অভিজ্ঞতা?

লেখক: ইউরোপ যাওয়া হয়নি। আমেরিকা, কাতার, অষ্ট্রেলিয়া, চিন সব ঘুরেছি। সবচেয়ে ভাল লেগেছে পরিচ্ছন্নতা এবং সাহায্যের হাত বাড়ানো। কোনও কাজে ফাঁকিবাজি নেই, যে যে-কাজটিই করেন, বেশ দায়িত্ব নিয়ে করেন। মালয়েশিয়া ও চিনের মতো এশিয়ার দেশগুলি এই সংস্কৃতি গ্রহণ করেছে। আমরা আমাদের দেশে এটা পারিনি। হয়তো জনসংখ্যা এর একটা বিরাট কারণ। আমার ডাক্তার কী বলেন জানো, এই পরিবেশ দূষণ রোখার জন্যই আমাদের দেশে অনেক বেশি অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হয়।
পাঠক: আপনি যে এত চরিত্র সৃষ্টি করেন সেগুলো কী নিজের ‘আপন মনের মাধুরী’ দিয়ে গড়েন, না চারপাশেই এঁদের খুঁজে পান।
লেখক: আমার জীবনে মানুষকে ঘিরে বিচিত্র অভিজ্ঞতা রয়েছে। একেক সময় একেকরকম ভাবনা আসে। তখন সেখান থেকেই খুঁজে পাই।
এই সেই লেখক। যৌবনে জীবনজিজ্ঞাসার উত্তরহীন অস্থিরতায় জীবনের ‘পজ’ বোতাম টানার কথা ভেবেছেন একসময় বহুবার। আজ ৮৯-এ দেখে অনুভব হয়, জীবনের প্রশান্তির চাবিকাঠি তাঁর আয়ত্বে।
পাঠক: আপনি এখনও কাজ করেন?
লেখক: হ্যাঁ মাঝেমাঝে যাই। এখনও সম্মানমূল্য পাই।
পাঠক: জীবনীটা হয়ে যাক।
লেখকের মুখে হাজার ভোল্টের হাসি।
এই সেই লেখক। যৌবনে জীবনজিজ্ঞাসার উত্তরহীন অস্থিরতায় জীবনের ‘পজ’ বোতাম টানার কথা ভেবেছেন একসময় বহুবার। আজ ৮৯-এ দেখে অনুভব হয়, জীবনের প্রশান্তির চাবিকাঠি তাঁর আয়ত্বে। লেখক না হলে পাহাড়ে পাহাড়ে আধ্যাত্মিক ভবঘুরে হতেন? থাক। প্রশ্ন করতে গিয়েও নিজেকে সংবরণ করলাম। সে প্রশ্নের উত্তর থাকবে হয়তো অপ্রকাশিত জীবনীর জঠরে। সিদ্ধার্থের দোলাচলকে জয় করে যিনি নির্বাণের আনন্দে সংসার গড়ে নেন, তাঁর মুখেই তো হাজার ওয়াটের হাসি মানায়।
পাঠক: আপনাকে আমি দুটো জিনিস দিতে চাই। মানস সরোবরের একচামচ জল এবং কৈলাসের পথ থেকে তুলে আনা একটি পাথর।
লেখক: সে তো অনেক দূর। ঘোড়ায় চেপে যেতে হয়।
পাঠক বলে, “ঘোড়াপথে ‘যাতায়াতে ২২ মাইল। তারপর ১৭,৫০০ ফিট উচ্চতা।”
প্রণাম করে ফিরে যেতে যেতে মনে মনে অবশ্য পাঠক ভাবে, তাঁর চাইতেও কত উচ্চতার শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছিল এই কয়েক ঘণ্টা! ফিট-মিটারের যোগ্যতা কোথায় সার্থক এ সন্ধ্যা মাপার?
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
