(Korpur O Mahakal 2)
– কী গো শরীর কেমন এখন তোমার?
– ঠিকাছি গো, চল আজ সকালেই পুজো দিয়ে আসি, কাল ভোরের ফ্লাইট, আর সময় পাব না।
সকাল সকাল সকলে মিলে আবার গেল বিশ্বনাথের মন্দিরে পুজো দিতে। আজ শ্রাবণ মাসের প্রথম সোমবার। তাই গিজগিজ করছে লোক। মাইকে অনবরত ঘোষণা করছে, ‘ওমুক তিওয়ারি, তমুক সিং – আপকা ঘরওয়ালে আপকে লিয়ে মন্দির অফিস মে ইনতেজার কর রহে হে, আপ যাহা পে ভি হ্যায়, তুরন্ত মন্দির অফিস মে আকর মুলাকাত কিজিয়ে।’
আরও পড়ুন: কর্পূর ও মহাকাল
আদ্রিতি কর্পূরকে বলে আমি তোমার মাকে সামলাচ্ছি, তুমি কিমির হাতটা শক্ত করে ধরে রেখো, পারলে একটু কোলে নিয়ে নাও ওকে। ওদিকে আদ্রিতির মা এক হাতে ওর বাবার হাত ধরে অন্য হাতে ঠাকুরের ডালা নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে চলেছে। আদ্রিতি পেছন থেকে বলে যাচ্ছে, মা তোমরা কিন্তু কেউ কারওর হাত ছেড়ো না।
সুবিশাল মন্দির চত্ত্বর, সাদা মার্বেলের ওপর সূক্ষ্ম কারুকাজ, আর মন্দিরের চূড়া সোনায় মোড়া। বিশ্বাস করা হয়, এটি পৃথিবীর একমাত্র জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির, যেখানে শিব এবং পার্বতী একসঙ্গে অধিষ্ঠান করেন। যেখানে শিব-পার্বতী যুগলে অধিষ্ঠান করেন, সেখানে কোনও নারী এভাবে স্বামীহারা হতে পারে না, এ কথাই মনে মনে বিশ্বাস করে আদ্রিতি।

— এত উচ্চশিক্ষিত হয়েও ধর্মের প্রতি এত অন্ধবিশ্বাস আসে কী করে তোমার? মানুষ তো আজ না হোক কাল যাবেই!
হেসে হেসে বলতে থাকে কর্পূর। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলে মৃত্যুকে আর আলাদা করে ভয় পাওয়ার থাকে না।
— তুমি জানো মৃত্যুর পরে মানুষের মস্তিষ্ক সাত মিনিট জীবিত থাকে, সেই সময় সে তার জীবনের সেরা স্মৃতিগুলো মনে করতে থাকে। আমিও তো কাল ওই সময় তোমার সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর কথা মনে করছিলাম।
পুজোর লাইনে এত ভিড়, ঠেলাঠেলি করে কোনওক্রমে পুজো দেওয়া হল। কিন্তু কর্পূর কোথায় গেল আবার? এদিকে, ওদিক তাকিয়ে দেখল, লাইনের পেছনে চলে গেল কিংবা এগিয়ে গেল না তো?
কোমল দৃষ্টিতে কর্পূর তার স্ত্রীর মুখ নিরীক্ষণ করতে করতে বলতে থাকে এসব।
— চুপ করবে তুমি এবার! আমার ভাল লাগছে না এখন এসব শুনতে। চলো মন দিয়ে পুজোটা দিই।
পুজোর লাইনে এত ভিড়, ঠেলাঠেলি করে কোনওক্রমে পুজো দেওয়া হল। কিন্তু কর্পূর কোথায় গেল আবার? এদিকে, ওদিক তাকিয়ে দেখল, লাইনের পেছনে চলে গেল কিংবা এগিয়ে গেল না তো?
— যাও তো মা, তোমরা ওদিকটা গিয়ে একটু বসো, আমি আর বাবা একটু দেখে আসছি।

কিমিকে, ওর ঠাকুমা, দিদাকে একদিকে দাঁড় করিয়ে আদ্রিতি আর ওর বাবা গোটা মন্দির চত্ত্বর খুঁজতে লাগল। কোত্থাও পেল না। ভূতুড়ে কাণ্ড তো! এই তো পাশে ছিল, হঠাৎ করে একটা মানুষ উবে যেতে পারে নাকি!
মন্দির কমিটির অফিসে যোগাযোগ করা হল, তারা মাইকে ঘোষণা শুরু করল। কিন্তু কোথায় কী! আদ্রিতির মাথায় আবার বাজ ভেঙে পড়ল, গেল কোথায় মানুষটা, হোটেলে ফিরে গেল না তো, যোগাযোগ করতে না পেরে, কারণ ফোনটা তো সবার এখানকার লকারে রাখা ছিল। কিন্তু এভাবে না বলে চুপচাপ চলে যাওয়ার লোক তো কর্পূর না। তাহলে? বেলা গড়িয়ে গেল। কোনও খোঁজ নেই। এদিকে আজ রাত পেরিয়ে ভোরের ফ্লাইট।
তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে, কমলা আভায় তিরতির করে বয়ে চলেছে গঙ্গার জল। ঘাটগুলোয় সন্ধ্যা আরতির প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ভক্তদের ভিড় জমে উঠছে ঘাটগুলো কেন্দ্র করে। তাদেরই ভিতর দিয়ে হেঁটে চলেছে আদ্রিতি, তার চোখ শুধু তার স্বামীকে খুঁজে চলেছে।
কী করবে বাবা? চলো একবার লোকাল থানায় যাই। থানায় গিয়ে সব তথ্য দিয়ে ডায়েরি করে আসা হল। ডায়েরি করলেই কি আর উধাও হয়ে যাওয়া মানুষ সঙ্গে সঙ্গে চোখের সামনে হাজির হয়?
— তোমরা হোটেলে ফিরে যাও বাবা, আমি একটু এদিক ওদিক দেখে আসি।
গোধুলিয়া চক থেকে দশাশ্বমেধ ঘাট হয়ে, হাঁটতে হাঁটতে মণিকর্ণিকা ঘাটের দিকে এগোতে লাগল আদ্রিতি, উদভ্রান্তের মতো।
তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে, কমলা আভায় তিরতির করে বয়ে চলেছে গঙ্গার জল। ঘাটগুলোয় সন্ধ্যা আরতির প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ভক্তদের ভিড় জমে উঠছে ঘাটগুলো কেন্দ্র করে। তাদেরই ভিতর দিয়ে হেঁটে চলেছে আদ্রিতি, তার চোখ শুধু তার স্বামীকে খুঁজে চলেছে। অন্ধকার নেমে আসায় খুঁজে চলা আরও দুষ্কর হয়ে উঠল। কর্পূরের কোনও খোঁজ পাওয়া গেল না।

আদ্রিতি হোটেলে ফিরে গিয়ে পরিবারের লোককে জানাল, ‘তোমরা কিমিকে নিয়ে ফিরে যাও বাবা, আমি কর্পূরকে এভাবে ফেলে রেখে একা ফিরব না। ওকে খুঁজে একেবারে সঙ্গে নিয়েই ফিরব।’ অগত্যা বৃদ্ধা বাবা-মা নাতনি আর মেয়ের শাশুড়িকে নিয়ে কলকাতায় ফিরে এল।
দুদিন, চারদিন করে এক সপ্তাহ হয়ে গেল কোনও খোঁজ নেই। মাঝে মাঝে থানা থেকে ফোন আসে, ওমুক জায়গায় গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে, তমুক ঘাটে একটা বডি গঙ্গা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, আপনি এসে সনাক্ত করে যান। ওই পরিস্থিতিগুলোয় কীভাবে যে মনের জোর রাখতে হয়, তবু আদ্রিতি লড়াইয়ের ময়দানে থেকে হাল ছাড়ে না।
তার বিশ্বাস সে তার স্বামীকে খুঁজে পাবেই, এবং তাকে সঙ্গে নিয়েই ফিরবে।
এই অস্থির মনকে ভগবান কি কিছুর ইঙ্গিত দিতে চাইছেন? আর কিছু ভাবতে পারছে না আদ্রিতি, কেবল ছুটে চলেছে। এবার ঘাটে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখে রীতিমতো তার আকাশ থেকে পড়ার মতো অবস্থা।
— মা, পাপা কোথায়, কবে ফিরবে তোমরা?
— তুমি দাদু, দিদানের কাছে সোনা মেয়ে হয়ে থাকো মাম্মা, আমরা খুব তাড়াতাড়ি ফিরব, চিন্তা করো না। ফোনের এপারে কান্নায় গলা বুজে আসে আদ্রিতির।
— ম্যাম, আজ ডিনার মে ক্যেয়া লেনা হ্যায়?
— আজ ভুখ নেহি লাগ রাহি হ্যায়, কুছ নেহি চাহিয়ে।
— চিন্তা মাত কিজিয়ে ম্যাম, ঠিক হ্যায় কুছ লাগে তো, কল কার লিজিয়ে গা।
বন্ধ ঘরটায় কর্পূরের স্মৃতি যেন ওকে আরও গিলে খাচ্ছে, এসেছিল তিনজনে একসঙ্গে ঘুরতে, এখন এই ঘরটায় সে একা। কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল মানুষটার, কোথায় আছে, কী যে করছে…

একমাস হয়ে গেল, কোনও খোঁজ নেই। মনটা বড় উদাস হয়ে আছে। আদ্রিতির মনে হল একবার যাই মণিকর্ণিকা ঘাটের ওই মন্দিরটায় একবার একটু গিয়ে বসি, ধ্যান করি, যদি মন শান্ত করা যায়। কিংবা যদি ওই অঘোরীর দেখা পাওয়া যায়, তাকে গিয়ে সবটা খুলে বলবে, সে যদি কোনও সুরাহা দিতে পারে। ওয়ালেট থেকে শিবঠাকুরের ছবিটা বের করে প্রণাম সেরে বেরিয়ে গেল আদ্রিতি। যত ঘাটের দিকে এগোয়, গতি তার তত দ্রুত হয়।
এই অস্থির মনকে ভগবান কি কিছুর ইঙ্গিত দিতে চাইছেন? আর কিছু ভাবতে পারছে না আদ্রিতি, কেবল ছুটে চলেছে। এবার ঘাটে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখে রীতিমতো তার আকাশ থেকে পড়ার মতো অবস্থা। অনতিদূরের এক উঁচু বেদীতে ওই অঘোরী সাধু বসে ধ্যান করছেন, তার মুখোমুখি কর্পূর। সেও বসে আছে সাধুর বেশে।
অঘোরী বাবা আমায় মন্ত্রবলে জীবন দান করেছেন, পরিবর্তে আমায় আজীবন তার শিষ্য হয়ে নির্বাণের পথ রচনা করতে হবে, মহাদেবের কাছে পৌঁছনোর জন্য। তবেই আমার মুক্তি। তুমি কি চাও না আমি বেঁচে থাকি?
দেখে মনে হচ্ছে ওই অঘোরী যেন দীক্ষা দিচ্ছেন কর্পূরকে। আদ্রিতি ছুটে গেল কর্পূরের কাছে।
— তুমি এখানে কী করছ? তুমি জানো আমি তোমায় কত খুঁজেছি? চলো তাড়াতাড়ি এখান থেকে…
কর্পূর নির্নিমেষ চোখে আদ্রিতির দিকে তাকিয়ে আছে। সেই তাকানোর ভিতর মোহ নেই কোনও, মায়া আছে।
— তুমি ফিরে যাও দিতি। আমার আর এখান থেকে ফেরা হবে না।
— মানে?

— অঘোরী বাবা আমায় মন্ত্রবলে জীবন দান করেছেন, পরিবর্তে আমায় আজীবন তার শিষ্য হয়ে নির্বাণের পথ রচনা করতে হবে, মহাদেবের কাছে পৌঁছনোর জন্য। তবেই আমার মুক্তি। তুমি কি চাও না আমি বেঁচে থাকি?
— সে তো অবশ্যই চাই। তাই বলে…
— তাহলে আর কোনও কথা বাড়িও না, আমায় এবার উঠতে হবে, মোহ-মায়া ত্যাগ করে আমায় এগিয়ে যেতে হবে, ওই যে দ্যাখো সূর্য ডুবছে, ওইখানে। ফিরে যাও দিতি। আমায় নিয়ে ভেব না। জেনো, আমি এই ছোট্ট পৃথিবীর কোনও না কোনও প্রান্তে ঠিক আছি, বেঁচে। সাবধানে ফিরো। অনেকটা পথ এবার তোমায় একা হাঁটতে হবে।
দিতি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দেখে, কর্পূর ওকে ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছে অঘোরী বাবার সঙ্গে। গোধূলি মুছে সন্ধ্যা আলিঙ্গন করছে চারপাশ, ভিড়ের মাঝে বিলীন হয়ে যাচ্ছে দুটো মানুষ। বিলীন হয়ে যাচ্ছে সম্পর্ক, অস্তিত্ব, অন্বেষণ…
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্য়মে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত