(Tila Bari)
শিয়ালদহ। মানে, শিয়ালদা থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস। রাতের ট্রেন এবং আড্ডা। বিধাননগর, দক্ষিণেশ্বরকে এমন টা-টা বলে চলে যাওয়া, সে বড় সহজ কাজ নয়! যাই হোক বর্ধমান, বোলপুর পেরিয়ে মালদা পৌঁছতেই মন খুশ। ছ’জনের ছোট্ট দল। রাত কাবার হতে না হতেই আবার কলকল— হৈ হৈ এবং তল্পিতল্পা নিয়ে নেমে পড়ার তোড়জোড়। পৌঁছে গেলাম মাল জংশন। না, শীত তো একেবারেই নেই; তবে কলকাতার থেকে গরম কম। বেশ ঝকঝকে এপ্রিলের সকাল। আধা-মফস্বলি পিচ রাস্তায় নিচু নিচু পাকাবাড়ি এবং আকাশছোঁয়া গাছের বাহার। সবুজ আর আকাশের নীল দুই-ই বেশ তরতাজা। তাই দেখে চকিতে মনে হল, সত্যিই তাহলে বেড়াতে আসা হল!
আরও পড়ুন: ‘চিত্রভানু’- কালিম্পং ও প্রতিমা ঠাকুর
হুস করে গাড়ি এসে দাঁড়াল, টিলা বাড়ি গেস্ট হাউসের সামনে, নাম তিলোত্তমা গেস্ট হাউস। উত্তরবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের অধীনে; জায়গাটার নাম লাটাগুড়ি। জেলা জলপাইগুড়ি। অন্যান্য জায়গার মতো তেমন ভিড় জমানো নয় বলেই বোধহয় এত সুন্দর। উঁচু নিচু পাহাড়ি জমিতে অসংখ্য কটেজ। এরই মধ্যে আরেকটা একতলা বাড়িতে ডাইনিং-কিচেন এবং ছোট্ট মিউজিয়াম। ওই অঞ্চলের যাবতীয় গাছপালা এবং পশুপাখির ছবি দিয়ে সাজানো। একটি মেশিনে পাখিদের নাম অনুযায়ী বোতাম-ব্যবস্থা। সেটি টিপলেই পছন্দের পাখিটি ডেকে উঠবে, নিজস্ব স্বরে। লাউঞ্জে বসে এক কাপ চা শেষ করে এবং /ওইসব খেলায় খানিকক্ষণ মেতে, যে যার ঘরে চলে এলাম।
শুকনো পাতা ছড়ানো জমিতে, একতলা পিলারের ওপর একটি করে কটেজ; দেওয়াল জোড়া কাচের জানলা থেকে পর্দা সরালেই পাশের কটেজে সঙ্গীদের জানলা আর সামনের পিচ রাস্তায়, ক্বচিৎ কখনও গাড়ি বা পাতা কুড়ুনি স্থানীয় মেয়েরা; অথবা স্কুল ইউনিফর্ম পরা ছেলেমেয়েদের ছোটবড় জটলা। জনজীবন থেকে পুরো বিচ্ছিন্ন না হয়েও, প্রকৃতিসুখের আরাম এবং শব্দহীন বিশ্রাম। ভাগ্যিস তিন রাত থাকবার বন্দোবস্ত হয়েছিল। দুপুরে একঘুম দিয়ে, খোলা চাতালে এসে দাঁড়াতেই দেখি, দিনের বেলার সেই ঝলমলে আলোয় কখন যেন গোধূলির রঙ ধরেছে। লম্বা এক বিশ্রামের তোড়জোড় চলছে আকাশে। দীর্ঘ সব ইউক্যালিপটাসের হাওয়ায় ভেসে আসছে সুগন্ধি গোলাপিতে মেতে ওঠা কমলা আর ছাইরঙা গাঢ় নীল। মোহময় এক আরাম।

এমন বিকেলে বেরিয়ে পড়তেই হয়; আর এক ছুটে চলে যেতে হয় নদীর পাড়ে। আমারও গাড়ি নিয়ে উড়তে লাগলাম; পৌঁছতে হবে মূর্তি নদীর ধারে। তার আগে হাতিবাড়ি। তিনটে মা হাতি আর তাদের তিনজনের তিনটে বাচ্চা। আয়েশ করে কলাগাছ খাচ্ছে। পায়ে শিকল পরানো হাতিদের দেখতে ভাল লাগে না বলে, বসে রইলাম মাঝখানের পার্কটায়; পাখির ডাক বা ওড়াউড়ি নেই; কলকাতার পার্কগুলোতে এই সময় থেকে ঝগড়া শুরু করে শালিখ আর কাকেরা। একটা বড় গাছে ঠাসাঠাসি করে ঠিক করতে থাকে, কে কোথায় বসে ঘুমোবে। এখানে বোধহয় সব পাখিদেরই নিজস্ব বাংলো আছে। মানুষই ঠাসাঠাসি করে থকে। এখানেও বিস্তর কটেজ এবং প্রায় সবগুলিই ভর্তি; বারান্দায় কাপড় শুকোচ্ছে।
এখানকার পাট গুটিয়ে সত্যি সত্যি এসে দাঁড়ালাম মূর্তি নদীর পাড়ে। আগেও দেখেছি; জল প্রায় নেই বললেই হয়। বন বিভাগের কটেজগুলি ছাড়িয়ে আর একটু এগিয়ে যেতেই বেশ একটা লোকালয়হীন চরাচর। জল কম থাকলেও স্রোত আছে; আছে নুড়ির ওপর বয়ে যাওয়ার কুল কুল শব্দ; কখনও যেন তা নূপুরের রিনরিন। অনেক বছর পর একটা নদীর কাছে এসে দাঁড়ালাম, যার পাড়গুলি বাঁধানো নয়। বড় বড় পাথর, বালি বালি কাদা আর ভিজে ভিজে সামান্য মাটি।
গেস্ট হাউসের লোকেরাই বড় বড় ছাতা নিয়ে এসে আমাদের পৌঁছে দিচ্ছে খাবার ঘরে। পায়ের নিচে ভিজে নুড়ির আভাস পেয়ে মনে পড়ছে গত রাতে ওই বৃষ্টি মাথায় করে, কটেজগুলো থেকে বেরিয়ে কেমন সব খেতে গেছিলাম আমরা!
আমাদের দেখে নদীটা যেন বলে উঠল, বৃষ্টি আনোনি! খালি হাতে এসেছো? সূর্য পাটে গেছেন; ঝুঁঝকো আলোয় তখনও কিছুটা কমলা লেগে আছে। সাদা আর ছাইরঙা ছোট বড় নুড়ি নিয়ে, নদীটা বয়ে চলেছে উত্তর থেকে দক্ষিণে। অন্য পারে ঘন বন, তখনও গোলাপি হয়ে আছে। ছাইরঙা বালির পাড় ঠেলে গাছগুলো স্তব্ধ হয়ে আছে সন্ধ্যার আহ্বানে; এবার উৎসবে জেগে উঠবে পশুরা; সার বেয়ে নেমে আসবে হাতি, হরিণ ও বুনো মহিষের দল। ওদিকে বসতি নেই; তাই নিয়নের আলো বা লম্ফ জ্বলেনি কোনও ঘরে। জোনাকি আর শেয়ালের চোখ জ্বলে উঠলেই গাঢ় হবে বনতলের অনন্ত আঁধার।
ডাকাডাকিতে হুঁশ ফিরলে দেখি, একটা চায়ের দোকানে ঘন হয়ে বসেছে দলের সকলে; বাঁশের বেঞ্চিতে বসে গরম ম্যাগি আর ঘন দুধের চা। দেহাতি দোকানি মেয়েটি ভাঙা ভাঙা বাংলায় বুঝিয়ে দিল যে, এটাই কিন্তু চায়ের শেষ রাউন্ড; ঝাঁপ ফেলে এবার সে ফিরে যাবে তার গাঁয়ে; কয়েক মাইল হেঁটে তবে তার ডেরা। আমরাও ফিরে এলাম গেস্ট হাউসে, নুড়ি নিয়ে খেলতে থাকা মূর্তি নদীর ঝিরঝিরে স্রোত বুকে নিয়ে।

গেস্ট হাউসের রেলিং ঘেরা খোলা চাতালে বসে আড্ডা-গানে ভেসে যেতে আর কতক্ষণ লাগে! কিন্তু ঝেঁপে বৃষ্টি এল; একেবারে ঝমঝম করে। আহা! উঠোনে বৃষ্টি, বারান্দায় বৃষ্টি, জানলায় বৃষ্টি, বৃষ্টি সমস্ত গেস্ট হাউস জুড়ে। পাতার মাথা থেকে বড় গাছের গোড়াগুলি অবধি ভিজে যাচ্ছে সেই জলে। মাঝে মাঝে শার্সিতে বিদ্যুৎ। মনে মনে মূর্তি-কে বললাম, উপহার পেলে তো! তাও আবার কৃপণ মেঘের এক বা দু’পশলা নয়, সারারাত ধরে একেবারে বন কাঁপানো ঝমঝম— ঝর্ঝর; এবং এই খর চৈত্রে।
২
পরদিন সকালেও বৃষ্টি; তবে তেমন জোরে নয়। গেস্ট হাউসের লোকেরাই বড় বড় ছাতা নিয়ে এসে আমাদের পৌঁছে দিচ্ছে খাবার ঘরে। পায়ের নিচে ভিজে নুড়ির আভাস পেয়ে মনে পড়ছে গত রাতে ওই বৃষ্টি মাথায় করে, কটেজগুলো থেকে বেরিয়ে কেমন সব খেতে গেছিলাম আমরা! গা ছমছমে অন্ধকারে গাছগুলোর সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজছিল সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা খালি কটেজগুলোও।
সঙ্গীরা তখন বাইনোকুলারে খুঁজে চলেছে মা আর ছানা গন্ডারের দল। এই অঞ্চল জুড়ে এরকম গোটা কয়েক রাইনো পয়েন্ট আছে, যেমন যাত্রাপ্রসাদ (হস্তিনী যাত্রাপ্রসাদের স্মৃতিতে গড়া), চুকচুকি (পাখি দেখার জায়গাও), খুনিয়া, রামসাই বা চন্দ্রচূড় ওয়াচ টাওয়ার।
আজ আর দিবানিদ্রা নয়। দুপুর দুপুর বেরিয়ে পড়া। গন্তব্য গরুমারা ন্যাশনাল ফরেস্ট। ‘গাইডেড ট্যুর’; আমাদের জিপের আগে আগে চলেছে, বনবিভাগের জংলি জিপ। প্রচুর ময়ূর আর বুনো মহিষ; হাতিরা দেখা দিল না, পথ আটকালো না ঐরাবত। আমি শুধু বুক ভরে শুষে নিলাম বনগন্ধের নির্যাস, আলো আঁধারির রহস্য আর জঙ্গুলে নৈঃশব্দ্য। গতকালের বৃষ্টিতে স্নানমাখা গাছ-লতা-ফুল; আর ঝিলিক মারা আকাশে তখনও দাঁড়িয়ে থাকা বুনো মেঘ।
বেশ খানিক জঙ্গলবিহার সেরে এলিফ্যান্ট ক্যাম্প এবং তার পরে আরও খানিক এগিয়ে রাইনো স্পট। দু’ধাপ উপরে উঠে বাঁধানো চত্বর। নিচের তৃণভূমি দেখে আন্দাজ হল যে, আমরা বোধহয় কুড়িতলার ওপর দাঁড়িয়ে। বিকেলের মরা আলোয় তখনও দূরে দূরে চরে বেড়াচ্ছে গন্ডারের দল। বাইনোকুলারের ব্যবস্থা আছে। খালি চোখে দেখলে মনে হবে যেন ওয়াশ পেন্টিং। সবুজ আর ধূসরের মাখামাখি।

এখানেও হাতি আর বন মহিষদের নিরাপদ আস্তানা। বুনো ঘাসের মধ্যে দিয়ে পথ কেটে বেরিয়ে এসেছে যে স্ফটিক-স্বচ্ছ জলধারাটি, সেটি কোনও নদী নয়। নাবাল জমিতে কাঁদর। বর্ষায় ভরে উঠলেও গরমে শুকিয়ে যায়। আর একটু দূর দিয়ে ক্ষীণ জলরেখায় মূর্তি নদী; সে গিয়ে মিশেছে ওই অনেক দূরে, বনানীর আড়ালে আর এক নদী— জলঢাকায়। এ অঞ্চলটায় অনেক নদী— নেওড়া, রায়ডাক, গরতি। তা না হলে কি আর ওই বিশাল দেহী তৃণভোজীদের খাবার সঙ্কুলান হত!
বিকেলের সেই ঝিমধরা আলোয় অনেকক্ষণ বসে থাকলাম। সঙ্গীরা তখন বাইনোকুলারে খুঁজে চলেছে মা আর ছানা গন্ডারের দল। এই অঞ্চল জুড়ে এরকম গোটা কয়েক রাইনো পয়েন্ট আছে, যেমন যাত্রাপ্রসাদ (হস্তিনী যাত্রাপ্রসাদের স্মৃতিতে গড়া), চুকচুকি (পাখি দেখার জায়গাও), খুনিয়া, রামসাই বা চন্দ্রচূড় ওয়াচ টাওয়ার। আমরা গিয়েছিলাম মেদলা ওয়াচ টাওয়ারে।
অ্যাংলো-ভুটান যুদ্ধ (১৮৬৪-১৮৬৫) হল এক সন্ধিক্ষণ। ব্রিটিশদের কাছে হেরে গিয়ে ভুটান বাধ্য হয় এই সব অঞ্চল ছেড়ে দিতে। বছরে কিছু টাকা দেবার কড়ারে দুতরফেই সাক্ষরিত হয় ট্রিটি অব সিনচুলা (১৮৬৫) ও ট্রিটি অব পুনাখা (১৯১০)।
এই জাঙ্গল সাফারির শেষ পর্বে ছিল, সাঁওতালি নাচ; অন্ধকারে ঘাসের মধ্যে মধ্যে জ্বালানো নিয়ন আলোয় পা ফেলে ফেলে; একে একে সকলেই এসে বসলাম, সেই কালিপুর ইকো ভিলেজের চত্বরে। বুধুরাম আর কালিপুর এই দুই আদিবাসী বস্তি থেকে স্থানীয় মানুষরা এসে, ভাগাভাগি করে নাচ দেখায়। রাতে থাকলে, বন ফায়ারের ব্যবস্থা। এখানে পাশেই মূর্তি নদী এবং নাচের সঙ্গে লেবু চা।
বন দফতরের শুভেচ্ছা-স্মারক হিসেবে, সকলকে একটি করে জুট ম্যাট উপহার দিয়ে শেষ হল গরুমারা জাঙ্গল সাফারি প্যাকেজ। গেস্ট হাউসে ফেরার রাস্তায় আবার সেই বাতাবাড়ি, বর্মন পাড়া, দরবেশ পাড়া এবং মাথা চুলকা; এই সব নামের অন্দরে আছে সরস্বতী, ছাতুয়া বা রামসাই এমন সব গ্রাম। আর আছে বিস্তর কাটাছেঁড়াসমেত টুকরো ইতিহাস।

৩
টিলাবাড়িতে শেষ দিন; ফলে রাতটুকু কাটিয়ে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়া। পার্কের মাঝখানে বিরাট এক কংক্রিট দাবার ছক, মস্ত মস্ত বোড়ে সমেত। তিনপাশে তিনটে লোহার বেঞ্চি। এক কাপ চা নিয়ে বসে ভাবছিলাম ব্রিটিশদের সেই কিস্তিমাৎ চালের কথা। গরুমারা জঙ্গলসমেত প্রায় সমগ্র ডুয়ার্স ছিল ভুটানের অন্তর্গত।
অ্যাংলো-ভুটান যুদ্ধ (১৮৬৪-১৮৬৫) হল এক সন্ধিক্ষণ। ব্রিটিশদের কাছে হেরে গিয়ে ভুটান বাধ্য হয় এই সব অঞ্চল ছেড়ে দিতে। বছরে কিছু টাকা দেবার কড়ারে দুতরফেই সাক্ষরিত হয় ট্রিটি অব সিনচুলা (১৮৬৫) ও ট্রিটি অব পুনাখা (১৯১০)। প্রশাসনিকভাবে জলপাইগুড়ি জেলা তারা তৈরিই করে (১৮৬৯) মূলত এখানকার দামী কাঠ, জলপাই বন এবং ঘন জঙ্গলের সম্পদ সংগ্রহ করে চুটিয়ে বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে।
সেখানে গেলে দেখা যায়, প্রাচীন ভিজিটারস বুক; উপরি পাওনা হিসেবে নাকি শোনাও যায় ভারী বুটের আওয়াজে Mr. Becket, Dr. Brougham, R Haughton, Mr Dale, Sir Ashley Eden এমন সব বাঘা বাঘা সাহেবদের অনায়াস চলাচল এবং ‘ফায়ার’, ‘ফায়ার’ নির্দেশ।
তাদের নজর ছিল ‘Tea and Timber— The Green Gold’। সহায় হল, তিস্তা আর করলা নদীর উর্বর মাটি। সমস্যা ছিল বন্যা আর জানোয়ারের উপদ্রব। সেই সঙ্গে ভুটান সীমান্তের সুরক্ষায় বানানো শুরু হল, মিলিটারি আউটপোস্ট। রেল চলল কলকাতা অবধি (১৮৭৮), গড়ে তোলা হল জলপাইগুড়ি মিউনিসিপালিটি (১৮৮৫)। আর গভীর জঙ্গলের অন্দরে বেশ কিছু ব্রিটিশ বাংলো। সেই সঙ্গে ক্লাব ইত্যাদি তো আছেই।
ফলে, স্বাধীনতার পর ইন্দো-ভুটান বন্ধুত্ব চুক্তি (১৯৪৯) সাক্ষরিত হলেও এইসব অঞ্চলকে আর হাতছাড়া করতে চাইল না স্বাধীন ভারতবর্ষ। সৌজন্য দেখাতে ভুটানকে ফেরত করা হল আলিপুরদুয়ারের কিছু অংশ। ভারত-ভুটান বাণিজ্যপথ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় এই অঞ্চলের নাম হয় ‘দুয়ার’— যা আসলে ডুয়ার্স (Dooars) নামে পরিচিত। আর এই টিলাবাড়িও এমন একটি অঞ্চল যেটি কোনও সাহেবের নামে চিহ্নিত নয়। টিলার চারপাশে কিছু বাড়ি দেখে বসতি আন্দাজ হওয়ায় এখানেই খুঁটি পোঁতা শুরু হয়। সাহেবরাই এই অঞ্চলটির নাম রাখে টিলা বাড়ি।

দু’তিনটি কাজে নজর পড়ে তাদের। এক হল জঙ্গলের সীমা নির্ধারণ করে বনবাংলো বানানো; দুই চা-চাষের উদ্যোগ আর তিন হল রাঁচি এবং বীরভূম থেকে সাঁওতাল ও অন্যান্য উপজাতিদের এনে বসত করানো; যারা চা বাগানের শ্রমিক হিসেবে কাজ করবে। ফলে সাঁওতালি নাচ বলে যা আমরা দেখলাম, তা আসলে চালু কিছু লোকগান এবং ‘মুভি সং’; এই শিল্পীদের কয়েকজনের নাম সোমরা, এতোয়ারি বা বুধুয়া হলেও বেশিরভাগ শিল্পীদের নামই কিন্তু মিনু, প্রিয়াঙ্কা, রাকেশ; এবং সকলেই রাঁচির মুন্ডাগোষ্ঠীর হলেও এরা না জানে মুন্ডারি ভাষা, না দেখেছে নিজেদের মাতৃভূমি; শিকড় হিসেবে জানে শুধু ওই নামটুকুই।
বুঝলাম, অন্তত আরও একবার আসতে হবে এখানে ও থাকতে হবে এই গরুবাথান জঙ্গলেরই গহনে, যেখানে চেল নদীর ধারে এখনও অক্ষত ‘চেল বনবাংলো’ (Chel Bunglow), বা বরাডিহি বাংলো (Baradighi Bunglow-Chalsa lataguri, 1891), অথবা তিলঝোরা (Tiljhora Bunglow), বা মালবাজারে চাপরামারির জঙ্গলে শতাব্দী প্রাচীন সেই ফাগু চা-বাংলোয়।
অরণ্য গহনে এইসব বাংলোগুলি হেরিটেজ চিহ্নে এখন বেশ দামি। কিন্তু সেখানে গেলে দেখা যায়, প্রাচীন ভিজিটারস বুক; উপরি পাওনা হিসেবে নাকি শোনাও যায় ভারী বুটের আওয়াজে Mr. Becket, Dr. Brougham, R Haughton, Mr Dale, Sir Ashley Eden এমন সব বাঘা বাঘা সাহেবদের অনায়াস চলাচল এবং ‘ফায়ার’, ‘ফায়ার’ নির্দেশ।
পরের গন্তব্য কালিম্পং। হাতে সময় আছে দেখে, থামা হল, Roy Cousins Patrol Pump-এর একপাশে Tea Moments নামে সেই বিখ্যাত চা-দোকানে। ব্রাউনি সহযোগে ফার্স্ট ফ্ল্যাশ দার্জিলিং চা শেষ করেই মন যেন উসখুশ করে বলে উঠল… এবার শুধু দার্জিলিং আর দার্জিলিং।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত