(Mrinal Sen Memoir)
১৯৮৮ সাল, চলে গেলেন সমরেশ বসু। আরও একবার অভিভাবকহীন হল বাংলা সাহিত্য। কলকাতা দূরদর্শন বিশেষ অনুষ্ঠান করল সমরেশ বসুকে নিয়ে। সেই অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছিলেন মৃণাল সেন। এরপর একদিন মা আমার হাতে দূরদর্শনের কনট্র্যাক্ট ফর্ম দিয়ে পাঠাল ভবানীপুরের বেলতলা রোডে মৃণাল সেনের বাড়িতে, কারণ ওঁকে দিয়ে কন্ট্রাক্ট ফর্মটা সই করাতে হবে।
আরও পড়ুন: স্মৃতির আকাশ থেকে (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯), (১০), (১১), (১২), (১৩), (১৪), (১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯), (২০), (২১), (২২), (২৩), (২৪), (২৫), (২৬), (২৭), (২৮), (২৯), (৩০), (৩১), (৩২), (৩৩), (৩৪), (৩৫), (৩৬), (৩৭), (৩৮), (৩৯), (৪০), (৪১), (৪২), (৪৩), (৪৪), (৪৫), (৪৬), (৪৭), (৪৮)
মৃণাল সেন তখন ওখানেই থাকতেন। আমি তো এক কথায় রাজি, অত বড় একজন চলচ্চিত্রনির্মাতার কাছে যাব। এরকম একটা সুযোগ কেইবা হাতছাড়া করে! সরকারি সেই ফর্মটার সঙ্গে প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে নিলাম আমার অটোগ্রাফের খাতাটা। আমাদের বাড়ির খুব কাছেই তাই হেঁটেই চলে গেলাম।

বাড়ির বেল বাজাবার সঙ্গে সঙ্গে সেই চিরপরিচিত সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে স্বয়ং মৃণাল সেনই দরজা খুললেন। সুভদ্র, বিশ্ববন্দিত পরিচালক ভেতরে ডেকে বসালেন। নিজের পরিচয় দিয়ে সব বৃত্তান্ত বলার পরে সরকারি ফর্মটিতে সই করে দিলেন। সই পর্বটি সেখানেই শেষ হল না, কারণ ততক্ষণে আমার পকেট থেকে বের করে অটোগ্রাফ খাতাটাও এগিয়ে দিয়েছি। এক ঝলক আমার দিকে তাকিয়ে হেসে সই করে দিলেন।
কোথায় থাকি জিজ্ঞেস করাতে বললাম মনোহরপুকুর রোডে। শুনে বললেন, ‘আমিও তো ওখানে থাকতাম’। উত্তরে বলেছিলাম, ‘জানি, আপনাকে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে অনেকবার হেঁটে যেতে দেখেছি’। চলে আসার সময়ে যখন জুতো পরছি, তখন বললেন, ‘ভেতরে এসে চেয়ারে বসে জুতোটা পরো।’ আমি লজ্জা পাচ্ছিলাম তাই তাড়াতাড়ি বললাম, ‘না না, ঠিক আছে, আমি দাঁড়িয়েই পরে নিচ্ছি।’ মনে পড়ে আমি এক পায় ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আরেক পায়ের জুতোর ফিতে বাঁধছিলাম। উনি হেসে আবার বললেন, ‘এক পায়ে দাঁড়িয়ে কেউ কখনও কিছু করতে পেরেছে?’ হেসে নীরব থেকে নিজের কাজ করছিলাম।

এরপর সিনে সেন্ট্রালের নানা অনুষ্ঠানে আসতেন যখন, তখন দেখা এবং কথা হত। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে সেখানেও দেখা হত। ততদিনে ওঁকে মৃণালদা বলতে শুরু করেছি, কারণ ওঁর পুত্র কুনাল সেনের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে জেনেছিলাম যে উনি পুত্র হয়েও কখনও ওঁকে বাবা বলে ডাকেননি, বন্ধু বলতেন। শুধু একবার বন্ধুদের সামনে একটা বিশেষ কারণে ওঁর পুত্রও মৃণাল সেনকে মৃণালদা বলে ডেকেছিলেন!
সেটা শোনার পর থেকে আমি সাহস করে মৃণালদাই বলতাম। সম্পর্কটা আরও ঘনিষ্ঠ হল যখন বিশিষ্ট দন্ত চিকিৎসক ডা. বারীন রায়ের সূত্রে কয়েকটি কাজের বিষয়ে মৃণালদার বাড়িতে যেতাম। ততদিনে বেলতলা রোডের বাড়ি ছেড়ে উনি পদ্মপুকুর রোডে একটা নতুন ফ্ল্যাটে চলে গিয়েছিলেন।
মৃণালদার তৈরি কোনও ছবির বুকলেট পেলেই ওঁকে দিয়ে সই করিয়ে রাখতাম। কোনও ফোন না করেই ওঁর বাড়িতে চলে যেতাম। অসন্তুষ্ট বা বিরক্ত হতেন না!
মৃণালদা ভালবাসতেন সন্দেশ খেতে, তাই বারীনদাও প্রতিবার ওঁর জন্য নকুড়ের সন্দেশ কিনে পাঠাতেন। তপন সিংহ চলে যাওয়ার পরে ওঁকে অনুরোধ করি তপনদার বিষয়ে কিছু লিখতে, তখন উনি তপনদার ছবিগুলো নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘জানো তপনের, ‘ক্ষনিকের অতিথি’ ছবিটা আমার খুব প্রিয়। সুযোগ পেলেই আমি দেখি, আমি সেটা নিয়েই লিখব।’

মৃণালদার তৈরি কোনও ছবির বুকলেট পেলেই ওঁকে দিয়ে সই করিয়ে রাখতাম। কোনও ফোন না করেই ওঁর বাড়িতে চলে যেতাম। অসন্তুষ্ট বা বিরক্ত হতেন না! কাজের লোকটি যদিও কোনও সময় বলত উনি ব্যস্ত রয়েছেন, ততক্ষনে উনি আমার গলা শুনে ভেতরে ডেকে নিতেন। বুকলেটগুলোর দিকে তাকিয়ে বলতেন, ‘ওগুলোর মধ্যে একটাও আমার কাছে নেই।’
মার্ক্সবাদে বিশ্বাসী বামপন্থী মানুষটি কোনওদিনও নিজেকে সেলিব্রেটি তকমার মধ্যে নিজেকে বন্দি করে রাখেননি। কোনও কারণে কোনওদিন বারীনদার চেম্বারে এলে কত সহজভাবে গল্প করতেন। তপন সিংহ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে নন্দনে অশোককুমারের জন্মশতবর্ষের সময় স্মারক গ্রন্থের জন্য আবার লেখা চাইলাম। বললেন, অমুক সাংবাদিকের হাতে কয়েকদিন পরে উনি লেখাটা দিয়ে দেবেন।

একটি ইংরেজি দৈনিকের সেই সাংবাদিক আমাদের উভয়েরই পরিচিত, কিন্তু কোনওদিনই সেই লেখা হাতে আসেনি! পরে মৃণালদার কাছে জেনেছিলাম যে উনি যথা সময় লেখাটি লিখে দিয়েছিলেন। সঙ্গত কারণেই সেই সাংবাদিকের নাম উল্লেখ করলাম না।
একটু অপেক্ষা করতে বললেন। কাজ সেরে এসে বসলেন, তারপরে বইটা হাতে নিয়ে খুব আগ্রহভরে পাতা উল্টোতে উল্টোতে একটি বিশেষ পাতায় এসে থেমে গেলেন। সেই পাতায় ২২ শ্রাবণে কবির শেষযাত্রার একটা ছবি ছিল।
পিছন ফিরে তাকালে কত কথা হঠাৎ করে মনে পড়ে! রবীন্দ্রসদনে তখন সৌমিত্রকাকুর, ‘রাজা লিয়ার’ নাটকটি চলছিল। একদিন মৃণালদা ওঁর একাধিক ছবির অভিনেতার নাটক দেখতে এলেন। ফিরে যাওয়ার সময় গাড়ি পর্যন্ত যেতে যেতে কিছু কথা হয়েছিল।
২০১১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মের সার্ধশতবর্ষে একটি বহুজাতিক সংস্থা থেকে আমার সংকলন এবং সম্পাদনায় একটি বই প্রকাশিত হয়েছিল। একদিন বারীনদার বাড়ি থেকেই মৃণালদাকে ফোন করে বললাম বইটা দিতে চাই। সেদিন সন্ধেবেলাতেই যেতে বললেন। ওঁর প্ৰিয় সন্দেশ আর বই নিয়ে সময়মতো চলে গেলাম ওঁর বাড়িতে।

একটু অপেক্ষা করতে বললেন। কাজ সেরে এসে বসলেন, তারপরে বইটা হাতে নিয়ে খুব আগ্রহভরে পাতা উল্টোতে উল্টোতে একটি বিশেষ পাতায় এসে থেমে গেলেন। সেই পাতায় ২২ শ্রাবণে কবির শেষযাত্রার একটা ছবি ছিল।
সেই বিপুল সংখ্যক জনসমুদ্রের দিকে আঙ্গুল দিয়ে ইঙ্গিত করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এই ভিড়ের মধ্যে সেদিন আমিও ছিলাম।’ ওঁর স্ত্রী অভিনেত্রী গীতা সেন চলে যাওয়ার পর থেকে মৃণালদা আরও একা হয়ে পড়েছিলেন। মাঝে মধ্যে যেতাম। অল্প স্বল্প কথা হত। ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর সকালে বয়সজনিত কারণে মৃণালদা চলে গেলেন।
আমি দূরাভাষের মাধ্যমে ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়, মমতাশঙ্কর এবং অঞ্জন দত্তর সঙ্গে কথা বলে মৃণালদার বিষয়ে অনেক তথ্য সংগ্রহ করলাম। বাড়িতে বসেই কিছুটা কাজ এগিয়ে রাখলাম তারপরে অপিসে গিয়ে বাকিটা শেষ করলাম।
খবরটা পাওয়ার পরে আমার সহকর্মীর সঙ্গে আলোচনা করে পরিকল্পনা করলাম মৃণালদার স্মরণে একটা বিশেষ পাতা সাজাব। যে সংবাদপত্রে আমি তখন কর্মরত, সেই পত্রিকার কর্তৃপক্ষকে এ বিষয় রাজি করাতে আমার কালঘাম ছুটে গিয়েছিল! তাঁদের একরকম ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে, একমাত্র রাজনীতি ছাড়া অন্য কোনও বিষয় নিয়ে পাঠকদের কোনও আগ্রহ নেই!

যাই হোক আমি দূরাভাষের মাধ্যমে ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়, মমতাশঙ্কর এবং অঞ্জন দত্তর সঙ্গে কথা বলে মৃণালদার বিষয়ে অনেক তথ্য সংগ্রহ করলাম। বাড়িতে বসেই কিছুটা কাজ এগিয়ে রাখলাম তারপরে অপিসে গিয়ে বাকিটা শেষ করলাম। পরেরদিন দেশপ্রিয় পার্ক থেকে ওঁর শেষযাত্রা ছিল। আর যোগ দিতে ইচ্ছে করল না, কারণ অবসন্ন মন আর সায় দিল না। মনে হল অতীতের স্মৃতিগুলোই অন্তরে থেকে যাক।
ছবি সৌজন্য: লেখক ও প্রতাপ দাসগুপ্ত
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত