(Serampore Rajbari Puja)
শ্রীরামপুরের গোস্বামী পরিবারের সুবিশাল অট্টালিকা সম্পর্কে কমবেশি অনেকেই জানেন। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি পরিচিত শ্রীরামপুর রাজবাড়ি নামে। আর সিনেমাপ্রেমীদের কাছে এই বাড়ির পরিচিতি আরও একটু আলদা— প্রয়াত চিত্রপরিচালক অনীক দত্তের জনপ্রিয় ছবি ভূতের ভবিষ্যৎ-এ এই রাজবাড়িকেই দেখানো হয়েছিল ভূতেদের আস্তানা হিসেবে।
কিন্তু সিনেমাটি দেখার পর রাজবাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালে খানিকটা ধন্দে পড়তে পারেন। এটাই কি সেই বাড়ি? পর্দায় যে অট্টালিকাকে এত বিশাল, এত দীর্ঘ বলে মনে হয়েছিল, বাস্তবে তার চেহারা যেন কিছুটা আলাদা। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নটা মাথায় আসা অস্বাভাবিক নয়।
আরও পড়ুন: বেলজিয়ামের ঝাড়লণ্ঠন থেকে ঢাকহীন পুজো— সুরুলের সরকার বাড়ির দুর্গোৎসব
রহস্যের উত্তর লুকিয়ে আছে বাড়িটির স্থাপত্যে। পুরো বাড়িটির বাইরের দিক ঘুরে দেখলে বোঝা যায়, সিনেমার জন্য বাড়িটির উত্তর ও দক্ষিণ মহলের কিছু অংশ এমন নিপুণভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল যে, পর্দায় তৈরি হয়েছিল আরও বিশাল এক রাজবাড়ির বিভ্রম। সেটাই পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছিল। এ বাড়িতে বিভিন্ন সময়ে এসেছেন চলচ্চিত্র জগতের বহু তারকা। বিখ্যাত লোকেদের মধ্যে এসেছেন মহাত্মা গান্ধী, বিধান রায় ও সুভাষ বোস।

ভূতের ভবিষ্যৎ-এর পরিচিত দৃশ্যগুলির মধ্যে ছিল দোতলার সেই দীর্ঘ বারান্দা, যার চকচকে মেঝে ক্যামেরার চোখে আলাদা মাত্রা পেয়েছিল। আজ অবশ্য সেই জায়গার চরিত্র বদলে গেছে। কিন্তু সিনেমায় রাজবাড়ির যে অংশটি প্রায় অনাবিষ্কৃতই থেকে গিয়েছিল, সেটিই হয়তো এই বাড়ির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা— সুবিশাল ঠাকুরদালান।
এখানে ভূতেদের আনাগোনা নেই; আছে দেবীর আরাধনা। প্রতি বছর এই ঠাকুরদালানেই মহাসমারোহে দুর্গাপুজো করে গোস্বামী পরিবার। শতাব্দীপ্রাচীন পারিবারিক ঐতিহ্য, উৎসবের আচার আর স্থাপত্য— সব মিলিয়ে দুর্গোৎসবের সময় এই অংশটিই যেন রাজবাড়ির প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে।

গোস্বামী পরিবারের উত্থান, রাজবাড়ির নির্মাণ, তার স্থাপত্য এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা দুর্গোৎসব— সব মিলিয়ে এই অট্টালিকায় যেন লুকিয়ে আছে আলাদা একটি গল্প। সেই গল্প জানতে হলে ঢুকতে হবে রাজবাড়ির অন্দরমহলে।
১৯৩৭ সালে ‘বানী মন্দির’-এর তৈরি বংশতালিকা অনুযায়ী, রামগোবিন্দের দুই পুত্র ছিল— রামগোপাল ও রাধাকান্ত। রাধাকান্তের কনিষ্ঠ পুত্র হরিনারায়ণ ডেনিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে কাস্টমস কালেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
শ্রীরামপুর গোস্বামী পরিবারের ইতিহাস
শ্রীরামপুর গোস্বামী পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রামগোবিন্দ গোস্বামী। শৈশব থেকে তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় মামাবাড়িতে কেটেছে। তাঁর মাতামহ অচ্যুতানন্দ গোস্বামী (জন্ম ১৫০৬) ছিলেন গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অদ্বৈতাচার্য গোস্বামীর (১৪৩৪–১৫৫৯) পুত্র। রামগোবিন্দের পিতা পাটুলির পন্ডিত লক্ষ্মণ চক্রবর্তী অচ্যুত গোস্বামীর কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন। বৈষ্ণব ধর্ম ও সাহিত্য সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনের পর রামগোবিন্দ তাঁর মামার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন। পরবর্তীকালে তিনি শাক্ত ধর্ম ত্যাগ করে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেন এবং ‘গোঁসাই’ বা ‘গোস্বামী’ উপাধি ধারণ করেন।

একবার নৌকায় ভ্রমণের সময় তাঁর স্ত্রীর প্রসববেদনা শুরু হলে রামগোবিন্দ শ্রীরামপুরের ছাতরায় নৌকা ভিড়িয়ে সেখানে নামতে বাধ্য হন। এই খবর পেয়ে শেওড়াফুলির শাসক তাঁকে কিছু জমি দান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অব্রাহ্মণের কাছ থেকে দান গ্রহণ করা রামগোবিন্দের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই তিনি মাত্র একটি কড়ির (প্রাচীন মুদ্রা) বিনিময়ে সেই জমি গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে সেখানে বসবাসের জন্য রামগোবিন্দ একটি ছোট আটচালা ঘর নির্মাণ করেন। সেখানেই অত্যন্ত অনাড়ম্বরভাবে শুরু হয়েছিল গোস্বামী পরিবারের আদি দুর্গাপূজা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের উত্তরসূরিরা সেই জায়গাতেই নির্মাণ করেন এক বিশাল অট্টালিকা।
১৯৩৭ সালে ‘বানী মন্দির’-এর তৈরি বংশতালিকা অনুযায়ী, রামগোবিন্দের দুই পুত্র ছিল— রামগোপাল ও রাধাকান্ত। রাধাকান্তের কনিষ্ঠ পুত্র হরিনারায়ণ ডেনিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে কাস্টমস কালেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রঘুরাম ধনী ও প্রভাবশালী ব্রিটিশ ব্যবসায়ী জন পামারের (১৭৬৭-১৮৩৬) সঙ্গে সুসম্পর্কের সুবাদে প্রচুর বিত্ত-বৈভব অর্জন করেছিলেন।

রঘুরাম গোস্বামী তাঁর বংশধরদের নিয়ে যখন বর্তমান বাসস্থানে উঠে এসেছিলেন, তখন এখানে একটি ছোট বাড়ি ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর সময়ের মধ্যে বাড়িটি তার বর্তমান বিশাল ও জাঁকজমকপূর্ণ রূপ ধারণ করে। দোতলা এই অট্টালিকাটিতে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল একটি বিশাল নাটমন্দির এবং পাঁচটি খিলানযুক্ত প্রশস্ত দুর্গাদালান। তার সাথে যুক্ত ছিল ভেতরের বারান্দা ও সারিবদ্ধ কক্ষ।
রথযাত্রার দিন দেবীর কাঠামো পূজা অনুষ্ঠিত হয়। ষষ্ঠীর দিন হয় বোধন। ঠাকুরদালানের পাশেই বোধনের জন্য একটি পৃথক কক্ষ রয়েছে, যা শিবের আবাসস্থল অর্থাৎ কৈলাস পর্বত হিসেবে গণ্য করা হয়।
ও’ম্যালির (O’Malley) লেখা ‘হুগলি ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার’-সহ অনেক বইতেই উল্লেখ করা হয়েছে, হরিনারায়ণ ও রামনারায়ণ ছিলেন রামগোবিন্দের পুত্র— নাতি নন; তবে এই তথ্যটি পরিবারের প্রচলিত ইতিহাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
শ্রীরামপুর রাজবাড়ির দুর্গাপূজা

গোস্বামী পরিবারের আদি দুর্গাপূজাটি রাজবাড়ি থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে অবস্থিত একটি দুর্গাদালানে অনুষ্ঠিত হয়, যা ‘বুড়ি দুর্গাপূজা’ নামে পরিচিত। শ্রীরামপুর রাজবাড়িতে দুর্গাপূজার সূচনা করেছিলেন রঘুরাম গোস্বামী। পরিবারের প্রবীণ সদস্য (রাধাকান্তের সপ্তম প্রজন্ম) শিবাশিস গোস্বামীর মতে, রঘুরামের শুরু করা এই পূজাটি এবার ৩৪৩তম বর্ষে পদার্পণ করছে।
রথযাত্রার দিন দেবীর কাঠামো পূজা অনুষ্ঠিত হয়। ষষ্ঠীর দিন হয় বোধন। ঠাকুরদালানের পাশেই বোধনের জন্য একটি পৃথক কক্ষ রয়েছে, যা শিবের আবাসস্থল অর্থাৎ কৈলাস পর্বত হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে, ঠাকুরদালানে দেবীর আসনটিকে তাঁর পিত্রালয় বা বাপের বাড়ি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বোধনের পর, যে ঘটে ‘অকাল-বোধন’ সম্পন্ন হয়, তা ঠাকুরদালানে এনে দেবীর পাশে স্থাপন করা হয়। এটি কৈলাস থেকে দেবীর আগমনের প্রতীক।

দেবীকে শোলা এবং সালমা ও চুমকির মতো রুপোর পাতের সাজসজ্জা দিয়ে সজ্জিত করা হয়। দেবীর হাতের অস্ত্রগুলোও টিন ও রুপোলি ফয়েল দিয়ে তৈরি। চালচিত্রটির আকৃতি বাঁশের তৈরি কুলোর মতো। এতে বিভিন্ন দৃশ্য ও চরিত্র আঁকা থাকে— যেমন জয়া, দশাবতারের প্রথম পাঁচটি রূপ (মীন, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন), চামুণ্ডা কর্তৃক চণ্ড ও মুণ্ড অসুর বধ, কৈলাসে শিবের অবস্থান, চামুণ্ডার সহায়তায় দুর্গা কর্তৃক রক্তবীজ অসুর বধ, দশাবতারের বাকি পাঁচটি রূপ (পরশুরাম, রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ ও কল্কি) এবং সবশেষে বিজয়া।
শিবাশিস জানান যে, শ্রীরামপুর রাজবাড়িতে তাঁদের নিজস্ব ধর্মীয় গ্রন্থের নির্দেশ মেনে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এখানে পরিবারের ধর্মীয় শাস্ত্রানুসারে দেবীপুরাণ, কালিকা পুরাণ ও বৃহৎ নন্দিকেশ্বর পুরাণের সমন্বয়ে পূজার আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়।
শিবাশিস জানান যে, শ্রীরামপুর রাজবাড়িতে তাঁদের নিজস্ব ধর্মীয় গ্রন্থের নির্দেশ মেনে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এখানে পরিবারের ধর্মীয় শাস্ত্রানুসারে দেবীপুরাণ, কালিকা পুরাণ ও বৃহৎ নন্দিকেশ্বর পুরাণের সমন্বয়ে পূজার আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়।
সপ্তমীর ভোরে ‘ঘটমাল্য’ নামক একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পূজা শুরু হয়। এই প্রথায় বাড়ির প্রবীণতম নারী প্রধান ঘটটিতে মালা পরিয়ে দেবীকে বরণ করে নেন— যেন মা মেনকা তাঁর কন্যাকে বরণ করছেন। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই সপ্তমী পূজার যাবতীয় কার্যক্রমের সূচনা হয়। ঠাকুরদালানে কুলদেবতা রাধামাধবের সামনে নবপত্রিকা স্নান ও পূজার আচার সম্পন্ন করা হয়। উল্লেখ্য, বিষ্ণুপুরের রাজা অতীতে তিনটি দেবতার পূজার জন্য রামগোবিন্দকে পুরোহিত হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন।

দেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত অন্ন বা খাদ্যসামগ্রী ‘অন্নভোগ’ নামে পরিচিত; এর মধ্যে থাকে ভাত, খিচুড়ি, ডাল, পাঁচ রকমের ভাজা, দু-রকমের তরকারি, চাটনি, পায়েস ও মিষ্টি। আগে এক বিশেষ ধরনের পায়েস তৈরি করা হত— এতে চিনি ব্যবহার না করে ঘি-মাখানো ভাজা চালের সাথে মিশ্রি ও বাতাসা মেশানো হত। দেবীর কাছে খোসাসহ ফল এবং কাঁচা সবজিও নৈবেদ্য হিসেবে নিবেদন করা হয়।
এই পারিবারিক পূজায় কোনও ফল বা সবজি বলি দেওয়া হয় না; বরং একটি চালকুমড়ো, একটি আখ ও একটি শশা আস্ত অবস্থায় দেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়।
প্রতিমা বিসর্জনের জন্য দেবীকে কাঁধে করে গঙ্গার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। আগে দুটি নৌকার সাহায্যে নদীর মাঝখানে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হত, কিন্তু দুর্গাপূজার সময় একবার ঘূর্ণিঝড় হওয়ার পর সেই প্রথা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সন্ধিপূজার সময় ‘কুলো প্রদীপ’ নামে পিতলের তৈরি এক বিশেষ প্রদীপ জ্বালানো হয়। বাঁশের কুলোর আদলে তৈরি এই প্রদীপটিতে ১০৮টি পিতলের প্রদীপ একত্রে যুক্ত থাকে এবং এটি একটি কলাপাতার ওপর স্থাপন করা হয়। নবমীর দিন একজন কুমারীকে নিয়ে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া পাঁচটি মাটির পাত্র ব্যবহার করে ‘ধুনো পোড়ানো’র রীতি পালন করা হয়, যাতে সাধারণত পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ নারী সদস্যরা অংশ নেন।

দশমীর দিন ‘বরণ’ বা দেবীকে বিদায় জানানোর আচার পালনের আগে বাড়ির নারীদের অন্তত এক টুকরো ইলিশ মাছ খাওয়া বাধ্যতামূলক। তাঁরা খয়ের ও চুন ছাড়া পান খান; পানের মশলা হিসেবে এলাচ, মৌরি ও সন্দেশের মতো মিষ্টির টুকরো ব্যবহার করা হয়, কারণ সে সময় বাংলায় প্রচলিত পান মশলা পাওয়া যেত না। দেবীকে ‘ঝাড়খিলি পান’ নিবেদন করা হয়— এটি এমন এক বিশেষ পান যা একটি বড় পানপাতা থেকে ছোট ছোট কয়েকটি পান সাজিয়ে তৈরি করা হয়। এমন এক টুকরো পান অসুরসহ প্রতিটি দেব-দেবীর হাতের তালুতে গুঁজে দেওয়া হয়। দশমীর দিন ‘কনকাঞ্জলি’র রীতিও পালন করা হয়।
প্রতিমা বিসর্জনের জন্য দেবীকে কাঁধে করে গঙ্গার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। আগে দুটি নৌকার সাহায্যে নদীর মাঝখানে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হত, কিন্তু দুর্গাপূজার সময় একবার ঘূর্ণিঝড় হওয়ার পর সেই প্রথা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
