Jamindari Durga Puja
(Jamindari Durga Puja)

১৭৪২ সালের সেপ্টেম্বর। কাটোয়ার কাছে দাঁইহাটে মহা ধুমধামে দুর্গাপুজো চলছে। পুজোর যজমান কোনও বাঙালি জমিদার নন, বরং নাগপুরের রঘুজি ভোঁসলের সেনাপতি। নাম ভাস্কর পণ্ডিত, যাঁর বর্গি ঘোড়সওয়ারদের ভয় বাংলার ছেলেভুলানো ছড়ায় আজও টিকে রয়েছে। পুজোর খরচ উঠেছিল পশ্চিম বাংলার কয়েকজন জমিদারের থেকে আদায় করা টাকায়।

সে বছর মে মাসেই বর্গিরা মুর্শিদাবাদ লুট করে গেছে; শুধু জগৎ শেঠের কুঠি থেকেই নাকি লুট হয়েছিল ৩ লক্ষ টাকা। তবে ২৭শে সেপ্টেম্বর ভোরে নবাব আলিবর্দি খাঁর ফৌজ নদী পেরিয়ে ঘুমন্ত মারাঠা শিবিরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শিবির, মালপত্র ফেলে বর্গিরা প্রাণ নিয়ে পিঠটান দিল। শোনা যায়, ভাস্করের পুজো আর শেষ হয়নি।


আরও পড়ুন: রুপোর আয়নায় দেবীর মহাস্নান— পুরুষরাই সামলান বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গাপুজো


দৃশ্যটা একবার ভেবে দেখার মতো। পুজো যাঁর, তিনি হিন্দু এবং লুটেরা। যাঁর আক্রমণে পুজো পণ্ড হল, তিনি মুসলমান ও সেই মুহূর্তে বাংলার রক্ষক। দু’বছরের মধ্যে এই নবাব সন্ধির নাম করে ভাস্করকে ডেকে এনে খুন করাবেন। এ গল্পে সাধু কেউ নয়। বর্ধমান রাজসভার পণ্ডিত বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কার বর্গিদের সম্পর্কে লিখে গেছেন, তারা ব্রাহ্মণ, গর্ভবতী নারী, শিশু, কাউকে রেহাই দেয় না।

দুর্গাপুজোর ইতিহাস বলতে আমরা সাধারণত পলাশির পরের গল্পটাই শুনি। শোভাবাজার, ক্লাইভ, সাহেবদের জন্য বাইজি নাচ আর জম্পেশ খানাপিনা। শুনে মনে হয়, পুজোর জাঁক বুঝি কোম্পানির আমলেরই দান। অথচ ১৭৫৭ সালে সাহেবরা যে দালানে পা রাখলেন, সেই দালান তাঁরা পেয়েছিলেন তৈরি অবস্থায়। পুজোর কাহিনি, বিধি ও পৃষ্ঠপোষক, তিনটেই গড়ে উঠেছিল আগের সাড়ে তিনশো বছরে, সুলতান, সুবাদার আর নবাবদের আমলে।

Jamindari Durga Puja
পুজোর কাহিনি, বিধি ও পৃষ্ঠপোষক, তিনটেই গড়ে উঠেছিল নবাবদের আমলে

এটা সেই সাড়ে তিনশো বছরের গল্পের খানিকটা।

তবে তারও আগে একটা গল্প আছে। সেটা সেরে নিই। শরৎকালে দেবীর পুজো শাস্ত্রমতে অকালের; আসল সময় বসন্ত। রাবণ বধের জন্য রাম অসময়ে দেবীকে জাগিয়েছিলেন। এই অকালবোধনের কাহিনি বাল্মীকি রামায়ণে নেই। কালিকাপুরাণ আর বৃহদ্ধর্মপুরাণে তার সূত্র ছিল, কিন্তু বাঙালির ঘরে ঘরে তাকে পৌঁছে দিয়েছে পঞ্চদশ শতকের কৃত্তিবাসী রামায়ণ। কৃত্তিবাসের আত্মপরিচয়ে গৌড়েশ্বরের সভায় সমাদর পাওয়ার কথা আছে। সেই গৌড়েশ্বর রাজা গণেশ না রুকনউদ্দিন বারবক শাহ, তা নিয়ে পণ্ডিতেরা একমত নন। তবে সময়টা নিয়ে বিতর্ক নেই। গৌড়ে তখন সুলতানি আমল।

সাল-তারিখগুলো পারিবারিক ঐতিহ্যের, দলিলের নয়। তবে ঐতিহ্য একটা কথা লুকোয় না। ভবানন্দ আর লক্ষ্মীকান্ত দু’জনেরই উত্থান মোগল সেনাপতি মানসিংহের অনুগ্রহে, সাম্রাজ্যের সেবার পুরস্কারে।

পুজো এলেই আসবে পুজোর বিধি। ষোড়শ শতকে নবদ্বীপের স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনন্দন ভট্টাচার্য তাঁর ‘দুর্গোৎসবতত্ত্ব’-এ পুজোর খুঁটিনাটি বেঁধে দিলেন। বাংলার বহু পুজো আজও তাঁর বিধান ধরেই চলে। রঘুনন্দনের শতকে বাংলার মসনদ একের পর এক হাত বদলেছে। প্রথমে গৌড়ের স্বাধীন হোসেনশাহি সুলতানেরা, ১৫৩৮ সালে তাঁদের পতনের পর শের শাহ আর কররানি পাঠানেরা, শেষে ১৫৭৬ সালে মোগল আমল। প্রতিটি আমলেই শাসক মুসলমান, আর প্রতিটি আমলেই নবদ্বীপের টোলে বসে হিন্দুর পুজোর বিধি লেখা চলেছে।

একে সহিষ্ণুতার রূপকথা মনে হলে খানিকটা সরল করে ফেলা হবে। ওই নবদ্বীপেই চাঁদ কাজি একবার কীর্তন বন্ধের হুকুম দিয়েছিলেন; নালিশ গিয়েছিল কীর্তনবিরোধী হিন্দুদের কাছ থেকেও। পরে চৈতন্যদেবের মিছিল করে গিয়ে প্রতিবাদ জানানোয় সে হুকুম উঠে যায়। আসলে শাসকের দিক থেকে যা ছিল, তা বদান্যতা বা বিদ্বেষ নয়; বলা চলে, হিসেব। সেই হিসেবটা বুঝতে আমাদের খুলতে হবে তৎকালীন খাজনার খাতা।

Jamindari Durga Puja
যাঁর নিজের জমিটুকু রাখার অধিকারও পরের সনদে বাঁধা, তিনি বছরে ক’টা দিন নিজের ঠাকুরদালানে রাজা হতেন

জমিদার মোগল আমলের আগেও ছিল। মোগল রাজস্বব্যবস্থা তাঁদের এক নতুন শর্তে বাঁধল: প্রজার খাজনা তুলে সুবাদারের ঘরে পৌঁছে দাও, বদলে পাও সনদ আর ‘রাজা’ খেতাব। তৈরি হল এক মিডলম্যান শ্রেণি। বড় জমিদারবাড়ির পুজোর প্রাচীনতম নামগুলো এই মিডলম্যানদেরই অবদান।

কথিত আছে, ষোড়শ শতকের শেষ দিকে রাজশাহির তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ প্রায় আট লক্ষ টাকা খরচ করে দুর্গোৎসব করেছিলেন। তারপর ১৬০৬ সালে নদিয়ার ভবানন্দ মজুমদার বিপুল ব্যয় করে দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন। ১৬১০ সালে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা বড়িশার লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার আয়োজন করেন আরেক বর্ণাঢ্য ব্যয়বহুল দুর্গাপুজোর।

এক শতাব্দী পরে মুর্শিদকুলি খাঁর বন্দোবস্তে ছবিটা আরও পোক্ত হল। বর্ধমান, নদিয়া, নাটোর, দিনাজপুরের মতো গুটিকয় বড় জমিদারির হাতে সুবার খাজনার বড় অংশ জমা পড়ল, আর এই জমিদারদের অধিকাংশই হিন্দু।

সাল-তারিখগুলো পারিবারিক ঐতিহ্যের, দলিলের নয়। তবে ঐতিহ্য একটা কথা লুকোয় না। ভবানন্দ আর লক্ষ্মীকান্ত দু’জনেরই উত্থান মোগল সেনাপতি মানসিংহের অনুগ্রহে, সাম্রাজ্যের সেবার পুরস্কারে। ক্ষমতার সেবার পুরস্কার ছিল জমিদারি। সন-তারিখ ঘষে তুলে দিলে এ গল্প যেকোনও আমলের। তাই বাংলার প্রাচীনতম জমিদারবাড়ির পুজোগুলোর গোড়ায় বিদ্রোহী নেই, আছে শাসকের বিশ্বস্ত লোক।

এই উত্থানের গল্প বংশধরেরা অবশ্য লুকোননি, বরং কাব্য করে গাইয়েছেন। পলাশির পাঁচ বছর আগে, ১৭৫২ সালে, কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি ভারতচন্দ্র ‘অন্নদামঙ্গল’ শেষ করেন। কাব্যের শেষ খণ্ডে মানসিংহ বাংলায় আসেন প্রতাপাদিত্যকে দমন করতে। ভবানন্দ তাঁকে সাহায্য করেন, আর দেবী অন্নদার কৃপায় জাহাঙ্গিরের দরবার থেকে রাজ্য পান। মোগলের সেবা সেখানে লজ্জার কথা নয়, দেবীর আশীর্বাদ।

Jamindari Durga Puja
নদিয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়

হিন্দু প্রতিরোধের যে ন্যারেটিভ আজ জনপ্রিয় হচ্ছে, তার ধারপাশ দিয়েও এই ইতিহাস হাঁটেনি। আবার সম্প্রীতির যে দাস্তান তার জবাবে শোনানো হয়, সেখানেও এর ঠাঁই নেই। এ ইতিহাস ক্ষমতার ও ক্ষমতার সঙ্গে বোঝাপড়ার। এই বোঝাপড়া অবশ্য অনেকটাই ওপরতলার: সুবাদার, জমিদার আর তাঁদের সভার। গ্রামের রায়তের কাছে শাসকের হিসেব বেশিরভাগ সময় পৌঁছত খাজনার অঙ্ক হয়ে, ধর্মের প্রশ্ন হয়ে নয়। আবার অনেক গ্রামেই যাঁকে হিন্দুরা সত্যনারায়ণ বলে পুজো দিত, মুসলমানরা তাঁকেই সত্যপীর বলে শিরনি দিত।

এক শতাব্দী পরে মুর্শিদকুলি খাঁর বন্দোবস্তে ছবিটা আরও পোক্ত হল। বর্ধমান, নদিয়া, নাটোর, দিনাজপুরের মতো গুটিকয় বড় জমিদারির হাতে সুবার খাজনার বড় অংশ জমা পড়ল, আর এই জমিদারদের অধিকাংশই হিন্দু। নবাবের তাঁদের দরকার ছিল। কিন্তু তাঁদের ঠাকুর দালানে কোন দেবীর পুজো হয়, তা নিয়ে নবাবের কোনও মাথাব্যথা ছিল না। তাহলে এই রাজারা আসলে কী ছিলেন? ক্ষমতা হিসেব তাঁদের ছিল জমি, কাছারি, লেঠেল, প্রজা। ছিল না শুধু সার্বভৌমত্ব।

আবার জানা যায় আরেক পিঠের গল্প: কৃষ্ণচন্দ্র নবাবকে তখনকার কালীঘাট অঞ্চলে এনে গভীর জঙ্গলের মধ্যে মন্দির দেখিয়ে বুঝিয়েছিলেন, এখান থেকে রাজস্ব তোলার মতো লোকই নেই।

সত্যিকারের রাজা চেনার সহজ উপায় আছে। তিনি নিজের নামে মুদ্রা ছাপেন, নিজের ইচ্ছেয় যুদ্ধ আর সন্ধি করেন। পাশের কোচবিহারেই ১৫৫৫ থেকে নরনারায়ণের নামে ‘নারায়ণী’ মুদ্রা চলছে। আমাদের রাজাদের মুদ্রা ছিল না, ছিল খেতাব। প্রজারা কি এ কথা জানত না? জানত বৈকি। রাজার খাজনা বাকি পড়লে কী হয়, সে গল্প জনশ্রুতি হয়েই আমাদের কাছে পৌঁছেছে, আর জনশ্রুতি মানে প্রজারই স্মৃতি। তবু তাদের কাছে রাজা বলতে তিনিই, কারণ নবাব থাকেন দূরে, আর কাছারি বসে গ্রামে।

সবথেকে চোখা নজিরটা ১৭১৪ সালের। ভূষণার জমিদার সীতারাম রায় নিজেকে স্বাধীন রাজা ঘোষণা করেছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর ফৌজ তাঁকে হারিয়ে মুর্শিদাবাদে নিয়ে এল; বিচারে প্রাণদণ্ড হল, আর তাঁর জমিদারি কলমের এক খোঁচায় চলে গেল নাটোরের রামজীবনের হাতে। রাজা যুদ্ধে হারলে হন পরাজিত শত্রু; সীতারাম হলেন দণ্ডিত প্রজা। এঁরা তাই সিংহাসনহীন রাজা; এ লেখা সেই সিংহাসনহীন রাজাদের পুজো নিয়েই।

Jamindari Durga Puja
পলাশির ওই যুদ্ধের পরের শরতে শোভাবাজারে নবকৃষ্ণ দেবের পুজোতে ক্লাইভ এসেছিলেন

আসুন, ফিরে যাই কাটোয়ার সেই ভোররাতে। মনে করুন: তলোয়ার ছিল ভাস্করের হাতে আর নবাবের হাতে; জমিদারের হাতে ছিল শুধু টাকার থলি। তাঁদের রাজত্ব দিল্লি বা মুর্শিদাবাদের সনদে লেখা; খাজনা বাকি পড়লে সেই সনদ কেড়ে নেওয়া যেত। জনশ্রুতি, নদিয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রকেও খাজনার দায়ে নবাবের কয়েদে থাকতে হয়েছিল।

আবার জানা যায় আরেক পিঠের গল্প: কৃষ্ণচন্দ্র নবাবকে তখনকার কালীঘাট অঞ্চলে এনে গভীর জঙ্গলের মধ্যে মন্দির দেখিয়ে বুঝিয়েছিলেন, এখান থেকে রাজস্ব তোলার মতো লোকই নেই। সে কথা শুনে নবাব নাকি শুধু খাজনা মাফই করেননি, কালীঘাটের মন্দিরের জন্য অর্থও বরাদ্দ করেছিলেন।

বাংলার খাজনা আদায়কারী রাজারা তুলে নিলেন রাজার এই আচারটুকুই। সিংহবাহিনী, দশভুজা, অসুরদলনী: সার্বভৌম ক্ষমতার এমন প্রতিমা আর হয় না। যাঁর যুদ্ধ করার, সন্ধি করার, এমনকি নিজের জমিটুকু রাখার অধিকারও পরের সনদে বাঁধা, তিনি বছরে ক’টা দিন নিজের ঠাকুরদালানে রাজা হতেন।

এবার প্রশ্ন, এঁরা দুর্গাঠাকুরকেই বাছলেন কেন। শরতের দেবীপূজা ভারতের বহু রাজদরবারে রাজারই আচার। বর্ষা শেষ, পথঘাট শুকিয়েছে, যুদ্ধযাত্রার মরশুম শুরু; দশমী ছিল রাজার সীমা পেরিয়ে অভিযানে বেরোনোর দিন। বিজয়নগরের সম্রাটেরা মহানবমীতে সামন্তদের সামনে নিজেদের শক্তি দেখাতেন। ১৬১০ সালে, বড়িশার পুজোর বছরেই, মহীশূরের ওয়াদিয়াররা সেই উত্তরাধিকার হাতে নিয়ে ‘দশেরা’ শুরু করেন।

বাংলার নিজের সাহিত্যেও দেবী রাজ্য দেন। ষোড়শ শতকের শেষে, মোগল বিজয়ের অস্থির সময়ে, মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ডিহিদারের অত্যাচারে ভিটে ছেড়ে এক জমিদারের আশ্রয়ে বসে ‘চণ্ডীমঙ্গল’ লেখেন। তাঁর কাব্যে চণ্ডী এক ব্যাধ, কালকেতুকে, জঙ্গল কেটে নগর বসিয়ে রাজা করে দেন। যার রাজ্য নেই তাকে রাজ্য দেওয়া: বাংলায় এটাই দেবীর মহিমা! ধর্মকথার মোড়কে এ আসলে রাজনীতির আলেখ্য।

Jamindari Durga Puja
নবাব খাজনার হিসেব নিতেন, দালানে পুজোর হিসেব নিয়ে মাথা ঘামাতেন না

বাংলার খাজনা আদায়কারী রাজারা তুলে নিলেন রাজার এই আচারটুকুই। সিংহবাহিনী, দশভুজা, অসুরদলনী: সার্বভৌম ক্ষমতার এমন প্রতিমা আর হয় না। যাঁর যুদ্ধ করার, সন্ধি করার, এমনকি নিজের জমিটুকু রাখার অধিকারও পরের সনদে বাঁধা, তিনি বছরে ক’টা দিন নিজের ঠাকুরদালানে রাজা হতেন।

নবাব খাজনার হিসেব নিতেন, দালানে পুজোর হিসেব নিয়ে মাথা ঘামাতেন না; আসতেন, এমন প্রমাণও নেই। ভক্তিতে খাদ ছিল, এমন কথা বলছি না। কিন্তু শুধু ভক্তি দিয়ে বনেদি পুজোর ওই জাঁকের ব্যাখ্যা হয় না; সেটা এক না-পাওয়া সিংহাসনের বদলিও: জনমানসে সেই অদৃশ্য সিংহাসনটাকে বছরে একবার গোচর করানোর চেষ্টা। সব মিলিয়ে ধুনোর ধোঁয়া, ঢাকের আওয়াজ আর জমিদারি ঠাটবাটের আড়ালে খেদটা চাপা পড়ত, আর প্রজার চোখে ফুটে উঠত সেই অদৃশ্য সিংহাসনের তেজ।

সাহেবরা যা দেখে মুগ্ধ হলেন, সেই বাইজি নাচ, মজলিশ, আতর-পানের আদবের অনেকটাই নবাবি দরবারের উত্তরাধিকার। আয়োজনের ভাষা সেই পুরনোই রইল; শুধু তর্জমায় সেটা হয়ে দাঁড়াল আনুগত্য।

কংসনারায়ণের পুজো নিয়ে যে কিংবদন্তি চলে আসছে, সেটা এখানে একবার ঝালিয়ে নেওয়া যেতে পারে। তিনি নাকি অশ্বমেধ বা রাজসূয়ের মতো কোনও মহাযজ্ঞ করতে চেয়েছিলেন, যে যজ্ঞ সার্বভৌম রাজার। পণ্ডিত রমেশ শাস্ত্রী বিধান দেন, কলিযুগে ওই যজ্ঞ চলে না, তার বদলে দুর্গোৎসব করুন। অর্থাৎ রাজসূয়ের জায়গায় দুর্গোৎসব। সত্যি মিথ্যে যা-ই হোক, কিংবদন্তি নিজেই বলে দিচ্ছে পুজোটা কীসের বদলে কী।

এ কথা কোনও দলিলে লেখা নেই; কোনও জমিদার কোথাও লিখে যাননি যে তিনি রাজা সাজতে পুজো করতেন। এটা আচারের ইতিহাস আর তার পৃষ্ঠপোষকদের পরিচয় মিলিয়ে নির্মিত একটা সিদ্ধান্ত। এবার দুটোকে পাশাপাশি রাখলে অন্য সমীকরণ দাঁড় করানো কঠিন।

এল ১৭৫৭ সাল। পলাশির ওই যুদ্ধের পরের শরতে শোভাবাজারে নবকৃষ্ণ দেবের পুজোতে ক্লাইভ এসেছিলেন। গল্পটা নিয়ে সন্দেহ আছে; কারও কারও মতে এ কাহিনি পরে গড়া। কিন্তু বানানো হলে তো গল্পটা আরও গভীর ছাপ রেখে যায়। বোঝা যায়, একটা সমাজ আসলে কোন কথা রটাতে চেয়েছিল। নবাব আমাদের পুজোয় এসেছিলেন, এমন বড়াই কোনও জমিদারবাড়ির প্রচলিত কাহিনিতে মেলে না। কোম্পানির আমলে পুজোয় ক’জন সাহেব এলেন, সেটাই হয়ে দাঁড়াল বাড়ির মর্যাদার মানদণ্ড।

এখানে কেউ কেউ আপত্তি তুলবেন: মুসলমান নবাব হিন্দুর পুজোয় আসবেনই বা কেন, সমাজ তা মানত? অথচ সাহেবরাও হিন্দু ছিলেন না। বরঞ্চ, সাহেবরা যা দেখে মুগ্ধ হলেন, সেই বাইজি নাচ, মজলিশ, আতর-পানের আদবের অনেকটাই নবাবি দরবারের উত্তরাধিকার। আয়োজনের ভাষা সেই পুরনোই রইল; শুধু তর্জমায় সেটা হয়ে দাঁড়াল আনুগত্য।

নতুন শাসক এসে সেই দালানেই প্রধান অতিথির আসনটা পেলেন। গৃহকর্তা নিজের হাতে সেটা এগিয়ে দিলেন। এতদিনের অদৃশ্য সিংহাসনটা সেদিন প্রথম চোখে দেখা গেল। তাতে অবশ্য বসলেন অন্য লোক; গৃহকর্তা পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন।

ফারাকের কারণটা সামাজিক মনস্তত্ত্বের অনেক আগে, হিসেবের। ১৭৫৭ সালে নদিয়ার রাজবংশের বয়স দেড়শো বছর, আলিবর্দির বংশের নবাবির বয়স সতেরো। পুরনো জমিদারের পায়ের নিচে নিজের বলে খানিকটা জমি ছিল। তবে কোম্পানি আমলে অনেকের উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজদের সঙ্গে ব্যবসা করে ধনবৃদ্ধি।

দালান এক, প্রতিমা এক, জাঁকও এক। বদলে গেল শুধু দর্শকের আসন, আর কাঁধের উড়নিতে লাগল আনুগত্যের রং। নবাব আমলে পুজো ছিল শাসকের অনুপস্থিতিতে রাজা সাজার মঞ্চ; এবার হল শাসকের উপস্থিতিতে বিনম্র প্রজা হওয়ার মঞ্চ। সিংহাসনহীন রাজারা এতদিন অন্তত নিজের দালানে রাজা ছিলেন। নতুন শাসক এসে সেই দালানেই প্রধান অতিথির আসনটা পেলেন। গৃহকর্তা নিজের হাতে সেটা এগিয়ে দিলেন। এতদিনের অদৃশ্য সিংহাসনটা সেদিন প্রথম চোখে দেখা গেল। তাতে অবশ্য বসলেন অন্য লোক; গৃহকর্তা পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন।

সূত্র
১. কৃত্তিবাস ওঝা, শ্রীরাম পাঁচালী (কৃত্তিবাসী রামায়ণ), লঙ্কাকাণ্ড
২. রঘুনন্দন ভট্টাচার্য, দুর্গোৎসবতত্ত্ব
৩. বৃন্দাবন দাস, শ্রীচৈতন্যভাগবত
৪. মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, চণ্ডীমঙ্গল, আখেটিক খণ্ড
৫. ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর, অন্নদামঙ্গল (১৭৫২), ‘মানসিংহ’ খণ্ড
৬. Jadunath Sarkar (ed.), The History of Bengal, Vol. II: Muslim Period, 1200–1757, University of Dacca, 1948.
৭. Richard M. Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204–1760, University of California Press, 1993.
৮. Rachel Fell McDermott, Revelry, Rivalry, and Longing for the Goddesses of Bengal: The Fortunes of Hindu Festivals, Columbia University Press, 2011.
৯. সুকুমার সেন, বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড
১০. সপ্তর্ষি রায় বর্ধন, কালীঘাট মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে প্রবন্ধ
১১. ‘Maratha Raids’, Banglapedia
১২. ‘Raghunandan Bhattacharya’, Banglapedia
১৩. ‘Battle of Katwa (1742)’, Wikipedia
১৪. ‘Sabarna Roy Choudhury’, Wikipedia
১৫. ‘Durga Puja’, utsav.gov.in
১৬. ‘Of Palaces and Courtyards’, onlinedarshan.com
১৭. ‘How the British victory at Plassey created the modern Durga Pujo’, Scroll.in
১৮. কৃষ্ণদাস কবিরাজ, শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, আদিলীলা ১৭

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Please login to bookmark Close
Picture of গুঞ্জন দাশগুপ্ত

গুঞ্জন দাশগুপ্ত

গুঞ্জন দাশগুপ্তের পড়াশোনা পাঠভবন, কলকাতা; লরেন্স স্কুল, সানাওয়ার; এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দীর্ঘদিন তথ্যপ্রযুক্তির অন্তঃপুরে কাটিয়ে মাঝবয়সে লেখাকে পেশা করেন। এক যুগের বেশি চিত্রনাট্যকার হিসেবে কাজ করেছেন টলিউডে, বলিউডে ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়; তারপর মন দেন নিজের লেখা ও দর্শনচর্চায়। ২০২৩ সালে প্রকাশিত প্রথম থ্রিলার উপন্যাস, কুয়াশা কোডেড রহস্য, দিয়ে শুরু মা-ছেলের অভিযান-কাহিনি ‘অনন্যা–রুদ্র’ সিরিজ। গল্প লেখেন দেবলপুত্র গুঞ্জন নামে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

The Banglalive's Picks

Weekly Newsletter

Enjoy our flagship newsletter as a digest delivered once a week.

By signing up, you agree to our User Agreement and Privacy Policy & Cookie Statement.

Please login to bookmark Close
প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার দেবী ইনানা বা ইশতার যেন আমার দুর্গা, আমার অতি পরিচিত ঘরের মেয়ে দুর্গা। কিন্তু প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে, দুটি মূর্তি প্রায় এক‌ই রকম। পরে খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যাবে, মিল কিছু থাকলেও অমিল‌ও প্রচুর। লিখছেন সিদ্ধার্ঘ্য মুখোপাধ্যায়...
Please login to bookmark Close
সেদিন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সামনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং রাজা রামমোহন রায়। দেবেন্দ্রনাথ তখন নেহাত বালক। বারো বছর বয়স। দেবেন্দ্রনাথের হাতে একটি আমন্ত্রণপত্র। ঠাকুর পরিবারের দুর্গাপুজোর নিমন্ত্রণ। রাজা রামমোহন রায়কে দেবেন্দ্রনাথ বলছেন, ‘সামনে পুজো, তাই তিনদিনই প্রতিমা দর্শনে আপনার নিমন্ত্রণ।‌ পত্রে দাদু এই অনুরোধ করেছেন।’ লিখছেন পায়েল চট্টোপাধ্যায়...
Please login to bookmark Close
গল্পটা আজকের নয়, আজ থেকে আনুমানিক ২৬০ বছর আগের। সাবেক কলকাতার পোস্তা অঞ্চলে সেদিন বেজে উঠেছিল আগমনী ঢাক, যার পুরোধা ব্যাক্তি ছিলেন চুঁচুড়া থেকে আগত স্বর্ণ ব্যবসায়ী শ্রী বৈষ্ণবদাস মল্লিক। আজও তাঁর তৈরি বসতবাটিতে মহাসমারোহে মহামায়ার আগমন ঘটে। লিখছেন নির্মাল্য চ্যাটার্জি...

Subscribe

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com