(Thakurbarir Durga Puja)
সেদিন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সামনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং রাজা রামমোহন রায়। দেবেন্দ্রনাথ তখন নেহাত বালক। বারো বছর বয়স। দেবেন্দ্রনাথের হাতে একটি আমন্ত্রণপত্র। ঠাকুর পরিবারের দুর্গাপুজোর নিমন্ত্রণ। রাজা রামমোহন রায়কে দেবেন্দ্রনাথ বলছেন, ‘সামনে পুজো, তাই তিনদিনই প্রতিমা দর্শনে আপনার নিমন্ত্রণ। পত্রে দাদু এই অনুরোধ করেছেন।’
রাজা রামমোহন রায় পড়লেন ধন্দে। ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বী তিনি। মূর্তিপুজোর ঘোরতর বিরোধী। এমন আমন্ত্রণ আসা অনভিপ্রেত ও অস্বস্তিকর। আমন্ত্রণপত্র এসেছে প্রিন্স দ্বারকানাথের পরিবারের তরফে। নিয়ে এসেছেন স্বয়ং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বন্ধু-পুত্র, স্নেহের পাত্র। সরাসরি তাঁকে ফিরিয়ে দিলে আহত হবে কিশোর মন। নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করতে পারেননি রামমোহন রায়। ছেলে রাধাপ্রসাদকে ডেকে পাঠান সেই সময়। বাবার হয়ে ছেলে গ্রহণ করেন ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপুজোর আমন্ত্রণপত্র।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সেদিন খুশি হয়েছিলেন। রাজা রামমোহন রায় বা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেউই সেদিন জানতেন না যে পরবর্তীকালে একই চেতনার সুতোয় বাঁধা পড়বেন তাঁরা। পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধাচারণ করে রাজা রামমোহন রায়ের মতোই ব্রাহ্মধর্ম অনুসরণ করেছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ভবিষ্যতের এই সময়ের কথা বোধহয় সেদিন দু’জনের কেউই জানতেন না। সময়ের সন্ধিক্ষণে দুই সমচেতনাসম্পন্ন মানুষ এভাবেই প্রথমবার পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছিলেন, ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে।
১৭৮৪ সালে জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারে দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল। তবে ঠাকুর বাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো তার আগে শুরু হয়। একসময় জাঁকজমকপূর্ণ পুজো হত। ‘ঠাকুর বাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো হয়েছিল খোলার ঘরে’— এমনটাই স্মৃতিচারণায় বলেছেন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা নীলমণি ঠাকুরের একমাত্র মেয়ে কমলমণি ঠাকুর।

শুরুর দিকে সাদামাটা অনাড়ম্বর পুজো হত। ঠাকুর পরিবার সেসময় যৌথ পরিবার ছিল। একটাই পুজো হত। পাথুরিয়াঘাটার সাবেক বাড়িতে শুরু হয়েছিল পুজো। দর্পনারায়ণ ঠাকুরের নামেই পুজো শুরু হয়। সাধারণভাবে অনুষ্ঠিত হলেও এই পুজো সবসময় মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল।
অষ্টাদশ শতকের সত্তরের দশকে অবস্থার পরিবর্তন হয় দর্পনারায়ণ ঠাকুরের। বিত্তশালী এবং ধনবান হয়ে ওঠেন তিনি। পরিবর্তন আসে দুর্গাপুজোতেও। আড়ম্বর ও উপচারের সঙ্গে দুর্গা পুজো শুরু হয়। সে সময়ে কলকাতার মানুষ এই পুজোর নিমন্ত্রণের অপেক্ষায় থাকতেন। এমনকি সাহেবরাও এই পুজোর আমন্ত্রণের অপেক্ষা করতেন। ১৭৯২ সালে ‘ক্যালকাটা ক্রনিক্যাল’ পত্রিকায় ঠাকুর পরিবারের পুজোর আগাম খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
দর্পনারায়ণ ও নীলমণি ঠাকুরের পরিবার আলাদা আলাদা পুজো শুরু করেন। কিন্তু কিছু সাধারণ নিয়ম মানা হত প্রতিটি পরিবারের পুজোর ক্ষেত্রে। যেমন, প্রতি পরিবারের নিজস্ব কুমোর, নিজস্ব পোটো ছিল। প্রতি পুজোয় দেবীর মুখের ছাঁচ হত স্বতন্ত্র।
দুর্গাপুজো শুরু হওয়ার কিছু দিন পর ঠাকুর পরিবার দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। সম্পত্তি সংক্রান্ত বিবাদকে কেন্দ্র করে দর্পনারায়ণ ও নীলমণি ঠাকুরের মধ্যে মতান্তর হয়। নীলমণি ঠাকুর ১৭৮৪ সালে জোড়াসাঁকো চলে আসেন। পুজোর সময় পাকা বাড়ি, ঠাকুরদালান তৈরি করা আর সম্ভব হয়নি। তাই জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির প্রথম পুজো হয়েছিল খোলার ঘরে।
এই সময় থেকেই দুর্গাপুজো ভাগ হয়ে যায়। দর্পনারায়ণ ও নীলমণি ঠাকুরের পরিবার আলাদা আলাদা পুজো শুরু করেন। কিন্তু কিছু সাধারণ নিয়ম মানা হত প্রতিটি পরিবারের পুজোর ক্ষেত্রে। যেমন, প্রতি পরিবারের নিজস্ব কুমোর, নিজস্ব পোটো ছিল। প্রতি পুজোয় দেবীর মুখের ছাঁচ হত স্বতন্ত্র। এই মূর্তিকে ‘দেবাঙ্গ’ আখ্যা দেওয়া হয়েছিল ঠাকুর পরিবারের তরফ থেকে।

প্রত্যেক ঠাকুর পরিবার পুজোয় নির্দিষ্ট কারিগর দিয়েই মূর্তি তৈরি করাতেন। মূর্তি গড়া হত দুর্গাদালান অথবা চণ্ডীদালানে। চালচিত্রের নিচে সপরিবারে ত্রিনয়নী মা দুর্গা অবস্থান করতেন। পায়ের কাছে অসুর, মাথার উপর শিব ঠাকুর থাকতেন। পুজোয় দুটি পাখি ওড়ানো হত। একটি শঙ্খচিল, অন্যটি নীলকণ্ঠ পাখি। মাকে পথ দেখিয়ে কৈলাস থেকে ঠাকুরবাড়িতে নিয়ে আসার দায়িত্ব থাকত শঙ্খচিলের ওপর, আর বিজয়ার দিন নীলকণ্ঠ পাখি মহাদেবকে দেবীর ফিরে আসার বার্তা দিত।
প্রত্যেক ঠাকুর পরিবারেই এই দুই পাখি ওড়ানোর রীতি ছিল। ঠাকুরবাড়ির পুরুষেরা প্রতিমার সঙ্গে গঙ্গা তীরে যেতেন নতুন পোশাক পরে। গঙ্গার তীরে দুটি নৌকোর মাঝে স্থাপন করা হত দুর্গা প্রতিমা। মাঝ গঙ্গায় গিয়ে নৌকো দুটি দু’পাশে সরে গেলে বিসর্জন সম্পূর্ণ হত।
প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের আমলেই রাজকীয়ভাবে দুর্গাপুজো উদ্যাপন শুরু হয়। দ্বারকানাথের সময়ে পরিবারের সব পুরুষদেরই তাঁর সঙ্গে ঠাকুরদালানে আসতে হত। এমনটাই ছিল নিয়ম। পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধাচারণ করলেও দেবেন্দ্রনাথের জন্যও এই নিয়ম বরাদ্দ ছিল।
দর্পনারায়ণ ঠাকুরের পর তাঁর সাত পুত্রের মধ্যে দুই পুত্র গোপীমোহন ও হরিমোহন ঠাকুর দুর্গাপুজো করতেন বলে জানা যায়। এই পুজোতে সাহেবরা আসতেন। ঠাকুরবাড়ির সাধারণ নিয়ম মেনেই পুজো করা হত। গোপীমোহন ঠাকুরের পুজোর খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হত। যদিও গোপীমোহন ঠাকুরের উত্তরসূরিরা এত আড়ম্বরে দুর্গাপুজো করার পক্ষপাতী ছিলেন না। তাঁরা পালা করে পুজো শুরু করেন। তবে এই সময় থেকেই ঠাকুর পরিবারে পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন ওঠা শুরু হয়।
প্রসন্নকুমার ঠাকুর, রাজা রামমোহন রায়ের অনুগামী ছিলেন। সতীদাহ প্রথা, অন্তর্জলীযাত্রার বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তবে দুর্গাপুজোর রীতি অনুসরণ থেকে পিছিয়ে আসেননি তিনি। এই সময় থেকেই ঠাকুর পরিবারের সদস্যরা নানাভাবে বিভক্ত হয়ে গেছেন। তবে দুর্গাপুজো যে যার মতো করে করেছেন পরিবারের নিয়ম মেনে। ঠাকুর পরিবারের ঢাকি, ঢুলি, কুমোর পটুয়াদের নিযুক্ত করা হত কয়েক পুরুষ ধরে।

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির প্রথম পুজো খোলার ঘরে শুরু হলেও দ্বারকানাথ ঠাকুরের আমলে তা বর্ণাঢ্যভাবে শুরু হয়। তবে এই পুজোয় লেগে থাকত মাটির গন্ধ। যাত্রাদলের শিল্পীদের এনে যাত্রাপালার ব্যবস্থা করতেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। নৃত্য-গীতের আসর বসত। শোনা যায়, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের স্ত্রী দিগম্বরী দেবীর মুখের আদলে দুর্গাপুজোয় মায়ের মূর্তি করা হত। অপরূপা ছিলেন তিনি। তাঁর মুখের আদলে দেবীর মূর্তি গড়ার রীতি ছিল অনেকদিন। মাকে প্রভূত সোনার গয়না এবং সোনার মুকুট পরানো হত। দু’বেলা বেনারসি শাড়ি বদল করা হত।
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপূজার ভোগে দেওয়া হত একান্ন রকমের পদ। পরে পুজোর দর্শনার্থীদের মধ্যে সেই প্রসাদ বিতরণ করা হত। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের আমলেই রাজকীয়ভাবে দুর্গাপুজো উদ্যাপন শুরু হয়। দ্বারকানাথের সময়ে পরিবারের সব পুরুষদেরই তাঁর সঙ্গে ঠাকুরদালানে আসতে হত। এমনটাই ছিল নিয়ম। পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধাচারণ করলেও দেবেন্দ্রনাথের জন্যও এই নিয়ম বরাদ্দ ছিল।
দেবীর বিসর্জন দুঃখী করত সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও। তিনি লিখেছেন ‘দুর্গা অশ্রুপূর্ণ নয়নে বিদায় নিয়ে চললেন, মনে হত সত্যিই দেবীর চোখে জল এসেছে।’ তবে এসব উপচারের মধ্যে দেবেন্দ্রনাথ থাকতেন না।
দুর্গাপুজোর ক্ষেত্রে পিতার বিরুদ্ধাচারণ করতে পারেননি তিনি। যদিও দেবীর আরতির পর প্রণাম করতেন না। তবে সেটাও বাবার অলক্ষ্যে। দ্বারকানাথের পরে ঠাকুরবাড়িতে দুর্গাপুজো হলেও দেবেন্দ্রনাথ আর সেই পুজোয় অংশগ্রহণ করতেন না। বাড়ি থেকে দূরে থাকতেন বা চলে যেতেন হিমালয়ে।
ঠাকুর পরিবারের অন্য সন্তানেরা পরবর্তীকালে দুর্গাপুজোর প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন। পুজোর ব্যবস্থাও করেছিলেন অনেকে। দেবেন্দ্রনাথ এর সন্তানরাও নিজেদের স্মৃতিচারণায় দুর্গাপুজোর উল্লেখ করেছেন। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথায় জানা যায়, তাঁদের বাড়িতে দুর্গা ও জগদ্ধাত্রী পুজো হত। বাসন্তীপুজো হত না। ঠাকুরদালানে প্রতিমা তৈরি দেখার স্মৃতিচারণা করেছেন তিনি।

‘প্রথমে খড়ের কাঠামো, তার উপর মাটি, খড়ের প্রলেপ, তার ওপর রং, ক্রমে চিত্র-বিচিত্র খুঁটিনাটি আর সমস্ত কার্য, সবশেষে অর্ধচন্দ্রাকৃতি চালের পরে দেবদেবীর মূর্তি আঁকা, আমাদের চোখের সামনে পৌরাণিক দেবসভা উদঘাটিত হত’। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর সং দেখতে পছন্দ করতেন। রামায়ণ পালার সং, শুম্ভনিশুম্ভ পালার সং তাঁর শিশুমনকে প্রভাবিত করেছিল। দুর্গাপুজোর স্মৃতির প্রসঙ্গে এই স্মৃতির কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।
দেবীর বিসর্জন দুঃখী করত সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও। তিনি লিখেছেন ‘দুর্গা অশ্রুপূর্ণ নয়নে বিদায় নিয়ে চললেন, মনে হত সত্যিই দেবীর চোখে জল এসেছে।’ তবে এসব উপচারের মধ্যে দেবেন্দ্রনাথ থাকতেন না।
অবন ঠাকুর তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছেন ‘আমাদের বাড়িতেই বসত মস্ত জলসা। খাওয়া-দাওয়া, মিষ্টি মুখ, আতর, পান, গোলাপজলের ছড়াছড়ি। ঝাড়বাতি জ্বলছে। বিষ্টু ওস্তাদ তানপুরা নিয়ে গানে গানে মাত করে দিতেন।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরও দুর্গাপুজোর আনন্দ উপভোগ করতেন। তবে আড়ম্বরবিহীন পুজোয় আধ্যাত্মিকতা খুঁজে পেতেন। তাঁর জীবনীকার বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘আরতির সময় ধূপ-ধুমে সমাচ্ছন্ন দেবীর অস্পষ্ট মুখখানি তাহার মনে অজানা রহস্যের এক সুন্দর মোহজাল বিস্তার করিত। বিজয়ার দিনেও তাঁর অন্তর ব্যথিত হতো।’
ঠাকুর পরিবারের মেয়েদের দুর্গাপুজোয় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধি ছিল। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠা কন্যা সৌদামিনী দেবী লিখেছেন, ‘আমাদের বাড়িতে যখন দুর্গোৎসব ছিল, ছেলেরা বিজয়ার দিনে নূতন পোশাক পরিয়া প্রতিমার সঙ্গে সঙ্গে চলিত, আমরা মেয়েরা সেই দিন তেতালার ছাদে উঠিয়া প্রতিমার বিসর্জন দেখিতাম। তখন বছরের মধ্যে সেই একদিন আমরা তেতালার ছাদে উঠিবার স্বাধীনতা পাইতাম।’ অন্তঃপুরবাসিনীরা পুজোর কাজ, অঞ্জলি এসবের মধ্যেই দিন কাটাতেন।

নগেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর পর জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে দুর্গাপুজো বন্ধ হয়। তখন ১৮৫৮ সাল। তবে দ্বারকানাথ ঠাকুরের ছোট ভাই রমানাথ ঠাকুরের কয়লাহাটার বাড়িতে তখনও দুর্গাপুজো হত। সেখানেই উৎসবে মেতে উঠতেন সকলে। এছাড়াও জোড়াসাঁকোর বকুলতলার বাড়ি অর্থাৎ গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়িতে বিজয়াসম্মিলনী হত। সাক্ষী ছিলেন স্বয়ং অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
অবন ঠাকুর তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছেন ‘আমাদের বাড়িতেই বসত মস্ত জলসা। খাওয়া-দাওয়া, মিষ্টি মুখ, আতর, পান, গোলাপজলের ছড়াছড়ি। ঝাড়বাতি জ্বলছে। বিষ্টু ওস্তাদ তানপুরা নিয়ে গানে গানে মাত করে দিতেন। আর বিজয়ার সেই করুণ গান শুনে মেয়েরা চিকের আড়ালে চোখের জল ফেলতেন।’
ঠাকুর পরিবারের মধ্যে থেকেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের বাবার ধর্মানুসরণকেই বিশ্বাস করতেন। তাই কখনও দুর্গোৎসবে অংশগ্রহণ করেননি। কিন্তু আজীবন তাঁর সৃষ্টিতে স্থান পেয়েছে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। তবে মূর্তির মধ্যেই ঈশ্বরের আবির্ভাবকে তিনি একমাত্র সত্য বলে মনে করতেন না।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট ভাই নগেন্দ্রনাথ ঠাকুর ভক্তিভরে দুর্গাপুজো করেছিলেন শেষ কয়েক বছর। তিনি স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন ‘দুর্গোৎসব আমাদের সমাজের বন্ধন, সকলের সাথে মিলনের সুস্থ উপায়, ইহার ওপর হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়, করিলে সকলের মনে আঘাত লাগিবে।’
ঠাকুর বাড়ির সবচেয়ে খ্যাত সন্তান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুর্গাপুজো নিয়ে মনোভাব ছিল একেবারে অন্যরকম। তিনি নিজেও ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তিনি ঈশ্বরকে গতানুগতিক পথে অনুসন্ধান করতে চাননি। কর্মসাধনার ভিতর দিয়েই পেতে চেয়েছিলেন। তাই সাকার বা নিরাকার দু’ধরনের সাধনাতেই স্বচ্ছন্দ্য ছিলেন কবি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, উৎসবের দিন একলার গৃহ সকলের হয়।
১৯০৩ সালের ২২শে অক্টোবর বোলপুর থেকে তিনি কাদম্বিনী দেবীকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘সাকার, নিরাকার একটা কথার কথা মাত্র, ঈশ্বর সাকার এবং নিরাকার দুই-ই। শুধু ঈশ্বর কেন, আমরা প্রত্যেকেই সাকারও বটে নিরাকারও বটে। আমি এই সকল মতামত লইয়া তর্ক বা বিবাদ করিতে চাই না। তাঁহাকে রূপে এবং ভাবে আকারে এবং নিরাকারে কর্মে এবং প্রেমে সকল রকম এই ভজনা করিতে হইবে। আকার তো আমাদের রচনা নহে আকার তো তাঁহারই।’
ঠাকুর পরিবারের মধ্যে থেকেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের বাবার ধর্মানুসরণকেই বিশ্বাস করতেন। তাই কখনও দুর্গোৎসবে অংশগ্রহণ করেননি। কিন্তু আজীবন তাঁর সৃষ্টিতে স্থান পেয়েছে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। তবে মূর্তির মধ্যেই ঈশ্বরের আবির্ভাবকে তিনি একমাত্র সত্য বলে মনে করতেন না।
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে পৌত্তলিকতা সম্পূর্ণরূপে বর্জিত হয় মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমলে। তিনিই জোড়াসাঁকোয় সকল পৌত্তলিক রীতিনীতি বন্ধ করেন। বৈদিক ও উপনিষদের মন্ত্রের আলোয় ব্রাহ্ম অনুষ্ঠান পদ্ধতির প্রবর্তন করেন।
ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ বাবার পথ অনুসরণ করলেও তিনি কখনই নিজেকে সম্পূর্ণ ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বী মনে করেননি। কাদম্বিনী দেবীকেই চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘ব্রাহ্মসমাজ আমাকে ঠিক ব্রাহ্ম বলে গ্রহণ করেনি এবং আমাকে তাঁরা বিশেষ অনুকূল দৃষ্টিতে কোনদিন দেখেননি। আমায় কোন বাঁধনে বাঁধতে পারেনি বলেই বোধহয় ব্রাহ্মসমাজ আমায় আপন করে নিতে পারেনি। তবে এই বাঁধনে না বাধার খেদও আমার নেই।’
বহু চিঠিপত্রেই রবীন্দ্রনাথ দুর্গা এবং দুর্গাপুজো নিয়ে তাঁর মতামত ব্যক্ত করেছেন। ব্রাহ্ম হলেও ব্রাহ্মদের সব মতাদর্শ কবি সমর্থন করতেন না। যেমন ১৯৩৪ সালের ২৫শে এপ্রিল শান্তিনিকেতন থেকে রবীন্দ্রনাথ অমিয় চক্রবর্তীকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আমি যে জন্ম ব্রাত্য, শিশুকাল থেকেই আমি শ্রেণীভ্রষ্ট। এমনকি ব্রাহ্মসমাজও আমাকে খুঁটিতে বাঁধতে পারেনি। এজন্যেই দেশের লোকের কাছ থেকে আমি প্রশংসা পেয়েছি, প্রীতি পাইনি।
‘কিন্তু বাঁধনের শর্তে প্রীতি যদি না পেয়ে থাকি, তবে তা নিয়ে খেদ করব না। আমি যে গৃহে জন্মেছি সেখানকার ধর্মেই দীক্ষা পেয়েছিলুম। কিন্তু আমার মন তারই মাপে নিজেকে গড়ে নিতে কোনমতেই রাজি ছিল না। তবু আমি এ নিয়ে টানা-হ্যাঁচড়া না করেই বেশ সহজভাবেই আপন প্রকৃতির পথে চলেছিলুম। সেই পথ ধরেই আজ আমি নিজের উপযোগী গন্তব্য স্থানে পৌঁছেছি। এটাকে অপরাধ বলে মাথা খুঁড়ে মরিনি।’ ধর্ম অনুসরণ এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাস, দুই আলাদা সেতুতে বেঁধেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাই পৌত্তলিকতার সঙ্গে ব্রাহ্ম সমাজের যে চিরকালীন বিরোধ, তার অংশ কখনই ছিলেন না তিনি।
ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপুজোর যাত্রাপথ পৌত্তলিকতা থেকে শুরু হয়ে ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বনে এসে শেষ হয়েছিল, এমন কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। দ্বারকানাথ ঠাকুর একদিকে যেমন দুর্গাপুজো জাঁকজমক করে করেছেন, তেমনই অন্যদিকে সামলেছেন রামমোহন রায় প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মসভার ট্রাস্টির সদস্যপদও। পৌত্তলিকতা পুরোপুরি ত্যাগ না করলেও তাঁর আমল থেকেই ব্রাহ্ম ধর্ম অবলম্বনের পথটি বেছে নেওয়ার পরিসর তৈরি হয়।
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে পৌত্তলিকতা সম্পূর্ণরূপে বর্জিত হয় মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমলে। তিনিই জোড়াসাঁকোয় সকল পৌত্তলিক রীতিনীতি বন্ধ করেন। বৈদিক ও উপনিষদের মন্ত্রের আলোয় ব্রাহ্ম অনুষ্ঠান পদ্ধতির প্রবর্তন করেন। শুরু হয় নিরাকার ঈশ্বরের সাধনা। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমলে ব্রাহ্ম ধর্ম যেন এক নতুন আলো দেখল। তিনি ব্রাহ্ম ধর্মকে কঠোরতার নিগড় ভেঙে মানবতাবাদের আলো দেখালেন, যে আলোয় প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের ভিতর ঈশ্বরের অনুসন্ধান শুরু হয়।
তথ্যসূত্র
১. অবনীন্দ্র রচনাবলী -আমাদের সেকালের পুজো
২. দ্বারকানাথ ঠাকুরের জীবনী -ক্ষীতীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৩. ঠাকুর বাড়ির দুর্গাপুজো, নিবন্ধ – চিত্রা দেব
৪. পিতৃস্মৃতি ও অন্যান্য রচনা – সৌদামিনী দেবী
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
