Inanna O Durga
(Inanna O Durga)

আমি যখন প্রথম প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার দেবী ইনানা বা ইশতারের ছবি দেখি তখন চমকে উঠেছিলাম। এ তো আমার দুর্গা, আমার অতি পরিচিত ঘরের মেয়ে দুর্গা। সেই থেকে, তা সে প্রায় ১০-১৫ বছর হল, এই চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরে বেড়িয়েছে যে কী করে, এই যে মিল আমার চোখে পড়েছে, তার স্বরূপ সন্ধান করতে পারব। 


আরও পড়ুন: পুজোর মহারাজকীয় খানাপিনা


শুরু করি আমার চোখে দেখতে ভীষণ মিল লাগা দুই দেবীর ছবি দিয়ে। নিচে বাঁয়ে আক্কাদীয় দেবী ইশতারের ২৩৫০-২১৫০ সাধারণ পূর্বাব্দের (BCE) সীলমোহরে পাওয়া ছবি, আর ডানদিকে আমার তোলা বর্তমান সময়ের (একবিংশ শতকের প্রথমাংশে) কলকাতার দুর্গা প্রতিমার ছবি। প্রথম দর্শনে যদিও মনে হতে পারে, দুটি মূর্তি প্রায় এক‌ই রকম। কিন্তু পরে খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যাবে, মিল কিছু থাকলেও অমিল‌ও প্রচুর।

আগে মিলগুলো দেখে নিই। সবচেয়ে প্রথমে যা চোখে পড়ে সেটা হল, সিংহবাহিনী দেবীর হাতে/প্রধান হাতে উদ্যত এক ভীষণ অস্ত্র। অস্ত্র দুই ক্ষেত্রে আলাদা, অর্থাৎ বাঁকা তলোয়ার আর ত্রিশূল হলেও তাদের ভয়াবহতার তীব্রতা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। 

দ্বিতীয়ত, দুর্গার বাকি হাতগুলোয় যেমন অস্ত্র এমনভাবেই ধরা যে, দেখে মনে হয় শক্তির তীব্র বিকিরণ হচ্ছে চারিদিকে, তাতেই যেন এক প্রভা মণ্ডল তৈরি হয়েছে‌, ইশতার মূর্তির‌ও তেমনি মাথার পিছন দিকে থাকে ঠিকরে পরা দ্যুতির মতো নানা অস্ত্রের সম্ভার। 

তৃতীয়ত, দুই দেবীর‌ই মাথায় জমকালো মুকুট। চতুর্থ বিষয় আসলে অমিল। তবে আমার মতো প্রথম যাঁরা দেখবে, তাঁদের মনে হতেও পারে ইশতারের‌ও তো দশ বা বারো হাত! কিন্তু ইশতার মূর্তির দুটিই হাত, দুপাশে ছড়ানো ডানা, যেগুলো অনেকগুলো হাতের সমাহার বলে ভুল হয়েছিল আমার। 

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার মূর্তিশিল্পতত্ত্ব (Iconography) এবং ধর্মীয় আচার অনুযায়ী, এই ডানার বহুস্তরীয় অর্থ ছিল, যার মধ্যে ইশতারের মহাজাগতিক সত্তা অন্যতম। শুক্র গ্রহের দেবী হিসেবে তাঁর অধিষ্ঠান, যুদ্ধের দেবী হিসেবে তাঁর রূপকল্প, তাঁর সহজেই পাতাল এবং মর্ত্যে যাতায়াত, এ সবের‌ই মূর্ত প্রতীক এই ডানা। মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন দেবতাদের প্রধান অনেকের‌ মূর্তিতেই এই ডানা দেখতে পাওয়া যায়।

দুই দেবীর‌ বাহ্যিক রূপের তুলনামূলক আলোচনা এই লেখার প্রধান উদ্দেশ্য নয়। আমাদের উদ্দেশ্য যে প্রাথমিক মিল আমাদের চমকে দিয়েছিল, তার স্বরূপ সন্ধান। আমরা ইনানা সম্বন্ধে জানব, প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় তাঁর উৎপত্তি অবস্থান জানার চেষ্টা করব।

এবার আসি ইশতার মূর্তির সঙ্গে দুর্গা মূর্তির পার্থক্যের আলোচনায়। প্রথমেই চোখে পড়ে দুর্গা তাঁর চার ছেলে মেয়ে নিয়ে উপস্থিত, কিন্তু ইশতার একা! কেবল একটি অতি বাধ্য সিংহ তাঁর সঙ্গী। কখনও বা দুটি সিংহ, কখনও দু একটা প্যাঁচা তাঁকে সঙ্গ দেয়। কিছু চিহ্ন, বিশেষ করে আটটি কোণ বিশিষ্ট এক তারা, শুক্র গ্রহের চিহ্ন থাকে তাঁর পাশে। 

অনেক পুরনো, চতুর্থ শতকের শেষ দিকে উরুক থেকে পাওয়া পাত্রের গায়ে ইনানার যে প্রথম ছবি পাওয়া যায়, তাতে সিংহ নেই। তবে একজন পূজারীর পূজা অর্পণের চিত্রকল্প আছে, যা পরবর্তী সময়ে ইশতারের মূর্তিতে দেখা যায় না। দ্বিতীয়ত, ইশতার যুদ্ধের দেবী। কিন্তু কোনও মূর্তিতে তাঁকে কোনও ব্যক্তি বা প্রাণী বা অ-প্রাণীকে হত্যা করতে দেখতে পাওয়া যায় না, অন্তত সরাসরি। দুর্গার যে রূপ আমাদের আলোচ্য, তা মহিষাসুরমর্দিনী।

দুই দেবীর‌ বাহ্যিক রূপের তুলনামূলক আলোচনা এই লেখার প্রধান উদ্দেশ্য নয়। আমাদের উদ্দেশ্য যে প্রাথমিক মিল আমাদের চমকে দিয়েছিল, তার স্বরূপ সন্ধান। আমরা ইনানা সম্বন্ধে জানব, প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় তাঁর উৎপত্তি অবস্থান জানার চেষ্টা করব। তৎকালীন সমাজ-অর্থনীতিতে তাঁর অবস্থান দেখে নেব। 

পরবর্তী সময়ে তাঁর ইশতার হয়ে ওঠা এবং মেসোপটেমিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রশক্তির সময়ে তাঁর অবস্থান এবং পরিবর্তন দেখে নেব সংক্ষিপ্তভাবে। তারপর দেখব পারস্য দেবী অ্যানাহিটার মধ্যে তাঁর প্রভাব কীভাবে সঞ্চারিত হয়েছিল। তারপর দেখে নেব অ্যানাহিটা কুষাণ দেবী নানা-র মাধ্যমে কীভাবে কুষাণ এবং কুষাণ পূর্ব, মধ্য এশিয়ায় ধর্মীয় সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করেন? তারপর জেনে নেব ভারতীয় দেবী প্রতিমার উৎপত্তির বিবরণ।

অধ্যায় ১: ইনানা

সভ্যতার শুরু সুমেরীয় মেসোপটেমিয়ার উরুক শহর থেকে। এই বর্তমান ঐতিহাসিক অবস্থান পূর্বতঃসিদ্ধ হিসেবে ধরে নিয়ে বলা যায়, ইনানার ইতিহাস সভ্যতার ইতিহাসের উষালগ্নের সঙ্গে ওতপ্রোত। বর্তমান ইরাকের (ইরাক শব্দটির সম্ভাব্য উৎপত্তিও উরুক শব্দ থেকে) মধ্য দক্ষিণে, ইউফ্রেটিস নদীর পূর্বে উরুক, যার বর্তমান নাম ওয়ার্কা, অবস্থিত। ৫০০০ সাধারণ পূর্বাব্দের আশপাশের সময় পাশাপাশি অবস্থিত দুটি উবায়েদ সংস্কৃতিভুক্ত গ্রাম, উনুগ আর কুলাবা নামের শহরে পরিণত হয়। 

একদম তলার দিকে কোনও স্থাপত্যের নিদর্শন নেই, কিন্তু উপাসনাস্থলের অন্যান্য চিহ্ন রয়েছে। তার অর্থ মেসোপটেমিয়ায় পোড়া ইট ব্যবহার শুরু হওয়ার আগেই এই মন্দির স্থাপিত হয়ে গেছে প্রাথমিকভাবে।

কিছু পরে, শহর দুটি জুড়ে গিয়ে বৃহত্তর উরুক শহর তৈরি করে। এই উনুগ শহরটির কেন্দ্রে যে মন্দির ছিল সেই মন্দির ঘিরে তৈরি হয় উরুক শহরের ইয়ানা কেন্দ্র, যেখানকার প্রধান মন্দিরটি ইনানা দেবীর সম্ভবত সবচেয়ে পুরনো এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্দির। মন্দিরটি এতই পুরনো যে তার স্থাপনের সময়কার কোনও লেখ পাওয়া যায়নি, কারণ তখনও লিপি আবিষ্কার হয়নি অর্থাৎ ৩১০০ সাধারণ পূর্বাব্দ নাগাদ কিউনিফর্ম লিপির ব্যবহার হতে শুরু হওয়ার আগেই মন্দিরটি স্থাপিত হয়ে গিয়েছিল। 

একদম তলার দিকে কোনও স্থাপত্যের নিদর্শন নেই, কিন্তু উপাসনাস্থলের অন্যান্য চিহ্ন রয়েছে। তার অর্থ মেসোপটেমিয়ায় পোড়া ইট ব্যবহার শুরু হওয়ার আগেই এই মন্দির স্থাপিত হয়ে গেছে প্রাথমিকভাবে। প্রাচীনতম যেসব মন্দিরের প্রত্নতাত্ত্বিক এবং স্থাপত্যের নিদর্শন মেলে, ওই ইয়ানা কেন্দ্রের মধ্যেই, তা স্থাপিত ৩৪০০ থেকে ৩১০০ সাধারণ পূর্বাব্দের মধ্যে। 

ইনানার যে মন্দির ইয়ানা এবং উরুকের প্রধানতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, গোটা সুমেরীয় মেসোপটেমিয়ার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয়-রাজনৈতিক এবং সামাজিক কেন্দ্র; তা-ও তৈরি ওই ৩৪০০-৩১০০ সাধারণ পূর্বাব্দের সময়সীমার মধ্যেই। সেই সময়কাল থেকে পরবর্তী প্রায় হাজার বছর উরুক এবং ইনানার উপাসনার সবচাইতে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে প্রমাণ পাওয়া যায়।

ইতিহাসের একটু পিছন দিক থেকে শুরু করা যাক, ‘সুমেরীয় রাজাদের নামের তালিকা’, ইনানার মন্দির স্থাপনের প্রায় হাজার বছর পরে লেখা, আধা লোকগাথা- আধা ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী উরুক শহর স্থাপন করেন এনমেকার। তিনি ইনানার এক মন্দির বানান যার নাম ‘স্বর্গের বাড়ি’। যদিও ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে এর কোনও প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি, তবু বলাই যায়, যে উরুকের শহর হয়ে ওঠার একদম শুরু থেকেই ইনানার উপাসনাও এখানে শুরু হয়ে গিয়েছিল।

উরুকের একদম প্রথম ১০০০ বছর, অর্থাৎ পঞ্চম সাধারণ পূর্ব সহস্রাব্দের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সামান্য যা পাওয়া যায়, তাতে নির্দিষ্ট করে ইনানার আরাধনার রূপ খুব কিছু জানা যায়নি। তার পরের ১০০০ বছর অর্থাৎ চতুর্থ সাধারণ পূর্ব সহস্রাব্দের উরুক যুগে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন অনেক বেশি পাওয়া যায়।

এরপরের ৪০০০ সাধারণ পূর্বাব্দ থেকে ৩১০০ সাধারণ পূর্বাব্দের প্রায় ৯০০ বা ১০০০ বছর সময়কালকে ‘উরুক যুগ’ বলা হয়। এই সময়ের মধ্যেই ছোট কয়েকটি গ্রামের সমষ্টি থেকে উরুক পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম শহর হয়ে ওঠে। এই যুগের শুরু হয় তাম্র যুগে আর শেষ হয় ব্রোঞ্জ যুগে। 

৩১০০ সাধারণ পূর্বাব্দে উরুকের এলাকা ছিল ৬ বর্গ কিলোমিটার এবং জনসংখ্যা ৪০-৮০০০০। ইনানা এবং আনুর দুটি বড় বড় মন্দির কমপ্লেক্স তৈরি করা হয় এই সময়। চতুর্দিক ছড়ানো সেচ খাল তৈরি করা, পয়ঃপ্রণালী তৈরি করা, শহরের চারদিকে প্রতিরক্ষা প্রাচীর তৈরি করা, প্রথম রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যবস্থা তৈরি করা, দূরদূরান্তের সঙ্গে ব্যবসায়ী সম্পর্ক তৈরি করা, এ সবকিছুই ওই সময়কালের মধ্যে উরুকেই সম্ভব হয়েছিল। এছাড়াও দুটি এমন আবিষ্কার ওই সময় উরুকের মানুষ করেছিলেন যে তার উত্তরাধিকার আজ‌ও আমরা সবাই বহন করে চলেছি— প্রথমত, লিপি আবিষ্কার এবং দ্বিতীয়ত, কুমোরের চাকা আবিষ্কার। 

উরুকের একদম প্রথম ১০০০ বছর, অর্থাৎ পঞ্চম সাধারণ পূর্ব সহস্রাব্দের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সামান্য যা পাওয়া যায়, তাতে নির্দিষ্ট করে ইনানার আরাধনার রূপ খুব কিছু জানা যায়নি। তার পরের ১০০০ বছর অর্থাৎ চতুর্থ সাধারণ পূর্ব সহস্রাব্দের উরুক যুগে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন অনেক বেশি পাওয়া যায়। তার অন্যতম কারণ সেই সময়ে পোড়ামাটি, ধাতু ইত্যাদি সংরক্ষণযোগ্য মাধ্যমে সে যুগের সাধারণ কাজে এবং মন্দিরে ব্যবহার্য জিনিসপত্র তৈরি হতে থাকে। এবং এই সময়ের‌ই শেষ দিকে কিউনিফর্ম লিপির প্রাথমিক রূপের ব্যবহার হয় উরুকে, এবং সেটার অন্যতম কারণ ইনানার মন্দিরের হিসেবপত্র রাখা।

উরুক যুগের শেষ দিকে উরুক হয়ে ওঠে সুমেরীয় মেসোপটেমিয়া এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং রাষ্ট্র। যত না সামরিক শক্তির দিক থেকে, তার চেয়ে অনেক বেশি সংস্কৃতি এবং বাণিজ্যের দিক থেকে। উরুকের এই উত্থানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল ইনানার আরাধনা। কিন্তু ইনানার আরাধনা সম্ভবত শুরু হয় কৃষি সমাজের দেবী হিসেবে, যেখানে খেজুর এবং যবের ফসল আর তা রক্ষা করার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ পাওয়া যায়। 

৫০০০ বছর আগেকার ইনানার কোনও মূর্তি এখনও পাওয়া যায়নি, কিন্তু একটিমাত্র অ্যালাবেস্টার পাত্র থেকে ইনানার রূপের বর্ণনা করেছেন পণ্ডিতেরা। প্রায় তিন ফুট লম্বা পাত্রটি ইনানার মন্দিরের উৎখননের সময় পাওয়া যায় ১৯৩৩-৩৪ সালে, নির্ণয় করা হয় যে ৩৩০০-৩২০০ সাধারণ পূর্বাব্দের মধ্যে এটি তৈরি। 

পরবর্তী সময়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় উর্বরতা, প্রজনন, যৌনতা এবং যুদ্ধপ্রকরণ। আসলে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের, বিভিন্ন বিষয়ের দেবী মূর্তির ধারণার সংশ্লেষিত রূপ হয়ে ওঠেন উরুক যুগের শেষ দিককার ইনানা। এবং উরুকের প্রধানতম উৎসবটিও তাঁকে ঘিরেই প্রধানত সংগঠিত হয়ে ওঠে।

এই উৎসব ছিল সুমেরীয় ক্যালেন্ডারের প্রথম অনুষ্ঠান। সুমেরীয় ক্যালেন্ডার শুরু হত বসন্ত বিষুবের দিন থেকে। শীতের কষ্টকর মাসগুলোর পরে বসন্তের সুফলা সুজলা আগমন এবং প্রধান ফসল যব কাটার সময় এসে পড়া, দুইয়ে মিলে সুপ্রাচীন কাল থেকেই উরুকের মানুষ এই সময় উৎসবের আমেজে কাটাত। উর্বরতা, শক্তি এবং প্রাচুর্যের দেবী ইনানার উৎসব তাই এই সময় অত্যন্ত এবং প্রধানতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মরাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। 

Inanna O Durga
উরুক পাত্রতে দেবী ইনানা

৫০০০ বছর আগেকার ইনানার কোনও মূর্তি এখনও পাওয়া যায়নি, কিন্তু একটিমাত্র অ্যালাবেস্টার পাত্র থেকে ইনানার রূপের বর্ণনা করেছেন পণ্ডিতেরা। প্রায় তিন ফুট লম্বা পাত্রটি ইনানার মন্দিরের উৎখননের সময় পাওয়া যায় ১৯৩৩-৩৪ সালে, নির্ণয় করা হয় যে ৩৩০০-৩২০০ সাধারণ পূর্বাব্দের মধ্যে এটি তৈরি। 

নিচ থেকে উপরে চারটি ভাগে কারুকাজ করা পাত্রটিতে, একদম নিচে জল বা ইউফ্রেটিস নদী, নলখাগড়া এবং শস্যের চারা ইত্যাদি জীবনের প্রাথমিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দেখা যায়। দ্বিতীয় স্তরে ভেড়া ছাগল ইত্যাদি পালিত পশুর দল। তৃতীয় স্তরে কিছু পুরুষ মানুষকে দেখা যায় বিভিন্ন শস্য, ফল ইত্যাদি নিয়ে যাচ্ছে দেবীকে নিবেদন করতে। চতুর্থ স্তরে দেখা যায় একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ অর্ঘ্য নিবেদন করছেন দেবী ইনানার কাছে, দেবীর দুই দিকে দুটি নলখাগড়ার গুচ্ছ যা দেবী ইনানার প্রতীক।

এমনকি ২৩৩৪-৩১ সাধারণ পূর্বাব্দ নাগাদ‌ যখন আক্কাদীয় সম্রাট সারগন দ্য গ্রেট সুমের এবং উরুকের দখল নেন, তখন তিনি ইনানার সম্মান প্রদর্শনে কোনও ঘাটতি তো করেননি, বরঞ্চ আক্কাদীয় দেবী ইশতার আর ইনানাকে একই দেবী হিসেবে পুজো করা শুরু করেন।

উরুক পাত্রটিতে যাকে দেবী ইনানাকে সামনে দাঁড়িয়ে অর্ঘ্য নিবেদন করতে বা পুজো করতে দেখা যায়, তিনি সম্ভবত ইনানার মন্দিরের প্রধান পুরুষ পুরোহিত। এই প্রধান পুরোহিত‌ই সম্ভবত উরুকের রাজশক্তির পরিচালক ছিলেন। কিন্তু কয়েকশো বছর পর, ২৯০০ সাধারণ পূর্বাব্দ নাগাদ‌ ধর্ম-প্রধান শাসন ব্যবস্থার অবসান হয়। প্রতিষ্ঠা হয় উরুকে প্রথম রাজবংশের। তার সঙ্গে সঙ্গেই ইনানার উপাসনা এক নতুন স্তরে উন্নীত হয়। এই সময় থেকে ইনানা উরুকের প্রধান দেবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। এর আগে ইনানার সঙ্গে সমমর্যাদায় আনু দেবের পুজো হত, এই সময় থেকে আনুর গুরুত্ব ক্রমাগত কমতে থাকে।

ইনানার গুরুত্ব বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে ইনানার উপাসনার ক্ষেত্র পরিবর্তিত হতে থাকে। কৃষির উর্বরতার তুলনায় যৌনতা, প্রাচুর্য এবং যুদ্ধের দেবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকেন ইনানা। তবে কৌম অবচেতনার স্তরে ইনানা এবং তাঁর আক্বাদীয় রূপ ইশতার কৃষিকাজের আরকিটাইপাল ইমেজ হিসেবেই থেকে যান যুগ-যুগান্তরের পরপারে।

অধ্যায় ২: ইশতার

উরুকের রাজনৈতিক ক্ষমতা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছয় ২৭০০-২৬০০ সাধারণ পূর্বাব্দ নাগাদ‌, আধা-লোকগাথা এবং সম্ভবত ঐতিহাসিক চরিত্র, গিলগামেশের রাজত্বকালে। গিলগামেশের গাথাগুলো থেকেই জানা যায়, ইনানার মন্দিরের সঙ্গে তাঁর এক গভীর সম্পর্ক ছিল। তবে এই সময়ের পর থেকে উরুকের রাজনৈতিক ক্ষমতা কমতে থাকে। উর এবং লাগাশের রাজনৈতিক ক্ষমতা বাড়তে থাকে। কিন্তু ইনানা কেন্দ্রিক উরুকের সংস্কৃতি গোটা সুমেরীয় মেসোপটেমিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল আরও বহুকাল যাবত।

এমনকি ২৩৩৪-৩১ সাধারণ পূর্বাব্দ নাগাদ‌ যখন আক্কাদীয় সম্রাট সারগন দ্য গ্রেট সুমের এবং উরুকের দখল নেন, তখন তিনি ইনানার সম্মান প্রদর্শনে কোনও ঘাটতি তো করেননি, বরঞ্চ আক্কাদীয় দেবী ইশতার আর ইনানাকে একই দেবী হিসেবে পুজো করা শুরু করেন। এই সময়েই ইশতার দেবীর যে রূপ নিয়ে আমরা আলোচনা শুরু করেছিলাম, তার পূর্ণাঙ্গ রূপ চূড়ান্ত হয়।

ঋগবেদীয় এবং প্রাচীন পারসীয় মাইথোলজি এবং ধর্ম একই ছিল, কিন্তু দুই দলের মধ্যে দূরত্বের কারণে দুটি আলাদা ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় পারসীয় ধর্ম এবং বৈদিক ধর্ম। বেশ কিছু দেবদেবী যেমন মিত্র, পবন, সরস্বতী এঁরা দুই ধর্মেই থেকে যান, যদিও তাঁদের স্বরূপের পরিবর্তন হয়।

সারগন এবং তাঁর পরবর্তী আক্বাদীয় রাজাদের মাধ্যমে উরুক এবং আরও কয়েকটি ছোট সুমেরীয় শহরের আঞ্চলিক দেবী ইনানার প্রতিষ্ঠা হয় সমগ্র মেসোপটেমিয়ার দেবী ইশতার হিসেবে। ক্রমাগত তাঁর পরিচিতি কেন্দ্রীভূত হতে থাকে যুদ্ধের দেবী হিসেবে। আক্কাদীয় সাম্রাজ্যের সময় থেকেই অস্ত্র সজ্জিতা, সিংহবাহিনী মূর্তি হিসেবেই ইশতারকে দেখা যেতে থাকে।

পরের দু’হাজার বছর ধরে দ্বিতীয় সুমেরীয়, প্রাচীন ব্যাবিলনীয়, কাসাইট, আসিরিয় শাসনকালেই যুদ্ধের দেবী হিসেবে মোটামুটি এভাবেই ইশতার পূজিত হন। যদিও কখনই তিনি আর মেসোপটেমিয়ার প্রধান দেবী হয়ে ওঠেননি। মেসোপটেমিয়ার শেষ স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তি, নতুন ব্যাবিলনীয় শাসনকালে ইশতারের সবচেয়ে বড় সৌধটি তৈরি করেন নেবুকাদনেজার– ব্যাবিলনের ইশতার গেট। 

অধ্যায় ৩: ইশতার প্রতিমার মেসোপটেমিয়ার বাইরে গমন

মেসোপটেমিয়ার বাইরে ইশতারের উপাসনা এবং তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে, প্রধানত আসিরিয় এবং ব্যাবিলনীয় শাসন ও সংস্কৃতির প্রসার ও প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে। কিন্তু পারস্যের ইতিহাস অন্য ধারায় এগিয়ে চলছিল। পারস্যের পুরনো অধিবাসীদের মধ্যে দেবী উপাসক এলেমাইট বা সর্প উপাসক জিরফ্ট সভ্যতার প্রভাব পরবর্তী সময়ে সেভাবে আর দেখা যায় না। ২০০০-১৫০০ সাধারণ পূর্বাব্দের মধ্যে প্রাচীন ভারতীয় আর্যদের থেকে প্রাচীন পারসীয় আর্যরা আলাদা হয়ে পারস্য মালভূমিতে বসবাস শুরু করেন এবং ক্রমাগত পশ্চিম দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন।

ঋগবেদীয় এবং প্রাচীন পারসীয় মাইথোলজি এবং ধর্ম একই ছিল, কিন্তু দুই দলের মধ্যে দূরত্বের কারণে দুটি আলাদা ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় পারসীয় ধর্ম এবং বৈদিক ধর্ম। বেশ কিছু দেবদেবী যেমন মিত্র, পবন, সরস্বতী এঁরা দুই ধর্মেই থেকে যান, যদিও তাঁদের স্বরূপের পরিবর্তন হয়। আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হল, প্রাচীন ইন্দো-ইরানীয় অথবা বৈদিক আর্য এবং প্রাচীন পারসীয়রা কেউই মূর্তি পূজা করতেন, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পরে আরও পূর্ব দিকে এগিয়ে এসে এখনকার উজবেকিস্তান এবং তার আশপাশের তৎকালীন সোগদিয়ানা, ব্যাকট্রিয়া বা বর্তমান আফগানিস্তানের পশ্চিম ও উত্তর অংশ দখল করে ভারতের সিন্ধু নদ অব্দি এলাকা দখল করে গ্রিক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন।

বৈদিক দেবী সরস্বতীর ইরানীয় রূপ হচ্ছেন অ্যানাহিটা। অ্যানাহিটার প্রাচীন নাম ছিল ‘আরাদ্বী সুরা অ্যানাহিটা’, আরাদ্বী সুরা ছিলেন স্বর্গের নদীর (সরস্বতী) স্বরূপ। তাঁর সঙ্গে পশ্চিম পারস্যের আনাহিতি নামের দেবী, যিনি ছিলেন ন্যায় নীতির দেবী, সংযুক্ত হয়ে ‘আরাদ্বী সুরা অ্যানাহিটা’ রূপ নেন (১৫০০-১০০০ সাধারণ পূর্বাব্দ নাগাদ)। আরও পরে কেবল অ্যানাহিটা নামেই তাঁর উপাসনা হতে থাকে। অ্যানাহিটা জল, উর্বরতা, বীরত্ব, সুস্থতা এবং বুদ্ধিমত্তার দেবী। কিন্তু বীরত্ব এবং যুদ্ধজয়ের দেবী হিসেবে তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে যত পারস্যের পশ্চিম দিকে তাঁর প্রভাব বাড়তে থাকে ব্যাবিলনীয় ইশতারের গুণ তাঁর মধ্যে আরোপিত হতে থাকে। 

অ্যানাহিটার রূপ বর্ণনা করে একাধিক মন্ত্র রচিত হলেও অ্যাকাদেমিয় সময়ের আগে তাঁর কোনও মূর্তি সেরকম পাওয়া যায় না। দ্বিতীয় আর্টাজারক্সিস‌ই (404-358 সাধারণ পূর্বাব্দ) প্রথম অ্যানাহিটার মূর্তি সারা পারস্য সাম্রাজ্যে স্থাপন করেন। যদিও সেই মূর্তিগুলি পরবর্তীকালের রাজশক্তির প্রকোপে ধ্বংস হয়ে গেছে, তবে দু-একটা সিল বা ভাস্কর্য থেকে দেখা যায় অ্যানাহিটা সিংহের ওপর দাঁড়িয়ে বা বসে আছেন, এবং তাঁকে ঘিরে চারিদিকে বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্রের সম্ভার। ইশতার মূর্তির সরাসরি প্রভাব অ্যানাহিটার রূপকল্পে সংবাহিত হতে থাকে।

Inanna O Durga
দ্বিতীয় আর্টাজারক্সিস‌ এবং অ্যানাহিটা

অধ্যায় ৪: অ্যানাহিটার পূর্ব দিকে গমন

৩২৪ সাধারণ পূর্বাব্দে আলেকজান্ডার পারস্য আক্রমণ করে অ্যাকাদেমিয় শাসনের অবসান ঘটান। পরে আরও পূর্ব দিকে এগিয়ে এসে এখনকার উজবেকিস্তান এবং তার আশপাশের তৎকালীন সোগদিয়ানা, ব্যাকট্রিয়া বা বর্তমান আফগানিস্তানের পশ্চিম ও উত্তর অংশ দখল করে ভারতের সিন্ধু নদ অব্দি এলাকা দখল করে গ্রিক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। তবে পরবর্তী ১০০ বছরের মধ্যে আবার পশ্চিমে সেলুসিড এবং পূর্বে ব্যাকট্রিয় গ্রিক রাজ্যে ভাগ হয়ে যায়। 

অ্যানাহিটার সঙ্গে গ্রিকরা তাঁদের প্রেমের দেবী অ্যাফ্রোদিতি এবং শুদ্ধতা ও বন্য জীবনের দেবী আর্টেমিসের মিল পান। আবার রাজকীয় ক্ষমতার রক্ষাকারিনী এথেনার সঙ্গেও তাঁর মিল খুঁজে পান। ব্যাকট্রিয়ান গ্রিকরা অ্যাফ্রোদিতি, আর্টেমিস এবং এথেনার সঙ্গে সঙ্গে অ্যানাহিটার পূজাও শুরু করেন। তাঁদের মুদ্রায় এর অনেক প্রমাণ আছে। এঁদের একাংশ উত্তর-পশ্চিম ভারতের ইন্দো-গ্রিক রাজত্ব তৈরি করেন সাধারণ পূর্বাব্দ ২০০ থেকে পরবর্তী দুশো বছর মতো সময়কালে।

কুষাণরা ব্যাকট্রিয়ায় বসতি স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার দেবী নানাকে উপাসনা করতে শুরু করেন। নানা-র যে রূপ তাঁরা আরাধনা করতেন সেই দেবী প্রতিমার চার হাত, অস্ত্রভূষিতা, সিংহবাহিনী এবং তিনি যুদ্ধ, সাম্রাজ্য, দিন-রাত এবং উর্বরতার দেবী।

পার্থিয়ানরা ২৪৭ সাধারণ পূর্বাব্দ থেকে আস্তে আস্তে উত্তর পূর্ব ইরানে সাম্রাজ্য বিস্তার করতে থাকেন। প্রথমে সেলুসিড গ্রিকদের থেকে ইরানের উত্তর অংশ, পরে মেসোপটেমিয়া অব্দি অঞ্চল তাঁরা দখল করেন। প্রথমদিকে ব্যাকট্রিয়ান গ্রিকদের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক বজায় রাখলেও পরবর্তী শতকে পার্থিয়ানদের সবচেয়ে বড় সম্রাট মিথ্রিডেটিস ব্যাকট্রিয়ানদের যুদ্ধে হারিয়ে তাদের সাম্রাজ্যের পশ্চিম দিকের অংশ দখল করে নেন। 

পরবর্তী সময়ে পার্থিয়ানদের একটা অংশ পহ্লবরা আফগানিস্তান হয়ে ভারতের উত্তর-পশ্চিম অংশে রাজত্ব বিস্তার করেন। সাধারণ পূর্বাব্দ প্রথম শতক থেকে সাধারণ অব্দ প্রথম শতক (CE first century) অব্দি সময়কালে, কুষাণরা এঁদের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তার করেন সাধারণ অব্দের দ্বিতীয় শতকে। পার্থিয়ানরা অ্যানাহিটার পরিবর্তিত রূপ, যেখানে অ্যানাহিটা, অ্যাফ্রোদিতি, আর্টেমিস সমন্বিত হয়ে গেছিলেন, তাঁর উপাসনা করতেন।

Inanna O Durga
কুষাণ দেবী নানা

এরপর আসেন কুষাণরা। বর্তমান উত্তর-পশ্চিম চিনের স্তেপ অঞ্চল, তারিম বেসিন থেকে বিচ্যুত হয়ে ব্যাকট্রিয়ার উত্তর দিকে, বর্তমান তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান এবং উত্তর আফগানিস্তানে কুষাণরা এসে পৌঁছন সাধারণ পূর্বাব্দ দ্বিতীয় শতকের শেষ দিকে। প্রায় ১০০ বছর পরে তাঁরা হিন্দুকুশ পার হয়ে দক্ষিণে কাবুল উপত্যকায় গ্রিক এবং পার্থিয়ানদের হারিয়ে সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। সাধারণ অব্দের প্রথম শতকে কুষাণরা উত্তর পশ্চিম ভারতের গান্ধার প্রদেশ এবং সিন্ধু অববাহিকায় রাজত্ব বিস্তার করেন। মধ্য ভারতে কুষাণ সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয় সাধারণ অব্দের দ্বিতীয় শতকে, প্রধানত কণিষ্কের আমলে।

কুষাণরা ব্যাকট্রিয়ায় বসতি স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার দেবী নানাকে উপাসনা করতে শুরু করেন। নানা-র যে রূপ তাঁরা আরাধনা করতেন সেই দেবী প্রতিমার চার হাত, অস্ত্রভূষিতা, সিংহবাহিনী এবং তিনি যুদ্ধ, সাম্রাজ্য, দিন-রাত এবং উর্বরতার দেবী। যদিও নানা-র উদ্ভব নিয়ে বহু মত আছে, সরাসরি মেসোপটেমিয়ার দেবী নানায়া-র সঙ্গে তাঁকে এক করা যায় কি না এবং নানায়া ইনানা/ইশতারের পরিবর্তিত রূপ কি না, এ বিষয়ে পণ্ডিতেরা একমত নন। কিন্তু এটা বলাই যায় যে আক্বাদীয় এবং আসিরিয় ইশতার প্রতিমার সঙ্গে অ্যানাহিটা এবং কুষাণ দেবী নানা-র চাক্ষুষ মিল অত্যন্ত লক্ষণীয়। নানা-র উপাসনা এবং প্রতিমা কণিষ্ক এবং তাঁর সাম্রাজ্যের মাধ্যমে ভারতীয় মূল ভূখন্ডেও প্রচলিত হয় সাধারণ অব্দের দ্বিতীয় শতকে।

বিদ্বজনেরা অনেকেই মনে করেন, সিংহবাহিনী মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তি ভারতের নিজস্ব ভাবনা, কল্পনা। সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হ‌ওয়া সম্ভব। তার একটা কারণ, সিন্ধু সভ্যতার সিলে দেবী মূর্তি দেখা যায় মহিষ হত্যাকারিনী রূপে।

যেহেতু বেশিরভাগ দুর্গা মূর্তি, ভারতে যা পাওয়া যায়, তা সিংহবাহিনী এবং অস্ত্রসজ্জিতা, এবং তার সবচাইতে পুরনোগুলিই কুষাণ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার পরবর্তী সময়ের সৃষ্টি, সেহেতু একটা মত বহুদিন ধরেই প্রচলিত যে কুষাণ দেবী নানা-র প্রতিমার প্রভাবেই দুর্গা প্রতিমার রূপ প্রতিষ্ঠা পায়।

অধ্যায় ৫: দুর্গা প্রতিমার উৎপত্তি এবং প্রসার 

কিন্তু সমস্যা হল প্রাচীনতম (এখন অব্দি পাওয়া) দুর্গা প্রতিমাগুলি নিয়ে। রাজস্থানের টংক জেলার সাগর থেকে পাওয়া মহিষাসুরমর্দিনীর টেরাকোটা ফলকগুলি সাধারণ পূর্বাব্দ ১০০ থেকে সাধারণ অব্দ ১০০-র মধ্যে মালব রাজ্যে তৈরি এ ব্যাপারে পণ্ডিতেরা অনেকেই একমত। এই দেবী প্রতিমার সঙ্গে সিংহ আছে, এবং মহিষাসুরকে শুধু হাতেই হত্যা করছেন।

Inanna O Durga
সাগর থেকে পাওয়া মহিষাসুরমর্দিনীর টেরাকোটা ফলক

এখন কুষাণ শাসন ভারতের এতটা ভিতরে বিস্তৃত হয় সাধারণ অব্দের তৃতীয় শতকে। যে সময়ের ওই টেরাকোটা ফলকগুলি, তখন অব্দি কুষাণ প্রভাব বড়জোর গান্ধার প্রদেশ পর্যন্ত‌ই বিস্তার লাভ করেছিল। তাহলে এই যে সিংহবাহিনী মহিষাসুরমর্দিনী রূপ দুর্গা প্রতিমার, তা গঠিত হয়ে গেছিল কুষাণরা ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তার করার আগেই।

বিদ্বজনেরা অনেকেই মনে করেন, সিংহবাহিনী মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তি ভারতের নিজস্ব ভাবনা, কল্পনা। সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হ‌ওয়া সম্ভব। তার একটা কারণ, সিন্ধু সভ্যতার সিলে দেবী মূর্তি দেখা যায় মহিষ হত্যাকারিনী রূপে। যদিও মধ্যবর্তী সময়ের কোনও মূর্তি পাওয়া যায়নি যে সূত্রে আমরা সিন্ধু সভ্যতার দেবী প্রতিমার সঙ্গে মালবীয় মহিষাসুরমর্দিনীর সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি। তেমনই সিন্ধু সভ্যতার কিছু নিদর্শনে দেবীর সঙ্গে বাঘ দেখতে পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে দেবীর কোনও কোনও রূপের বাহন হিসেবে বাঘ দেখা গেলেও, সিংহবাহিনী দুর্গার কোনও প্রতিমা সাধারণ পূর্বাব্দ প্রথম শতকের আগে পাওয়া যায় না।

ইনানা এবং বর্তমান বাংলার দুর্গা দুই দেবীই মানব চৈতন্যের গভীরে প্রোথিত কৃষি সমাজের উৎসব। উরুকে যব কাটা হত বসন্তকালে, তাই সেই সময়ে ইনানার উৎসব পালিত হত। বাংলার প্রধান ফসল ধান কাটা হয় শরতের শেষে, তাই কি দেবীর ‘অকালবোধন’ করা শুরু হয়?

উপসংহার: কিছু প্রশ্ন 

আমাদের আলোচনা যে সময়কালে এসে ঠেকেছে তার ঠিক পরবর্তী সময়েই দুর্গা প্রতিমার এবং দুর্গা আরাধনার বিবর্তন এবং প্রসারণ শুরু হয়ে যায়। গুপ্ত যুগের শেষ দিকেই লেখা হয় দেবী মাহাত্ম্য, যা আজ পর্যন্ত দুর্গা পূজার মূলসূত্র। দুর্গাপূজা ভারতের সর্বত্র, এমনকি আফগানিস্তান এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ অব্দ ৭০০ বা ৮০০ সালের মধ্যে।  দেশ এবং সংস্কৃতিভেদে দেবী প্রতিমার এবং লোকগাথা ও পুরানের বিবর্তন হতে থাকে, যার এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বর্তমান বাংলার দুর্গাপূজা পৃথিবীর অন্যতম বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে।

কিন্তু কিছু প্রশ্ন থেকে যায় যার উত্তর ভবিষ্যতে সন্ধান করা যাবে।

প্রথমত, ইনানা এবং বর্তমান বাংলার দুর্গা দুই দেবীই মানব চৈতন্যের গভীরে প্রোথিত কৃষি সমাজের উৎসব। উরুকে যব কাটা হত বসন্তকালে, তাই সেই সময়ে ইনানার উৎসব পালিত হত। বাংলার প্রধান ফসল ধান কাটা হয় শরতের শেষে, তাই কি দেবীর ‘অকালবোধন’ করা শুরু হয়? দুই দেবীর উৎসবের কি কোনও ধারাবাহিকতার সম্পর্ক আছে!

দ্বিতীয়ত, ইনানার যে রূপ ইশতারের মূর্তিতে পাওয়া যায়, সেই মূর্তি সম্ভবত প্রভাবিত করে পরবর্তী সময়ের অ্যানাহিটা এবং নানা-র মূর্তিকে। ভারতীয় দুর্গা কি সেই ধারাবাহিকতার অঙ্গ? তৃতীয়ত, সুমেরীয় ইনানার পুরাণের সঙ্গে ভারতীয় দুর্গার পুরাণের কি কোনও ধারাবাহিকতার সম্পর্ক আছে?

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Please login to bookmark Close

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

The Banglalive's Picks

Weekly Newsletter

Enjoy our flagship newsletter as a digest delivered once a week.

By signing up, you agree to our User Agreement and Privacy Policy & Cookie Statement.

Please login to bookmark Close
সেদিন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সামনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং রাজা রামমোহন রায়। দেবেন্দ্রনাথ তখন নেহাত বালক। বারো বছর বয়স। দেবেন্দ্রনাথের হাতে একটি আমন্ত্রণপত্র। ঠাকুর পরিবারের দুর্গাপুজোর নিমন্ত্রণ। রাজা রামমোহন রায়কে দেবেন্দ্রনাথ বলছেন, ‘সামনে পুজো, তাই তিনদিনই প্রতিমা দর্শনে আপনার নিমন্ত্রণ।‌ পত্রে দাদু এই অনুরোধ করেছেন।’ লিখছেন পায়েল চট্টোপাধ্যায়...
Please login to bookmark Close
গল্পটা আজকের নয়, আজ থেকে আনুমানিক ২৬০ বছর আগের। সাবেক কলকাতার পোস্তা অঞ্চলে সেদিন বেজে উঠেছিল আগমনী ঢাক, যার পুরোধা ব্যাক্তি ছিলেন চুঁচুড়া থেকে আগত স্বর্ণ ব্যবসায়ী শ্রী বৈষ্ণবদাস মল্লিক। আজও তাঁর তৈরি বসতবাটিতে মহাসমারোহে মহামায়ার আগমন ঘটে। লিখছেন নির্মাল্য চ্যাটার্জি...
Please login to bookmark Close
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের কাছে কল্যাণপুরে বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়িতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দুর্গাপুজোর অধিকাংশ দায়িত্ব সামলান পরিবারের পুরুষ সদস্যরা। ফল কাটা থেকে শুরু করে নৈবেদ্য সাজানো— দুর্গাপুজোর প্রায় প্রতিটি পর্বেই তাঁদের সক্রিয় উপস্থিতি। লিখছেন অমিতাভ গুপ্ত...

Subscribe

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com