বাঙালি রান্নার ‘সেই’ স্বাদ— শুধুই স্মৃতি আজ?

Traditional Bengali Food
Traditional Bengali Food

বাঙালি রান্নার ‘সেই’ স্বাদ— শুধুই স্মৃতি আজ?

(Traditional Bengali Food)

স্বাদের স্মৃতি-পরম্পরা— এই শিরোনামে লিখতে বসেই মাথায় ঘুরছে লোকমুখে মানে মা-ঠাকুমার হেঁশেল ঘরে প্রচলিত কিছু মেয়েলি প্রবাদ। স্বাদের চিরন্তন পরম্পরা টিকিয়ে রাখতেই বুঝি এমন সব লোকায়ত প্রবাদ মেয়েদের মুখে মুখে ফিরেছে একসময়। মূলত, বাঙালি রান্না নিয়েই আমার আপাতত মাথাব্যাথা। তাই ‘ঝোল হল তো ঝাল হল না, আঁশ হল তো মাছ হল না’ বা ‘যেমন রাঁধুনি, তেমন হাঁড়ি’ যতই উচিত কথা হোক, তা নির্ভেজাল সত্য।

আজকাল অজস্র ফুড ভ্লগার, ইউটিউবার, ক্লাউড কিচেন, পপ আপ মেনুর কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের সৌজন্যে হাতের মুঠোয় প্রতিনিয়ত বানভাসি বাংলার চিরাচরিত সব রান্নাবান্না। আর তা যেন আক্ষরিক অর্থেই ‘ওল্ড ওয়াইন ইন নিউ বটল’, বা বলা যেতে পারে ‘নিউ কন্টেন্ট ইন ওল্ড ফরম্যাট’।


আরও পড়ুন: আতাকামা’র আকাশে


আজকের প্রজন্ম সেসব রান্নার নামই হয়তো শোনেনি। সোশ্যাল মিডিয়ার দেখনদারিতে সেসব পোস্ট হয়তো লাইক, শেয়ার, কমেন্টের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে, কিন্তু হাতেগোনা কয়েকটি বাদে অজস্র এই সব ফুড কন্টেন্ট পাতে দেওয়ার মতো হচ্ছে না। যারা রান্নাবান্না নিয়ে প্রকৃত অর্থে বহুদিন নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে চলেছেন আর নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছেন, তাঁরা প্রণম্য। তাঁদের কাছ থেকেও অনেক কিছুই শেখার আছে এখনও। কারণ আমাদের মা, ঠাকুমা, দিদিমা, জ্যেঠিমা কেউ আজ বেঁচে নেই। তাই নিজের হেঁশেলে কিছু আটকে গেলে তাঁরাই ভরসা।

এখানে স্বাদ টিকিয়ে রাখার প্রধান অন্তরায় আজকের নিউক্লিয় পরিবার। একান্নবর্তী পরিবারে চলতে ফিরতে সু-রাঁধিয়েদের সঙ্গে অহোরাত্র যাপনের মাধ্যমেই উঠে আসত রান্নার তাকবাক।

Traditional Bengali Food
এখন নেই সে অযোধ্যা থুড়ি মাছ-শাকপাতা-আনাজের গুণমান

কিন্তু এখন কোথায় পাব তারে? এখন নেই সে অযোধ্যা থুড়ি মাছ-শাকপাতা-আনাজের গুণমান, আর অনুপান উপচে পড়লেও নেই সেই রাম থুড়ি রান্নার গুণমান। সবাই ছুটছি প্রবল ইঁদুর দৌড়ে। তার মাঝে অল্পসময়ে তাক লাগিয়ে ভাইরাল হওয়ার প্রবণতায় পরান আটুপাটু। ফুড হল সেই চমকদার কন্টেন্ট যে পহেলে দর্শনধারী, পরে না হয় গুণ বিচার। স্বাদগ্রহণে হয় চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জন।

সাধে ভারতীয় চৌষট্টিকলার একটি রন্ধন? ভারতীয় শিল্প ষড়ঙ্গের পরেই সপ্তম অঙ্গ বলে যদি কিছু থাকে তা হল রন্ধন শিল্প— এমন মত গবেষক শেখ মকবুল ইসলামের, যিনি রান্নার ঘরানা আর কৌশলকে একধরনের ইন্ট্যানজিবল ট্র্যাডিশন বলেছেন। এর মধ্যে লুকিয়ে রান্নার উপকরণ তেমনি, রান্নাঘর, রান্নার পাক-কৌশল, সমাজতত্ত্ব এবং সর্বোপরি পুষ্টিতত্ত্ব।

অনেকভাবে এই কদলী পুষ্পকে সুখাদ্যের পর্যায়ে উন্নীত করেছে ওস্তাদ বাঙালি সু-রাঁধিয়েরা সেই আবহমানকাল ধরে। ছোলা, নারকোল দিয়ে নিরামিষ ঘণ্ট, ভিতরের সেদ্ধ সাদা অংশ সরষে-পোস্ত-নারকোল কোরা, কাঁচালঙ্কা সর্ষের তেল দিয়ে মেখে অথবা চিংড়ি মাছ দিয়েই খেতে অভ্যস্ত বাঙালি।

শিল্প হয়ে উঠেছে বলেই রান্নার উৎকর্ষ, গুণমান আমরা বিচার করে তার স্বাদের পরম্পরায় আলো ফেলতে চলেছি? হ্যাঁ প্রেজেন্টেশন, গারনিশিং-এর গুণে লোভনীয় ছবি ওঠে আইটেমের। কিন্তু মুখে দিলেই আমার ঠোঁটকাঁটা মা হয়তো বলেই ফেলতেন, ‘এ বাবা! লাউচিংড়িতে পেঁয়াজ? অথবা থোড় ছেঁচকিতে রসুন?’

যেমন বাঙালির এক সিগনেচার পদ শুক্তুনি বা সুক্তোয় মঙ্গলকাব্যিক পরম্পরা মেনে নামানোর আগে দুধে আটা বা পিঠালি গোলা ঢেলে ঘন করার পদ্ধতি চিরাচরিত। কিন্তু আজকালকার ক্লাউড কিচেনের বাড়বাড়ন্তে সেই সুক্তোয় পাঁচমেশালি আনাজপাতির পাশে গাজর বা ঘিয়ের বদলে কাঁচা সরষের তেল বা হলুদও হংসমধ্যে বকযথা। মনে হয় যেন যথার্থই দৃশ্যদূষণ। সুক্তোর ফোড়নে পাঁচফোড়ন, তেজপাতা ঠিক থাকলেও শুকনো লঙ্কার ব্যাবহার গুরুচণ্ডালি দোষ মনে হয়। বাংলায় তেতোর সঙ্গে নুন-মিষ্টি চললেও লঙ্কার কেমিস্ট্রি অন্তত ঘটিবাড়িতে ব্রাত্য।

Traditional Bengali Food
সুক্তোর ফোড়নে পাঁচফোড়ন, তেজপাতা ঠিক থাকলেও শুকনো লঙ্কার ব্যাবহার গুরুচণ্ডালি দোষ মনে হয়

বাঙালির আরেকটা সিগনেচার ডিশ মোচার ঘণ্ট। অনেকভাবে এই কদলী পুষ্পকে সুখাদ্যের পর্যায়ে উন্নীত করেছে ওস্তাদ বাঙালি সু-রাঁধিয়েরা সেই আবহমানকাল ধরে। ছোলা, নারকোল দিয়ে নিরামিষ ঘণ্ট, ভিতরের সেদ্ধ সাদা অংশ সরষে-পোস্ত-নারকোল কোরা, কাঁচালঙ্কা সর্ষের তেল দিয়ে মেখে অথবা চিংড়ি মাছ দিয়েই খেতে অভ্যস্ত বাঙালি।

সেখানে পেঁয়াজ রসুন দিয়ে কষে মোচা চিংড়ি রাঁধা দেখে সবাই বাহবা দিয়ে ধন্যি ধন্যি করলেন হয়তো, কিন্তু সেই পরম্পরা মেনে রান্না হল না। খেয়ে হয়তো নিলাম কোনওদিন মুখ বুজে, তবে মায়ের হাতের সেই স্বাদ অপূর্ণ থেকে গেল। আর সেই সঙ্গে সেই রাঁধিয়েকে নম্বরও কম দিলাম গুরুচণ্ডালি দোষে দুষ্ট মোচা চিংড়ির জন্য।

যাদের সেই পাঠশালায় শিক্ষালাভ হয়েছে, তারা জানে সে স্বাদটা ঠিক কেমন বা সেই পদ কেমন দর্শনধারী হয়েছে। আমার দুই মা, দিদিমা, ঠাকুমার হেঁশেলে আমার সেই স্বাদের শিক্ষালাভ হয়েছিল বলে পারিবারিক ঐতিহ্য মেনে আমিও তেমনই চেষ্টা করে চলি।

ঠিক তেমনই ঘরে কাটানো ছানা বা ডালের ধোকার ডালনায় কসৌরি মেথি বা কারিপাতার ব্যবহার হলে বা বাঙালির নিজস্ব প্রণালীর দই-মাছে কাজু-চারমগজ-পোস্ত বাটার ঘন গ্রেভি দিলেই জিভে কৃত্রিম স্বাদ পাই। বাঙালির দই-মাছে টক দই, ঘি আর গরম মশলার নাতি ঘন বিছানায় শয্যা নেয় টাটকা কাতলা বা রুইমাছের পেটি।

আসলে বাঙালি সংস্কৃতি ও লোকশ্রুতিতে গৃহস্থালি, পারিবারিক শিক্ষা এবং স্বাদ ও রান্নার ধারাবাহিক ঐতিহ্য নিয়ে এক বনেদিয়ানা বা সাবেকি প্রথা আজও বহমান।

Traditional Bengali Food
বাঙালি সংস্কৃতি ও লোকশ্রুতিতে গৃহস্থালি, পারিবারিক শিক্ষা এবং স্বাদ ও রান্নার ধারাবাহিক ঐতিহ্য নিয়ে এক বনেদিয়ানা বা সাবেকি প্রথা আজও বহমান

যাদের সেই পাঠশালায় শিক্ষালাভ হয়েছে, তারা জানে সে স্বাদটা ঠিক কেমন বা সেই পদ কেমন দর্শনধারী হয়েছে। আমার দুই মা, দিদিমা, ঠাকুমার হেঁশেলে আমার সেই স্বাদের শিক্ষালাভ হয়েছিল বলে পারিবারিক ঐতিহ্য মেনে আমিও তেমনই চেষ্টা করে চলি।

মনে মনে বলে উঠি, ‘মায়ের হাতের রান্না, না মিললে পাবে কান্না’, বা যারা ঠিক সেই প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করেছেন তাঁরাও বলে উঠবেন, ‘যেমন মা, তেমনি তার মেয়ে’। আর আমি গর্বিত সেই রাঁধুনি যে পরম আনন্দে তখন আত্মীয়ের পাতে ‘আরেকটু দিই’ বলে পরমানন্দে ভাবতে থাকি ‘পাশ করে গেছি তাহলে’।

আমাদের খুঁতখুঁতে দিদিমার রান্নাঘরে এই কারণেই বুঝি সকাল থেকেই শুরু হয়ে যেত রান্নার ঠাকুরের তদারকি। দিদিমা নিজে বসতেন বটিতে, তরকারি কাটতে। তরকারি কাটা ঠিক না হলে রান্নার স্বাদ ঠিকঠাক হয় না। প্রজ্ঞাসুন্দরীরও তেমনই মত।

কথাতেই বলে, ‘পুরনো চাল ভাতে বাড়ে’। তাই সেই পরম্পরা, অভিজ্ঞতা মেনে যদি ঠিকঠাক রন্ধন পদ্ধতির এক্সিকিউশন হয়— তরকারি কাটা, ধোয়া, বাছা থেকে উপকরণের অনুপাত, জলের পরিমাণ আর ঠিক সময়ে রান্না নামানো— তাহলে এই টোট্যালিটিতেই লুকিয়ে থাকে পরম্পরার স্বাদ, গন্ধ, রং।

সেখানে বেশি উত্তাপে গলিয়ে বা তেল জ্বালিয়ে ফোড়ন পুড়িয়ে বা বেশি পরিমাণে হিং বা মাত্রাতিরিক্ত জল ঢেলে যদি আনাজপাতির স্বাদের দফারফা করা হয়, তা হলে মুশকিল। অভিজ্ঞ হাতের রান্নার স্বাদও তাই সময়ের সঙ্গে আরও সমৃদ্ধ হয়। এখন সেই যৌথপরিবারের কৌলিন্য নেই। তাই রন্ধন শিক্ষাই যেন কিছুটা অসম্পূর্ণ।

Traditional Bengali Food
সর্ষের তেলের সঙ্গে ইলিশের গাঁটছড়া বহুদিনের

সাধে কি আর ঠাকুরবাড়ির প্রখ্যাত গবেষক প্রজ্ঞাসুন্দরীদেবী বলেছিলেন রান্নাঘরের তাকবাক সঠিক জেনে রন্ধনযজ্ঞে নামতে নয়তো রান্নায় ঠিক ‘তার’ আসবে না? এ যেন বাঙলার মেয়েদের এক নিজস্ব কেমিস্ট্রি ল্যাব। নব্যযুগের আধুনিকায়নে বাঙালির রান্নাঘরের ঝুলকালি, উনুনের পাড়, ওপরে একফালি কুলুঙ্গি, শিলনোড়া এসব অন্তর্হিত হয়ে মডিউলার কিচেনে সুদৃশ্য কিচেন হব, চিমনি, মিক্সার গ্রাইন্ডার, চপার সব এসেছে। কিন্তু সেই স্বাদ, সেই গন্ধ? সঠিক পরিমাণ, অনুপাত, উত্তাপ, ওজন সে সবের দিকে খেয়াল রেখেও সেই সাবেকি স্বাদ আসছে না বাঙালির নিজস্ব চিংড়ির বাটিচচ্চড়িতে বা ঝালের ঝোল বা চাপড় ঘণ্টে। সব থেকেও কী যেন নেই তার মধ্যে।

আমাদের খুঁতখুঁতে দিদিমার রান্নাঘরে এই কারণেই বুঝি সকাল থেকেই শুরু হয়ে যেত রান্নার ঠাকুরের তদারকি। দিদিমা নিজে বসতেন বটিতে, তরকারি কাটতে। তরকারি কাটা ঠিক না হলে রান্নার স্বাদ ঠিকঠাক হয় না। প্রজ্ঞাসুন্দরীরও তেমনই মত। ঠাকুরবাড়িতেও প্রতিদিন সকালে মেয়েদের তরকারি কাটার ক্লাস নিতেন সৌদামিনী দেবী। বিভিন্ন সাইজের আনাজ হলে সব একসঙ্গে সেদ্ধ হবে না। কেউ থাকবে কাঁচা, কেউ গলে যাবে। এর পেছনে কিন্তু বৈজ্ঞানিক কারণ।

আজকাল কত মিষ্টির দোকান, ক্লাউড কিচেন বাঙালির প্রিয় তালের বড়া ভেজে কৌটো বন্দি করে চড়া দামে বিক্রি করছে, কিন্তু তালের বড়ার সেই স্বাদ তার মধ্যে নেই। ব্যস্ততার যুগে তাল ছাঁকার হ্যাপা বড়।

হাই হিটে তেলের মধ্যে ফোড়ন পুড়ে গিয়ে রান্নার ঝোলে উকুনের মতো ভাসলে সে ঝোল দর্শনধারী হবে না। চূড়ান্ত ডিসক্রেডিট। এখন ডাক্তারবাবুরাও বলেন, হাইহিটে তেল গরম না করে রান্না করতে। আবার কাঁচা তেলে ফোড়ন দিলে ফোড়নের গন্ধ বেরোবে না। সে ফোড়ন দেওয়াই বৃথা। অথচ বাঙালি রান্নায় ফোড়নের মস্ত ভূমিকা। আর সেই ব্যালেন্স বা ফাইন টিউনিংটাই প্রকৃত রন্ধনশিল্পীর পরিচয়।

বড় করে যখন একটা ছ্যাঁচড়া বা লাবড়া হচ্ছে, তখন সেখানে সেই পরিমাণে ফোড়ন না দিলে সে ছ্যাঁচড়া পাঁচমেশালি বাঙালি পদে উত্তীর্ণ হবে না। ঠিক তেমনই ইলিশমাছের মাথা দিয়ে পুঁইশাকের চচ্চড়ি রাঁধার সময় প্রথম থেকে ঢাকাচাপা দেওয়া চলবে না। কারণ সব আনাজ থেকে জল বেরোবে প্রচুর। আর সেই জল শুকিয়ে নিতে হবে যতক্ষণ না কড়ায় সামান্য তলা লেগে যায়। নয়তো সব আনাজপাতি গলে পাঁক হয়ে গিয়ে জলজলে সে চচ্চড়ি ঘ্যাঁট হয়ে যাবে। দিদার হাতের সাবেকি স্বাদ আর পাবই না জিভে ঠেকালে। এইসবই হল হেঁশেল ঘরের তাকবাক।

Traditional Bengali Food
ব্যালেন্স বা ফাইন টিউনিংটাই প্রকৃত রন্ধনশিল্পীর পরিচয়

এসব ঠিকমতো না জেনেও একটি পদ হয়তো রান্না হয়ে সেলিব্রিটি স্টেটাস পাচ্ছে ফেসবুকের এক কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের হাতের জাদুতে, তার মোহনরূপের কারণে, কিন্তু মানের উৎকর্ষ যাচাইয়ে তা ফুল মার্কস পাচ্ছে না বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই।

আজকাল কত মিষ্টির দোকান, ক্লাউড কিচেন বাঙালির প্রিয় তালের বড়া ভেজে কৌটো বন্দি করে চড়া দামে বিক্রি করছে, কিন্তু তালের বড়ার সেই স্বাদ তার মধ্যে নেই। ব্যস্ততার যুগে তাল ছাঁকার হ্যাপা বড়। তাই বলে তালের বড়ায় যদি তালের রস কম আর চালের গুঁড়ো, আটা-সুজির রমরমা বেশি হয়, তাহলে তালের বড়ার আর কী রইল?

বাঙালি রান্নার স্বাদে-গন্ধে রিজিডিটি কারওর হয়তো নাও থাকতে পারে। তিনি তাঁর ব্যস্তসমস্ত শেডিউলের তাড়নায় সোনাহেন মুখ করে মহার্ঘ্য পদ অর্ডার করতেই পারেন, কিন্তু আমার মতো অনেকেরই তা চলে না, কারণ সেই যে মায়ের হাতের পাতলা মাছের ঝোলের স্বাদটায় আমি এতদিন অভ্যস্ত?

এই তালের বড়ায় আমি শিখেছি চাঁপা বা কাঁঠালি কলার ব্যবহার, যা আজকের ডাক্তারদের পরিভাষায় প্রাকৃতিক সুগার। সেই থেকেই মিষ্টত্ব আসবে, বড়া নরম হবে। শুধু ভাজার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে মোটা দানার এক চামচ চিনি দিলেই সেই বড়া ফাঁপা হবে। তালের বড়া অন্যান্য তেলেভাজার মতো সর্ষের তেলেই ভাজার রীতি। সেখানে যদি কেউ রিফাইন্ড অয়েলে ভাজেন, তাহলে সেই সাবেকি মনভোলানো স্বাদ আসবে কি?

সেদিন ইলিশমাছের ঝাল খেয়ে এক নিমন্ত্রণবাড়িতে মন ভরল না। একে এখন বহুদিনের কফিনবন্দী মাছ, তায় রিফাইন্ড তেলে রান্না।  মুখে দিলেই আসে কান্না। আসার সময় ক্যাটারারকে বলেও এলাম না পেরে। সর্ষের তেলের সঙ্গে ইলিশের গাঁটছড়া বহুদিনের। তা আর কে বোঝায় সেই ক্যাটারারের মালিককে? তিনি তো দামেও কম্প্রোমাইজ করছেন। সর্ষের তেল মহার্ঘ্য যে!

Traditional Bengali Food
বাঙালি রান্নার স্বাদে-গন্ধে রিজিডিটি কারওর হয়তো নাও থাকতে পারে

এই লেখা এদ্দূর পড়ে অনেকেই বলবেন, আপ রুচি খানা। আমারও তাই মত। কিন্তু আমার যে রুচিতে বাধে ইলিশ মাছ সাদা তেলে রান্না হলে। মস্ত গুরুচণ্ডালি দোষ হয় যে। মঙ্গলকাব্যেও মাছ রান্নায় কটুতেলের ঝাঁঝের কথা আছে। তাই বলে সাহেবি স্মোকড হিলশা কি আর সর্ষের তেলে হবে? সে কন্টিনেন্টাল কিচেনের শেফ ইলিশের কাঁটা বেছে মাখন, অলিভ অয়েল বা রিফাইন্ড তেল যাতে খুশি রাঁধুন, আমার তা নিয়ে কোনও মাথাব্যাথা নেই।

বাঙালি রান্নার স্বাদে-গন্ধে রিজিডিটি কারওর হয়তো নাও থাকতে পারে। তিনি তাঁর ব্যস্তসমস্ত শেডিউলের তাড়নায় সোনাহেন মুখ করে মহার্ঘ্য পদ অর্ডার করতেই পারেন, কিন্তু আমার মতো অনেকেরই তা চলে না, কারণ সেই যে মায়ের হাতের পাতলা মাছের ঝোলের স্বাদটায় আমি এতদিন অভ্যস্ত? সেখানে জিরে-গোলমরিচ-ধনে-শুকনোলঙ্কা বাটাটা শিলেই পিষে নিয়ে আনাজপাতি দিয়ে মাছের যে ঝোল হয়, তা এখনও আমি রাঁধতে অভ্যস্ত আর তাই সেই স্বাদ অটুট। একই কথা খাটে সর্ষেবাটা দেওয়া মাছের ঝাল দেওয়াতেও। সেই যে মা নামানোর সময় ছড়াত সামান্য কাঁচা তেল? সেটাই হল সে রান্নার ট্রিক্স। মিক্সার গ্রাইন্ডার হয়তো আছে আদা বা অন্য কিছু বাটবার জন্য, কিন্তু ঝাল বা ঝোলের জন্য সে আউট।

সেও তো অনেক দামি তাই পাহাড়ি আতপ টাতপ, সোনা মুসুরি, হরিণাখুরি যা মেলে তাই সই। আর যারা অর্ডার করছেন, তারা সেই পুষ্পান্নর স্বাদ পাননি বলেই খুব খুশি। আসলে চলতে ফিরতে নিজের যাপনে সম্পৃক্ত রাখতে হয় রান্না।

আজকের ক্লাউড কিচেনের বাড়বাড়ন্তে বাঙালির বাড়িতে কৌটো বন্দি হয়ে আসে বাসন্তী পোলাও। আমরা এর নাম জন্মে শুনিনি। আমাদের নিরামিষ গোবিন্দভোগ চালের পোলাও মানে ঘিয়ের সুগন্ধে ভুরভুর করা থিকথিকে কাজু-কিসমিস দেওয়া ঠাকুরঘরের ভোগের পুষ্পান্ন। হলুদ রঙে পড়ত এক টুসকি কিশোরী রঙ। তবে এহেন কেমিস্ট্রির ছাত্রী যবে থেকে জানল মেটানিল ইয়েলোর রাসায়নিকের বদ-গুণাগুণ, তবে থেকে সেই রঙে ফতোয়া জারি হয়ে তার বদলে এক চিমটে হলুদ পড়তে শুরু করল।

আধুনিককালের এই বাসন্তী পোলাওকে আমি বলি তেল-পোলাও। এখন লাভের মুখ দেখতে মরিয়া সব কিচেন কিং অ্যান্ড কুইনরা। তাই ঘিয়ের বদলে সাদা তেলই সই। যার মধ্যে নামমাত্র কাজু কিসমিস, দু একটা গরম মশলা আর বাকিরা মানে জয়িত্রী, জায়ফল, শাহজিরে, শাহমরিচ, বড় এলাচ সবাই গরহাজির। তাহলে দিদার ভোগ ঘরের স্বাদ কোথায় বাসন্তী পোলাওতে।

আর গোবিন্দভোগ? সেও তো অনেক দামি তাই পাহাড়ি আতপ টাতপ, সোনা মুসুরি, হরিণাখুরি যা মেলে তাই সই। আর যারা অর্ডার করছেন, তারা সেই পুষ্পান্নর স্বাদ পাননি বলেই খুব খুশি। আসলে চলতে ফিরতে নিজের যাপনে সম্পৃক্ত রাখতে হয় রান্না। যেমন, পায়েস বা ভোগের পরমান্ন মানে আমি শিখেছি এক সের দুধে একমুঠো চাল একটু শিলে থেঁতো করে ধুয়ে ঘি মাখিয়ে রাখা। নয়তো আবারও সেই চাল বেশি, দুধ কম হয়ে আঠা আঠা ভাব চলে গেলেই পায়েসের দফারফা।

আসলে সোশ্যাল মিডিয়ার অজস্র অবৈতানিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ নিয়ে অনেক নতুন রন্ধনবিদ হয়তো রান্না করে নাম কিনছেন, কিন্তু কোথাও যেন ফাঁক থেকে যাচ্ছে স্বাদের। সেই একান্নবর্তী পরিবারের স্বাদগন্ধটা গরহাজির সে রান্নায়। বংশ পরম্পরায় যে স্বাদে আমরা অভ্যস্ত, তা নিত্যনতুন রেসিপির সংমিশ্রণে এক জগাখিচুড়ি স্বাদে পর্যবসিত। তাই রান্না মানেই হল পরিমাপ, পর্যবেক্ষণ, পরিকল্পনা  এবং সর্বোপরি  পরম্পরা। মানে ৪ টি ‘প’ আর তা মেনেই সঠিক পদক্ষেপ।

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Please login to bookmark Close
Picture of ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

বিগত ২০ বছর ধরে পূর্ণ সময়ের লেখক। প্রথমে বেথুন কলেজ ও পরে রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের অরগ্যানিক কেমিস্ট্রিতে ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড। সাহিত্যের সব শাখায় সমান বিচরণ তাঁর। উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণ কাহিনি, রম্যরচনা, প্রবন্ধ, ফিচারের পাশাপাশি বায়োনভেলা, খাদ্য সংস্কৃতি, লোকসংস্কৃতি নিয়ে নিয়মিত লেখেন। প্রথম ছোট গল্প দেশ পত্রিকায় ও প্রথম উপন্যাস সানন্দা শারদীয়ায় প্রকাশিত। প্রথম শ্রেণির পত্রিকার পাশাপাশি বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন এবং ওয়েব পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। এ যাবৎ বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত নানা স্বাদের বইয়ের সংখ্যা তিরিশ ছাড়িয়েছে। টুকটাক পুরস্কারও পেয়েছেন সেই সূত্রে। শখ বলতে ঘুরে বেড়ানো, রান্নাবান্না, পুরাণ-লোকসংস্কৃতি চর্চা এবং অবশ্যই গান। কলকাতা দূরদর্শনসহ বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে এবং আকাশবাণীর মহিলামহলে একাধিকবার আমন্ত্রিত হয়েছেন বক্তা হিসেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Please login to bookmark Close

The Banglalive's Picks

Weekly Newsletter

Enjoy our flagship newsletter as a digest delivered once a week.

By signing up, you agree to our User Agreement and Privacy Policy & Cookie Statement.

Please login to bookmark Close
১৭৪২ সালের সেপ্টেম্বর। কাটোয়ার কাছে দাঁইহাটে মহা ধুমধামে দুর্গাপুজো চলছে। পুজোর যজমান কোনও বাঙালি জমিদার নন, বরং নাগপুরের রঘুজি ভোঁসলের সেনাপতি। নাম ভাস্কর পণ্ডিত, যাঁর বর্গি ঘোড়সওয়ারদের ভয় বাংলার ছেলেভুলানো ছড়ায় আজও টিকে রয়েছে। লিখছেন গুঞ্জন দাশগুপ্ত...
Please login to bookmark Close
প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার দেবী ইনানা বা ইশতার যেন আমার দুর্গা, আমার অতি পরিচিত ঘরের মেয়ে দুর্গা। কিন্তু প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে, দুটি মূর্তি প্রায় এক‌ই রকম। পরে খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যাবে, মিল কিছু থাকলেও অমিল‌ও প্রচুর। লিখছেন সিদ্ধার্ঘ্য মুখোপাধ্যায়...
Please login to bookmark Close
সেদিন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সামনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং রাজা রামমোহন রায়। দেবেন্দ্রনাথ তখন নেহাত বালক। বারো বছর বয়স। দেবেন্দ্রনাথের হাতে একটি আমন্ত্রণপত্র। ঠাকুর পরিবারের দুর্গাপুজোর নিমন্ত্রণ। রাজা রামমোহন রায়কে দেবেন্দ্রনাথ বলছেন, ‘সামনে পুজো, তাই তিনদিনই প্রতিমা দর্শনে আপনার নিমন্ত্রণ।‌ পত্রে দাদু এই অনুরোধ করেছেন।’ লিখছেন পায়েল চট্টোপাধ্যায়...

Subscribe

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com