Planning Commission 8

প্ল্যানিং কমিশন

প্রবর্তন থেকে বিসর্জন (পর্ব - ৮)

(Planning Commission 8)

অনেক ঢাকঢোল বাজিয়ে শুরু হয়েছিল দশম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (২০০২-২০০৭)। গড়ে ৮ শতাংশ বার্ষিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। দারিদ্র্য হ্রাস ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়। কৃষি, শিল্প ও পরিষেবা খাতে সুষম উন্নয়নের সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

প্রাথমিক শিক্ষার সার্বিকীকরণ এবং স্কুলছুট পড়ুয়ার হার কমানোর কথাও বলা হয়। শিশুমৃত্যু ও প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস এবং জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। নিরাপদ পানীয় জল ও মৌলিক পরিষেবা সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। এবং পরিবেশ সংরক্ষণ ও আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসের বিষয়টি দশম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার নথিপত্রে লিপিবদ্ধ হয়।


আরও পড়ুন: প্ল্যানিং কমিশন প্রবর্তন থেকে বিসর্জন পর্ব- ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭


বাস্তবে মূল্যায়ন করতে গিয়ে দেখা গেল গড় অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ৭.৬–৭.৮ শতাংশ অর্জিত হয়েছে, যা আগের পরিকল্পনাগুলির তুলনায় অনেক বেশি। মূলত একশো দিনের কাজ প্রকল্প (মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল গ্যারেন্টি এমপ্ল্যয়মেন্ট অ্যাক্ট) অর্থাৎ গ্রামের লোকেদের বছরে অন্তত একশো দিনের কায়িক শ্রমের ব্যবস্থা আইন প্রণয়ন করে বাস্তবায়নের জন্য দারিদ্র্যর হার কিছুটা কমে।

ইতিমধ্যে সারা বিশ্বে ঘটে গেছে তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব। মোবাইল ফোন এবং পার্সোনাল কম্পিউটারের ব্যবহার দ্রুত গতিতে বাড়তে শুরু করে। ফলে তথ্যপ্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ ও পরিষেবা খাতের দ্রুত উন্নয়ন ঘটে। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়তে থাকায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়। পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। জঙ্গল সুরক্ষা আইন (২০০৬) চালু হওয়ার জন্য জনজাতি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা জোরদার হয় এবং তাদের উপার্জন বাড়তে থাকে। প্রসঙ্গত এই সব আইনের কথা কিন্তু দশম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মূল নথিতে ছিল না।

Planning Commission 8
একশো দিনের কাজ

এই সময়ের আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল তথ্যের অধিকার আইন ২০০৫ (RTI – Right to Information Act)। সরকারি কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো এবং সাধারণ নাগরিকদের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইনটির প্রয়োজন ছিল। ২০০৫ সালের ১৫ই জুন ভারতের সংসদে এই আইনটি গৃহীত হয়ে রাষ্ট্রপতির সম্মতি পাওয়ার পর ১২ই অক্টোবর সম্পূর্ণভাবে কার্যকর বা চালু হয়। সরকারি প্রকল্পে সাধারণ মানুষের নজরদারির সুযোগ সৃষ্টির জন্য আইনটি প্রয়োজন ছিল।

প্রসঙ্গত মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল গ্যারেন্টি এমপ্লয়মেন্ট অ্যাক্ট বা ‘মনরেগা’, তথ্যের অধিকার আইন (২০০৫) এবং জঙ্গল সুরক্ষা আইন (২০০৬) প্রণয়ন করে প্ল্যানিং কমিশন। বিভিন্ন মন্ত্রকের মতামত নিয়ে সকলের সঙ্গে আলোচনা করে একটা কার্যকর প্রকল্প প্রণয়নের জন্যে আদর্শ মঞ্চ ছিল প্ল্যানিং কমিশন। কোনও মন্ত্রক বা রাজ্য সরকারগুলির এই বিষয়ে কোনও আপত্তি ছিল না।

বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দশম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ২০০৪-এর পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ একাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (২০০৭-২০১২) এবং দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার প্রথম দু’বছর (২০১২-১৩ ও ২০১৩-১৪) ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।

আরও দুটি জনকল্যাণমুখী আইন সকলের জন্য শিক্ষা (রাইট টু এডুকেশন) এবং সকলের জন্য খাদ্য (রাইট টু ফুড) দশম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময় প্ল্যানিং কমিশনে আলোচনার স্তরে থাকলেও অনেক পরে সেগুলি আইনগত অনুমোদন পায়।

দশম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সাফল্য ও ব্যর্থতা পাশাপাশি তুলনা করলে দেখা যায়, ৮ শতাংশ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। কৃষি খাতের বৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় অনেকটাই কম ছিল। বেকারত্ব ও আয়-বৈষম্য যথারীতি পুরোপুরি দূর করা যায়নি। গ্রামীণ ও শহুরে উন্নয়নের মধ্যে বৈষম্য থেকেই গেল। অন্যান্য সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারিত সময়ে পূরণ করা সম্ভব হয়নি।

Planning Commission 8
দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং

তা সত্ত্বেও বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দশম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ২০০৪-এর পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ একাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (২০০৭-২০১২) এবং দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার প্রথম দু’বছর (২০১২-১৩ ও ২০১৩-১৪) ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।

ভারতের দশম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মোট প্রস্তাবিত ব্যয় বরাদ্দ (Plan Outlay) ছিল ১৫ লক্ষ ২৫ হাজার ৬৩৯ কোটি টাকা। প্রকৃত ব্যয় (Actual Expenditure) হয়েছিল ১৬ লক্ষ ১৮ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা। ২০০১-০২ সালে স্থিতিশীল মূল্যের ওপর ভিত্তি করে হিসেবটি করা হয়েছিল। মোট ব্যয় বরাদ্দর ৫১ শতাংশ বা ৮ লক্ষ ৯৩ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় সরকারের খরচ করার সুপারিশ করা হয়। আর রাজ্যগুলির জন্য ধার্য হয়েছিল ৪১.৪৬ শতাংশ বা ৮ লক্ষ ৯৩ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা।

১৯৯১ সালে ভারত এক চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। তখন সদ্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে অরাজনৈতিক মনমোহন সিংহকে অর্থমন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ করা হয়। প্রায়োগিক অর্থনীতি (Applied Economics) ও আমলাতান্ত্রিক কর্মসংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর সম্যক ধারণা ও যথেষ্ট অভিজ্ঞতা কাজে আসে।

দশম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মোট ব্যয়ের একটি বড় অংশ সামাজিক খাতে (Social Sector) যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিকাঠামো বা শক্তি খাতে (Energy Sector) ব্যয় করা হয়েছিল। সামাজিক খাতে বরাদ্দের তুলনায় প্রকৃত ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছিল।

দুই

একাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (২০০৭-২০১২) শুরুর আগেই, ২০০৪ সাল থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মনমোহন সিং। তিনি একসময় প্ল্যানিং কমিশনের সদস্য সচিব ছিলেন (১৯৮০-১৯৮২)। ১৯৮০-র দশকে (১৯৮৫–১৯৮৭) প্ল্যানিং কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। তার অনেক আগেই তিনি ভারত সরকারের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের উপদেষ্টা হিসাবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্বও সামলেছিলেন। যেমন মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা (১৯৭২–১৯৭৬), রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর (১৯৮২–১৯৮৫) প্রভৃতি।

১৯৯১ সালে ভারত এক চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। তখন সদ্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে অরাজনৈতিক মনমোহন সিংহকে অর্থমন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ করা হয়। প্রায়োগিক অর্থনীতি (Applied Economics) ও আমলাতান্ত্রিক কর্মসংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর সম্যক ধারণা ও যথেষ্ট অভিজ্ঞতা কাজে আসে।

Planning Commission 8
মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল গ্যারেন্টি এমপ্ল্যয়মেন্ট অ্যাক্ট পাশ করা হয় সেই সময়

একাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা খাতায় কলমে ২০০৭-এ চালু হলেও প্রকৃতপক্ষে ২০০২-এ শুরু হওয়া দশম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার নথির রূপরেখা ২০০৪ সালেই বদলে যায়। ফলে একাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকে নির্দ্বিধায় দশম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সম্প্রসারিত ও সংশোধিত সংস্করণ বলা যায়। দশম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মূল নথিতে না থাকলেও মনরেগা বা একশো দিনের কাজ, তথ্যের অধিকার আইন (২০০৫) এবং জঙ্গল সুরক্ষা আইন (২০০৬) দশম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময়সীমা (২০০৭) শেষ হওয়ার আগেই চালু হয়ে যায়। পাশাপাশি সেই সময় আলোচনার স্তরে থাকা সকলের জন্য শিক্ষা (রাইট টু এডুকেশন) এবং সকলের জন্য খাদ্য (রাইট টু ফুড) একাদশ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

একাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ২০১০ সালের ১লা এপ্রিল থেকে সকলের জন্য বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার অধিকার আইন বা রাইট টু এডুকেশন অ্যাক্ট (RTE) সারা ভারতে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়। এই আইনের মাধ্যমে ভারতের ৬-১৪ বছর বয়সী সকল শিশুর জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়।

একাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শুরু হওয়ার পরের বছর (২০০৮ সাল) বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। উন্নত দেশগুলির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মুখ থুবরে পড়ে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রগণ্য ব্যাঙ্কগুলি দেউলিয়া হয়ে যায়। পরিকল্পিত অর্থনীতির ফসল জনকল্যাণমুখী প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার আঁচ ভারতের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আঁচড় কাটতে পারেনি।

একাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ২০১০ সালের ১লা এপ্রিল থেকে সকলের জন্য বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার অধিকার আইন বা রাইট টু এডুকেশন অ্যাক্ট (RTE) সারা ভারতে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়। এই আইনের মাধ্যমে ভারতের ৬-১৪ বছর বয়সী সকল শিশুর জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়।

Planning Commission 8
এল তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব

একাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য অবদান হল দেশের সব নাগরিকের জন্য খাদ্য নিশ্চয়তার বন্দোবস্ত করা। খাদ্য নিরাপত্তা আইন বা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আইন (NFSA) ২০১৩ সালের ৫ই জুলাই থেকে কার্যকর বলে গণ্য করা হয়। যদিও ততদিনে খাতায়-কলমে শুরু হয়েছে দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা।

দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষকে (গ্রামীণ এলাকার ৭৫ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলের ৫০ শতাংশ) খুব কম দামে ভর্তুকিসহ খাদ্যশস্য প্রদান করার জন্য এই আইনটি তৈরি হয়েছিল। আজও দেশের ৮০ কোটিরও বেশি মানুষ এই আইনের আওতায় থাকার জন্য প্রতি মাসে অত্যন্ত কম দামে ভর্তুকিযুক্ত খাদ্যশস্য পেয়ে থাকেন।

মনরেগা, তথ্যের অধিকার আইন (২০০৫) এবং জঙ্গল সুরক্ষা আইন (২০০৬), সকলের জন্য শিক্ষা (রাইট টু এডুকেশন) এবং সকলের জন্য খাদ্য (রাইট টু ফুড) বা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আইন (NFSA) প্রভৃতি প্ল্যানিং কমিশনে প্রণয়ন করা হলেও সেগুলি বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক বর্তেছিল।

একাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য অবদান হল আধার কার্ড। দেশের সব নাগরিকের জন্য একটি নির্দিষ্ট নম্বর নির্ধারণ করে একটি নতুন পরিচয়পত্র দিতে তৈরি হয় আধার কার্ড। ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (UIDAI) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতে আধার কার্ড প্রকল্প প্রথম ২০০৯ সালে কাজ শুরু করে, এবং আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম আধার নম্বর নাগরিকের হাতে তুলে দেওয়া হয় ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০১০ সালে।

মনরেগা, তথ্যের অধিকার আইন (২০০৫) এবং জঙ্গল সুরক্ষা আইন (২০০৬), সকলের জন্য শিক্ষা (রাইট টু এডুকেশন) এবং সকলের জন্য খাদ্য (রাইট টু ফুড) বা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আইন (NFSA) প্রভৃতি প্ল্যানিং কমিশনে প্রণয়ন করা হলেও সেগুলি বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক বর্তেছিল। কিন্তু প্ল্যানিং কমিশন আধার কার্ড প্রকল্পের আঁতুরঘর হলেও তার বাস্তবায়নও এখান থেকেই শুরু হয়।

Planning Commission 8
একাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য অবদান হল আধার কার্ড

একাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় আরেকটি বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে চর্চা শুরু হয়। ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (সংক্ষেপে ডিবিটি)। তবে গভীরভাবে আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই এসে যায় দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। ডিবিটি-র প্রত্যক্ষ ফসল ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ গোত্রের যাবতীয় জনকল্যাণমূলক প্রকল্প। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন নামে নানাবিধ ভাতা সরাসরি উপভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ আগে ছিল না।

একাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ২০১১-১২ সালের মধ্যে ১৮-২৩ বছর বয়সি গোষ্ঠীর উচ্চশিক্ষায় তালিকাভুক্তি বৃদ্ধি।

ভারত সরকারের দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (২০১২-২০১৭) খসড়া নথিতে ৯ শতাংশ বৃদ্ধির হার অর্জনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও ২০১২ সালের ২৭শে ডিসেম্বর আয়োজিত জাতীয় উন্নয়ন পরিষদ (NDC) দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার জন্য ৮ শতাংশ বৃদ্ধির হার অনুমোদন করে।

এই প্রকল্প দূরবর্তী শিক্ষা, আনুষ্ঠানিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক, দূরবর্তী এবং আইটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একত্রিকরণের উপর নজর দেয়। দ্রুত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃদ্ধির (দারিদ্র্য হ্রাস) বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। সামাজিক খাতে পরিষেবা প্রদানের উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে ক্ষমতায়ন ছিল একাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য। মহিলাদের ক্ষমতায়ন ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাস এই পরিকল্পনায় গুরুত্ব পায়। পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব সরকার এবং জনসাধারণকে যৌথভাবে পালন করার কথা এর আগে কোনও পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার নথিতে বলা হয়নি। ২০০৯ সালের মধ্যে সবার জন্য বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ করার কথা এই প্রথম কোনও পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় নথিভুক্ত হয়।

একাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল “দ্রুত এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি” (Faster and More Inclusive Growth)। যদিও এতে জিডিপি (GDP) বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৯ শতাংশ ধরা হয়েছিল, তবে বৈশ্বিক মন্দার কারণে বাস্তবে ৮ শতাংশ বৃদ্ধির হার অর্জিত হয়েছিল।

Planning Commission 8
একাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল “দ্রুত এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি”

একাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার জন্য মোট সরকারি বরাদ্দ ধরা হয়েছিল ৩৬ লক্ষ ৪৪ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের অংশ ছিল ২১ লক্ষ ৫৬ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা (প্রায় ৫৯.২ শতাংশ) আর রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর অংশ ছিল ১৪ লক্ষ ৮৮ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা (প্রায় ৪০.৮ শতাংশ)। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কেন্দ্রীয় সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৫ শতাংশ সম্পদ সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়, যার ফলে সরকারি বরাদ্দে কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। তবে রাজ্য সরকারগুলো তাদের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১০০ শতাংশ সম্পদ সংগ্রহ ও ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছিল।

তিন

ভারত সরকারের দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (২০১২-২০১৭) খসড়া নথিতে ৯ শতাংশ বৃদ্ধির হার অর্জনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও ২০১২ সালের ২৭শে ডিসেম্বর আয়োজিত জাতীয় উন্নয়ন পরিষদ (NDC) দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার জন্য ৮ শতাংশ বৃদ্ধির হার অনুমোদন করে।

প্ল্যানিং কমিশন বিলুপ্ত (৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪) হওয়ার সাথে সাথে, অর্থনীতির জন্য আর কোনও আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা তৈরি করা হয়নি। এমনকি ২০১৭ সালে দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সমাপ্তিলগ্নে এর যথার্থ মূল্যায়ন সম্ভব হয়নি।

সরকার দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় দারিদ্র্য ১০ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব পেশ করে। সমস্ত ধরনের বাধা এড়িয়ে দেশের পরিকাঠামোগত প্রকল্পগুলির উন্নতির দিকে এই পরিকল্পনার লক্ষ্য স্থির হয়। প্ল্যানিং কমিশনের নথিতে বলা হয় দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় পরিকাঠামোগত সম্প্রসারণের জন্যে ১ ট্রিলিয়ন (মার্কিন) ডলার পর্যন্ত বেসরকারি বিনিয়োগের চেষ্টা বজায় রাখতে হবে, যা সরকারের ভর্তুকির বোঝা ২ শতাংশ থেকে ১.৫ শতাংশ হ্রাস নিশ্চিত করবে। নগদ ভর্তুকি হস্তান্তরের জন্য ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (আধার) দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ব্যবহার করার কথাও বলা হয়েছিল।

অ-কৃষি খাতে ৫ কোটি নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা, স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে লিঙ্গ ও সামাজিক ব্যবধান দূর করা, উচ্চ শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বাড়ানো, ০-৩ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি কমানো, সমস্ত গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা, প্রতি বছর ১০ লক্ষ হেক্টর সবুজ আচ্ছাদন বৃদ্ধি করা, ৯০ শতাংশ পরিবারকে ব্যাঙ্কিং পরিষেবার আওতায় আনার প্রস্তাব গুরুত্ব দিয়ে দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার নথিতে লিপিবদ্ধ হয়।

এছাড়া দ্রুত, সুস্থায়ী ও অধিকতর অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃদ্ধি (Faster, Sustainable and More Inclusive Growth), গড়ে ৮ শতাংশ বার্ষিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব হ্রাস, কৃষি, শিল্প ও পরিকাঠামোর উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দক্ষতা উন্নয়ন, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সুস্থায়ী উন্নয়ন, আঞ্চলিক ও সামাজিক বৈষম্য হ্রাসের কথা দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার নথিতে উল্লেখ করা হয়।

প্ল্যানিং কমিশন বিলুপ্ত (৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪) হওয়ার সাথে সাথে, অর্থনীতির জন্য আর কোনও আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা তৈরি করা হয়নি। এমনকি ২০১৭ সালে দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সমাপ্তিলগ্নে এর যথার্থ মূল্যায়ন সম্ভব হয়নি।

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Please login to bookmark Close
Picture of অমিতাভ রায়

অমিতাভ রায়

প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিবিদ ও পরিচিত পরিকল্পনাবিশারদ। পড়াশোনা ও পেশাগত কারণে দেশে-বিদেশে বিস্তর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। তার ফসল বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় বই। জোয়াই, আহোম রাজের খোঁজে, প্রতিবেশীর প্রাঙ্গণে, কাবুলনামা, বিলিতি বৃত্তান্ত ইত্যাদি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Please login to bookmark Close

The Banglalive's Picks

Weekly Newsletter

Enjoy our flagship newsletter as a digest delivered once a week.

By signing up, you agree to our User Agreement and Privacy Policy & Cookie Statement.

Please login to bookmark Close
দুর্ঘটনা কখনও শহরের ঐতিহ্য হতে পারে না। কলকাতা পুলিশের ভিড় সামাল দেওয়ার দক্ষতা নিয়ে বাঙালিদের দীর্ঘদিনের গর্ব ছিল। সেই গর্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে অভিজ্ঞতার পাশাপাশি প্রয়োজন ছিল বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়। লিখছেন প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী...
Please login to bookmark Close
দামাস্কাস হল এলি কোহেনের জীবনের চূড়ান্ত পর্ব। ঐতিহাসিকদের মতে, এই সুপ্রাচীন আরব মহানগরী আদতে কোহেনের কাছে তাঁর অর্জিত জ্ঞানের ফলিত প্রয়োগের ক্ষেত্রও বটে। বস্তুত পরবর্তীকালে মোসাদের প্রশিক্ষণ পাঠক্রমে এলির বুয়েন্স এয়ার্স ও দামাস্কাস অভিযান একজন এজেন্টের যথার্থ কার্যকলাপ রূপে মান্যতা পায়। শুরু হল এলি কোহেন ত্রয়োবিংশ পর্ব। লিখছেন কিংশুক বন্দ্যোপাধ্যায়...
Please login to bookmark Close
ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় ছিল ১৯৮৯ থেকে ১৯৯১ সাল। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মেয়াদ ১৯৯০-এর মার্চ মাসে শেষ হয়ে গেলেও অস্থির সময়ে পরবর্তী পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। ১৯৯০-৯১ এবং ১৯৯১-৯২ আর্থিক বর্ষে শুধুমাত্র বার্ষিক পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পড়ুন প্ল্যানিং কমিশন প্রবর্তন থেকে বিসর্জন পর্ব ৭। লিখছেন অমিতাভ রায়...

Subscribe

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com