(Roshan Kumari Memoir)
ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের আকাশে কিছু নক্ষত্রের দীপ্তি কখনও ম্লান হয় না। তাঁরা সময়ের সীমা অতিক্রম করে বেঁচে থাকেন তাঁদের শিল্পে, তাঁদের শিল্পসাধনায়। পদ্মশ্রী ড.রোশনকুমারীজি চলে গেলেন ৫ই অক্টোবর। তাঁর প্রয়াণ কেবল একটি জীবনের অবসান নয়, একটি যুগের পরিসমাপ্তি হল। তবে তাঁর শিল্পসাধনা, শিক্ষার উত্তরাধিকার সময়ের সীমা অতিক্রম করে বেঁচে থাকবে।
রোশনকুমারীজি ছিলেন এমনই এক শিল্পী, যাঁর নৃত্যসৌন্দর্য, লয়বোধ এবং কথকের প্রতি আজীবন নিষ্ঠা তাঁকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের ইতিহাসে এক স্বতন্ত্র আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর কথা ভাবলে আজ কেবল একজন অসামান্য কথকশিল্পীর প্রতিকৃতি চোখে ভাসে না, মনে পড়ে এক শিল্পপরম্পরার কথা, যেখানে নৃত্য কেবল মঞ্চের উপস্থাপনা নয়, এক গভীর সাধনা, এক শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনচর্চা, এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে প্রবাহিত হয়ে চলা জ্ঞান ও অনুভবের উত্তরাধিকার।
আরও পড়ুন: স্মরণ: দূরে গিয়ে ভুল হল
গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকবার তাঁর সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়েছে, যা আমার কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২২ সালে আমার নৃত্যবিষয়ক তথ্যচিত্র I Can Hear You Dance-এ তাঁর জীবনের কথাও তুলে ধরেছিলাম। এই তথ্যচিত্রের কেন্দ্রে ছিল কথকের কিংবদন্তি শিল্পীদের জীবন, তাঁদের শিল্পদর্শন ও শিল্পপদ্ধতি। এই শিল্পপদ্ধতির মধ্য দিয়েই একটি শাস্ত্রীয় নৃত্যধারার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও অন্তর্নিহিত দর্শন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বয়ে চলে।
তথ্যচিত্রটি দেখার পর রোশনকুমারীজির সঙ্গে আমার কথা হয়। তিনি ছবিটির ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। তাঁর মতো একজন শিল্পীর কাছ থেকে নিজের কাজের এমন স্বীকৃতি পাওয়া আমার কাছে ছিল পরম প্রাপ্তি। অনেক আশীর্বাদ করেছিলেন সেদিন। তাঁর কথায় যে আন্তরিকতা ছিল, তা আজও মনে পড়ে।

একবার বান্দ্রার হোয়াইটফিল্ড রোডে তাঁর ফ্ল্যাটে গিয়েছিলাম। অত্যন্ত সুন্দর ও রুচিসম্মতভাবে সাজানো সেই বাড়ির প্রতিটি জিনিসের বিন্যাসে তাঁর শিল্পীমনের পরিচয় পাওয়া যেত। মনে হয়েছিল, মঞ্চে যে সৌন্দর্যবোধের প্রকাশ ঘটত তাঁর নৃত্যের মধ্য দিয়ে, সেই একই রুচি ছড়িয়ে ছিল তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও।
সেদিন অনেকক্ষণ কথা হয়েছিল। কথায় কথায় তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এত অল্প বয়সে কেন নাচ ছেড়ে দিয়েছিলেন? উত্তরে বলেছিলেন, বাবার মৃত্যুর পর আর নিজেকে নাচের জন্য প্রস্তুত করতে পারেননি। তাঁর জীবনের সঙ্গে, শিল্পসাধনার সঙ্গে বাবার সম্পর্ক ছিল এতটাই গভীর যে, সেই শূন্যতা নিয়ে আর মঞ্চে ফিরে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। যাঁর জীবনের এতখানি জুড়ে ছিল নৃত্য, তাঁর পক্ষে এমন সিদ্ধান্ত কতটা কঠিন ছিল, তা ভাবলে আজও মন ভারী হয়ে আসে।
জয়পুর ঘরানার এই কিংবদন্তি শিল্পীর নৃত্যে ছিল অসাধারণ শক্তি, গতি, লয়কারি এবং ভাবের প্রকাশ। কথকের শক্তি তার বহুমাত্রিকতায়। একদিকে তালের জটিল গাণিতিক বিন্যাস, অন্যদিকে কাব্যিক অনুভূতির সূক্ষ্ম প্রকাশ।
ফেরার সময় আবারও আশীর্বাদ করলেন। বললেন, তাঁর সুস্থতার জন্য যেন দোয়া করি। আমাদের বার্ষিক অনুষ্ঠানে আসার আমন্ত্রণও জানিয়েছিলাম। তিনি আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে শেষ পর্যন্ত আর হয়ে ওঠেনি।
রোশনকুমারীজির জন্ম ২৪শে ডিসেম্বর ১৯৩৭, এক সংগীতময় পরিবারে। তাঁর পিতা ফকির মুহম্মদ ছিলেন বিখ্যাত তবলা ও পাখোয়াজবাদক। মা জোহরাবাই আম্বালেওয়ালি ছিলেন স্বনামধন্য নেপথ্য সংগীতশিল্পী। ছোটবেলা থেকেই তাঁর নৃত্যশিক্ষা শুরু হয় কে. এস. মোরে এবং পণ্ডিত জ্ঞানশঙ্করের কাছে। এছাড়াও, তিনি পণ্ডিত সুন্দরপ্রসাদজির নৃত্যশৈলী শেখার সুযোগ পান। শ্রী গোবিন্দম পিল্লাই ও মহালিঙ্গম পিল্লাইয়ের কাছে ভরতনাট্যমের তালিমও নিয়েছিলেন তিনি।

জয়পুর ঘরানার এই কিংবদন্তি শিল্পীর নৃত্যে ছিল অসাধারণ শক্তি, গতি, লয়কারি এবং ভাবের প্রকাশ। কথকের শক্তি তার বহুমাত্রিকতায়। একদিকে তালের জটিল গাণিতিক বিন্যাস, অন্যদিকে কাব্যিক অনুভূতির সূক্ষ্ম প্রকাশ।
একটি তিহাইয়ের নিখুঁত সমাপ্তিতে যেমন বিস্ময়, তেমনই সামান্য দৃষ্টিবিনিময় কিংবা হাতের একটি মুদ্রাতেও অনুভূতি হয় স্বর্গীয়। এই দুই দিকের সুন্দর সমন্বয়েই কথকের শৈল্পিক সার্থকতা, আর রোশনকুমারীজি ছিলেন তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তাঁর পরিবেশিত অসংখ্য নৃত্যরচনার মধ্যে চাঁদ-চকোর ছিল তাঁর বিশেষ প্রিয়। ভাব, অভিনয় এবং নৃত্যের সূক্ষ্ম প্রকাশে এই রচনাটি তাঁর শিল্পীসত্তার এক অনন্য পরিচয় বহন করত। গোপীকৃষ্ণজির সঙ্গে তাঁর যুগলবন্দিগুলিও কথকের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
তাঁর নৃত্যের কিছু বৈশিষ্ট্য আজও কথকশিল্পীদের আলোচনায় ফিরে আসে। প্রচলিত তিনতালের পরিবর্তে একতালে গৎনিকাস পরিবেশন করে তিনি এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। কথকের ঘরানার কিংবদন্তি শিল্পীদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই প্রয়োগ করেছিলেন।
তাঁর ঘুঙুরের কথাও আলাদা করে বলতে হয়। তাঁর প্রতিটি পায়ের ঘুঙুরের ওজন ছিল প্রায় দেড় কিলোগ্রাম। ব্যবহার করতেন খোলামুখের ঘুঙুর, যার ধ্বনি ছিল স্বতন্ত্র ও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তাঁর পায়ের কাজের সঙ্গে সেই ঘুঙুরের আওয়াজ মিলেমিশে এক অসাধারণ ছন্দ তৈরি করত।
তাঁর পরিবেশিত অসংখ্য নৃত্যরচনার মধ্যে চাঁদ-চকোর ছিল তাঁর বিশেষ প্রিয়। ভাব, অভিনয় এবং নৃত্যের সূক্ষ্ম প্রকাশে এই রচনাটি তাঁর শিল্পীসত্তার এক অনন্য পরিচয় বহন করত। গোপীকৃষ্ণজির সঙ্গে তাঁর যুগলবন্দিগুলিও কথকের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
কলকাতার সঙ্গে রোশনকুমারীজির এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক ছিল। এই শহরের কথা উঠলেই তিনি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে বলতেন, কলকাতার মানুষের কাছ থেকে কত ভালবাসা পেয়েছেন। কলকাতাও তাঁকে ভালবাসা ফিরিয়ে দিয়েছিল সমানভাবে। একসময় এখানকার বড় বড় সংগীত ও নৃত্য সম্মেলন তাঁর পরিবেশনা ছাড়া যেন সম্পূর্ণই হত না। সদারঙ্গ, তানসেন, অল বেঙ্গল সহ আরও বহু সম্মেলনের মঞ্চে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিচিত ও প্রিয় শিল্পী।
রোশনকুমারীজির শিল্পজীবনের এক স্মরণীয় অধ্যায় সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী চলচ্চিত্র জলসাঘর। এই ছবিতে তাঁর নৃত্য পরিবেশনা কথককে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আরও বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়।
কলকাতার উত্তম মঞ্চে তাঁর ভুবলাকা পুরস্কার গ্রহণের একটি অনুষ্ঠানের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে। পুরস্কার গ্রহণের সময় দর্শকদের বিপুল করতালিতে প্রেক্ষাগৃহ মুখরিত হয়ে উঠেছিল। উপস্থিত সকলের অনুরোধে তিনি কিছুটা ভাব পরিবেশন করেছিলেন।
প্রয়াণের কিছু দিন আগেই তাঁর এক ছাত্রী নৃত্য পরিবেশন করেছিলেন, আর রোশনকুমারীজি নিজে পঢ়ন্তে সঙ্গত করেছিলেন। তাঁর কণ্ঠে প্রতিটি বোল যেন নতুন প্রাণ পেয়েছিল। প্রতিটি বোলের শেষে সমে এসে পৌঁছনোর মুহূর্তটি যেন নক্ষত্রের বিস্ফোরণ। সেই দৃঢ়তা, সেই লয়ের দখল, সেই উচ্চারণ আজও কানে বাজে।

রোশনকুমারীজির শিল্পজীবনের এক স্মরণীয় অধ্যায় সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী চলচ্চিত্র জলসাঘর। এই ছবিতে তাঁর নৃত্য পরিবেশনা কথককে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আরও বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়। জলসাঘর-এ সংগীত ও নৃত্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জমিদারি সংস্কৃতি এবং হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্যের স্মৃতি।
রোশনকুমারীজি বহু চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিমল রায়ের ‘পরিণীতা’, ‘মির্জা গালিব’ ও ‘বসন্ত বাহার’। অভিনয় ও নৃত্য পরিবেশনার পাশাপাশি তিনি ‘গোপী’, ‘লেকিন’, ‘চৈতালী’ ও ‘সর্দারি বেগম’-এর মতো চলচ্চিত্রে নৃত্য পরিচালনাও করেছেন। তবে চলচ্চিত্রের জন্য এত কাজ করলেও তাঁর মন পড়ে থাকত মঞ্চেই। মঞ্চের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আজীবনের। দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে নৃত্যের প্রতিটি মুহূর্তকে জীবন্ত করে তোলার আনন্দই ছিল তাঁর শিল্পীজীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
তাঁর প্রয়াণ কেবল একজন শিল্পীর জীবনাবসান নয়, একটি যুগেরও পরিসমাপ্তি। তবে কথকের ইতিহাসে রোশনকুমারীজির নাম ও অবদান চিরকাল এক স্বতন্ত্র স্থান অধিকার করে থাকবে। তাঁর ঘুঙুরের প্রতিধ্বনি অনন্তকাল বেজে যাবে।
শিল্পজীবনে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার, পদ্মশ্রী ও ভুবলাকা পুরস্কারসহ বহু সম্মাননা। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয় রয়ে গেছে তাঁর শিল্পে, শিক্ষায় এবং সেই অসংখ্য শিল্পীর মধ্যে, যাঁরা তাঁর কাছ থেকে কথকের ঐতিহ্যকে ধারণ করার শিক্ষা পেয়েছেন।

তাঁর প্রয়াণ কেবল একজন শিল্পীর জীবনাবসান নয়, একটি যুগেরও পরিসমাপ্তি। তবে কথকের ইতিহাসে রোশনকুমারীজির নাম ও অবদান চিরকাল এক স্বতন্ত্র স্থান অধিকার করে থাকবে। তাঁর ঘুঙুরের প্রতিধ্বনি অনন্তকাল বেজে যাবে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
