এক বিপন্নপ্রায় পেশার সন্ধানে
(Kolkata Massuer)
দু’হাতের উপর ভর দিয়ে, হাঁটু দিয়ে চাপ দিচ্ছেন ভদ্রলোক। অনেকটা প্যাডেলের মতো করে। তেলের ঝাঁঝ ও স্যাঁতস্যাঁতে আঁধারে চারদিক ঘন। তাতে সামান্য আলোয় কোনও মতে ধরা যাচ্ছে মানুষটিকে। কাঠের দীর্ঘ পাটাতনে চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন। চোখ বোজা। পাশে মোবাইলে বেজে চলেছে ভোজপুরি সুর। বাইরে আষাঢ়ের সঙ্গে কিছুটা বেমানান হলেও, মালিশওয়ালার তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই। সে গামছা বেঁধে এক মনে দলাই মালাইয়ে ব্যস্ত। একবার উপর, একবার নিচ; হাত পা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। বাবুঘাটের এই দৃশ্য শহরের চিরন্তন।
এখানে আসার একাধিক পথ আছে। বাস, ট্রেন, মেট্রো, বাইক যার যেমন সুবিধা। তবে ট্রেনে আসলে ইডেন গার্ডেন থেকে গঙ্গার ধার বরাবর কিছুটা হাঁটতে হয়। সামনেই ফুট ব্রিজ পড়বে। সেখান থেকে ডান দিক ঘুরলেই বাবুঘাট। সরু ফুটপাথ, পাশে তিন-চারটি চায়ের দোকান। সামান্য এগোতেই চাতাল শুরু। আজ থেকে আনুমানিক ১৯৬ বছর আগে এটি নির্মাণ করেন রানি রাসমণি। তাঁর প্রয়াত স্বামী বাবু রাজচন্দ্র দাসের স্মৃতিতে। ঘাটটির প্রবেশদ্বারে সেকালের সুদৃশ্য স্তম্ভগুচ্ছ। জায়গাটির পসার দেখার মতো। কোথাও ইঁট পাতা নাপিত, দশকর্মার দোকান, ফুল বিক্রেতা, স্নানযাত্রী তো কোথাও আবার শখের ফটোগ্রাফার।

সিঁড়ি ধরে নেমে আসলেই দেখা মেলে মালিশওয়ালাদের। ব্রিজের পিলারের ফাঁকে ফাঁকে বসে থাকে তারা। কোথাও সার দিয়ে অনেকে। কোনও কোনও খোপে আবার কেউ একাই। মালিশ চলছে। কাঠের তক্তা গোছের পাটাতনের উপর শুয়ে আছেন ক্রেতা। তক্তাটি লম্বায় মোটামুটি ছ-ফুট। মাথার কাছটা উঁচু ও বাঁকানো। অনেকটা বালিশের মতো। টানটান হয়ে শুয়ে থাকা মানুষটিকে ভাল করে তেল ডলছেন মালিশওয়ালা। সাধারণত ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত তারা থাকে। রোজকার নিদারুণ ভিড়ে স্বস্তি প্রদানে, এই দেহ মর্দনকারীদের জুড়ি মেলা ভার।

শহরের ঘাটগুলিতে মালিশওয়ালাদের এই অবস্থান কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। সময়টা উনিশ শতক। ঔপনিবেশিক ভারতের রাজধানী তখন কলকাতা। কোম্পানির শাসন আরও দৃঢ় করতে, দিকে দিকে তৈরি হচ্ছে কিছু না কিছু। কোথাও সুবিশাল ইমারত, কোথাও পাটকল, বন্দর, কলকারখানা তো কোথাও আবার রেলের পাত। কাজের খোঁজে অনেকেই তখন কলকাতা অভিমুখী। বিশেষত বিহারের ভোজপুর, গয়া, ছাপরা এলাকা, উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে অসংখ্য মানুষ পাড়ি দেয়। শাসকের ভূমি রাজস্ব নীতি ও স্থানীয় কুটির শিল্প ধ্বংসের ফলে তীব্র গ্রামীণ সংকট দেখা দেয়। তাছাড়া নতুন শহরে, নতুন সুযোগ। অতএব, জীবন-জীবিকার তাগিদে দেশান্তরে বাধ্য হন তারা।

এই পরিযায়ী মানুষের একাংশ কলকাতার উত্তরে এসে ওঠে। তৎকালীন ঘাট ও তদসংলগ্ন আখড়াগুলির সংস্পর্শে আসে তারা। সেখানে শরীরচর্চার পাশপাশি নিয়মিত মর্দন ও মালিশের রীতি ছিল। সে যুগে ঘাটগুলিতে বাবুদের নিত্য আনাগোনা হত। বিরতি-সুখে প্লাবিত কর্তারা স্নানের আগে কিছুটা জিরিয়ে নিতেন। কাঠের ছোট পাটাতনে উপুড় হয়ে শুতেন বাবু। প্রথমে তেল বুলিয়ে কিছুটা আলতো, এরপর রগড়ে রগড়ে চলত দলাইমালাই। ওই যার যেমন দরকার। এভাবেই রোজকার কড়চা ক্রমশ পেশার রূপ নেয়।

একসময় বাগবাজার, শোভাবাজার, কুমোরটুলি ও আহিরীটোলা ঘাটে রমরমা পসার ছিল। মালিশওয়ালারা নিয়মিত বসতেন। তবে কালের প্রবাহে সে সব আজ অতীত। কথা বলে জানতে পারলাম, ওখানে আর বিশেষ কেউ নেই। ‘হয়তো দু’একজন আছে বাবু। তাও কোনও গ্যারান্টি নেই। মালিশ নিতে গেলে আমাদের কাছেই আসতে হবে।’ বাবুঘাটের অধিকাংশই উড়ে। সবারই দেশের বাড়ি গ্রামে। বছরে কয়েকবার যান। কালেভদ্রে পরিবারের কেউ কেউ আসে।
এক্ষেত্রে গবেষক সুকুমার সেনের উক্তি মনে পড়ে যায়। কথাগুলি প্রাসঙ্গিক। ‘শহর কলিকাতা ইংরেজ-প্রতিষ্ঠিত নয়, বাঙালী-প্রতিষ্ঠিতও নয়, আপনি গড়ে ওঠা-তবে ইংরেজ ও বাঙালীর হাতাহাতি সাহায্যে। (পাঠককে এখানে সাবধান করে দিই। এখানে বাঙালী বলতে অন্য প্রদেশের লোককেও বুঝতে হবে-যারা অন্তত দু-তিন পুরুষ যাবৎ বাংলা দেশে অথবা কলিকাতায় উপনিবিষ্ট)’।

মালিশওয়ালাদের এই বিদ্যাই তাদের সব। এটি কোনও স্পা বা আধুনিক প্রতিষ্ঠান প্রাপ্ত নয়। বরং পরম্পরাগত লৌকিক জ্ঞান (vernacular anatomical knowledge)। প্রধানত গুরু-শিষ্য প্রথায় বা বংশ পরম্পরায় তা লব্ধ হয়। এই মর্দন প্রক্রিয়ার কিছু বিশেষ নিয়ম আছে। যথা হস্তচালনা, ঘর্ষণ, চাপ প্রয়োগ ও অস্থিসন্ধির সঞ্চালন। মালিশ শুরুর আগে পরনের যা কিছু (অন্তর্বাস বাদে) খুলে দড়িতে রাখতে হয়। এরপর গ্রাহককে উপুড় করে, পিঠে মেরুদণ্ডের দুপাশ বরাবর উপর থেকে নিচে ও ক্রমে নিচ থেকে উপর চাপ দিয়ে, দীর্ঘ টানে তেল ঘষা হয়। এভাবেই চলে বেশ কিছুক্ষণ। এরপর এক এক করে হাত, পা, তালু ও চেটো। মালিশের তেল বলতে সর্ষের তেলই প্রধান। অবশ্য হালফিলে অলিভ ওয়েলও চলে।

দীর্ঘক্ষণ কাজের ফলে প্রায়শই মানুষের কাঁধ ও ঘাড় (trapezius and rhomboid muscles) শক্ত হয়ে যায়। এসবেরও বিহিত আছে মালিশওয়ালাদের। পেশি শিথিল করতে বুড়ো আঙুলের সাহায্যে তারা বৃত্তাকার চাপ দেয়। এটিকে বলে Thumb Kneading। অনেক সময় কনুই দিয়েও মালিশ করা হয়। এই পেশার সবটাই অভিজ্ঞতা। প্রজ্ঞা ও নৈপুণ্যে মালিশওয়ালারা শরীরের সুনির্দিষ্ট কিছু বিন্দু চিহ্নিত করেন। এরপর acupressure-র সাহায্যে, চাপ দিয়ে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করা হয়। এতে সামগ্রিক ক্লান্তি দূর হয়ে ঘুম খোলে। ‘আচ্ছা, কতদিন হল আপনারা এখানে আছেন, বা কাজ করছেন?’ এই প্রশ্নে একজন জানান, ‘আমার বয়স এখন ৫৬। বাবাকে দেখতাম খুব ছোট থেকে। দেখে দেখেই সব শিখেছি। এবার হিসেব করে নিন।’
বাবুদের কাল আর নেই। সেই মেজাজও অতীত। আধুনিক স্পা, পার্লারের যুগে চাহিদা কমেছে মর্দনকারীদের। তাছাড়া পাড়ার সেলুনগুলিতেও মালিশ করা হয়।
এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে নাটকীয় দিক হল হাড় ফাটানো বা bone cracking। ঘাড়, আঙুলের ‘চটকা’র পাশাপাশি মেরুদণ্ডের রগড়ও দেখার মতো। এখানে গ্রাহককে সোজা করে বসিয়ে তার হাত দুটি মাথার পিছনে লক করা হয়। এরপর মালিশওয়ালা পিঠে হাঁটু ঠেকিয়ে পিছনের দিকে টানেন। এভাবে শিড়দাঁড়ার কশেরুকাগুলি (vertebrae) প্রসারিত হয় ও আড়ষ্টতার উপশম ঘটে। ভাবুন একবার! কীভাবে যুগের পর যুগ কলকাতার এই ঘাটগুলিকে সচল রেখেছেন এঁরা। চোখে না দেখলে বোঝানো কঠিন।
অবশ্য সব কঠিনেরই কিছু অধিক থাকে। এক্ষেত্রে তা সময়। বাবুদের কাল আর নেই। সেই মেজাজও অতীত। আধুনিক স্পা, পার্লারের যুগে চাহিদা কমেছে মর্দনকারীদের। তাছাড়া পাড়ার সেলুনগুলিতেও মালিশ করা হয়। ফলত বিশ্বায়নের এই ব্যস্ততায়, ক্রমশ কোণঠাসা এই প্রান্তিক গোষ্ঠীরা। মালিশওয়ালাদের আয়ের কোনও স্থিরতা নেই। ‘এখন রেট কত নেন?’, ‘ওই পাঁচশো টাকা বাবু।’, ‘পাঁচশো টাকায় ফুল বডি? কতক্ষণ করেন? আধঘণ্টা?’ পা ঘষতে ঘষতেই কিছুটা তাকালেন উনি। ভদ্রলোক প্রৌঢ়। চুলে কলপ করলেও বলিরেখা দৃশ্যমান। সামান্য হেসে বললেন, ‘ওই আর কী। যতক্ষণ দরকার মনে হয়, করে যাই।’

এঁদের প্রত্যেকেরই বাঁধাধরা কিছু খদ্দের আছে। বছরের পর বছর শুধু তাদের কাছেই আসে। তবু সবকিছুর পরেও, অনটনের অঙ্ক যেন রয়েই যায়। ‘বাজার একদম ভাল যাচ্ছে না। কোভিডের আগে তাও কিছু ছিল।’ তাদের বক্তব্যে আজ আশঙ্কা। সত্যিই তো, একালের দুর্মূল্যে কি ঘর চলে? উপরন্তু দৈনিক চাহিদাও অনিশ্চিত। এটি সম্পূর্ণ আবহাওয়া ও স্নানযাত্রী সংখ্যার উপর নির্ভরশীল। কিছু বিশেষ পরবে আয় বাড়ে। যেমন, মকর সংক্রান্তি ও গঙ্গাস্নান। এভাবেই কাটে দিনের পর দিন।
এই দোলাচল থেকে মুক্তি পেতে, অনেকেই বেছে নিয়েছেন বিকল্প পথ। বিশেষত নব প্রজন্ম। তাদের অধিকাংশই স্ব-পেশা থেকে বিমুখ। ‘আমাদের ছেলেরা আর আসতে চাইছে না। যেমন আমার ছেলেই আসেনি।’ ওদের স্বরে আক্ষেপ। তবু এহেন সঙ্কটকালেও তারা দৃঢ়। হার মানতে নারাজ। তাদের বক্তব্য, ‘যে আসতে চাইবে আসবে বাবু। তবে আমরা যতদিন আছি, করে যাব!’

তথ্যটি অপ্রিয় হলেও, এই পেশার অবস্থা আজ ভীষণ বিপন্ন। উত্তর কলকাতার ঘাটের এই মালিশওয়ালারা কেবলমাত্র পেশাজীবী নন। বরং শহরের বহুমাত্রিক, ঔপনিবেশিক ও পরিযায়ী ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। ফলত, বর্তমান ও অতীত রক্ষণে মানুষের উচিত এগিয়ে আসা। অন্তত দেশের স্বার্থে, দশের স্বার্থে; যাতে উত্তর-প্রজন্মের সাক্ষ্য শুধুই গল্প, সিনেমা বা রচনাতেই আবদ্ধ না থেকে যায়।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত